তার ধ্যানজ্ঞান ছিল সাংবাদিকতা

প্রকাশিত: ১১:০১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২১

তার ধ্যানজ্ঞান ছিল সাংবাদিকতা

মনজুরুল আহসান বুলবুল

সমকালের প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রিয় সারওয়ার ভাই ছিলেন আমার সম্পাদক, আন্দোলন-সংগ্রামের সহযোদ্ধা, সাংবাদিকতার শিক্ষক ও অভিভাবক। তার সঙ্গে আমার অসাধারণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। জীবদ্দশায় তার জন্মদিনে অফিসে গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতাম। পারিবারিকভাবে বড় পরিসরে তার জন্মদিন উদযাপন না হলেও আমরা অফিসে স্বল্প পরিসরে তার জন্মদিন উদযাপন করতাম। সারওয়ার ভাইয়ের ৭৯তম জন্মদিনে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
একসঙ্গে কাজ করার অনেক আগে থেকেই সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। তিনি তখন ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক। তাকে খুব শ্রদ্ধা করতাম, দেখা হলেই কথা বলার চেষ্টা করতাম। সংবাদে কাজ করতাম বলে তিনিও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। বলতেন, সংবাদ আমারও প্রতিষ্ঠান, আমি সংবাদে কাজ শুরু করেছিলাম। তারপর নানা সময়ে ইত্তেফাকে যাব কি যাব না তা নিয়ে কথা হয়েছে।
সংবাদের বার্তা বিভাগের দায়িত্ব যখন নিই, তখন আমি ছিলাম দেশের সংবাদপত্রশিল্পের তরুণতম বার্তা সম্পাদক। ফলে আমার পরামর্শের প্রয়োজন ছিল। সংবাদের অনেকেই আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে আমার এক ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয় ইত্তেফাকের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের ওপর। ইত্তেফাক কীভাবে হেডলাইন করে, কোন ছবি বড় করে ছাপে, প্রথম পাতার নকশা কেমন করে এসব বুঝতে প্রতিদিন পত্রিকাটি দেখতাম। সারওয়ার ভাই বিষয়টি বুঝতে পারতেন। ইত্তেফাকের সবাই জানেন, পরবর্তীকালে পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও কীভাবে বেড়ে গিয়েছিল। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আমি অথবা সারওয়ার ভাই ফোন করতেন। নিউজ, ছবি ও মেকআপ সম্বন্ধে আমরা মতবিনিময় করতাম।
সারওয়ার ভাই শুধু আমাকে স্নেহই করতেন না, আমার সাংবাদিকসুলভ মেধারও মূল্য দিতেন। তিনি একবার এক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। যাওয়ার আগে ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগের সহকর্মীদের বলেন, আমার সঙ্গে যেন প্রতিদিন যোগাযোগ রাখে। তার কথামতো ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগের শাহাবউদ্দিন ভাই, বাতেন ভাই আমাকে ফোন করতেন। এভাবে আমাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের দিক থেকে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছিল বয়সের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও। অনেকটা শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কের মতো। ছাত্র শিক্ষককে সম্মান করবেনই, কিন্তু শিক্ষক যখন ছাত্রকে মর্যাদা দেন তখন সেই ছাত্র উজ্জীবিত হয়।
সারওয়ার ভাই বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সময় আমাকে সঙ্গে নিতেন। তখন আমার গাড়ি ছিল না। আমরা একসঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যেতাম, বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা বড় আলোচনা সভায় অংশ নিতাম। এভাবে আমাদের পেশাদারিত্বের নির্ভরশীলতার সম্পর্কটি একসময় ব্যক্তিগত নির্ভরশীলতার জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আমি সাংবাদিক ইউনিয়ন করতাম। সাংবাদিকতা সম্পর্কিত কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে মতবিনিময় করতাম। তিনি তার মতো করে আমাকে পরামর্শ দিতেন। আমি তার পরামর্শ অবশ্য পালনীয় মনে করতাম। কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সারওয়ার ভাইয়ের বড় ভূমিকা থাকত, তবে অনেকেই সেটি বুঝতে পারতেন না। তিনি যখন প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক বিভিন্ন আলোচনায় নেতৃত্ব দিতেন, সারাদিন আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক কথা বলতাম। কিন্তু রাতে অবধারিতভাবে হয় আমি তাকে ফোন করতাম অথবা তিনি আমাকে ফোন করতেন। আমি এখনও সম্মানিত বোধ করি- সারওয়ার ভাই যেকোনো ইস্যুতে অনেক মানুষের মতামত নিতেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমার মতামত জানতে চাইতেন। বিভিন্ন জায়গায় ভালো সাংবাদিকদের নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, তরুণ নিজউম্যানদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে মনজুরুল আহসান বুলবুল একজন। আমার জন্য এটা বিশাল প্রাপ্তি।
পরবর্তীকালে আমরা যুগান্তরের পরিকল্পনা থেকে প্রকাশনা পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করেছি। প্রায় প্রতিনিয়ত আমাদের মধ্যে মতবিনিময় ও আলোচনা হতো। মনে আছে, যুগান্তরের প্রথম সংখ্যা কেমন হবে তা প্রকাশের আগের দিন দুপুরে আমরা ঠিক করে ফেলি। সেদিন নারায়ণগঞ্জের কাছে দুই পীরের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কয়েকজন মুরিদ নিহত হয়েছিল। সারওয়ার ভাই শীর্ষ শিরোনাম ঠিক করলেন- ‘পীরে পীরে লড়াই, মুরিদের রক্তক্ষয়’। দুপুর ২টার সময় ‘হেডলাইন’ ঠিক করা হয়েছিল যাতে বিকেল ৪টার মধ্যে পত্রিকা ছাপানো শুরু করা যায়। আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রথম সংখ্যায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ পত্রিকা পাঠকের কাছে পৌঁছানো। কিন্তু ওইদিন সন্ধ্যায় সে সময়ের বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বৈঠক ছিল। বৈঠকটি রাজনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি মিটিংয়ে সারওয়ার ভাইকে বললাম, তিন লাখ বা সাড়ে তিন লাখ পত্রিকা ছাপাতে হবে এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পাঠক কিন্তু আগামীকালের পত্রিকায় গতকালের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জানতে চাইবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাদের বৈঠকের সংবাদ না দিতে পারলে পাঠক প্রথম দিনেই বলবে- যুগান্তর একটি ভালো পত্রিকা বটে, তবে প্রথম সংখ্যায় একটি বড় সংবাদ মিস করেছে। মুশকিল হলো, ওই বৈঠক শেষ হতে রাত ৯টা বেজে যাবে। তখন আমরা চিন্তিত হলাম, যদি রাত ৯টায় ছবি আর নিউজ আসে তাহলে ছাপা শুরু করতে ১০টা বেজে যাবে। রাত ১০টার দিকে ছাপা শুরু করে রাত ৩টার দিকে শেষ করা কঠিন হবে। রাত ৩টার মধ্যে ছাপা শেষ না হলে সারাদেশে পত্রিকা পাঠানো সম্ভব হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে সারওয়ার ভাই সম্পাদক হিসেবে তার সিদ্ধান্তের জায়গায় ঠিক থাকলেন, আবার আমার মতামতও গ্রহণ করলেন। রিপোর্টের অর্ধেক তৈরি করে রাখা হলো। শুধু বৈঠকে কারা কারা উপস্থিত ছিলেন আর কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি কী আশ্বাস দিয়েছেন এসব লেখার জন্য ওপরের তিন-চারটা প্যারার জায়গা রাখা হলো। বঙ্গভবনে ফটোসাংবাদিককে রাখা হলো নেতাদের বেরিয়ে আসার ছবি পাওয়ার জন্য। দ্রুততম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈঠকের খবরটি আমরা পরের দিনের পত্রিকায় ছবিসহ প্রকাশ করলাম।
আমরা মাঝেমধ্যে শুনি সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও চিফ রিপোর্টারের সিদ্ধান্তের বাইরে বার্তা কক্ষে কিছু হয় না। অবশ্যই তাদের মতামতের গুরুত্ব আছে, কিন্তু বার্তা কক্ষে একজন জুনিয়র রিপোর্টারেরও মূল্য আছে। একজন জুনিয়র রিপোর্টার যদি শেষ মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসেন, যা আগামীকালের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ তাহলে কিন্তু সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক বা চিফ রিপোর্টার তাদের পদাধিকার বলে জুনিয়র রিপোর্টারের রিপোর্টটিকে বাতিল করতে পারেন না। বস্তুত সংবাদপত্র একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। সারওয়ার ভাই এ বিষয়টি গুরুত্ব দিতেন, টিম ওয়ার্কে বিশ্বাস করতেন। আমরা জানতাম তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, কিন্তু তিনি আমাদের মতামত গুরুত্ব দিতেন। সবাইকে গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়ার প্রবণতা থেকে তিনি একজন সফল বার্তা সম্পাদক, সফল টিম লিডার ও সফল সম্পাদকে পরিণত হয়েছিলেন।
সারওয়ার ভাইয়ের ধ্যানজ্ঞান ছিল সাংবদিকতা; কিন্তু আগ্রহ ছিল বহুমাত্রিক। তিনি সাংবাদিকতার বিভিন্ন স্তরে কাজ করলেও তার দুর্বলতা ছিল খেলাধুলা, সিনেমা ও সংগীতের প্রতি। বড় ম্যাচের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাংলাদেশের ম্যাচে তিনি মনোযোগসহ খেলাটি দেখতেন। আমাদের ক্রীড়া প্রতিবেদকরা জানতেন আজকের খেলার প্রতিবেদনটি সারওয়ার ভাই নিজে দেখবেন। তিনি সিনেমার প্রতি দুর্বল ছিলেন। বাংলা সিনেমা তো বটেই, বোম্বে সিনেমারও খোঁজখবর রাখতেন। কোন সিনেমা বেশি হিট হয়েছে, কোন নায়ক বা নায়িকা ভালো করছেন তা বিস্তারিত জানতেন। তিনি অনেক গান শুনতেন। তার এবং আমার প্রিয় সংগীত ‘আমি কান পেতে রই’ ছিল তার মোবাইল ফোনের রিংটোন। রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি ঝোঁক ছিল তার; সংবাদ শিরোনাম করার সময় এর প্রতিফলন ঘটতো।
সারওয়ার ভাই একজন কিংবদন্তি সম্পাদক ছিলেন। কিংবদন্তি সম্পাদক হওয়ার জন্য বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে যে ধরনের যোগাযোগ থাকা দরকার তা তার ছিল। রাজনীতি, ক্রীড়াঙ্গন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, বাণিজ্যসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। একজন সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক বা চিফ রিপোর্টারের বড় সম্পদ হলো তিনি কত বেশি মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ, একজন প্রতিবেদক যে রিপোর্ট করেন সেই রিপোর্টটি সঠিকভাবে সম্পাদনা করার জন্য সম্পাদক বা বার্তা সম্পাদকের অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা দরকার। সারওয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে আমরা এই যোগাযোগের শিক্ষা পেয়েছি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন সারওয়ার ভাই, আমি ও মিলন ভাই (হাবিবুর রহমান মিলন) প্রেস ক্লাব থেকে বের হয়ে অবধারিতভাবে বিরোধী দলগুলোর সমাবেশে যেতাম। আমরা বক্তব্য শুনতাম, সমাবেশে অংশ নেওয়া জনতার সংখ্যা দেখতাম। এর ফলে সমাবেশের সংবাদগুলো সম্পাদনা করা সহজ হতো। সারওয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি, যতটুকু সম্ভব ঘটনা প্রত্যক্ষ করা দরকার।
সারওয়ার ভাই ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। শিশুর সারল্যে ভরপুর একজন মানুষ ছিলেন। হাসিমুখে কথা বলতেন। দ্রুত রাগ করতেন, আবার দ্রুত সেই রাগ প্রশমিতও হতো। সারওয়ার ভাইয়ের জন্মদিনে আমরা একজন ভালো মানুষের প্রতি, একজন রুচিশীল মানুষের প্রতি, একজন শিক্ষিত দায়িত্বশীল সম্পাদকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি; দৈনিক সংবাদের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ