#পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি: একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৯

#পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি: একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম

#পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি:
একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ
আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম
(১৯২২-২০০০)

।। আতাউর রহমান।। কথা সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম বহুগুণে গুণান্নিত একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, সমাজসেবক, সংস্কারক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।

#জন্ম : আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম সিলেট জেলাধীন বিয়ানীবাজার থানার অন্তর্গত মাথিউরা গ্রামে ১৯২২ সনের ২২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জাফর আলী খান ও মাতার নাম জহুরা বেগম।

#শিক্ষা_জীবন : আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম-এর পড়াশোনা শুরু নিজ গ্রামের পাঠশালায়। তাঁর কৈশোর ও যৌবনকাল কেটেছে পিতার কর্মস্থল কোলকাতায়। তিনি কোলকাতায় মিশনারী স্কুল সেন্ট বারনাবাস থেকে ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর পর ভর্তি হন লর্ড রিপন কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।

#কর্ম_জীবন : ১৯৪৭ সনে দেশ ভাগের পর চলে আসেন ঢাকায়। এখানে এসে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ চাকুরী ছেড়ে ফিরে আসেন গ্রামের বাড়িতে। আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম উপলব্ধি করলেন যে, একমাত্র শিক্ষা ছাড়া সর্বহারা মানুষের মুক্তির পথ নেই। তাই তিনি বেছে নিলেন শিক্ষকতা। তিনি শিক্ষকতা শুরু করলেন কসবা প্রাইমারী স্কুলে যোগদানের মধ্য দিয়ে। এরপর নিজগ্রাম মাথিউরা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। আলোকিত হেডমাস্টার আলী আহমদ(অবসরপ্রাপ্ত),
প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালিশ ব্যক্তিত্ব আব্দুস সাত্তার (সেক্রেটারি ), রাজস্ব বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শোয়েব উদ্দিন আহমদ, জালাল উদ্দিন এডভোকেট প্রমুখ ছিলেন তাঁর ছাত্র(এরকম অনেকের নামই উল্লেখ করা যেত)। শিক্ষকতার পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন লেখনি। তিনি ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ, পয়গাম, পূর্বদেশ, মাহে নও, মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত ও আল ইসলাহ পত্রিকা ও সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন। কবিতা লেখার মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে তিনি প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা, ‘ওজিরে তালিম খেদমেত’ কবিতা ‘সাপ্তাহিক -নও বেলাল’-এ ১৯৫১ সনের ২৪ মে প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘দোওয়া’ ছাপা হয় ১৯৫৯ সনের ৬ নভেম্বর ‘মাসিক সৈনিকে’। লেখালেখি করেই তিনি কথাশিল্পী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত তাঁর লিখা ‘সোনার বাংলা’ নাটক মঞ্চস্থ হলে বেশ দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে।
জীবদ্দশায় তিনি দক্ষিণ মাথিউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, মাথিউরা দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বিয়ানীবাজার কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-এর সম্মানীত জীবন সদস্য।

#রাজনৈতিক_জীবন :
আকাদ্দস সিরাজ ছাত্রাবস্থায়ই পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্পৃক্ত হন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু পরিচালিত ‘হলওয়েল মুভমেন্ট’ আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দেশ ভাগের পর গ্রামের বাড়িতে এসে লেখালেখির পাশাপাশি তিনি রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। তিনি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের একটানা ২২ বছর (১৯৬৮-৯০) সাধারণ সম্পাদক এবং ৬ বছর (১৯৯০-৯৬) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কারণে ’৭৫ পরবর্তী সময়ে একবার কারাবরণ করেন এবং এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮২ সনে আরেক বার কারাবরণ করেন। আকাদ্দস সিরাজ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। দেশ স্বাধীনের সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করায় পাকসেনা কর্তৃক তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আসামের করিমগঞ্জ শহর থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক মুক্তবাংলা’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

#স্বীকৃতি :
তিনি জালালাবাদ যুব ফোরাম, সিলেট কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতা দিবস পদক ’৯১ সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ষ্টুডেন্টস এওয়ার্ডস (বি.এন.এস.এ) ইউকে কর্তৃক স্বর্ণ পদক ’৯৮, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ত্যাগী রাজনৈতিক নেতার স্বীকৃতি স্বরূপ ক্রেস্ট প্রদান-১৯৯৯, প্রথম দিনের সূর্য সাংস্কৃতিক সংগঠন, সিলেট কর্তৃক সংবর্ধনা-১৯৯৯ পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

#প্রকাশিত_গ্রন্থ:
কথাশিল্পী আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৯টি : নয়া দুনিয়া (উপন্যাস), নীরব নদী (বড় গল্প), পঞ্চবিংশতি (ছোট গল্প), মাটির চেরাগ (নাটক), সবুর দুনিয়া (কিশোর উপন্যাস), বন্দী জীবনের কিছু কথা (স্মৃতিচারণ), কারাগার থেকে বেরিয়ে (স্মৃতিচারণ), চালচিত্র (গল্প), রাক্ষূসে বন্যা এবং (যুগল উপন্যাস)।
আকাদ্দাস সিরাজুল ইসলামের স্বকীয়তা ছিল স্বাধীনতায়। তাঁর ব্যক্তি-চরিত্রের সাধনা ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির পরিপূর্ণতায়। আর তাঁর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা ও সাহসিকতা। ১৯৮৯ সাল। আমার শিক্ষকতার প্রথম বছর পূর্তিতে আসে ফেব্রুয়ারি মাস। একুশ’কে সামনে রেখে আমার (লেখক) সম্পাদনায় ক’জন বন্ধু মিলে প্রকাশ করি ‘অনির্বাণ একুশ’ নামের সাহিত্য ম্যাগাজিন। এ সাহিত্য সংখ্যার স্বনামধন্য লেখক ছিলেন- আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম, এমসি কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সফিউদ্দিন আহমদ, বিয়ানীবাজার কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রশীদ চৌধুরী, কবি দিলওয়ার, নাট্যকার তাজ উদ্দিন আহমদ, সাংবাদিক মোহাম্মদ আব্দুল বাসিত, নাট্যকার ফয়জুল আলম, তমিজ উদ্দীন লোদী, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার প্রমুখ। ১৯৮৯ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল ‘অনির্বাণ একুশ’ এর প্রকাশনা উৎসব। প্রধান অতিথি ড. সফিউদ্দিন আহমদ। বিশেষ অতিথিদের অন্যতম ছিলেন কথা সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় আসন গ্রহনকালে শ্রোতাদের করতালিতে দাঁড়িয়ে গেলেন কথাসাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজ। আমার হাত থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, “আজ কোন আনন্দ উৎসবের দিন নয়; ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান চলছে। এটা শোক দিবস, বাঙালি জাতিসত্তার রক্তাক্ত প্রতীক। ঘন ঘন হাত তালি দিবেন না। একুশের তাৎপর্যবাহী অনুষ্ঠানসমূহ পরিপূর্ণ মর্যাদায় ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে-এটাই আমরা আশা করব।” কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় সকলকে আকর্ষণ করলো। শত শত দর্শক বিস্ময় বিমুগ্ধ চিত্তে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। হলরূমে নেমে এলো উপলব্ধির পিনপতন নিরবতা। শহীদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আবহ। সেদিন তাঁর চেহারায় দেখেছিলুম আরেক অন্তহীন ক্ষোভ। তিনি হলেন আমাদের ক্ষণজন্মা আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম।

#মৃত্যু : এসব সৃজনশীল মানুষের মৃত্যু হয় না। চোখ মুজলেই মানুষ মরে না। তাই দক্ষ কথা সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম ২০০০ সনের ২ আগস্ট চিত্ত বদল করে চলে গেলেন ওপারে। এখান থেকে তাঁকে আর দেখা যাবে না। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পারিবারিক গোরস্থানে তাঁর শবদেহ দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর সিলেটের ‘জালালাবাদ লোক সাহিত্য পরিষদ’ কর্তৃক একটি স্মারক গ্রন্থ বের হয়। পরবর্তী ২০০১ সনে দু’খণ্ডে তাঁর সমগ্র রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে।

#লেখক: প্রধান শিক্ষক, দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয় ও সভাপতি- বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ খবর

আমাদের ফেইসবুক পেইজ