“”নারীর নিজের বাড়ি কই

প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

“”নারীর নিজের বাড়ি কই

আফরোজা সরকার
নিজের শেকড় তোলার কষ্টটা পুরুষ জীবনের চাইতে নারী জীবনে অনেক বেশি। বেশি, কারণ নারী জীবনে এই ঘটনা ঘটবেই ঘটবে। বেশি, কারণ নারীরা এই ব্যাপারটা অনুভব করে অনেক তীব্রভাবে। ঘুরেফিরে সব নারীর জীবনে অন্তত একবার এই শেকড় তোলার ঘটনা আছেই আছে।
মা-বাবার আদরের কন্যা, নিজের ভাই-বোন, নিজের পরিবার-ঘরদোর, চিরচেনা অসংখ্য মুখ… সবকিছু ফেলে একদিন চলে যেতে হয় কারো হাত ধরে। লোকে যাকে বলে শ্বশুরবাড়ি! দূর তয়েকে দেখে যত সহজ মনে হয় ব্যাপারটা, কাছে গেলে আসলে তার কানাকড়িও নয়। নিজের আজীবনের নিরাপত্তার বলয় ছেড়ে দূরের কিছু মানুষকে আপন বানিয়ে নেয়ার চেষ্টা যে কী ভয়াবহ, সেটা কেবল বিবাহিতারাই জানেন। হোক প্রেমের বিয়ে, তবুও! নতুন জায়গায় ঠিক মত ঘুম হয় না, নতুন বাড়ির রান্না গলা দিয়ে নামে না, ফেলে আসা বাপের বাড়ির পুষি বেড়ালটার জন্যও বুক ফেটে কান্না আসে…
তবু নারী শেকড় নামায়। আস্তে… খুব আস্তে নিজের নতুন ঠিকানায় ছড়িয়ে দেয় শেকড়। বাপের বাড়ি ছেড়ে আসতে গিয়ে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, আস্তে আস্তে তাঁকে মেরামত করে। শ্বশুরবাড়ি হয়ে ওঠে নিজের বাড়ি, নিজের সংসার। একটা সময় এমন আসে যে সেই নিজের সংসার ফেলে বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েও স্বস্তি মেলে না। আর বিপর্যয় আসে তখন… যখন হয় সংসারের ভাঙন… হয় ডিভোর্স!
সত্যি কথা বলতে কি, ডিভোর্সকে নারী যতটা না ভয় পায়, তার চাইতে অনেক বেশি ভয় পায় আবার শেকড় তোলার কাজটাকে। আবারও নিজের শেকড় গুটিয়ে অন্য কোথাও যেতে হবে, প্রাণপণে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে, এখানে সেখানে নিজের কেটে ছড়ে যাওয়া ক্ষত গুলো আবার মেরামত করতে হবে। স্বামী দুঃসহ, একত্রে বাস করা অসম্ভব। তবুও মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকে কত নারী কেবল এই সংসারের মায়ায়। নিজের হাতে তিলতিল গড়ে তোলা সংসার, মায়া… ভীষণ প্রবল এক মায়া। ঘটি-বাটি-আসবাব-ঘরদোর সব কিছুর জন্য মায়া। বাড়ির ঠিকা ঝি-এর জন্য মায়া, পাশের বাড়ির ভাবীর জন্য মায়া, নিচের তলার খালাম্মার জন্য মায়া… সেই মায়ার কোন শেষ নেই। কত সম্পর্ক, কত স্মৃতি, কত আবেগের সঞ্চয়… যা একজন সাদামাটা গৃহিণী গুছিয়ে নিজের আঁচলে বেঁধে রাখে।
আর যখন ডিভোর্স হয়… এই আজীবনের সঞ্চয় গুছিয়ে সে সাথে নিয়েই আসে। হয়তো আবার বিয়ে হয়, আবারও জীবন শুরু হয়, আবারও চলতে থাকে নিজের শেকড় বিস্তারের চেষ্টা, একটুখানি স্বস্তি খুঁজে পাবার প্রয়াস… কিন্ত আঁচলে বাঁধা রয়ে যায় সেই আবেগের সঞ্চয়। যাদের কারণে সংসার ত্যাগ করতে হয়েছে, তাঁদের কথা হয়তো কখনো মনেও পড়ে না। মন কাঁদে সেই ঘরদোরের জন্য, পাড়ার সেই রোজকার ভিক্ষুক বুড়োটার জন্য, ভাত খেয়ে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নেড়িটার জন্য, বারান্দার ধনে পাতা ভরা টবটার জন্য, সেই ঠিকা ঝি, পাশের বাড়ির ভাবী আর নিচের তলার খালাম্মার জন্য।
নারীর ক্ষেত্রে ডিভোর্স কেবলমাত্র স্বামীর সাথে হয় না…
ডিভোর্স হয় আসলে সংসারের সাথে। নিজের চিরচেনা ঘরদোর, তিল তিল যত্নে সাজানো নিজের একান্ত ভুবনের সাথে… ভাঙ্গা সম্পর্কের ক্ষত যতটা না কষ্ট দেয়, তার চাইতে ঢের বেশি কষ্ট দেয় আঁচলে বাঁধা সেই আবেগের সঞ্চয়গুলো”””””
লেখক–
আফরোজা সরকার

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ