নগরজুড়ে শরীফ-নাসিম নেতৃত্বে জুয়া, নেপথ্যে তাঁতীলীগ কালাম ও এসআই কামাল

প্রকাশিত: ১১:০৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৯

নগরজুড়ে শরীফ-নাসিম নেতৃত্বে জুয়া, নেপথ্যে তাঁতীলীগ কালাম ও এসআই কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক :: চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেও নগরীর সোবহানীঘাট, সবজিবাজার, চালিবন্দর, শশ্মনঘাট, কালিঘাট, ছড়ারপাড়, এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে শিলং তীর, ঝান্ডু-মান্ডু, ওয়ানটেন, নাইট তীর জুয়া। এসব জুয়া স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ হচ্ছে সর্বহারা। অভিযোগ উঠেছে এই আসরের জুয়াড়িদের মদদ দিচ্ছেন পুলিশের অসাদু কিছু কর্মকর্তা, কিছু হলুদ সাংবাদিক, এলাকার প্রাভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদরা। তাদের ছত্রছায়ায় চলছে এই জুয়ার বোর্ড। বিষয়টি নিয়ে বিপাকে আছেন এলাকাবাসীও। ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে নারাজ। জুয়া এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে চলছে পুলিশের দাবী। যদি তাই হয়, তাহলে সোবহানীঘাট পুলিশ ফাড়িঁর পাশের সবজি বাজারের মার্কেটের পিছনে সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের পাশে কিভাবে প্রকাশ্যে চলছে জুয়া? প্রশাসনও এই বিষয়টি জেনেও নীরব ? এনিয়ে জনমনে জেগেছে প্রশ্ন!
তবে স্থানীয়দের দাবী, নগরীর ছড়ারপার সুগন্ধা-১০ বাসার বাসিন্দা মৃত আব্দুল খালিকের ছেলে শরীফ আহমদ ও চালিবন্দর সমতা-২৪’র বাসিন্দা হানিফ আলীর ছেলে নাসিম আহমদ উল্লেখিত এলাকায় জুয়া পরিচালনা করে আসছেন। শরীফের আপন ভাই কালাম আহমদ তাঁতী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি সোবহানীঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ কামাল আহমদকে ম্যানেজ করে শরীফ ও নাসিমকে দিয়ে জুয়া চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অনেকের দাবী।
জানা গেছে, সোবহানীঘাট-চালিবন্দর এলাকার রামকৃষ্ণ মিশন সরকারি প্রাথমিক স্কুলে গেইটের পাশ সবজি বাজারের মাকের্টের পিছনে নাসিমের কলোনীতে বসেছে এই আসর। ২টি কক্ষের মধ্যে একটি কক্ষে তীর শিলংয়ের বোর্ড আর অপর কক্ষে ঝান্ডু-মান্ডু বোর্ড! প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই কক্ষ গুলোতে চলে জুয়া। এ তীর শিলং জুয়ার বোর্ডের নেতৃত্বে দিচ্ছেন যুবদল নেতা নাসিম। তার জুয়ার বোর্ড কমিশনে পরিচালনা করে ইসমাঈল, রাজু, বাসু, গবিন্দ, সামছুল, মিথুল ও লিয়াকত এবং ছাত্রদল নেতা শরীফের জুয়ার বোর্ড পরিচালনা করে ছোট জামাল, মাছুম, সেন্টু, বড় জামাল ও তার ছোট ভাই তারেক।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে স্থানীয়রা প্রতিবেদককে জানান, সোবহানীঘাট পুলিশ ফাড়িঁ এসআই কামাল প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাসিম ও শরীফের কাছ থেকে তাঁতী লীগ নেতা কালামের মাধ্যমে বোর্ডের চালানো বাবৎ ২ হাজার টাকা করে বখরা আদায় করেন। তবে প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালায়। কিন্তু অভিযানের খবরও বোর্ড কর্তৃপক্ষ কিভাবে পেয়ে যায়! এই জুয়ার আসরে দিনে এবং রাতে টোকনের মাধ্যমে তীর শিলং ও তীর নাইট শিলং জুয়া খেলা চলে আর ঝান্ডু-মান্ডু জুয়াতো সবসময়ই চলে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ি ও বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির কিছু অসৎ পুলিশ এসব জুয়াড়িদের কাছ থেকে অবৈধভাবে সুবিধা নেয়াই এই শিলং নামে জুয়া খেলা কিছুতেই থামছে না। যার ফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে তীর খেলা বন্ধে অভিযান চললেও কোনো সুফল মিলছে না। সাম্প্রতিক সময়ে চালি বন্দর ও কালিঘাট এলাকায় শিলং তীর এবং ঝান্ডু-মান্ডু খেলার উৎপাত দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পুলিশ সূত্রমতে, গত কয়েক মাসে সিলেটে অন্তত শতাধিক জুয়ার আসর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আর এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি প্রশংসার দাবিদার মহানগর পুলিশ। কিন্তু জুয়ার আসর বন্ধ করা হলেও ফাঁড়ি ও কিছু অসাধু পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের কারণে এসকল জুয়া খেলা ফের ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সিলেটের আনাচে-কানাচে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করেও দমন করা যাচ্ছে না এসব জুয়া। কারণ জুয়া খেলায় আটক হলে সাজা কম হয়। গ্রেপ্তারের পর জামিনে বের হয়ে পুনরায় ওই খেলায় জড়িয়ে পড়ছেন জুয়াড়িরা। আর এসব কারণে নিয়মিত অভিযান চললেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, কালিঘাটের বস্তাপট্টি নামক মার্কেটে নিচ তলায় রড-সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান। দুটি গলির একটু ভিতরে গেলে দেখা যায় দু’তলার ছাদের সিঁড়ি। বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই ছাদের এক পাশে রাখা পলিথিন ও পাটের বস্তার বান্ডিল। তাই এই মার্কেট সবার কাছে ‘বস্তা মার্কেট’ নামে পরিচিত। অপর পাশে দুটি চেয়ারে বসে আছেন দু’জন যুবক। নাম বড় জামাল ও ছোট জামাল। টেবিলে আছে কাগজের কিছু টুকরো। গ্রাহকরা আসছেন সারি বেঁধে। চেয়ারে বসা যুবকরা তাদেরকে ১০/২০/৫০/৩০০ টাকার বিনিময়ে একটি টোকেন দিচ্ছেন। কেউবা নিচ্ছেন কয়েকটি। এমনকি কেউ কেউ একসাথে ২০টি টোকেনও নিচ্ছেন। এ যেন কোনো যানবাহনের অথবা চিকিৎসকের টিকিট কাউন্টার। কিন্তু আসলে এই টোকেন হচ্ছে শিলং তীর খেলার। একই জায়গায় সন্ধ্যার পর চিত্র অন্যটি। সন্ধ্যার পর বসে ঝান্ডু-মান্ডু জুয়া আসর। দল বেধেঁ জুয়াড়িরা ঝান্ডু-মান্ডুর খেলেন। এই জুয়ার বোর্ডের নেতৃত্ব দেন ছাত্রদলের শরীফ আহমদ। কালীঘাটের বোর্ডের শরীফের সহযোগী বড় জামাল ও ছোট জামাল দিনে তীর শিলং ও রাতে ঝান্ডু-মান্ডু জুয়ার আসর বসান। কালীঘাটের ‘ডাইল পট্টি’ মার্কেটের পিছনে নদীর পারে টিনসেডের ঘরে দিন রাত চলে ঝান্ডু-মান্ডু জুয়ার আসর। শরীফ ৫ বছর আগে একটি কাপড়ের দোকানে চাকরী করতেন। কিন্তু জুয়ার বোর্ডের অদৃশ্য টাকায় এখন তিনি কোটিপতি। নগরীতে রয়েছে তার ৩ তলা বাসা, রয়েছে দুটি দামী গাড়ি। প্রশাসনের চোখ ফাকি দিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা করে আসছে শরীফ ও নাসিম।
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ উপ-কমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা বলেন, এসব জুয়া খেলার বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জুয়াড়িদের আটকে পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে। আর কোন পুলিশ সদস্য জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, যারা এই জুয়া খেলে তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে খেলে তাই তীর খেলা নির্মূল করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মানুষ সচেতন হলেই এই খেলা বন্ধ হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ খবর

আমাদের ফেইসবুক পেইজ