ড. নীলিমা ইব্রাহিম- একটি নক্ষত্র

প্রকাশিত: ৯:০১ অপরাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২০

ড. নীলিমা ইব্রাহিম- একটি নক্ষত্র

রঞ্জন মল্লিক :; ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন নীলিমা রায় চৌধুরী। পিতা ছিলেন প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী আর মাতা কুসুম কুমার দেবী। পিতা খুলনার বিশিষ্ট উকিল ছিলেন। পূর্বপুরুষ জমিদার বংশের ছিলেন।

নীলিমা রায় চৌধুরীর বাল্য কিংবা শিক্ষা জীবন দারুণ গৌরবোজ্জল। ১৯৩৫ সালে চারটি বিষয়ে লেটার নম্বর নিয়ে ম্যাট্টিক পাশ করেন। বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে প্রথম শ্রেণি লাভ করেন। তীক্ষ্ম মেধার অধিকারী সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিকায় উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটক, উক্ত বিষয়ে ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।

তিনি ১৯৪৫ সালে ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে বিবাহ করেন। অতপরঃ তিনি নীলিমা ইব্রাহিম নামেই সমধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন। পারিবারিক জীবনে তিনি পাঁচ কন্যা সন্তানের জননী।

নীলিমা ইব্রাহীমকে কিভাবে মূল্যায়ন করব? কারণ তার কর্মের ব্যাপ্তি বিশাল। পার্থিব জীবনের যে দিকে দৃষ্টিপাত কার যায় সেদিকেই তিনি উজ্জ্বল তারার মতো দেদীপ্যমান। শিক্ষায়, সাহিত্যে, সমাজ সেবায়, অর্থনীতি চিন্তায়, রাজনীতির বাস্তবতায় এবং নারীর সঠিক পরিচয় নির্ণয়ে তার আছে নিরলস সাধনা।
ষাটের দশকটি ছিল বাংলাদেশের (তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান) জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক কাল। এ সময় থেকেই বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে। সেই সময়টিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নীলিমা ইব্রাহিমের আগমন। ১৯৫৬ সালে প্রভাষক পদে বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। তারপর শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে নানাবিধ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

ষাটের দশকের শুরু থেকেই বেশকিছু উপন্যাস যেমন: বিশ শতকের মেয়ে, একপথ দুই বাঁক, কেয়াবন সঞ্চারিণী প্রকাশিত হয়। তাছাড়া নীলিমা ইব্রাহিমের বেশকিছু প্রবন্ধ এ সময় সাহিত্যিক সমাজে তোলপাড় সৃষ্টি করে। শরৎ প্রতিভা, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, বাংলার কবি মধুসূদন এবং তার গবেষণাধর্মী বই উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ ও বাংলা নাটক সুধিমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। তিনি শক্তিশালী লেখিকা হিসেবে নিজের আসনটি পোক্ত করেন। এসব উপন্যাস ও প্রবন্ধে তিনি সমাজ সচেতনা কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে নারীদের মনের কথা বলার চেষ্টা করেন।

পুরুষের পাশাপাশি নারীর স্বাবলম্বী হবার দৃষ্টিভঙ্গীর কথাই যেন তার গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় ছিল। তিনি দেখতে চেয়েছেন, নারীরাও মাথা উচু করে হেঁটে চলবে। মেরুদণ্ড যেন বাঁকা না হয়। যে নারী উপার্জন করে পুরুষ তাকে অবজ্ঞা করতে শতবার চিন্তা করে- এ কথাটি তিনি বিভিন্নভাবে প্রবন্ধ ও উপন্যাসে উপস্থাপন করে পাঠকের চিন্তাকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন। নারীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ, তার স্বাধীন সত্ত্বার উন্মোচন এবং সমাজে নারীর যথাযোগ্য স্থান নির্ণয়ের প্রয়াস পেয়েছেন তিনি। তবে তিনি নারীবাদী লেখিকা নন। সমাজে অসম বিকাশের জন্য নারী মুক্তির ক্ষেত্রে যে অচলায়তনের সৃষ্টি হয়েছে তা ভেঙ্গে নারী পুরুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও আত্মসস্মান সম্পন্ন জীবন লাভই তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। সেদিক থেকে তিনি এক মানবতাবাদী লেখক। বিশ শতকের মেয়ে, কেয়াবন সঞ্চারিনী প্রভৃতি উপন্যাসে তিনি নারীকে স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তার বিশ্বাস নারী পুরুষের মিলিত প্রয়াসেই মানবমুক্তি সম্ভব।

তিনি রাজনৈতিক সচেতন শিক্ষক ছিলেন। তাই পাকিস্তান সামরিক সরকারের বাঙালি দলন নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন বারবার। ১৯৬১ সালে কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকী পালনকে পূর্ব পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করলে তিনি এর বিরোধিতা করেন। ১৯৬৪ দাঙ্গায় নিপীড়িত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং আধুনিক বাঙালি জাতীয়তা চেতনায় একদল নতুন সাহিত্য ও সংস্কৃতিক কর্মী তৈরির কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বাংলা বিভাগের সেই আদর্শবাদী, বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের ব্রতী, অঙ্গীকার দীপ্ত অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিম বিপুল ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন।

নীলিমা ইব্রাহিমের জ্যেষ্ঠ কন্যা মঞ্জুরা কবীর সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ”বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় থাকার সময় আমাদের বাড়িটা ছিল বহু ছাত্রছাত্রীর অস্থায়ী আস্তানা। আজকের বহুনামী দামী নেতারা তখন ছিলেন ছাত্রনেতা। মা ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন মহিলা। সেই উনসত্তরের ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফার দিনে মা উদার হস্তে তার ছাত্রদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। ছাত্রছাত্রীরা সারাদিন মিটিং মিছিল সত্ত্বেও ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে চলে আসতো মায়ের কাছে। থাকা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার প্রচণ্ড আশাবাদী মনের স্পর্শে উজ্জীবিত হতো তারা। আমার আজ মনে পড়ে, কি চরম স্নেহে মা এসব ছাত্রদের ভালোমন্দের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। নীলিমা ইব্রাহিম সাহসী ছিলেন, তাই পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা নজরদারিকে তোয়াক্কা করতেন না।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নীলিমা ইব্রাহিম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে আত্মগোপন করেন। এ সময় আকাশবাণী থেকে প্রচার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়েছে। সংবাদটি প্রচারিত হবার কিছুদিন পর জুনের শেষদিকে যুদ্ধের মধ্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফিরে আসেন তিনি। এ সময় পাকিস্তান সরকারের প্রযোজন ছিল নীলিমা ইব্রাহিমকে বাঁচিয়ে রাখা। তবুও তিনি পাকিস্তানী খানসেনাদের মুখোমুখি হয়েছেন অসংখ্য বার। পাকিস্তানি খানসেনার তার বাড়ি সার্চ করতে এসেছিল। তখন চার মেয়ে ও মেঘনা গুহ ঠাকুরতা ( শহীদ অধ্যাপক জ্যোতিময় গুহ ঠাকুরতার মেয়ে) ফুলার রোডের শিক্ষক কোয়ার্টারে ছিলেন। আর্মি ক্যাপ্টেন বাড়ি সার্চ করতে উদ্যত হলে তিনি শান্ত গলায় বলেন বাড়িতে আমার মেয়েরা আছে, কোনো পুরুষ মানুষ নেই। কি ভেবে সেদিন মিলিটারিরা বাড়ি সার্চ না করে চলে যায়। তাছাড়া তাকে হেনস্থা করার জন্য ক্যান্টনমেন্ট থেকে তার নামে চিঠিও আসে। নীলিমা ইব্রাহিম এসব ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে নিজের গাড়ি চালিয়ে ঢাকা শহর ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। পাকিস্তানি সৈন্যদের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করতেন এবং ভাবতেন একদিন দেশ স্বাধীন হবেই।
স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠিত হলে নীলিমা ইব্রাহিম একজন সম্মানিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন। শ্রদ্ধেয় বিচারপতি কে এম সোবহান এর প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। নীলিমা ইব্রাহিমের এই কাজের বিশাল অভিজ্ঞতার খানিকটা ফসল আমরা পেয়েছি তার অমূল্যগ্রন্থ” আমি বীরঙ্গনা বলছি” এর মাধ্যমে। এই বইয়ের মাধ্যমে ৭১ এর যুদ্ধে লাঞ্ছিত বাঙালি নারীর কান্না-দুঃখ- শোকের ইতিহাসই কেবল পাই না, এখানে এক নারীর মানবাধিকার সচেতন শক্তিশালী লেখককে আমরা খুঁজে পাই। আমি বীরঙ্গনা বলছি- এই গ্রন্থের ভূমিকায় লেখিকা শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন: ১৯৭২ সাল যুদ্ধ জয়ের পর যখন পাকিস্তানি বন্দীরা ভারতের উদ্দেশ্যে এ ভূখণ্ড ত্যাগ করে তখন আমি জানতে পারি প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ জন ধর্ষিতা নারী এ বন্দিদের সঙ্গে দেশ ত্যাগ করছেন। অবিলম্বে আমি ভারতীয় দূতাবাসের সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার অশোক ডোরা এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত মরহুম নুরুল মোমেন খান যাকে আমি মিহির নামে জানতাম তাদের শরণাপন্ন হই। উভয়েই একান্ত সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে এসব মেয়েদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ আমাদের করে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নওসাবা শরাফী, ড. শরীফা খাতুন ও আমি সেনানিবাসে যাই এবং মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা লাভ করি। পরে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে নারকীয় বর্বরতার কাহিনী জানতে পারি। সেই থেকে বীরঙ্গনাদের সম্পর্কে আমার আগ্রহ জন্মে। এ ক্ষুদ্র গ্রন্থে সে আগ্রহের খণ্ডাংশ মাত্র।

তার এই ভূমিকা থেকেই পাঠক বুঝতে সক্ষম পাকিস্তানিরা আমাদের মা-বোনের ইজ্জতের উপর কি বীভৎস্য হামলা চালিয়েছিল। বইটি একটি প্রামাণ্য দলিল, তাই বইটি সর্বত্র পঠিত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার কথা ভুলতে পারি কি?
বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭৪ সালে নীলিমা ইব্রাহিম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন। একাডেমির অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা দৃঢ় হাতে দূর করেছিলেন। মকবুল নামে এক ভণ্ড খাদেম বাংলা একাডেমির চত্বর দখল করেছিল। প্রথমে ছিল একটি কবর এবং তার পাশে মাত্র চার শতক জায়গা। মকবুলের হাতের কারসাজিতে তা বেড়ে হয়ে গেল একশত চুয়াল্লিশ শতক। আর একটু চাপ দিলেই আরও জায়গা বেড়ে বাংলা একাডেমিকে গ্রাস করে। প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে দৃঢ় হাতে ভণ্ড মকবুলকে উচ্ছেদ করতে পেরেছিলেন সেদিন।
১৯৭২ সালে থেকে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভাপতি ছিলেন। এ সময় থেকে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী মহিলা আবাস চালিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন মহিলা সমিতি মিলনায়তন। সত্যি কথা বলতে কি, তার উৎসাহে এই মিলনায়তন মঞ্চে নিয়মিত নাটক উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বিরাট অবদান রেখেছিলেন। পরে মহিলা সমিতি ভবনের উপর তলায় একটি সেমিনার কক্ষ চালু করেছেন। যেখানে সৃজনশীল বিষয়ের চর্চার জন্য সেমিনার কক্ষ উন্মুক্ত করে দেন।

নীলিমা ইব্রাহিমকে একবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শেষ দিকে ১৯৯৫ সালে। একটি লেখার জন্য সরকার রাষ্ট্রবিরোধী মামলা ঠুকে দিল। নীলিমা ইব্রাহিমের বাসায় পুলিশ খুঁজতে গিয়েছিল, পায়নি। তিনি অসুস্থ ছিলেন, তাই আগাম জামিনের জন্য হাইকোর্টে গেলে সেখান থেকে নানা টালবাহনায় প্রত্যাখ্যাত হন। নিম্ন আদালত থেকে জামিন আনার কথা বলা হয়। সেই করুণ ও হƒদয় বিদারক কাহিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। স্বাধীন দেশে একজন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ও কলম সৈনিকের এই অবস্থা। সাংবাদিক কাজী শাহেদ আহমেদও আসামি ছিলেন। তিনি বলেন, নীলিমা ইব্রাহিম মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত লিখে গেছেন। লেখার ক্ষেত্রে তার জুড়ি ছিল না। এদেশে সৎ থাকলে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তিনিও পড়েছিলেন।
২০০২ সালের ১৮ জুন তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার কাজ ও আদর্শকে স্মরণ করি বারবার।
সুত্র : যুগান্তর

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ