নজির হোসেনের ধারাবাহিক : ৭১ সালের করচা (পর্ব -৩)

প্রকাশিত: ৬:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২১

নজির হোসেনের ধারাবাহিক : ৭১ সালের করচা (পর্ব -৩)

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছাত্রাবস্থায় নজির হোসেন ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন । ১৯৬৬ সালে তিনি সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৬৮ সালে গোপন কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করে কঠোর অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে সিলেট জেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হন । ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন । ৬৯ সালের শেষের দিকে সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির দায়িত্ব লাভ করে দলকে সংগঠিত করতে সুনামগঞ্জ চলে আসেন।সুনামগঞ্জ মহকুমার গোপন কমিউনিষ্ট সেলের প্রধান ছিলেন জনাব নজির হোসেন ৷

১৯৭১ সালে জুনের প্রথম দিকে শিলং এর সানী হোটেলে কমরেড বরুণ রায়, পীর হাবিবুর রহমান, বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও সরদার লতিফের উপস্থিতিতে গোপন কমিউনিষ্ট পার্টির সিদ্ধান্তের আলোকে টেকেরঘাট সাব সেক্টর একটি গেরিলা যুদ্ধের জোন হিসেবে গড়ে ওঠে । বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সেক্টর কমাণ্ডার ও নজির হোসেন টেকেরঘাট সাব সেক্টরের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৭২ সালে তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৪ সালে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন । ১৯৭৪ সালে ১৮ মাস ব্যাপী রাজনৈতিক পড়াশুনার জন্যে মস্কোতে ছিলেন । ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৪ বছর আত্নগোপনে ছিলেন এবং মুস্তাক সরকার বিরুধী শশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন ৷ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৫ সালে নিরাপত্তা আইনে ৬ মাস কারাবরণ করেন।

এখন তিনি রাজনীতি থেকে অবসরে আছেন। অবসরকালীন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো তুলে ধরছেন নিজের ব্যক্তিগত টাইম লাইনে। মার্চ মাসে লেখা ধারাবাহিক পর্বগুলো বাংলা নিউজ ২৪ ফোর এনওয়াই পাঠকদের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আজ ২য় পর্ব প্রকাশিত হল ।

নজির হোসেন :>>

২য় পর্বের পর :
২৫/০৩/১৯৭১ সালের সেই ভয়াল রাতটি আসে আমাদের সর্বদলীয় সভা শেষ হওয়ার পরই ৷ গোপন কমিউনিষ্ট সেলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি (নজির হোসেন) জনাব এডভোকেট আলী ইউনুস ( ন্যাপ সম্পাদক ) রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু ও ছাত্র ইউনিউনিয়ন নেতা জনাব গোলাম রব্বানী বিকাল ৩ ঘটিকার সময় জনাব উবায়দুর রেজা চৌধুরীর বাসায় যাই ৷ ছাত্রইউনিয়ন,ছাত্রলীগ ,আওয়ামী লীগ ,ন্যাপের কর্মীদের ভীড়ে বাড়ীটি লোকারন্য ৷ সুনামগঞ্জ ছিল বাম রাজনীতির এলাকা ৷ ৭০ দশকে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী সংগঠন ৷ ৭০ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গনভিত্তি পায় আওয়ামী লীগ ৷ এক গুচ্ছ নেতার আবির্ভাব হয় সুনামগঞ্জে ৷ ৭০ এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ সদর আসনে এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন জনাব উবায়দুর রেজা চৌধুরী ৷ এই সুবাদে তার বাড়ীটি হয়ে গিয়েছিল সংগ্রামী মানুষের অফিস ঘর ৷ ১৬ই মার্চ থেকে ইয়াহিয়া খানের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবের আলোচনা চলছিল ৷ আলোচনা ফলপ্রসূ মনে হচ্ছিল না। তাই মাঠের আন্দোলন এবং সতর্কতা জারী ছিল সর্বত্র ৷ জনাব আব্দুজ জহুর ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক । আমাকে আদর করতেন,তিনি এমপিএ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ছিলেন ৷ ১৭ মার্চ তিনি তার নির্বাচনী এলাকা তাহিরপুর জনগনকে উদ্বুদ্ধ ও বিভিন্ন এলাকায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলতে তাহিরপুর চলে যান ৷ ২৪ মার্চ জনাব উবায়দুর রেজা আমাকে এবং জনাব হোসেন বখতকে ডেকে নিরাপত্তার কারনে শহর ছেড়ে যাবেন বলে জানান এবং স্থানীয় সবাইকে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবার নির্দেশ দেন ৷ তার বাসা এবং পৌরসভার অফিস ঘরটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে যান ৷ জনাব আব্দুর রইছ সাহেবও তার নির্বাচনী এলাকায় চলে যান ৷ এই তিন জনই ছিলেন জনপ্রিয় নেতা ৷ জনাব দেওয়ান উবায়দুর রেজা ছিলেন আওয়ামী লীগের মহকুমা সভাপতি জনাব আব্দুর রইছ ছিলেন আওয়ামী লীগের মহকুমা সম্পাদক ৷ তাদের অনুপস্থিতিতে সবদিক থেকে গ্রহণযোগ্য ছিলেন জনাব হোসেন বক্ত সাহেব ৷

অস্থির সময় চলছিল সুনামগঞ্জে ৷ ছাত্রজনতার রাজপথ ভরা জঙ্গী মিছিলে মুখরিত ছিল সুনাম গঞ্জ ৷ সারা দেশে চলছে অসহযোগ আন্দোলন ৷ হরতাল,কার্ফু ৷ পাক সেনাদের গুলিতে নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলছিল ৷ পাকিস্তান বিরোধী রাজনৈতিক দল ,ছাত্র সংগঠন মূলতঃ কাঠের রাইফেল বানিয়ে ট্রেনিং দিতে শুরু করেছে ৷ সুনামগঞ্জে ছাত্রইউনিয়ন এবং ছাত্র লীগ যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেছে ৷ দেশ কোনদিকে যাচ্ছে তখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি ৷

পরিস্থিতি বিবেচনায় ২৫ শে মার্চের সভাটিতে সভাপতিত্ব করার জন্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র কেউ ছিলেন না ৷ ২৫শে মার্চের সভাটি হয় জনাব হোসেন বখতের সভাপতিত্বে ৷ নিম্নোক্ত ১৫ জন নিয়ে সুনামগঞ্জ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ৷ কঠিন দিন গুলিতে যারা সুনামগঞ্জ শহরে থেকে সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারবেন এমন নেতৃবৃন্দকে নিয়ে কমিটি টি গঠিত হয় ৷

১. সভাপতি ছিলেন জনাব হোসেন বখত ২. সেক্রেটারি ছিলেন জনাব আলফাত উদ্দিন, ৩. আমাকে করা হয় সহকারি সেক্রেটারি। অপর সদস্যরা হলেন ৪. জনাব দেওয়ান ওবায়দুর রেজা, ৫. জনাব আবদুর রইছ, ৬. জনাব আবদুজ জহুর, ৭. জনাব খলিলুর রহমান চৌধুরী, ৮. জনাব আছদ্দর মোক্তার, ৯. জনাব আকমল মুক্তার ১০. জনাব দিলওয়ার হোসেন, ১১. জনাব আলী ইউনুছ, ১২. জনাব গোলাম রব্বানী। ১৩. জনাব আব্দুল বারী ১৪. জনাব আফাজ উদ্দিন ১৫ . রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু ৷ (আমার লেখা সুনাগঞ্জের মুক্তযুদ্ধ যেমন দেখেছি বইটিতে বিস্তারিত আছে) ৷

আমি রাত ১০টায় সুনামগঞ্জ থানায় এসে যুদ্ধাবাহিনীর তালিকা ওসি সাহেবের কাছে জমা দেই ৷ সভায় যাওয়ার আগে আমার রাইফেলটা নেপুদার বাসায় রেখে গিয়ে ছিলাম তা সংগ্রহ করে পিটিআই স্কুলে চলে আসলাম ৷ নবাব ভাই ছিল আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট ৷ কৃষক সিমিতির মহকুমা কমিটির আহবায়ক করেছিলাম ৷ আবার সে একজন ভাল আনসার কমান্ডার তাই তাকে যুদ্ধা বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করে দেওয়া হয়েছিল ৷ বখত সাব আরপিন নগরের নওরোজ ভাইকে যুদ্ধা বাহিনীর সহকারী কমান্ডার করে দিলেন ৷ আসলে বখত সাবকে রাজী করিয়ে আমি অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম ৷তালিকার সাথে রাইফেল মেলাতে গিয়ে দেখলাম কয়েকটা সর্ট পড়েছে ৷

২৬ তারিখে সকাল ৮টায় ট্রেনিং এর সময় ঠিক করে আমি আমার লজিং জনাব আমান রেজা সাহেবের বাংলোয় চলে আসলাম ৷ যুদ্ধা বাহিনীর খাবার বিছনাপত্র ইত্যাদি সংগ্রহে ছাত্রলীগ নেতা শফিকুল চৌধুরী অক্লান্ত প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হয় ৷ আমার চিন্তায় তখন একটা গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা ৷ চে গুয়েভারা ও মাংসেতুং গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে ঘন্টা খানেক পড়াশুনা করলাম ৷ টেবিলে থাল দিয়ে ঢেকে রাখা ভাত খেয়ে রাইফেলটাকে সাথে নিয়ে ঘুমুতে গেলাম ৷ যেন যুদ্ধের সাথে সহবাস ৷ আমিতো ছিলাম চে গুয়েভারার আদর্শে অনুপ্রানিত নিবেদিত বিপ্লবী ৷

সকাল ৮টায় যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে হবে ৷
(চলবে)

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য, সুনামগঞ্জ -১ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

আমাদের ফেইসবুক পেইজ