তাহিরপুরে বিজয় দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০১৯

তাহিরপুরে বিজয় দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের

সিল-নিউজ বিডি-ডেস্ক :: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত বিজয় দিবসে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ।

বুধবার (৪ ডিসেম্বর) উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে তাহিরপুর মুক্ত দিবসের আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন।

মুক্তিযোদ্ধারা অভিযোগ করে বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট (বড়ছড়া) সাব সেক্টরের অসংখ্য বীরের স্মৃতি বিজড়িত ট্যাকেরঘাট ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ সরকারি কয়েক কোটি টাকার জমি স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান শামীম আহমদ তালুকদার ও তার আত্মীয়-স্বজনের দখলে আছে। এসব জমি উদ্ধারের দাবিতে এমন ঘোষণা দেন বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট (বড়ছড়া) সাব সেক্টরের বীরমুক্তিযোদ্ধাগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ঠিকতে না পেরে ৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী তাহিরপুর ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ দিবসটি সামনে রেখে বুধবার (৪ ডিসেম্বর) তাহিরপুর উপজেলা সদরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে বিজয় র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালি শেষে থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনের সামনে উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের  পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ , গণমাধ্যমকর্মী ও জনপ্রতিনিধিগণের অংশগ্রহণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের দাবি তুলে ধরে বলেন, প্রতিবছর বিজয় দিবসে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কাল হতে প্রতি বছর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’এ বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে সংবর্ধনা প্রদান করা হত। আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ পালিত হত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোক দিবস। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় দিবস পালন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক সভা সমাবেশ, অনুষ্ঠানমালাও আয়োজন করা হত। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ৫নং সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ কয়েক কোটি টাকার সরকারি সম্পদ, দখলে নিয়ে রেখেছেন স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সন্তান তাহিরপুরের তরং গ্রামের প্রয়াত রাজাকার আব্দুর রউফ তালুকদারের ছেলে শামীম আহমদ তালুকদারসহ বেশ ক’জন প্রভাবশালী।

গত চার বছর ধরে এ দখল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগপত্র দেয়া হয় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনারের (ভূমি)বরাবর। কিন্তু অদৃশ্য কারণে দখল হওয়া সরকারি জমি ও ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধার কেবল নোটিশেই সীমাবদ্ধ রেখেছে প্রশাসন।
মুক্তিযোদ্ধাগণ আরও বলেন, উপজেলার তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত এসএ ও আরএস দাগে ৭৬.৩৬ একর সরকারি জমি রয়েছে। ওই মৌজার ওই দাগে খতিয়ানের থাকা প্রায় এক একর জমি জুড়ে থাকা ’৭১-এর মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশ স্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন, ভবনের ভেতর থাকা জিনিসপত্রসহ জমি দখলে নেন প্রয়াত রাজাকার দালাল আবদুর রউফের ছেলে শামীম আহমদের নেতৃত্বে থাকা একদল ভূমিখেকোচক্র।

২০১৫ সালে রাতের আঁধারে ব্যক্তি মালিকানাধীন নাম সর্বস্ব একটি কিন্ডারগার্টেনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। পরে জনসমাগম ও প্রশাসনের দৃষ্টি আড়াল করতে জনগণের চলাচলের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটিও বন্ধ করে দেয়া হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় দিবসের প্রারম্ভে দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজাকার পুত্রের দখল হতে ‘মুক্তির মঞ্চ’ ও সরকারি জমি, শ্রমিক ইউনিয়ন, শ্রমিক কর্মচারী ক্লাব ক্যান্টিনসহ যাবতীয় মালামাল উদ্ধারের দাবি জানান। তারা বলেন, অন্যথায় বিজয় দিবসে প্রশাসনের আয়োজনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জন করতে বাধ্য হবেন তারা।
এছাড়াও মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে ট্যাকেরঘাটে থাকা ‘মুক্তির মঞ্চ’এ সংবর্ধনা প্রদানসহ বিজয় দিবসের সবধরনের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন করাও দাবি জানান।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডিজেন ব্যাণার্জীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার হাজি নুরুল মোমেন, সাবেক থানা কমান্ডার হাজি রৌজ আলী, রফিকুল ইসলাম,উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুস ছোবাহান আখঞ্জি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী মর্তুজা, নুরুল আমিন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান বিপ্লব, সোহেল প্রমুখ। এছাড়াও অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়ন সংসদ কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা নুর মাহমুদ বললেন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৫নং সেক্টরের ট্যাকেরঘাট (বড়ছড়া) এ সাব সেক্টরের অধীনে অসংখ্য মুক্তিকামী বীরসেনার অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টর মুক্তিযুদ্ধের এ তীর্থ ভূমিতে রয়েছে শহীদ সিরাজ বীর উত্তম সহ নাম না জানা বহু বীর শহীদগণের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের গণকবর ।
তিনি বলেন, আমাদের  আবেগ ও  মুক্তিযুদ্ধের  ইতিহাস ঐতিহ্যের মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশ স্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন টিনশেড বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ করে রেখে বাইরে কিন্ডারগার্টেনের সাইনবোর্ড ঝুলালেও মূলত ভেতরে রাজাকার পুত্র শামীম ও তার সহচররা ভবনগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া প্রদান, গরু চড়ানোর মাঠ, মালবাহী লরি পিকআপ ভ্যান রাখা, নিজেদের ব্যক্তিগত অফিস হিসাবেই ব্যবহার করে আসছেন।

এ ব্যাপারে শামীম আহমদ তালুকদারের দাবি তার প্রয়াত পিতা আব্দুর রউফ পাকিস্তানী সেনাদের দোসর ছিলেন না। যে জায়গা দখলের অভিযোগ করা হয়েছে সেখানে মুক্তির মঞ্চ বা মুক্তিযুদ্ধের কোনো কিছুই ছিল না।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডিজেন ব্যাণার্জী বলেন, উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মুক্ত দিবসের আলোচনা সভায় মুক্তিযোদ্ধাগণ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর প্রয়াত আব্দুর রউফের পুত্র শামীম আহমদ ও তার সহচরদের দখলবাজ আখ্যায়িত করেছেন। এবং মুক্তির মঞ্চসহ সরকারি জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের পূর্বেই মুক্তিযোদ্ধাগণের দাবির আলোকে ট্যাকেরঘাটে ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ সরকারি জমি দখলমুক্ত করণে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান ইউএনও।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ