নতুন বছরে চীন-মার্কিন সম্পর্ক: যুদ্ধ নাকি অস্বস্তিকর শান্তি?

প্রকাশিত: ১০:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২২

নতুন বছরে চীন-মার্কিন সম্পর্ক: যুদ্ধ নাকি অস্বস্তিকর শান্তি?

বিপ্লব রঞ্জন সাহা

২০২১ সালে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পরাশক্তিদ্বয়ের মধ‍্যেকার দ্বন্দ্ব প্রাধান‍্যশীল প্রচারমাধ‍্যমগুলোতে যেভাবে শিরোনাম হয়েছিল নতুন বছরেও কি তেমনটাই হবে নাকি তা অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক হবে, নাকি বৈশ্বিক উত্তেজনা আরো ভয়াবহ রূপ নিবে? একজন বৃটিশ লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক, টম ফৌডি পূর্ব এশিয়ার দিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন, নতুন বছর কি ‘যুদ্ধ নাকি অস্বস্তিকর শান্তির?’

যখন ২০২১ সাল শেষ হয়ে গেছে এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের অভিষেকের এক বছরও শেষ হতে চলেছে, তখন একটা বিষয় একেবারেই স্পষ্ট যে, আশা এবং প্রত‍্যাশার বিপরীতে চীনের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের অনুসৃত সাংঘর্ষিক বৈদেশিক নীতিতে কোন পরিবর্তন আসেনি, যদিও উপস্থাপনার দিক থেকে তা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন এই উত্তরাধিকারকে আলিঙ্গন করেছেন, যদিও তিনি শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক জাতীয় কৌশল অবলম্বন করে তুলনামূলকভাবে সহনীয় কৌশল খুঁজে বের করার প্রয়াস নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে নতুন নতুন বিধিনিষেধের পথই অনুসরণ করতে হচ্ছে। বছরটা শেষ হয়েছে চীনের আরো আরো কোম্পানিকে কালোতালিকাভূক্তকরণ, শিনজিয়াংয়ের সকল পণ‍্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, শীতকালীন অলিম্পিক প্রত‍্যাখ‍্যান এবং চীনের বিরুদ্ধে ‘অকাস’ (AUKUS) সামরিক ফোরাম গঠনের মতো কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে।

সম্পর্কের চলমান এই জট হয়তো তাৎক্ষণিক কোন সংকট সৃষ্টি করবে না কিন্তু এটি স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতির মতো দ্বন্দ্বকে ঘণীভূত করছে এবং একটি নতুন স্থবিরাবস্থার দিকে পৃথিবীকে ঠেলে দিচ্ছে। চীন বৃহৎ প্রযুক্তি ও আবাসন থেকে শুরু করে সাধারণ সমৃদ্ধি ও আরো অনেক কিছুর উন্নতিসাধন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্থানের মাধ‍্যমে এই নতুন পরিস্থিতির প্রতি সাড়া দিয়েছে।

২০২২ সালে বিভিন্ন বিষয় কি আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে নাকি উষ্ণতর হয়ে উঠবে। কেউ কেউ মনে করেন দ্বিতীয়টির সম্ভাবনাই বেশি। চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তরের প্রতিনিধি মা শিয়াওগুয়াঙ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আগামী বছরে (২০২২ সাল) তাইওয়ান প্রণালীর পরিস্থিতি আরো জটিল এবং মারাত্মক হবে। তিনি এই অঙ্গীকারও ব‍্যক্ত করেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীরা সহ‍্যের সীমা অতিক্রম করলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

এই বিবৃতি নিঃসন্দেহে ২০২২ সালের প্রত‍্যাশা কি হবে তার স্পষ্ট আভাস বহন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ‍্যেকার সম্পর্ক আর কখনো স্বাভাবিক হবে না এবং যদি উচ্চ মাত্রার কোন উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তা হবে তাইওয়ানকে ঘিরে।

কোন কোন ঘটনার দিকে আমাদের সুক্ষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার? প্রথমত, শীতকালীন অলিম্পিকের পরপরই একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনার অবতারণা হবে যা চলমান বছরের সুযোগ সম্ভাবনাকে সংজ্ঞায়িত করবে আর সেটা হলো চীনের কমিউনিস্ট পার্টির বিশতম কংগ্রেস যেটি ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হবে।

এটি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে কারণ এটি অনিবার্য যে শি জিন পিং তৃতীয় মেয়াদের জন‍্য নেতৃত্বে আসবে যা চীনা রাজনীতিতে মাও সে তুংয়ের পর থেকে আর কখনও হয়নি। আর এর জন‍্য পথ তৈরী করতে শি জিন পিং পার্টির ভেতরে এবং জনগণের মাঝে তার ন‍্যায‍্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে।

যখন একাধারে এই বিবেচনাটুকু এই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিচ্ছে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন সংকট সৃষ্টি করবেন না, কোন যুদ্ধ তো একেবারেই নয় অপরদিকে তিনি নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রতি আরো বেশি করে মনোযোগী হবেন বিশেষ করে তার ভাবাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি। চীনের বাণিজ‍্যিক পরিবেশ চলমান থাকবে এবং তিনি হংকং ও তাইওয়ান প্রসঙ্গে তার অবস্থানকে আরো জোরালো করবেন যা জাতীয় পুনরুজ্জীবনের জন‍্য তার ঘোষিত লক্ষ‍্যের অনুকূল।

এটি কোন সামরিক ধরণের হবে না কিন্তু এটি অবশ‍্যই এমন সব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করবে যা বিচ্ছিন্নতাবাদী অপতৎপরতাকে নির্মূল করবে এবং এহেন কাজে সহায়তাদানকারী কোম্পানিগুলোকেও তালিকাভুক্ত করে এদের শেকড় উপড়ে ফেলা হবে। যেমনটা উয়াং ঈ বলেছেন যে পুনরেকত্রীকরণই হলো বেইজিংয়ের জন‍্য একমাত্র প্রত‍্যাশিত পথ।

কিন্তু রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও উচ্চমাত্রার বাজির এরকম পরিস্থিতি তার বিপরীতে ক্রিয়াশীল হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের চারপাশে সর্বত্র সামরিকীকরণ অব‍্যাহত রাখবে যদিও চলমান বাস্তবতায় স্বদেশে বাইডেন প্রশাসনও মধ‍্যবর্তী নির্বাচনের মতো ব‍্যাপক রাজনৈতিক গণ অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট উচ্চকণ্ঠ হয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বোলচাল দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সবেমাত্র অতিক্রান্ত কোভিড ১৯ এর সময়কালে অর্থনীতির তলানি থেকে কোনরকম ভেসে উঠার প্রয়াস ভিন্ন কিছু নয়। এটা নিয়ে বাইডেন গর্ব করে যাচ্ছে।

অথচ চলমান পরিস্থিতিতে অপরাপর সমস‍্যাগুলো যথারীতি ঝুলে আছে। প্রায় একবছর কাল প্রশাসনে থাকার পর বাইডেনের জনপ্রিয়তা অনবরত নিম্নমুখে ধাবমান এবং তার প্রতি অনুমোদনের মাত্রা মার্কিন ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দিনে দিনে নীচের দিকে ধাবমান এবং মুদ্রাস্ফীতির মাত্রা বিগত চল্লিশ বছরের ম‍ধ‍্যে সবচেয়ে বেশি।

সবচেয়ে মারাত্মক দৃশ‍্যপটটি কি? একজন অপছন্দের প্রেসিডেন্ট সচরাচর হোয়াইট ওয়াশ হওয়া এবং রিপাবলিকান পার্টি যারা তার বিরুদ্ধে চীনের প্রতি নমনীয়তার কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে তাদেরকে মোকাবেলা করার বিপদ এড়াতে বেপরোয়া হয়ে মধ‍্যবর্তী নির্বাচনের পথ বেছে নিতে বাধ‍্য হবে।

ঠিক এই মুহূর্তে স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট বাইডেন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছেন এবং তিনি একজন অক্ষম ব‍্যক্তিতে পরিণত হবেন যার ফলশ্রুতিতে তাকে চীন বিরোধীতায় উচ্চকণ্ঠ হতেই হবে। বাইডেনকে অবিরাম চীন নামক তুরুপের তাসটিকে আরো কৌশলে এবং জোরালোভাবে ব‍্যবহার করতে হবে যাতে এটিকে বরাবরের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল ব‍্যর্থতাকে আড়াল করার একটি উপযুক্ত অজুহাত হিসেবে ব‍্যবহার করা যায়।

ফলাফল যাইহোক না কেন এটি আর নতুন করে সম্পৃক্তকরণ ও মিলমিশের মঞ্চ তৈরি করবে না। আর বেইজিংয়ের সাথে কোন মীমাংসায় যাওয়ার, শুল্ক তুলে নেওয়ার বা ইতিবাচক কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং এমনতর আর যা যা তার ভোট হারানোর কারণ হতে পারে তার জন‍্য বাইডেনের রয়েছে আরো সীমিত রাজনৈতিক পরিসর। তাই বাইডেন চীনের প্রতি কঠোর হওয়ার এবং আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিকে বেছে নিয়েছে।

এই রকম পরিস্থিতিতে আসন্ন বছরগুলোতে পারস্পরিক বিরোধ এবং অবিশ্বাস বেড়ে যাবে। কোন নেতারই ঘরোয়া রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে নিজের চলার পথে ছাড় দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা আগ্রহ থাকে না। একথা অনস্বীকার্য যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তিক্ততার সম্পর্কটা উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার কারণে শি জিন পিংয়ের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে উভয় দলই চেষ্টা করবে স্ব স্ব অবস্থানকে মজবুত করতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইবে অন‍্যান‍্য দেশের উপর স্বীয় মতামতকে চাপিয়ে দিতে। আর বেইজিং চেষ্টা করবে তার অর্থনৈতিক প্রাধান্য বজায় রেখে সারা পৃথিবীর অপরাপর দেশগুলোর উপর তার প্রভাব বিস্তার করতে।

এই সময়ে সারা পৃথিবীতে আরো কিছু দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে যার মধ‍্যে প্রথমেই অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচন যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপন্থী ও চীনপন্থী দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছে। এরপর এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তারপর মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন। এইসব নির্বাচন চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।

তাই উভয়পক্ষই অপেক্ষাকৃত ভালো একটি বছরের প্রত‍্যাশা করছে যা নিয়ে বাজি ধরার কোন সুযোগ নেই। এটা শেষপর্যন্ত একটি ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে নাও আনতে পারে তবে সবকিছু রহস‍্যে ঘেরা থাকবে কারণ বছরটি শি ও বাইডেন উভয়কে একটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি ফেলবে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।

যেহেতু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি পারম্পর্যকে ধারণ করে তাই গত বছরের শেষভাগের একটি প্রতিবেদন অত‍্যন্ত গুরুত্ব বহণ করে যেটিতে দেখানো হয়েছে যে একুশ শতকের সবচেয়ে মূল‍্যবান পণ‍্যের উপর নিয়ন্ত্রণের দৌড়ে চীনারা বিপুল ব‍্যবধানে বিজয়ী হয়েছে। হার্ভার্ডের বেলফার সেন্টারের একটি নতুন গবেষণায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতরে তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা গেছে তারতম‍্যটা আমেরিকানদের জন‍্য সত‍্যি ভীষণ দুশ্চিন্তার ব‍্যাপার। নরম‍্যান লুইস নামের একজন লেখক, বক্তা ও পরামর্শদাতার ভাষ‍্যমতে উক্ত গবেষণায় এটাও তুলে ধরা হয়েছে যে এ ব‍্যাপারে বিশেষজ্ঞদের অনুমানকে কিভাবে ও কতটা অবমূল্যায়ন করা হয়েছিলো।

‘প্রযুক্তিগত মহা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’শিরোনামের উক্ত প্রতিবেদনটি এই উপসংহারে উপনীত হয়েছে যে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে চীনের শুধুমাত্র এক মহাউল্লম্ফনই ঘটেনি বরং তারা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আধিপত্য বিস্তারের অবস্থানেও নিজেকে উন্নীত করেছে।

এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশেরও কম সময়ে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগণ‍্য নেতৃত্ব চীনের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ২০২০ সালে ২৫০ মিলিয়ন কম্পিউটার, ২৫ মিলিয়ন অটোমোবাইল এবং ১.৫ বিলিয়ন স্মার্টফোন তৈরি করার মাধ‍্যমে চীন বৈশ্বিকভাবে উচ্চ প্রযুক্তির পণ‍্য প্রস্তুতকারক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা কেড়ে নিয়েছে। চীনা প্রযুক্তি ও পণ‍্য বর্তমানে আলিবাবার আধিপত‍্যের অবসান ঘটিয়েছে।

কিন্তু গ্রাহাম এলিসন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে উপস্থাপনের উদ্দেশ‍্যে উল্লেখ করেছেন যে একটি প্রস্তুতকারক দেশ হওয়ার পাশাপাশি, একুশ শতকের উপযোগী প্রত‍্যেকটি মৌলিক প্রযুক্তিগত ক্ষেত্র যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টরস, ৫জি ওয়‍্যারলেস, কোয়ান্টাম ইনফর্মেশন সায়েন্স, বায়োটেকনোলজি এবং গ্রিন এনার্জিতে চীন হয়তো শীঘ্রই বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী দেশে পরিণত হবে বা ইতোমধ্যে এক নম্বর অবস্থানে পৌঁছে গেছে। এটি একটি লক্ষ‍ণীয় দিক পরিবর্তন যেটিকে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা একসময় অসম্ভব বলে মনে করতো।

হার্ভার্ডের প্রতিবেদনটি প্রত‍্যক্ষ করেছে যে ১৯৯৯ সালে ন‍্যাশনাল একাডেমিজ অব সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিসিনের ক্ষেত্রে ঘোষণা করা হয়েছিলো যে আমেরিকারই রয়েছে একক সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি যা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও তাকে সকলের উপযোগী করে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগে সমর্থ, সেটা একুশ শতকে আর সেই পর্যায়ে থাকবে কিনা সে ব‍্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

হার্ভার্ড রিপোর্টটি একথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে কিভাবে ‘টাইম ম‍্যাগাজিন’তার বিশেষ সংখ্যা ‘বিয়ন্ড ২০০০’-এ ঘোষণা করেছিলো যে চীন কিছুতেই একুশ শতকের মধ‍্যে শিল্পক্ষেত্রে দানবাকৃতি ধারণ করতে পারবে না। এর জনসংখ্যা বিশাল কিন্তু এর মোট গার্হস্থ্য উৎপাদন অতি স্বল্প। সেসময়কার একজন চীন বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম কার্বি বলেছিলেন, ‘চীন হলো ব‍্যাপকভাবে নিয়ম-শৃঙ্খলার দ্বারা শাসিত শিক্ষার্থীদের দেশ এবং তারা শুধু অনুকরণ করতেই সক্ষম, আবিষ্কার ও উদ্ভাবন করতে নয় এবং কখনো হবেও না। শুধুমাত্র মুক্ত চিন্তার মানুষেরা-নকলবাজরা কখনো নয়-তথ‍্য প্রযুক্তির এই যুগে নতুন কিছু প্রবর্তন করতে পারে।’

যাহোক, বিশেষজ্ঞদের ব‍্যাপারে এতটুকুই থাক। আজ হার্ভার্ডের প্রতিবেদন সত‍্যিটাকে মেনেই নিয়েছে যে ‘কর্তৃত্ববাদী’ চীন এখন স্পষ্টতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সবদিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি আরো উল্লেখ করেছে যে গত বছর (২০২১ সালে) চীন সারা পৃথিবীতে বিক্রিত শতকরা ৫০ ভাগ কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোন উৎপাদন করেছে ও যোগান দিয়েছে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শতকরা মাত্র ৬ ভাগের উৎপাদক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যত সময়ে একটি সোলার প‍্যানেল তৈরী করে ততটুকু সময়ে চীন করে সত্তরটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন যতগুলো ইলেকট্রিক যানবাহন বিক্রি করে চীন করে তার চারগুণ বেশি। উপরন্তু আমেরিকার যতগুলো ৫জি স্টেশন আছে চীনের রয়েছে তারচেয়ে নয়গুণ বেশি যাদের গতি আমেরিকার ৫জির গতির তুলনায় আবার ৫ গুণ বেশি।

চীনের অবস্থাকে বাড়িয়ে বলার কোন দরকার নেই। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা এখনও এগিয়ে যা তারা ধরে রেখেছে অর্ধ শতাব্দীর চেয়েও বেশি সময় ধরে। যাইহোক চীনের যাত্রাপথ এখনো নির্ভুল বিধায় সেমিকন্ডাক্টার ফেব্রিকেশান ও চিপ ডিজাইনের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছুঁয়ে ফেলেছে। চীন ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টার উৎপাদনের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে ১৯৯০ সালে চীন বৈশ্বিক উৎপাদনের শতকরা মাত্র এক ভাগ উৎপাদন করতো এখন তারা শতকরা ১৫ ভাগেরও বেশি উৎপাদন করে। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন শতকরা ৩৭ ভাগ থেকে ১২ ভাগে নেমে এসেছে।

তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার আধিপত্য ধরে রাখতে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ন‍্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

এই সপ্তাহে ক‍্যাপিটল হিলে উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্টটি হোয়াইট হাউজে জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ‍্যে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে পাস হয়েছে এবং ধারণা করা যায় যে এটি সিনেটেরও অনুমোদন পেয়ে যাবে। কিন্তু এটি কিসের আলামত বহণ করে? বিলটি অনুমোদিত হলে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অপরাধী বিবেচনায় চীনের শিনজিয়াং থেকে সকল পণ‍্য আমদানি নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।

আর্মন্ড বার্ট্র‍্যান্ড নামে একজন চীন কেন্দ্রিক ফরাসি ভাষ‍্যকার টুইটারে এটিকে বর্ণনা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গৃহীত সবচেয়ে কঠোর মানববিদ্বেষী আইন হিসেবে। এটির মূল লক্ষ‍্য ফোর্সড লেবার নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ততটা নয় যতটা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে চীনের প্রাধান্যকে খর্ব করা। খোদ হোয়াইট হাউজের বিবৃতিও বিষয়টিকে ততটা স্পষ্ট করে তুলতে পারেনি। ঠিক যে মুহূর্তে এই আইনটি পাস হয়েছে, তখনই ইউএস ইন্টারন‍্যাশানাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সোলার প‍্যানেল উৎপাদনের বিনিয়োগ ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন‍্য তৎপর হয়েছে। এধরণের সকল উদ্দোগই চীনের বিরুদ্ধে একহাত নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাপ্লাই চেইনটিকে বিভিন্ন স্থানে প্রতিস্থাপিত করার এক সমন্বিত প্রয়াস।

পুরো ২০২১ সালের অভিজ্ঞতা নিশ্চিতরূপে বলছে যে বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীনকে পরাজিত করা আদৌ সহজ কোন কাজ নয়। এ ব‍্যাপারে ট্রাম্পের সর্বাত্বক প্রয়াস কোন কাজে আসেনি বরং পরণতি হিসেবে নিজ দেশে মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে।

চীনের সাপ্লাই, প্রোডাকশন, রসদ সরবরাহ ও উৎপাদন ক্ষমতা তুলনহীন যার মানে হল তাদের সকল পণ‍্য অন‍্য যেকোন দেশের চেয়ে সুলভ। আর যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে কোন প্রতিযোগিতায় যেতে অক্ষম তাই তারা মানবাধিকার, ফোর্সড লেবার ইত‍্যাকার অজুহাতে চীনকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে একটা নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ; সদস্য, বাঙলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মীসংঘ।

ইমেইল: bipi1963@gmail.com

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
17181920212223
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ