দীর্ঘ করোনা আর বন্যার প্রভাব: সংকটের আবর্তে মধ্যবিত্ত, বর্তমান অবস্থা ঘুণেধরা বাঁশের মতো”

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২০

দীর্ঘ করোনা আর বন্যার প্রভাব: সংকটের আবর্তে মধ্যবিত্ত, বর্তমান অবস্থা ঘুণেধরা বাঁশের মতো”

সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা, গোয়াইনঘাট :: করোনার প্রভাবে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একরকম স্থবির। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, আয় কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের। কমেছে ভোগ ও বিনিয়োগ দুটিই। এতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত। এই শ্রেণির অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন অথবা কমিয়ে দেয়া হয়েছে বেতন। অন্যান্য উৎস থেকেও কমে গেছে আয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংসারের খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
অন্যদিকে নিম্ন আয়ের লোকজন সরকার ও বিত্তবানদের কাছ থেকে নানা ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়েছেন এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতার কারণে মধ্যবিত্তের পক্ষে সেটা নেয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তাদের সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে কার্যকর অর্থে কোনো পক্ষই (সরকার ও বিত্তবান) এগিয়েও আসছে না। বাধ্য হয়েই তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছেন।
শুধু দেশেই নয়, প্রবাসে যারা কাজ করতেন, তাদের বড় অংশ কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। এরাও বড় সংকটে পড়েছেন। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের আঘাতে রীতিমতো ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।নেই তাদের আয় বাড়ানোর পথ।
রাষ্ট্রীয়ভাবে মধ্যবিত্তদের সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের দৈনিক আয় ১০ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যে, দেশে তারাই মধ্যবিত্ত। এ হিসাবে মধ্যবিত্তদের মাসিক আয় ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। তবে এটি শুধু বেতনের মাধ্যমে আয় হতে হবে, এমন নয়। যে কোনোভাবে আয় করে যারা এ ধরনের একটি সামাজিক মর্যাদা তৈরি করেছেন, তারাই মধ্যবিত্ত। এক্ষেত্রে শিক্ষার হার বিবেচনা এবং গ্রাম ও শহরে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব পড়তে শুরু করে। মানুষের চলাচল কমে যায়। কেনাবেচা স্থবির হয়ে পড়ে। কমতে থাকে মানুষের আয়। প্রথমদিকে মধ্যবিত্তের ওপর তেমন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে তারা।
এই মুহূর্তে মধ্যবিত্ত গভীর সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে দেশে মধ্যম আয়ের লোকের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। এরা নিজেদের আয় দৈনন্দিন খরচসহ সন্তানদের পড়াশোনা, ভ্রমণ, বিনোদন, চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচগুলো মিটিয়ে কিছু সঞ্চয়ও করতে পারতো। বর্তমান সময়ে সঞ্চয়তো তো দূরের কথা চলতে হচ্ছে ধার দেনা করে। বর্তমান সময়ে ধারও কেউ দিতে চায়না। এদের একটি বড় অংশ ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আরকেটি অংশ চাকরিজীবী।
অপর একটি অংশ পৈতৃক সূত্রেই অর্জিত সম্পদ দেখভাল করে জীবিকানির্বাহ করছেন। এ তিনটি শ্রেণিই এখন সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে যারা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের একটি অংশ পণ্য উৎপাদন করে বিপণনের মাধ্যমে আয় করে, আরেকটি অংশ দোকানে সেগুলো বিক্রি করে। আবার একটি অংশ আছে পণ্যের জোগানে কাজ করে। এরা সবাই এখন আক্রান্ত। উৎপাদকরা আগের মতো পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন কমে গেছে। মানুষের আয় কমে যাওয়ায় পণ্য বিক্রিও হচ্ছে কম। ফলে বিক্রেতাদের আয় কমে গেছে। মাঝপথে সমস্যা তৈরি হয়েছে জোগানেও। তারাও এখন জটিলতায় পড়েছে।
ব্যবসা বানিজ্যে বেচাকেনা নেই।দোকানের ভাড়া দিতে পারছেন না অনেকে। এখান থেকে অর্জিত আয়ে তার সংসার চলত। এখন কোনো আয় নেই। পুঁজি ভেঙে খাচ্ছেন।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, এভাবে কত দিন চলতে পারব, আল্লাহই জানেন। মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ বেসরকারি চাকরিজীবী। যারা বেতনের ওপর নির্ভর করেই জীবিকানির্বাহ করেন। এই অংশটিও এখন সংকটে। কেননা বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। অনেকে বেতন কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়ে মধ্যবিত্তের এ অংশটি এখন ব্যয় কমাচ্ছে।
যেসব মধ্যবিত্তের বাড়ি, গাড়ি, মার্কেটে দোকানের মালিকানা রয়েছে, তারাও এখন সংকটে। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি কিনেছেন।
সব দিকে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই এখন বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না। বিভিন্ন ধরনের পরিবহন থেকেও আয় আসছে অনেক কম। অন্য যেসব সম্পদ রয়েছে, সেগুলো থেকেও আয় কমে এসেছে।
মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ সঞ্চয় করে থাকেন। সেগুলো ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রে জমা করেন। এখান থেকে আয় তো দূরের কথা, প্রতিনিয়ত পুঁজি হারাচ্ছেন। সঞ্চয়পত্র থেকে নিয়মিত আয় এলেও নতুন করে কেনা যাচ্ছে না। ফলে মেয়াদ পূর্তির পর তাদের আয়ে ভাটা পড়বে। ফলে সঞ্চয় থেকে আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখনও পরিবেশ প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে টিকে আছে।
তবে কতদিন টিকে থাকতে পারবে, সেটা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই বলছেন বর্তমান মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ ঘুণেধরা বাঁশের মতো। শারীরিক গঠন টা মানুষের মতো ঠিকই আছে, ভিতরটা ঘুণেধরা বাঁশের মতো। সামাজিকতা ঠিক রাখতে অনেকে কিড়িমিড়ি খেয়ে তাল মিলিয়ে চলছেন। তবে এভাবে আর কতদিন। বর্তমান সময়ে দীর্ঘ করোনা আর বন্যায় দেখা দেওয়া আর্থিক শূন্যতা তার দৈন্যতা পূরনে অনেক বছর সময় লাগতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দরকার ভোগ ও বিনিয়োগ। কিন্তু করোনা নিয়ন্ত্রণে না এলে কেউ বিনিয়োগও করবে না এবং কেনাকাটাও করবে না। ফলে সবার আগে করোনা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ জোর দেয়া উচিত।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ