পাথর খনি, পরিবেশ ও পর্যটন

প্রকাশিত: ৩:৪১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০

পাথর খনি, পরিবেশ ও পর্যটন

আব্দুল হাই আল-হাদী :: পরিবেশ রক্ষা ও পর্যটনের বিকাশে পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পাথর কোয়ারি বন্ধও করা হয়েছে। পাথর কোয়ারিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের ‘পেশা পরিবর্তনের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে, যাতে বেকার শ্রমিকরা বিকল্প কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে। পাথর কোয়ারি বন্ধের মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর এ পদক্ষেপ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এ উদ্যোগ বানচাল করতে একটি সুবিধাভোগী পক্ষের নানা তৎপরতার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যার কারণে পাথর কোয়ারি বন্ধের সরকারি উদ্যোগ কতটুকু টেকসই ও ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়গুলো। সেসব পাহাড়ের বুক চিরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বেশ কয়েকটি নদী। স্টম্ফটিক জলের সে নদীগুলো ছিল খনিজসম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর। দু’পাশে নিবিড় বন আর পাহাড়-টিলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোয় জড়িয়ে আছে তীরের মানুষের সুখ-দুঃখের বিচিত্র জীবনগাথা। সেসব নদীর ঘাটে মানুষ গোসল করত, সাঁতার কাটত। শিকারিরা মাছ ধরত। মানুষ নৌকা দিয়ে যাতায়াত করত এখান থেকে ওখানে। স্টম্ফটিক জলের গভীরে ছিল বিশাল আকৃতির অনেক পাথর। ১৫ থেকে ৫০ মিটার গভীরের সে পাথরগুলো ঝলক দিয়ে জানান দিত নিজের উপস্থিতি। গার্হস্থ্য কাজে ‘শিলপাটা’ তৈরির জন্য কখনও কেউ দু’একটি পাথর নিয়ে যেত। পারের পাহাড়-টিলার নিবিড় অরণ্যে বসবাস করত নানা প্রজাতির প্রাণী। পাহাড়-নদী-বন আর মানুষের মধ্যে অদ্ভুত এক সখ্য গড়ে উঠেছিল। জাফলং, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া, শ্রীপুর, উৎমাছড়া, বিছনাকান্দি, লাউড়ের গড়সহ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় সব জায়গাতে দেখা যেত এ অভিন্ন চিত্র।

ছবির মতো প্রকৃতির আপন হাতে গড়া অনিন্দ্য সুন্দর জায়গাগুলো ছিল যে কারও কাছে আকর্ষণীয়। পর্যটকদের পদভারে সারাবছর মুখরিত থাকত এসব জায়গা। বনভোজন আর শিক্ষাভ্রমণে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে ছিল এসব স্থান। প্রকৃতির সৌন্দর্যমণ্ডিত এসব স্থান কিন্তু মুভি পরিচালকদেরও অজানা ছিল না। তারাও তাদের শ্রেষ্ঠ ছবির শুটিংয়ে এসব স্থান বেছে নিতেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সাড়া জাগানো অনেক ছবির চিত্র ধারণ করা হয়েছে এসব স্থানে। কিন্তু ‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’। রূপ-রস-গন্ধ আর সম্পদে পূর্ণ ‘প্রকৃতিকন্যা’র এ সৌন্দর্য আর সম্পদই যেন তার কাল হয়ে দেখা দিল।

গত শতকের নব্বইয়ের দশক। দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামোগত কাজের গতি ত্বরান্বিত হলে পাথরের ব্যাপক চাহিদা দেখা দেয়। খোঁজাখুঁজি শুরু হয় পাথর খনির। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই এর সন্ধান পাওয়া যায় সিলেট অঞ্চলে। ক্রমান্বয়ে জাফলং, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া, শ্রীপুর, উৎমাছড়া, বিছনাকান্দিসহ ৮টি পাথর খনি থেকে পাথর উত্তোলিত হতে থাকে। সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা নিয়ে লোকজন খনি থেকে পাথর উত্তোলন শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে সর্বমোট ৫০টি পাথর কোয়ারি রয়েছে। প্রথমদিকে ইজারা গ্রহীতারা নদী থেকেই পাথর উত্তোলন করে। বারকি শ্রমিক দিয়ে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে তারা সংগ্রহের কাজ করত। মোটামুটি একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে সংগ্রহের সে কাজটি চলতে থাকল কয়েক বছর। অনেক মানুষেরও কর্মসংস্থান হলো। কিন্তু ইজারা গ্রহীতারা কোয়ারি নয়, যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁসের সন্ধান পেয়ে বসল। তারা ক্রমশ নদীর গভীরে মাটির নিচের পাথর সংগ্রহে মনোযোগী হলো। কিন্তু সব তো আর মানুষের দ্বারা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই তারা খননযন্ত্রের আশ্রয় নিল। তারা নদীতীরের পাথরের জন্য শত শত বিশাল আকৃতির গর্ত খুঁড়ে পাথর সংগ্রহ করল। গর্তের বালু এসে পড়ল নদীতে। ফলে নদী ক্রমশ ভরাট হতে লাগল। কোয়ারি হলেও পাথর তো অফুরন্ত নয়। গর্ত পর্ব শেষ হলে মাটির ৪০০-৫০০ মিটার গভীর থেকে শুরু হলো পাথর আহরণ। উদ্ভাবন করা হলো অভিনব পদ্ধতি ‘বোমা মেশিন’। সে মেশিনের সাহায্যে নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হলো ‘পাথর’।

ইজারা গ্রহীতাদের লোভী হাত আরও প্রসারিত হলো। তাদের দৃষ্টি পাশের বন-পাহাড়ের দিকে। পাথর সংগ্রহে উজাড় করে ফেলল প্রাকৃতিক বন। প্রশাসনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে নৈরাজ্য কায়েম করা হলো। হুমকি আর ভীতি সঞ্চারণের মাধ্যমে স্থানীয় নিরীহ বাসিন্দা অনেককে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হলো। আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মহাসড়ক, সংরক্ষিত বন, নদীতীর যত্রতত্র গড়ে তোলা হলো অবৈধ স্টোন ক্রাশার মেশিন। সেসব মেশিনের শব্দ আর ধুলোদূষণে পুরো এলাকা বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলা হলো। গভীর, অপরিকল্পিত গর্ত আর পাহাড়-টিলা কাটার দরুন খনি এলাকায় মারাত্মক ভূমিধস দেখা দিল। ক্রমে বদলে যেতে থাকল আবহমান ভূপ্রকৃতি।

কোয়ারিতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে- এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ইজারা গ্রহীতা রাঘববোয়ালদের বেপরোয়া আর অবৈধ কর্মকাণ্ডে ক্রমান্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়। শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যায়নি। কর্মস্থলে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মাটির গভীর, পাহাড় ও নদীতীরে খনন কাজের ফলে প্রায়ই মারাত্মক ভূমিধসের ঘটতে থাকে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়, শুধু ২০১৭ সালে ৩২ জন নিরীহ শ্রমিক পাথর কোয়ারিতে ভূমিধসে মারা যায়। প্রতিদিন কত মানুষ আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে, তার কোনো হিসাব নেই। দুর্ঘটনায় নিহত অনেকের লাশ লুকিয়ে ফেলারও অভিযোগ আছে।

পরিবেশবাদীরা প্রথম থেকেই পাথর কোয়ারিতে পরিবেশ বিধ্বংসী কাজের প্রতিবাদ করে আসছেন। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো। সময়ের পরিক্রমায় হাইকোর্ট বোমা মেশিনের ব্যবহার অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ক্রাশার মেশিনগুলোকে নির্দিষ্ট জোনে স্থানান্তর করার নির্দেশ দিয়েছেন। ক্রাশার মেশিন স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নীতিমালা তৈরি হয়েছে। আদালতের আদেশে গঠিত টাস্কফোর্স মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও পরিবেশবিনাশী কাজ হ্রাসের পরিবর্তে ক্রমশ বেড়েছে। পর্যটনকেন্দ্র জাফলং এবং ডাউকি ও পিয়াইন নদীকে সরকার ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করার পরও তা প্রায় ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়।

কিন্তু প্রাণ, পরিবেশ আর জীববৈচিত্র্যের সর্বনাশ করে পাথর কোয়ারি সত্যিকার অর্থে কী দিয়েছে? বাংলাদেশের ৫০টি পাথর কোয়ারি বার্ষিক চাহিদার মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ পূরণ করছে এবং ঘাটতির বাকি অংশের পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করা হচ্ছে। গত অর্থবছরে এই খাত থেকে মাত্র ১৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এ সামান্য টাকার জন্য প্রাণ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তার মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা এবং সে ক্ষতি অপূরণীয়। শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানি আর অগণিত পঙ্গু মানুষের কোনো ক্ষতিপূরণ হয়নি। ইজারা ও রয়েলিটি আদায় থেকে যে আয় হয়, তার পরিমাণ নগণ্যই বলা যায়। স্টম্ফটিক জলের ডাউকি, পিয়াইন, লোভাছড়া, ধলাই, উৎমাছড়া, যাদুকাটা ইত্যাদি নদীকে কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব? প্রাকৃতিক নিবিড় বনভূমি, পাহাড়-টিলা, বন্যপ্রাণী ইত্যাদির ক্ষতি কখনও পূরণ হওয়ার নয়।

লেখক ও পরিবেশকর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ