নির্ভরতার প্রতীক ছিলেন কামরান

প্রকাশিত: ১:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২০

নির্ভরতার প্রতীক ছিলেন কামরান

দেবব্রত চৌধুরী লিটন : সিলেট নগরের মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দলে কিংবা দলের বাইরে যে কেউ অনায়াসে তার কাছে যেতে পারতেন। বাসার সদর দরজাও উন্মুক্ত ছিল সবার জন্য। বাসায় যাওয়ার পর দেখা গেল তিনি বেডরুমে আছেন, অনুমতি ছাড়াই বিনা বাঁধায় দু’তলার সিঁড়ি মাড়িয়ে অনায়াসে যে কেউ চলে যেতে পারতেন তার বেডরুম অব্দি। যে কেউ তাঁর কাছে গেলে তিনি ধৈর্য্য ধরে গভীর মনোযোগে পুরো কথা শুনতেন, তারপর আশ^স্ত করতেন। কারও সমস্যার কথা শুনলে বিচলিত হতেন। এই হচ্ছেন জননেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সরব ছিলেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। দলীয় কোন কর্মী রাজপথের আন্দোলনের সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলে বুক চেতিয়ে এগিয়ে যেতেন এই নেতা। কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে কখনও সখনও শোয়ে পরতেন রাজপথে। তার উপর পুলিশের হামলার ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। শুধুমাত্র রাজনৈতিক আক্রোশের কারণে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন অসংখ্য বার।

সিলেট পৌরসভা ২০০২ সালে সিটি করপোরেশন রূপান্তরের পর তিনি প্রথম ভারপ্রাপ্ত মেয়র হন। এরপর ২০০৩ সালে সিসিকের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। ওয়ান ইলেভেনের সময় দুইবার কারাবরণ করতে হয় সিলেটবাসীর প্রিয় এই নেতাকে। ২০০৮ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

কারাগার থেকে মুক্তির পর কামরানের দেওয়া সেই আবেগাপ্লুত কণ্ঠের ভাষণ আজও সিলেটবাসীর কানে সুর হয়ে বাজে। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তখন কুমিল্লা কারাগারে। আমাকে বলা হলো উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হবে। আমি কারা ফটকের সামনে থেকে গাড়িতে উঠলাম। দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে চলার পর গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমেই দেখলাম আমি পৌঁছেছি সিলেটে। তখন আমাকে বলা হলো আমার মা আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই। মায়ের মৃত্যুতে আমাকে পেরোলে মুক্তি দেওয়া হল। আমার জনম দুখি মা আমি জেলে থাকা অবস্থায় আপনাদের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছিলেন। আমার মায়ের কথায় আপনারা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিলেন। আমি আপনাদের কাছে চিরঋনী।’

মঞ্চে কথা বলতে গিয়ে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান সুরেলা কন্ঠে একাধিক গান ধরতেন প্রায়শই। সিলেটের বিভিন্ন মঞ্চে তার গলায় শোনা যেত, ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে শত্রু বলে গণ্য হলাম।’
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সোমবার ভোরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিলেটবাসীর প্রিয় নাম বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

উনসত্তোর এর উত্তাল সময়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি কামরানের। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৭২ সালে সিলেট পৌরসভার সর্বকনিষ্ঠ কমিশনার হয়ে চমক দেখান এই জননেতা। সেই থেকেই সিলেট পৌরসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েন তিনি। টানা ১৫ বছর ছিলেন পৌরসভার কমিশনার। মাঝখানে প্রবাসে থাকায় একবার নির্বাচন থেকে বিরত ছিলেন। ফিরে এসে ১৯৯৫ সালে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন হলে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পান তিনি। ২০০৩ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ২০০৮ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় সিটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন।

শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সিলেটের আওয়ামী রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ১৯৮৯ সালে। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালে পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে প্রথমবারের মত সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন কামরান। ২০০৫ এ সম্মেলনের মাধ্যমে এবং ২০১১ সালে গঠিত কমিটিতে মহানগর আওয়ামী লীগের পুনরায় সভাপতির দায়িত্ব পান। দীর্ঘ তিন দশক সিলেটের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

আজ সিলেটবাসী চিরতরে হারিয়ে ফেললাম নিজেদের প্রিয় এই মানুষটিকে। বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন সিলেটের সত্যিকার অর্থেই একজন অভিভাবক। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বেড়ে উঠে কামরান প্রকৃত অর্থেই হয়েছিলেন জননেতা। দলমতের উর্ধে¦ উঠে সিলেটের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কখনো ধূসর হতে দেননি। কোনো আক্রোশ না দেখিয়ে পক্ষ ও বিপক্ষের সবাইকে ছায়া দিয়ে গেছেন মহান এই নেতা।

লেখক: আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী

আমাদের ফেইসবুক পেইজ