পবিত্র শবে কদরের ফজিলত ও ইবাদত

প্রকাশিত: ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ, মে ৯, ২০২১

পবিত্র শবে কদরের ফজিলত ও ইবাদত

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী

পবিত্র শবে কদরের ফজিলত ও ইবাদত। হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।শবে কদরের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। এ রাতে সিদরাতুল মুনতাহায় অবস্থিত অগণিত ফেরেশতাসহ হজরত জিবরাইল (আ.) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হন এবং ফেরেশতারা দুনিয়ার সমস্ত অংশে ছড়িয়ে পড়েন। প্রত্যেক স্থানে স্থানে রুকু–সিজদা করেন। মুমিন নর–নারীর জন্য দোয়ায় মশগুল হন। (তাফসিরে ইবনে কাসির)। এই মহান রজনীতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য গুনাহগারকে মাফ করেন, তওবা কবুল হয়। এ রাতে মাতা–পিতা ও আত্মীয়স্বজনের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে তাদের কবর জিয়ারত ও তাঁদের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন।
এ রাতে পড়ার জন্য রাসুল (সা.) যে দোয়া শিখিয়েছেন তার অর্থ হলো, ‘আল্লাহ আজকের রাতে আমাকে শবে কদরের ফজিলত দান করুন, আমার কাজকর্ম সহজ করে দিন, আমার অক্ষমতা মার্জনা করুন, আমার পাপসমূহ ক্ষমা করুন।

পবিত্র ও মহিমান্বিত রাতে আল্লাহর রহমত মাগফিরাত ও নাজাত থেকে যারা বঞ্চিত থাকবে: মদখোর, মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ী; মাতা–পিতার অবাধ্য সন্তান; আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, ইচ্ছাকৃত নামাজ ভঙ্গকারী, বিনা কারণে অপর মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকারী। (তাফসিরে কাশফুল আসরার, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৬৪)।

উপরোক্ত দোষে যারা দোষী এ রাতের বরকত পাওয়ার জন্য প্রথমেই তাদের তওবা করতে হবে। তাদের তওবা আল্লাহ কবুল করার পরই তারা এই রাতের ফজিলত লাভ করবে। এ রাতে যারা নিজের অপরাধ ক্ষমা চেয়ে এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে কাঁদবে, তাদের দোয়া কবুল হবে। শুধু নামাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ রাতে পবিত্র কোরআন শরিফ তিলাওয়াত, জিকির, মিলাদ শরীফ, ইস্তিগফার, তাস​বিহ পাঠ, তাওবা, বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া একান্ত করণীয়।

শবে কদরে উম্মতের বৈশিষ্ট্য:

শবে কদর উম্মতের জন্য আল্লাহ পাকের মহান দান। এটা কেবল এ উম্মতেরই বৈশিষ্ট্য। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা শবে কদর আমার উম্মতকেই দান করেছেন; পূর্ববর্তী উম্মতকে নয়।

ইমাম মালিক (রহ.) সূত্রে বর্ণিত আছে, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেওয়া হলো যে, আপনার উম্মতের বয়স অন্যান্য উম্মতের তুলনায় কম হবে, তখন তিনি আল্লাহর সমীপে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ! তাহলে তো পূর্ববর্তী উম্মতগণ দীর্ঘ জীবন পেয়ে ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে যে স্তরে উপনীত হয়েছে, আমার উম্মত সে স্তর লাভ করতে পারবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লাইলাতুল কদর দান করেন এবং এটাকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা দেন।

শবে কদর কোন রাতে?

একদা হযরত উবায়দা (রা.) নবী করীম (সা.) কে লাইলাতুল কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তখন নবীজী সেই সাহাবিকে বললেন রমজানের বেজোড় শেষের দশ দিনের রাতগুলোকে তালাশ করো। (বুখারি, হাদিস নং: ২০১৭)।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি কেউ লাইলাতুল কদর খুঁজতে চায় তবে সে যেন তা রমজনের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে। (মুসলিম, হাদিস নং : ৮২৩)। তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমজানের রাতগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

এ সম্বন্ধে সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে মতভেদ চলে আসছে। এ প্রসঙ্গে প্রায় চল্লিশটি বক্তব্য আছে। মুসলিম শ​রিফে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, শবে কদর হলো রমজানের ২৭তম রাত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত আছে। কোরআন–হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে শবে কদর রমজান মাসে আসে; কিন্তু এর সঠিক কোনো তারিখ নির্দিষ্ট নেই। বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

হাদিসের আলোকে আরও জানা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন এর তারিখ ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে। অর্থাৎ যদি এ রাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তবে অনেক অলস প্রকৃতির মানুষ শুধু এ রাতে ইবাদত–বন্দেগিতে নিয়োজিত হতো। অবশিষ্ট সারা বছর ইবাদত–বন্দেগি না করে আল্লাহ তাআলার রহমত হতে বঞ্চিত থাকত। দ্বিতীয়ত, এ রাত নির্দিষ্ট করা হলে কোনো ব্যক্তি ঘটনাক্রমে রাতটিতে ইবাদত করতে না পারলে সে দুঃখ ও আক্ষেপ প্রকাশ করতে করতে অনেক সময় নষ্ট করে দিত। এতে সে মাহে রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যেত। এ রাত যেহেতু নির্দিষ্ট করা হয়নি, সে জন্য এ রাতের সন্ধানে আল্লাহর সব বান্দা প্রতি রাতে ইবাদত–বন্দেগি করে থাকেন এবং প্রত্যেক রাতের জন্য পৃথক পৃথক পুণ্য অর্জন করতে থাকেন।

ইবনে মাজাহ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হযরত রাসূল (সা.) বলেন, যে লোক শবে কদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকে পরিপূর্ণ বঞ্চিত হল। আবু দাউদ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর পেলো কিন্তু ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে পারলো না, তার মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নেই। কদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশদিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন। (মুসলিম, হাদিস নং : ১১৬৭)।

শবে কদরে কী করব: রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ‘লাইলাতুল কদর’ লাভ করার জন্য রমজানের শেষ দশরাত জাগ্রত থেকে ইবাদতে কাটিয়েছেন এবং উম্মতে মুহাম্মাদীকেও সারা রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসূল (সা.) বলেন, শবে কদরকে নির্দিষ্ট না করার কারণ হচ্ছে যাতে বান্দা কেবল একটি রাত জাগরণ ও কিয়াম করেই যেন ক্ষ্যান্ত না হয়ে যায় এবং সেই রাতের ফজিলতের উপর নির্ভর করে অন্য রাতের ইবাদত ত্যাগ করে না বসে। তাই বান্দার উচিত শেষ দশকের কোন রাতকেই কম গুরুত্ব না দেয়া এবং পুরোটাই ইবাদাতের মাধ্যমে শবে কদর অন্বেষণ করা।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আমি রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহর রাসূল আমি যদি কদরের রাত সম্পর্কে অবহিত হতে পারি তবে আমি কি করব? তখন রাসূল (সা.) আমাকে এই দুয়া পাঠ করার জন্য বললেন। ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’। (তিরমিজি, হাদিস নং : ৩৫১)।

লাইলাতুল কদরের ফজিলত অপরিসীম। তাই সারা রাত জাগরণ করে সঠিকভাবে ইবাদত-বন্দেগীতে মনোনিবেশ করা কর্তব্য। বেশি বেশি নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, সালাতুস তাসবিহ, কাজা নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সাদকা, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইসতেগফার, দুয়া-দুরূদসহ নফল আমলের প্রতি মনযোগী হওয়া একান্ত জরুরি।

কোরআনুল কারীমে এরশাদ হয়েছে, ‘আমি একে নাযিল করেছি শবে কদরে। শবে কদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? শবে কদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা আল কাদর : ১-৫)।

আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে শবে কদরের কল্যাণ লাভ করার তাও​ফিক দিন, পবিত্র কোরআন শরিফ পড়ার,পবিত্র কোরআন শরিফ বোঝার, পবিত্র কোরআনমতো জীবন গড়ার তাও​ফিক দান করুন, ও শবে কদরের উছিলায় বিশ্বের মানব জাতিকে করোনা মহামারী ভাইরাস থেকে মুক্তি দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখকঃ- বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী ছাহেব, সাবেকঃ- ইমাম ও খতিব কদমতলী মাজার জামে মসজিদ সিলেট।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ