‘তুই চিনিস আমি কে?’ ‘হ্যাঁ চিনি, আপনি বঙ্গবন্ধু’

প্রকাশিত: ২:৪৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২১

‘তুই চিনিস আমি কে?’ ‘হ্যাঁ চিনি, আপনি বঙ্গবন্ধু’

সাজলু লস্কর ::

পাভেল রহমান দেশের প্রখ্যাত একজন আলোকচিত্রী। তিনি শৈশব থেকে ছবি তুলতেন। এভাবেই শুরু হয়েছিল তার ছবি তোলার পথচলা। দেশ-বিদেশে তার ক্যামেরায় তোলা ছবি সাড়া জাগিয়েছে। তিনি আলোচিত হয়েছেন একজন আলোকচিত্রী হিসেবে।

সিলেট জেলা পরিষদ কতৃক আয়োজিত ‘বঙ্গবন্ধু উৎসবে’র দ্বীতীয় দিনে বঙ্গবন্ধুর এবং তার পরিবার বিভিন্ন ছবি প্রদর্শন করে তার সহজ সরল জীবনের গল্প তুলে দরেছেন। তিনি যখন একেকটি ছবি দেখাচ্ছেন তখন তার সামনে থাকা দর্শকরা চোখের জলে বুক বিজাচ্ছেন।

পাভেল রহমান বাংলাদেশের বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক। ১৪ কি ১৫ বছর বয়স থেকে একেবারে মৃত্যু অবধি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিখ্যাত কয়েকটি ছবি তুলেছেন
স্বাধীনতার পরপরই ক্যামেরাটি আমার সঙ্গের সাথী হলো, বাতি হলো। সেই স্কুল জীবন থেকেই ক্যামেরাটি নিয়ে রাস্তাঘাটে ছবি তুলে বেড়াই। মনে আছে, যখন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম ও ছাত্র ইউনিয়নের কনফারেন্সে (সম্মেলন) বঙ্গবন্ধু প্রথম এলেন ১৯৭৩ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে; তখন তার ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে গেলাম।

এই প্রথম হাত বাড়ালেই বঙ্গবন্ধুকে ধরে ফেলি, ছুঁতে পারি; এমন দূরত্বে কাছে চলে গেলাম। তখন তার ছবি তুলতে শুরু করলাম। এখন সেই ছবিগুলো দেখলে বুঝতে পারি বঙ্গবন্ধু খুব অবাক হয়ে দেখছিলেন, ১৪-১৫ বছরের একটি কিশোর, হাতে ক্যামেরা, ছবি তুলছি। খুব অবাক হয়ে আমার ক্যামেরা বা আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। সেদিন অনেক ছবির মধ্যে একটি অদ্ভুত ছবি তুলে ফেলি বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্র ইউনিয়নের পোস্টার প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে পোস্টারগুলো দেখছেন।

পাশে মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম, পেছনে তার প্রধান নিরাপত্তা অফিসার মহিউদ্দিন ভাই। তখন তার ছবি তোলার জন্য অনেক সিনিয়র ফটোগ্রাফার ছিলেনÑরশীদ তালুকদার, মোহাম্মদ আলম, গোলাম মাওলা তাদের সঙ্গে আমিও ছবি তুলছিলাম। কিন্তু সুযোগ খুব কম পাচ্ছিলাম, যেহেতু সিনিয়ররাই কাজ করছিলেন। মাঝে মাঝে সুযোগ মতো একটি, দুটি ছবি তোলার চেষ্টা করছিলাম।

সেগুলোর মধ্যেই অদ্ভুত ছবিটি পেয়ে গেলাম, যেটি তার নিরাপত্তা নিয়ে প্রধান এবং প্রথম প্রশ্ন তোলা ছবি। এরপর আর কোনো ছবি হয়নি। তিনি প্রদর্শনীটি দেখছিলেন, প্যান্ডেলের ভেতরে; দুটি টোকাই খালি গায়ে শামিয়ানার কাপড় তুলে বঙ্গবন্ধুকে দেখছিল। সেই একই ফ্রেমে বঙ্গবন্ধু আছেন, তার পায়ের কাছে ছেলে দুটি তাকে দেখে হাসছে। এই একটিমাত্র ছবি প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা বলতে কিছুই ছিল না।

না হলে তার এক হাত দূরত্বে কী করে দুটি টোকাই হাজির হয়? ছবিটি পরে ছাত্র ইউনিয়নের পত্রিকায় ছাপা হলো। তখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছাত্র ইউনিয়নে কাজ করতাম।

কিন্তু ছবিটি দেখে এখন প্রথম আলোর সম্পাদক মতি (মতিউর রহমান) ভাই, তখন তিনি সিপিবির (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) পত্রিকা একতার দায়িত্বে; আমাকে একতায় চাকরি দিয়েছিলেন।

সেই সুবাদেই খেলাঘরের শিশুদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তার ছবি তুলতে এলাম, ১৯৭৪ সালে। ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সেদিন ভোরে এসেছিলাম, খেলাঘরের শিশুরা বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানাতে আসছিল। সেদিনই বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র কামাল (শেখ কামাল) ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। জানতে চাইলেন, কোথায় কাজ করি? আবাহনীর ফটোগ্রাফি করতে চাই?

তখন আবাহনী বিরাট ব্যাপার। মনে আছে, সন্ধ্যায় আমরা আবাহনী থেকে সবাই বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে যাব, কামাল ভাই বললেন, ‘তুমি সকালেই ক্লাবে চলে এসো।’ সেদিন সকাল থেকে সময় আর কাটছিল না। খুব অস্থির ছিলাম। সন্ধ্যায় কামাল ভাইয়ের গাড়িতে তখনকার সুপারস্টার ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, নান্নুর সঙ্গে গাড়িবহর নিয়ে গণভবনে এসেছি।

চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসে, বঙ্গবন্ধু লনে একাকী আমাদের আবাহনী ক্লাবের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সময় দেওয়ার জন্য বসে অছেন। সূর্য কেবল ডুবে ডুবে, সন্ধ্যার আলোগুলো জ্বলে উঠছে; সবুজ লনে কামাল ভাই বঙ্গবন্ধুকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন; তিনি সবার সঙ্গে অল্প-বিস্তর কথা বললেন। কিন্তু কামাল ভাই হঠাৎ ‘পাভেল’, ‘পাভেল’ বলে ডাক দিলেন। ভাবলাম আমাকে বোধহয় কোনো ছবি তুলতে বলবেন। কিন্তু হার্টবিট কাঁপিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর দিকে আমাকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আব্বা, ও পাভেল, আমাদের আবাহনীর ফটোগ্রাফার।’

তিনি আরাম করে একটি চেয়ারে বসেছিলেন। একটু নড়েচড়ে বসলেন ‘তোদের আবাহনীতে ফটোগ্রাফার আছে নাকি?’ এই কথায় খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম। বুঝতেই পারছিলাম না, আমার মতো একটি পুঁচকে, যার পরিচয় দেওয়ার কিছুই নেই; কামাল ভাই কীভাবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মাপের মানুষের সঙ্গে?

তিনি আমার হাত ধরে টানছেন, কী করব বুঝতে পারছি না। খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। কামাল ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ আব্বা আছে তো।’ বঙ্গবন্ধু আমার নামটি খুব পছন্দ করেছিলেন, নামটি তখন খুব আনকমন। তখনো পাভেল রহমান হয়ে উঠিনি, শুধু পাভেল নামেই পরিচিত। সামনে যাব কি যাব না খুব কনফিউজড, হাতে ফুল নেই, ক্যামেরা; বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে এটি তখন অবিশ্বাস্যয ব্যাপার ছিল।

খুব দোটানায় ছিলাম, কিন্তু কামাল ভাই পিঠে হাত দিয়ে একটু ধাক্কা দিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুর দিকে। বঙ্গবন্ধু আমার হাত ধরে নিজের দিকে টান দিলেন। যখন শুনলেন আমার নাম পাভেল, তার ডান হাত দিয়ে আমার বাম গালে আদর করলেন। ছোঁয়ালেন এবং বললেন, ‘কী চমৎকার নাম তোমার।’ সেই দৃশ্য, সেই ঘটনাটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া হয়ে গেল। সেদিনই তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয়। এর আগে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি, তার ছবি তুলেছি।

কিন্তু সেদিনই তার সঙ্গে ঘটা করে পরিচয়। তাও আবার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল যিনি আধুনিক ফুটবলের জনক; তিনি পরিচয় করালেন। সেই থেকে তার সঙ্গে আমার পাওয়ার জীবনের শুরু। যেহেতু ছাত্র ইউনিয়নেরই ছবি তুলতাম, যেহেতু ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ বাকশালের সময় এক হলো; তখন তার সেই জন্মদিনের দিন ছাত্রলীগের সবার সঙ্গে এক হয়ে ছবি তুলতে গণভবনে এসেছি।

জন্মদিনে আবাহনীর ট্রিপল ক্রাউন ট্রফি ফুটবল, ক্রিকেট ও হকি দিতে গণভবনে গিয়েছি। আবাহনীর হারুণ ভাই, পাভেল ভাই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সেনাবাহিনীর প্রধান কে এম সফিউল্লাহ সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা যেহেতু কামাল ভাইয়ের লোকজন, আবাহনীর; বঙ্গবন্ধুর কাছে আবাহনী একটি বিশেষ ব্যাপার; ফলে চিফ অব আর্মি স্টাফ থাকা সত্ত্বেও গণভবনে তার রুমে ঢুকে গিয়েছিলাম। ছবিগুলো তাকে দেখানো হচ্ছিল; বঙ্গবন্ধু আবাহনী ট্রিপল ক্রাউন ট্রফি পাওয়াতে খুব খুশি। তখন খুব অবাক কান্ড, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পাশেই বসে ছিলেন।

তিনি সবসময় চশমা পরে থাকেন, কিন্তু সেদিন আমি তাকে সানগ্লাস ছাড়া বঙ্গবন্ধুর পাশেই পেয়ে গেলাম। যদিও ছবিটি তোলার সময় জানতাম না তিনি জিয়াউর রহমান। সেই দিন ছবি তোলা এবং পরিচয়ের সূত্রে সাধারণত সকালে যখন কামাল ভাই ফুটবলের জন্য তৈরি হতেন, তখন ৩২ নম্বরে যেতাম। তিনি সেতার বাজাতেন, ক্রিকেট খেলতে পারতেন, ফুটবল খেলতেন; স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী গড়েছিলেন; নাটক করতেন। আমাদের কাছে তখন সুপারস্টার ছিলেন। সকালে সেতার বাজিয়েই কামাল ভাইয়ের কাজ ছিল আবাহনীতে খেলোয়াড়দের দেখা।

তিনি আমাকে ক্লাবে না গিয়ে ভোরে তাদের ৩২ নম্বরের বাড়িতে চলে আসতে বলতেন। বলতেন, ‘তুমি আমার বাসায় চলে আসবে, আমরা গাড়িতে করে ক্লাবে যাব।’ তার ৬৯ মডেলের নীল একটি টয়োটা ছিল, সেটিতে করে আবাহনী ক্লাবে যেতাম। ক্লাবটি ছিল জাফরাবাদে। মাঠ এখন যেখানে আছে, সেখানেই। আমরা আসতাম, কামাল ভাই সারা দিন খেলোয়াড়রা কী খাবেন, না খাবেন খুব যতœ নিয়ে দেখতেন। সবকিছু খোঁজ নিতেন, খেলার শিডিউল দেখতেন। এভাবেই দিন শুরু করতাম।

৩২ নম্বর এভাবে আমার কাছে খুব স্বাভাবিক বাড়ি হয়ে গেল। এক সময় সেই বাড়িতে আমি যখন খুশি যেতে পারতাম, সিকিউরিটিও চেক করত না। তারা আমার ক্যামেরার ব্যাগ বা অথবা যখন দোতলা, তিন তলায় উঠে যেতাম; তখন কোনোকিছুই দেখা হতো না।

এর মধ্যে কামাল ভাইয়ের বিয়ের আয়োজন হলো। সেখানেই বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারকে কাছে পাওয়ার বিরল সুযোগ হলো। বিয়ে হলে আনন্দ হয় এবং অনেক ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে বাইরের মানুষ হিসেবে, আলোকচিত্রী হিসেবে অথবা কামাল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তাদের সবার কাছে যাওয়ার, প্রতিটি ঘরে ঘরে যাওয়ার সুযোগ হয়ে গেল। তাদের পারিবারিক ছবি তুলতে শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধু একবার একজনের সঙ্গে পরিচিত হলে তাকে খুব সহজেই মনে রাখতে পারতেন। এমনকি তার বাবার নামও মনে করতে পারতেন।

এই দিক থেকে তার মেধা খুব উঁচুতে ছিল। কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটল তার মৃত্যুর মাসখানেক আগে। সেটি একটু বলে নিইÑ একদিন গোধূলি লগ্নে দোতলায় উঠছি, সিকিউরিটি চেকিং কিছুই হলো না; স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন দায়িত্বে ছিলেন, আমাকে বললেন, ‘কোথায় যাবেন?’ বললাম, ‘কামাল ভাইয়ের রুমে যাব তিন তলায়।’ আমাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।

যখন সিঁড়িতে পা রেখেছি, তখনই পরিচিত গন্ধ; আমার বাবাও মিকচারটি টানতেন; বঙ্গবন্ধু যে পাইপ টানতেন, সেই পাইপের মধ্যে যে নির্যাসটি ছিল, সেটি অ্যারিনমো তামাক। খুব মিষ্টি একটি গন্ধ, যখন পেলাম, মনে হলোÑ বাড়িতে তো একমাত্র বঙ্গবন্ধুই টোব্যাকো নেন; কামাল ভাই কখনোই সিগারেট খাননি; বঙ্গবন্ধু কি তাহলে ছাদে?

আমার একটু খটকা লাগল। কিন্তু নিচ থেকে তো কেউ অ্যালার্ট করেনিÑ প্রেসিডেন্ট, তখন বাকশাল হয়েছে, তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন; তিনি কোথায়? তিন তলায় উঠতে উঠতে ভাবছি, তিনি কি তাহলে ছাদে? ছাদ থেকেই গন্ধ আসছে। তিন তলায় পা দিতেই কামাল ভাইয়ের রুমের সামনেই দেখি বঙ্গবন্ধু বসে আছেন চেয়ারে, আমাদের গ্রামের মোড়লদের মতো করে পা ভাঁজ করে। লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে বসে আছেন।

আমাদের আবাহনী ক্লাবের সেক্রেটারি হারুণ ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করছেন। তাকে দেখা মাত্রই মনে হলো, আরে এটি তো দারুণ ছবি। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে, ফ্ল্যাশ লাগিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। আলো জ¦লা মাত্র চমকে উঠে আমার দিকে পেছন ফিরলেন এবং দেখলেন কি না জানি না; আলোতে তার চোখে ধাঁধা লেগেছে বোধহয়; তারপরও জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে কে তুই আমার ছবি তুললি? সেই গলায়। খুব ভয় পেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। হারুণ ভাই, এখন আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু, আমাদের পাভেল আপনার ছবি তুলেছে।

তিনি তো আমাকে চেনেন, দেখছেন সবসময়; তারপরও আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘তুই চিনিস আমি কে?’ আরে এ কথা তো ছেড়ে দেওয়া যায় না; উত্তর দেওয়া দরকার; তখন আমার ১৭ বছর, উত্তর না দিয়ে পারলাম না; তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ চিনি, আপনি বঙ্গবন্ধু।’ তিনি আমাকে প্রতিউত্তর দিলেন, ‘আমি কী শুধু বঙ্গবন্ধু? আমি দেশের প্রেসিডেন্ট।’ ভাবছি যে বঙ্গবন্ধু তো বঙ্গবন্ধুই, তিনি আবার দেশের প্রেসিডেন্ট? তিনি বললেন, ‘আমি দেশের প্রেসিডেন্ট।’ মনে হলো দেশের প্রেসিডেন্ট কি লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে ছবি তোলেন? বুঝতেই পারছি না প্রেসিডেন্ট কী পরে ছবি তোলেন। এর মধ্যে তিনি আবার সেই রকম শব্দে বলছেন, ‘তোমার পানিশমেন্ট হবে।

আসলেই ভয় পেয়ে গেছি। এ আমার বাবার ক্যামেরা, নিয়ে যাবে, নাকি ফিল্মটি খুলে নিয়ে যাবে নাকি আমাকেই ধরে নিয়ে যাবে যখন ভাবছি; হাঁটু কাঁপতে লাগল; কেন তিনি এত রাগ হয়েছেন। এরপরই তিনি তার এডিসি ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ, পরে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন, আর্মির; তাকে ডাকছেন ‘শরীফ, এদিকে আয় তো।’ তিনি আসা মাত্র বললেন, ‘আমার শার্টটি নিয়ে আয়।’

শর্টটি পরতে পরতে আমাকে বললেন, ‘তোমার পানিশমেন্ট হচ্ছে শার্ট পরব, তুমি আমার আরেকটি ছবি তুলবে।’ এরপর বুঝতে পারলাম প্রথমে হয়তো ফ্ল্যাশের আলোতে তার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি বুঝতে পারেননি আমি কে, পরে পুরো ব্যাপারটি বুঝতে পেরে কীভাবে হ্যান্ডেল করলেন এবং আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়ে মজা করলেনÑএ আমার জীবনের একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা ছবি তোলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে পেলাম। তিনি এত সাধারণ ছিলেন, সবাই জানেন। আমাকে নিচে কেউ কিছু বললেন না, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি; তাকে তার ঘরের মধ্যে ছবি তুলছি, সেই প্রটোকলেরও ব্যাপার আছে। সেভাবে তো ছবি তুলতে যেতে পারি না। সেই ছবিটি সবাই দেখেছেন।

ছবিটি তার নিরাপত্তাকর্মী বা তিনি নিয়ে গেলে ছবিটির মাধ্যমে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর বাঙালিয়ানা দেখাতে পারতাম না। সেদিন হয়তো আমার প্রিন্ট সিজ হয়ে যেত। সেটি ঘটেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি কত কষ্ট করেছেন, সবাই জানেন, কিন্তু কামাল ভাইয়ের হলুদের দিন তিনি এত আনন্দ করেছেন যে সেই একটি ঘণ্টার সমতুল্য তার জীবনে আর কোনো খুশির ক্ষণ এসেছে কি না সন্দেহ। সেই একটি দিনই জুলাই মাসে কামাল ভাইয়ের হলুদের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল গণভবনে। সেখানে তিনি অফিস করছিলেন। আত্মীয় স্বজনরাই তার দরজা খুলে তার রুমের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন।

তারা সবাই তাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তিনি কাজ না সেরে আসতে চাইছিলেন না। হয়তো পরে আসতেন। সবার চাপে আসতে বাধ্য হলেন। তখন তো আমাদের কালার প্রিন্ট ছিল না। যেসব ছবি তুলেছিলাম, সেই সাদাকালো ছবিগুলো হলুদের চাপে কালো ছোপ ছোপ হয়ে গেছে। তিনি বেগম মুজিবকে, ফজিলাতুন্নেছা; আমরা খালাম্মা বলে ডাকতাম, তিনি রেনু বলে ডাকতেন, তাকে হলুদ লাগিয়ে দিলেন। খালাম্মাও তাকে হলুদ লাগিয়ে দিলেন। রেহানা, হাসিনা আপাও নাচছিলেন। সারা দিন খুব উৎসবের অনুষ্ঠানটি হচ্ছিল। সেই একটি ঘণ্টাই বঙ্গবন্ধু তার পরিবারকে আনন্দের জন্য দিয়েছিলেন। এর আগে হাসিনা আপার বিয়ের সময় জেলে ছিলেন।

কামাল ভাই ও জামালের বিয়ের সময়ই তিনি আনন্দ করেছেন। আনন্দঘন মুহূর্তের ছবি তোলার যে সুযোগ আমার হয়েছিল, সেটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এখনো সেগুলো মানুষকে দেখাতে পারিনি, চাইওনি। কারণ এই বিয়ে নিয়ে নানা কথাবার্তা ছিল, যেগুলো তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে রটনা ছিল। জুলাইয়ের পর তো আগস্টে তাকে তার পরিবারের সঙ্গে জীবন দিতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু যখন শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিবিসির নির্বাচনে স্বীকৃতি পেলেন, তখন তার গেঞ্জি পরা, পাইপ টানা ছবিটি প্রথম প্রিন্ট করে হাসিনা আপাকে উপহার দিয়েছিলাম। এখন ৩২ নম্বরের জাদুঘরে টাঙানো আছে।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ