ধূমপায়ীদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কম

প্রকাশিত: ১:০৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ১২, ২০২০

ধূমপায়ীদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কম

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী :; করোনাভাইরাস কভিড-১৯ একটি নতুন রোগ এবং গুরুতর রোগের ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা গেছে। যেমন- ঝুঁকিতে আক্রান্তরা হলেন-৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী লোক, নার্সিং হোমে বা দীর্ঘমেয়াদি যতেœর সুবিধায় থাকা লোকেরা, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে বা মাঝারি থেকে মারাত্মক হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, যাদের হৃদরোগের গুরুতর অবস্থা রয়েছে, যে লোকেরা ইমিউনো কম্প্রোমাইজড (রোগ প্রতিরোধ শক্তি কম যাদের) ক্যান্সার চিকিৎসারত, অস্থিমজ্জা বা অঙ্গ-প্রতিস্থাপন, দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত এইচআইভি বা এইডস এবং কর্টিকোস্টেরয়েড ওষুধগুলোর দীর্ঘায়িত ব্যবহার, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ডায়ালাইসিস করানো লোকেরা, লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা।

সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে নারীদের তুলনায় পুরুষের মৃত্যুহার অনেক বেশি। আক্রান্ত প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেই নারীদের তুলনায় পুরুষের মৃত্যুহার বেশি প্রতীয়মাণ হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত যে প্রায় ছয় হাজার ৬০০ জন মারা গেছেন তার ৬২ শতাংশই পুরুষ। এমনকি যাদের দেহে হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের কোনো লক্ষণ ছিল না তাদের ক্ষেত্রেও প্রতি ১০০ জন মৃতের ৭২ জনই ছিল পুরুষ। চীনের পরিসংখ্যান বলছে, সেখানে যত সংখ্যক নারী মারা গেছে তার প্রায় দ্বিগুণ মারা গেছে পুরুষ। ইতালিতে মোট মৃতের ৭০ শতাংশই পুরুষ। তা ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া যেখানে নারীরা বেশি সংক্রমিত হয়েছে (৬১ শতাংশ) সেখানেও মৃত্যু বেশি হয়েছে পুরুষের; প্রায় ৫৪ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি ১৪ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন, তামাক সেবনকারীরা বা ধূমপায়ীরা নানারকম জটিল ও কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে বিধায় কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং প্রাণহানির ঝুঁকিতে সবার উপর অবস্থান করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর কারণ হিসেবে বলছে, সিগারেট সেবনে হাতের আঙ্গুলগুলো ঠোঁটের সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলে সিগারেটের ফিল্টারে বা হাতে লেগে থাকা ভাইরাস মুখে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রায় ১৪ গুণ বেড়ে যায়। অন্য কারণগুলো হচ্ছে ধূমপায়ীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্তের আশঙ্কাও অনেক বেশি-যা কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুমাত্রায় বাড়াতে পারে। তা ছাড়া, ধূমপান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই কমাতে থাকে এবং সহজেই করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এমনকি অকাল মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে যেমনটি হয়েছে চীনে ও জার্মানিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে- চীনে ১৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষের ৪৮ শতাংশই ধূমপান করে, যেখানে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা মাত্র দুই শতাংশ।

চীন, ইতালি, ফ্রান্সে কভিড-১৯ সংক্রমণে মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই ধূমপায়ী ছিল বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা বিশ্বের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যেসব শিশু ধূমপায়ীর সংস্পর্শে আসে তাদের তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। অতএব ধূমপায়ী ধূমপান বন্ধ করলে পরিবারের ধূমপান সম্পর্কিত অসুস্থতার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। পরোক্ষ ধূমপান এক্সপোজার হ্রাস করা বিশেষত বাচ্চাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য ফুসফুসের ভাইরাসগুলো দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে মারাত্মক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি একই রকম হতে পারে। এজন্য ধূমপায়ীদের যদি দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে তবে অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া উচিত।

সরকারি তথ্যমতে, করোনাভাইরাস বাংলাদেশে এখনো মারাত্মক আকার ধারণ করেনি, তবে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি তামাক সেবনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭-এ দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের তিন কোটি ৭৮ লাখ (৩৫.৩ শতাংশ) মানুষ কোনো না কোনো তামাক ব্যবহার করে। এক কোটি ৯২ লাখ মানুষ বা ১৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী

ধূমপান করে। এতে দেখা যায়, চলমান করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে

দেশের কয়েক কোটি মানুষ উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। সরাসরি ধূমপায়ী বা তামাকসেবীর চেয়েও বেশি মানুষ বাসা, কর্মস্থল, গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। করোনাপ্রতিরোধ করার জন্য ইমিউন সিস্টেম বা শরীরে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। ধূমপানও সব ধরনের তামাক শরীরের গুরত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা নষ্ট করে বিধায় এসব পণ্য সেবন হতে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ধূমপায়ীদের জন্য, করোনাভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবের সময় ধূমপান বন্ধ করা বা থামানো সেরা কাজগুলোর মধ্যে একটি।

বিভিন্ন নেশা বা বদঅভ্যাস দূর করা যেমন-ধূমপান শুধু নিজেকে না, পরোক্ষভাবে বাড়িতে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে সমানভাবে ক্ষতি করে।

সেই সঙ্গে মাদকের নেশা যেমন গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা কিংবা মদ্যপান আমাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে। করোনাভাইরাস যেমন আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে তেমনি ধূমপান বা ই-সিগারেট কিংবা সীসা সমানভাবে আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে।

লেখক : সাম্মানিক সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও অধ্যাপক, বারডেম হাসপাতাল।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ