নতুন বাজেট : পক্ষ-বিপক্ষ

প্রকাশিত: ১:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০

নতুন বাজেট : পক্ষ-বিপক্ষ

গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি

বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপে অর্থনীতি স্থবির ও মন্দাকবলিত। বাংলাদেশে এর প্রভাব সুস্পষ্ট। চাহিদা, সরবরাহ, উৎপাদন সবকিছুই নিম্নমুখী। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে, কর্মজীবীরা কর্মচ্যুত হচ্ছে, বেকার বাড়ছে আর বাড়ছে দারিদ্র্য ও অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা। এ মুহূর্তে মানুষের জীবন রক্ষা আর জীবিকার সংস্থান সৃষ্টি সময়ের দাবি। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় ৪৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা বা ৮.৫৬% বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার চেয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা ৩৩.৬% বেশি। এক কথায় প্রস্তাবিত ২০২০-২১ সালের বাজেট মোটামুটি সার্বিকভাবে বর্তমান ২০১৯-২০ সালের বাজেটের ধাঁচে রাখা হয়েছে। শুধু পার্থক্য, বিগত কয়েকটি বছর বাজেটে প্রায় সব খাতেই বরাদ্দ বৃদ্ধির উচ্চ হারের যে ধারাবাহিকতা ছিল এবার তা বজায় রাখা হয়নি। একই ধরনের ধারা রাজস্ব আয়, উন্নয়ন বাজেট বা পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা রায়। খাতওয়ারি বরাদ্দসমূহের বিষয়ে গতানুগতিক ধারা বজায় রাখা হয়েছে। বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন দৃষ্টিগোচর হয় না। একটু পার্থক্য যা চোখে পড়ে তা হলো, কিছু অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেসব ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি ও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বরাদ্দের সঙ্গে থোক বরাদ্দ দিয়ে করোনাভাইরাসজনিত সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিগত তিন মাসের অধিক সময় প্রায় সব সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ ছুটির আওতায় অকার্যকর ছিল। বাজেট প্রণয়নে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি, বোঝা যায়। কেননা এ সময়টাতেই সাধারণত এ বিষয়গুলো সম্পন্ন করা হয়। ফলে আনুমানিক বৃদ্ধি ও থোক বরাদ্দ রাখা ছাড়া সুস্পষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক খাতওয়ারি বরাদ্দ সম্ভব ছিল না, বলা যায়।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, যে কোনো ধরনের একটি বাজেট পাস করা জরুরি; অর্থ খরচের জন্য। অর্থাৎ তিনি বুঝিয়েছেন; যে দরকারি পরিবর্তনসমূহ পরে করা হবে তা সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে সমন্বয় করা যাবে। এ বিষয়টি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক বলা যায়। এতে দোষের কিছু দেখি না। কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া থোক বরাদ্দ সাধারণত ‘অ্যাডহক বেসিসে যখন যেখানে দরকার তখন সেখানে ব্যয় করা হবে’ এভাবে ব্যয়িত হয়। ফলে অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির কারণে জনকল্যাণে অর্থ ব্যবহৃত না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে কারণে থোক বরাদ্দ ব্যবহারে যথার্থতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য এ-সংক্রান্ত একটি মনিটরিং টিম বা সমন্বয় কমিটি গঠন করে তাদের ওপর যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দেওয়া যেতে পারে।
বর্তমান ২০১৯-২০ অর্থবছরের অধিকাংশ সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। প্রস্তাবিত বাজেট ২০২০-২১ সালে দেশে করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি পর্যুদস্ত ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। পরিবর্তিত এ বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে, প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের চেয়ে কিছু হলেও বেশি রাখা হয়েছে। ধারণা হয়, বাজেট কাঠামোকে ইতিবাচক রাখার জন্য এটা করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, করোনাকালীন নেতিবাচক পরিস্থিতির কারণে নিশ্চিতভাবে এ বাজেট বাস্তবায়ন একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সংবিধান অনুযায়ী আয়-ব্যয়ের হিসাব এভাবে উত্থাপিত হলেও বাস্তবে আয়ের স্বল্পতা ও তাতেও অনিশ্চয়তা এবং ব্যয়ের বিশালত্ব ও জরুরি আবশ্যকতার কারণে এটি একটি অসংগতিপূর্ণ ও সমন্বয়হীন প্রতিবেদন হিসেবে দেখার সুযোগ আছে।

রাজস্ব ও অন্যান্য খাতে আয়ের সুযোগ কমেছে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তার বিপরীতে করোনা সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধি, জীবিকা হারানোর কারণে দরিদ্রতা ও অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও তাদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, বেকার ও জীবিকা হারানো নব্য বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষি খাতকে চাঙ্গা রাখা ও কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহিত করা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক অর্থায়ন করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে ভার্চুয়াল পদ্ধতির মাধ্যমে চালু করতে ও ভবিষ্যতে এ পদ্ধতির ব্যাপক বিস্তার ও সক্রিয় রাখার বন্দোবস্ত করতে হবে। করোনা-উত্তরকালেও ভার্চুয়াল প্রযুক্তির ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়বহুল ও সুবিধাজনক হবে। ফলে এ খাতেও অর্থায়ন করতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেট (২০২০-২১) বিশাল ঘাটতির বাজেট। ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি। গেল অর্থবছরে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার ঘাটতির চেয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৪৪ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বেশি। তবে ঘাটতি জিডিপির শতকরা হার হিসাবে সবসময় ৫ থেকে ৫.৫ ভাগ ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ৬% উন্নীত করা হয়েছে। ঘাটতি কমাতে হলে ব্যয় কমাতে হবে, আয় বাড়াতে হবে। পরিচালন ব্যয় কমানো কঠিন, তবু যতটা সম্ভব কৃচ্ছ্রসাধনের প্রচেষ্টা থাকতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দের কিছু কাট-ছাঁট করে, করোনাকালীন সংকটসমূহ মোকাবিলার বাড়তি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ণয় কাজটিও খুব সহজ নয়। মেগা প্রকল্পগুলোর সব চালু রাখা হবে কিনা, না হলে কোনটি রাখা হবে, কোনটি স্থগিত বা কোনটি সীমিত খরচ করা হবে তা নির্ধারণ করা কঠিন হবে। কেননা প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন কারণে, বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থার কারণে প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক কম রাজস্ব আদায়ের আশঙ্কা আছে। সে কারণে বাজেটে প্রাক্কলিত বড় ধরনের ঘাটতি, প্রকৃত প্রস্তাবে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়া মোটামুটি নিশ্চিত। তৈরি পোশাক খাতে আয় যা রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ, বিশ্ব মহামারীর ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যাপক হ্রাস পেতে পারে। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে পেট্রোলিয়াম তেলের চাহিদা কমেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে এর দাম কমে গেছে। ফলে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ যেখান থেকে আমাদের বেশির ভাগ প্রবাসী আয় সেখানকার অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রবাসী শ্রমিকরা সেখানে কর্মচ্যুত হচ্ছেন, যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমার আশঙ্কা আছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে এরই মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় কম হবে ২৫%-এর মতো, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৪০০ কোটি ডলার কম।

শুল্ক আয় বৃদ্ধির বড় ধরনের পদক্ষেপ যাকে ফবংঢ়ধৎধঃব সড়াব হিসেবে অনেকে দেখছেন, তা হলো কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ। তবে এ বিষয়টিতে প্রায় সব মহল থেকে প্রতিবাদ আসছে। বেশির ভাগ মানুষ মনে করে এতে শুধু সুনাগরিকদের আইন ও নীতির প্রতি আনুগত্যকে নিরুৎসাহিত করা হবে না, এ সুযোগ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এ সুযোগ। এমনকি এরপর ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ রাখার কোনো যৌক্তিকতা থাকবে কিনা সন্দেহ হয়। দুর্নীতি দমন কার্যের প্রধান ও মূল সূত্র অবৈধ সম্পদ। ধোঁয়া দেখা গেলে আগুন আছে যেমন বোঝা যায়, আয়ের সুনির্দিষ্ট বৈধ ব্যাখ্যা ছাড়া সম্পদ তেমনই দুর্নীতির জানান দেয়। সে ধরনের সব ব্যাখ্যাহীন সম্পদ বৈধ হলে শাস্তিযোগ্য দুর্নীতি বলে তেমন কিছু থাকবে না।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে, নানা শর্তে এ সুযোগ চালু ছিল, এখনো আছে। তবে এত ঢালাওভাবে শুধু কিছু অর্থের বিনিময়ে সব ধরনের অপকর্ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে বৈধতা দেওয়ার শর্তহীন বিধান কখনো ছিল কিনা সন্দেহ হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু বোঝা যায় এতে খুব বেশি রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব না-ও হতে পারে। আমাদের দেশে কালো টাকা সাধারণত সিংহভাগই, মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়। সম্প্রতি জিএফআইর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৬-১৫- এ ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে ৪ লাখ কোটি টাকা।

তা ছাড়া আমাদের দেশে প্রায়ই সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা থাকে না। নতুন কোনো সরকার, আগের সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাতিল বা এর সঙ্গে সুবিধাভোগীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে এমনটিই দেখা যায়। ফলে এ সুবিধা গ্রহণ কতটুকু নিরাপদ তা নিয়ে কালো টাকার মালিকরা দ্বিধায় থাকে। বাস্তবে এ খাতে সাধারণত খুব বেশি রাজস্ব আয় হয় না। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সবসময় এ সুযোগ দেওয়া হলেও মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে, যার মধ্যে ৯ হাজার কোটি সাদা হয়েছে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে। এতে আর একটি বিষয় ¯পষ্ট হয় যে, যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে কালো টাকার মালিকরা শাস্তির আওতায় আসবেন, এ ধরনের পরিবেশ না থাকলে বা যদি ফাঁকি দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ থাকে তবে সাদা করার তাগিদ থাকে না।

সম্ভব হলে এ বিধানটি বাতিল করা বাঞ্ছনীয়, সম্পূর্ণ সম্ভব না হলেও শর্তযুক্ত করে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। যে আয়গুলো বৈধভাবে অর্জিত কিন্তু শুধু শুল্ক না দেওয়ার কারণে কালো টাকা হিসেবে বিবেচিত সেগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যায়। কোনো কোনো খাত যেখানে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে কালো টাকা সেখানেও সাদা করার সুযোগ দেওয়া যায়।

আরেকভাবে রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর উদ্যোগ আসে। তা হলো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, এতে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বিরাজমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের তারল্য সংকট সৃষ্টি হতে পারে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনমতো ব্যাংকের তহবিল না পাওয়া ও সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগে দরকারমতো খরচ করতে থাকব, আয় পরে যেভাবেই হোক করব। এ কথায় আশ্বস্ত হওয়া কঠিন। আয় করতে ব্যর্থ হলে নতুন টাকা ছাপিয়ে ব্যয় মেটাতে হবে, যার অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি সরকারকে ঋণ নিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে টাকা ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। ফলে সেদিকটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা যেগুলো প্রক্রিয়াধীন আছে তার ব্যবহার ত্বরান্বিত করা এবং নতুন ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার প্রচেষ্টা নিতে হবে।

উপরোক্ত পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সুপারিশ থাকবে সম্ভাব্য আয়ের পরিমাণ বুঝে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয় করা। সে ক্ষেত্রে খরচের অগ্রাধিকার নির্দিষ্ট করতে হবে। অগ্রাধিকার খাতগুলোয় সে ভিত্তিতে অর্থায়ন করতে হবে। যে খাতগুলো জরুরি নয় সেখানে অর্থ ছাড় দেওয়া কমাতে হবে। সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে বিষয়গুলোকে পরে সমন্বয় করা যাবে। তবে চবৎরড়ফরপধষ জবারবন্ডিএর ব্যবস্থা করা যায়। ছয় মাস পরে আয়-ব্যয়ের হিসাব ও বরাদ্দ পুনর্বণ্টনের খসড়া সংসদে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এ মুহূর্তে যা প্রয়োজন তা হলো- সার্বিকভাবে সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধি। সরকারি সব হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ক্লিনিক জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত আছে সেগুলোতে মঞ্জুরিকৃত পদসমূহে যেখানে পদ খালি সেখানে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারী জরুরি নিয়োগ দিতে হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। চিকিৎসাসহায়ক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের প্রয়োজন নিরূপণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি চিকিৎসাস্থলে কভিড-১৯-এর চিকিৎসাসেবার আলাদা ব্যবস্থা থাকতে হবে। কমপক্ষে জেলা পর্যায় পর্যন্ত জরুরি ভিক্তিতে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে।

আমাদের কৃষি খাত বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি- সব কটিতেই এ খাতের অবদান নিশ্চিতভাবে আমাদের বড় ভরসার স্থল। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু আলহাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেক আগেই বলেছিলেন, ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ কথাটি চরম বাস্তবতা হিসেবে অনুভূত হচ্ছে। করোনাকালীন ও করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রয়োজনে, সারা বিশ্বের কারও কোনো সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে যদি কৃষি খাত সচল থাকে। কৃষিকে সে কারণে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। কৃষিসংশ্লিষ্ট সব কর্মকান্ডকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য করতে হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণন, উৎপাদিত পণ্য যাতে নষ্ট না হয় ও কৃষক প্রকৃত দাম পায় তার বন্দোবস্ত করতে হবে। প্রকৃত কৃষক যাতে প্রণোদনার সুযোগ-সুবিধা সরাসরি পেতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

যত দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তত দিন নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষ চিহ্নিত করে প্রত্যেককে আলাদা ধরনের রেশন কার্ড বিতরণ করতে হবে। সে কার্ডের আওতায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে স্বল্পমূল্যে অথবা দরকার হলে বিনামূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নগদ অর্থ সাহায্য নির্দিষ্ট সময় পরপর সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভর্তুকি সুদহারে ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। তা ছাড়া কিছু প্রণোদনা প্যাকেজ সৃষ্টি করে নব্য বেকার ও বিদেশফেরত প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।

পোশাকশিল্পের বাইরে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকেও উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবহার-উপযোগী করার বন্দোবস্ত নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকরভাবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন নিরূপণ করে সে অনুযায়ী অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত ভার্চুয়াল শিক্ষাদান পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে চালুর প্রস্তাব করছি। দেশে করোনার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার পরও স্বাভাবিক পরিবেশে ভার্চুয়াল শিক্ষা চালু রাখলে সব পক্ষই লাভবান হবে। সে লক্ষ্যে অর্থায়ন করতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ‘সুশাসন’। বাস্তবায়নসংক্রান্ত সব কার্যক্রমের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি সর্বস্তরে ‘জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা’-কে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যবস্থা। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে ও পালনের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও সে অনুযায়ী মূল্যায়ন ও পদক্ষেপ নিতে হবে।

আশা করি সামনের দিনগুলোয় আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীজনিত সংকট ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বৈরিতা উত্তরণে সফল হব।

লেখক : চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ