ফিরে দেখা, বন্ধু মুক্তাদির

প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৮

ফিরে দেখা, বন্ধু মুক্তাদির

 

[এক]
আজহারুল ইসলাম চৌধুরী ও রুহুল আনোয়ার
৮৬ সালের সালের শীতের বিকেল। মফস্বল শহর সিলেটের আমরা দুই কিশোর সাইকেল চালিয়ে ছুটছি, ছোট হয়ে আসা দিনের আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে বন্ধুর বাসায়, কাজির বাজারের এক প্রান্তে। হাতে গোনা দিন কয়েকের ছুটিতে বাড়ি এসেছি আমরা। ছুটির আনন্দ টেনে লম্বা করতে আমরা একত্র হচ্ছি মজার আড্ডায়। শহরতলীর সব চেয়ে বড় গরুর হাট মাড়িয়ে ক্লান্ত দুজন তার বাসায় পৌঁছে দেখি- সে রাশভারী, মধ্য বয়সী এক ভদ্রলোকের সাথে গভীর আলাপে মত্ত।

আমরা কৈশোরের সহজাত অধৈর্য্য নিয়ে বাইরে খুনসুটিতে সময় কাটাতে থাকলাম। অনেক ক্ষণ পরে আমাদের বন্ধু বেরিয়ে এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো। আমাদের কৌতুহল মেটাতে লাজুক মুখে জানালো–ভদ্রলোক এক জন ব্যাঙ্কার, ভবিষ্যতের কিছু ব্যবসার ব্যাপারে উনার কাছ থেকে শিখছিলো। আমাদের তখন মনে গেথে আছে গলির মোড়ে দেখে আসা মেয়েটা, মাথায় ঘুরছে কালকে স্যারের বাসায় পড়তে যাবো কি যাবো না কিংবা বাসায় ফিরার পথে বাংলা ফাইভ না গোল্ডলিফ কিনবো?
আর যাই থাকুক, চিন্তার একেবারে শেষপ্রান্তেও ব্যবসার দেখা মিলবে না, এটা নিশ্চিত। অল্প বিস্তর আলাপের পরে পেলাম, দৃপ্ত কন্ঠে আমাদের বন্ধুর উচ্চারণ
-আমি ব্যাবসায়ী হতে চাই নিজে উপায় বের করে।
-রাজনীতিতে যাবো, নিজের চেষ্টায়।

রাজনৈতিক ভারসাম্যহীন আশির দশকে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম সিলেটের বিএনপির আঁতুড়ঘর থেকে মাত্র ক’হাত দূরে। আমরা বুঝিনি, বুঝতে চাইনি কিছুই, শেষ বিকেলের আলোয় এ কিশোরকে বড় অচেনা লাগছিলো। আজহার আর আমি ভাবছিলাম সে আমাদের নয়। কিন্তু, মেনে নিতে অনেক দ্বিধা ছিলো দুজনেরই। ছেলেবেলার নিখাদ বন্ধন।
আজ মধ্য বয়সে এসে, সুদুর উত্তর আমেরিকায়, দ্বিধাহীন আজহার আর আমি সগর্বে মেনে নিলাম
-আসলেই সে আমাদের নয়, সে অনেকের।

-বত্রিশ বছর আগেই যে ডাক শুনেছিলো, সে সকলের।
-ষোলো বছরেই যে স্বপ্ন দেখেছিলো আপন আলোতে জ্বলে উঠার, তাকে আমাদের অল্প কজনে আটকে রাখা যায় না।
বিরল আমাদের বন্ধু ভাগ্য, ২০১৮ তে সে সকলের খন্দকার মুক্তাদির!
পরিকল্পিত প্রস্তুতিতে সে হয়েছে- শিল্পোদ্যোক্তা, মানবসেবী, সংগঠক, ব্যবসায়ী নেতা এবং ত্যাগী রাজনীতিবিদ। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তার পরিবেশ-বান্ধব প্রতিষ্ঠানসমুহে কর্মরত পনের শ’য়ের অধিক শ্রমজীবী। সাংগঠনিক দক্ষতায় নেতৃত্ব দিয়েছে– BTTLMEA (Bangladesh Terry Towel & Linen Manufacturer & Exporter Association) Ges DCCI (Dhaka Chamber of Commerce & Industries) মতো প্রতিষ্ঠানে। বহুদিন পর্যন্ত স্থানীয় রাজনীতিতে সাংগঠনিক কোনও পদ ছিল না তাঁর, তবুও সিলেট বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের জন্য নীরবে নিভৃতে বিশাল ভূমিকা রেখে গেছে। আমার দৃষ্টিতে মুক্তাদিরের বড় অর্জন হচ্ছে- পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে সিলেটের সাধারণ মানুষসহ দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন।

[দুই]
মাসুম খান
১৯৭৫ সালের জানুয়ারী মাসে আমকে ও আমার দুই বছর বয়সী ছোট ভাইকে নিয়ে বাবা-মা দেশে ফেরৎ আসলেন, বিলাত থেকে। উদ্দেশ্য ছিলো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে বাবা নিজে ব্যবসা করবেন এবং সেই সাথে সন্তানদের দেশের মাটি ও সংস্কৃতিতে বড় করবেন। তাদের এই সিদ্ধান্তে আমি আজ কৃতজ্ঞ। দেশকে পেলাম। তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ আর আত্মীয়স্বজন আর কিছু ভালো বন্ধুদের পেলাম পড়াশুনার বিভিন্ন স্তরে।

শুরুতেই ব্লু-বার্ড স্কুলে তখন যে দুই-তিন জন সমবয়সীর সাথে বন্ধুত্ব হলো, তাদের একজন মুক্তাদির। ক্লাসের বিরতি এবং টিফিন পিরিয়ড আমাদের খেলার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ছুটির পর তাদের পুরানো টয়োটা গাড়িতে করে চলে যেতাম, কাজির বাজারের বাসায়। তাদের বাড়ির বড় বারান্দায় ফুটবল-কাবাডিসহ কত কি খেলা চলতো সারা বিকেল। সন্ধ্যা ঘনালে বাসায় পৌঁছে দিতেন তাদের চালক বরুনদা।

আমার বাল্যকালের অন্যতম সেরা বন্ধু মুক্তাদির। তারপর ব্লু-বার্ড থেকে আমরা যে ক’জন সিলেট ক্যাডেট কলেজে গেলাম, সেখানেও মুক্তাদির সঙ্গী। ১৯৭৫-এর জানুয়ারীতে যে পরিচয় ও সখ্যতার শুরু, তা আজ ২০১৮-তেও অক্ষুন্ন আছে। আমার বন্ধু মুক্তাদির একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী। এ লেখার উদ্দেশ্য মানুষ ও বন্ধু মুক্তাদিরকে আপনাদের সামনে তুলে ধরা।

বন্ধু অন্তপ্রাণ মুক্তাদিরের অন্যতম গুণ হচ্ছে চারিত্রিক সততা এবং দৃঢ়তা। আজ পিছন ফিরে তাকালে ছোট্ট, সাধারণ সব স্মৃতির ভিতর অসাধারণ এক নেতাকে খোঁজে পাই। ড্রইং এ মুক্তাদির বরাবরই কাঁচা, আমারও একই দশা। ক্লাস ফাইভে থাকতে একবার আমরা দুজন ড্রইং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই ঐদিন বাসায় চলে আসলাম। অতঃপর ধরা পড়তে খুব বেশি দেরি লাগেনি। তখন আমরা প্রিন্সিপাল স্যারের ভয়ে তটস্থ থাকতাম, তারপরও মুক্তাদির আমাকেসহ স্যারের সামনে গিয়ে স্বীকার করলো। মজার বিষয় হলো, সে গম্ভীর ভাবে উনাকে বলল, সে ড্রইং পরীক্ষা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায় না। সবার তো ছবি আঁকায় দক্ষ শিল্পী হবার দরকার নেই। এ সমস্যার সমাধান শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু, দীর্ঘ দিন পর আজ আমি বিস্মিত হই, ১০/১১ বছরের একটা পছলে জাঁদরেল একজন প্রধান শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে কতো দৃঢ়তায় তার মত ও যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো!

সংগঠক ও নেতৃত্বের গুণাবলী মুক্তাদিরের প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল সেই স্কুল জমানাতেই। আবারো সেই ক্লাস ফাইভের ঘটনা। সারা বছর বৃত্তির কোচিংয়ের ব্যাপক রগড়ের পরে শিক্ষক-শিক্ষিকারা সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদেরকে নিয়ে পিকনিকে যাবেন। যদিও দুই-একজন টিচাররা আয়োজনের সম্মুখভাগে থাকলেন, কিন্তু গাড়িভাড়া করা, খাবারের আয়োজন ইত্যাদির ব্যাপারে মুক্তাদির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, To have an old head on young shoulders- যার অর্থ করলে দাঁড়ায় তার বয়সের তুলনায় গুরু দায়িত্ব পালন অথবা যে কোন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারা। এই মুহুর্তে মুক্তাদিরকে নিয়ে লিখতে বসে এই কথাটাই মনে আসছে। এর উদাহরণ বহুবার আমি পেয়েছি আমার স্কুলে এবং ক্যাডেট কলেজের জীবনে। ক্যাডেট কলেজ জীবন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে পিতা-মাতা ছাড়া শিক্ষক ও ক্যাডেট কলেজের সিনিয়র ভাইদের সাথে থাকার। সেখানেও মুক্তাদির সব সময় পরিণত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে।

[তিন]
মুস্তাফিজুর রহমান
মুক্তাদির আমার সিলেট ক্যাডেট কলেজের বন্ধু। তাকে আমরা সব বন্ধুরা জানি একজন নিরহংকার পরোপকারী আশাতীত ভালমানুষ হিসাবে। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় আমরা একবার একসাথে কলেজের হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম, হাসপাতালে আমাদের খাবার নিয়ে আসতেন মেসওয়েটার মাহবুব ভাই। মুক্তাদির খাবারের প্লেটে খাবারের একটিও দানা নষ্ট না করে খুব পরিচ্ছন্নভাবে খাবার শেষ করত। একদিন খাবার পর মুক্তাদিরের অনুপস্থিতিতে মাহবুব ভাই বললেন, মুক্তাদির ভাই নিঃসন্দেহে বনেদী পরিবারের সন্তান। উনার খাবার আদব-কায়দা খেয়াল করেছেন?

আমরা পরে জানতে পারি সে একটি নীতি আর আদর্শসমৃদ্ধ রাজনৈতিক পরিবারে সন্তান। তার সুযোগ ছিল উন্নত বিশ্বের যে কোন দেশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করার। কিন্তু তা না করে শুধু তার বাবার আদর্শ বুকে নিয়ে দেশপ্রেমের কারণে সে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে।
আমি ব্যাক্তিগতভাবে রাজনীতি পছন্দ করি না বলে তাকে আমি আসলে নিরুৎসাহিত করেছিলাম। পরে তার দেশপ্রেম আর দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতাটা বুঝতে পেরে শুধু বলেছিলাম- দোস্ত, অল দ্যা বেস্ট। তবে তোর ব্যাপারে খারাপ কিছু শুনলে খুব খারাপ লাগবে। যদিও জানি রাজনীতি ইনশাআল্লাহ তোকে করাপ্ট করতে পরবে না।

[চার]
রমিত আজাদ
সময়টা ১৯৮২ সাল। আমরা তখন সিলেট ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। কলেজের প্রথা অনুযায়ী আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো এক্সকারশনে। এক্সকারশন শুনলেই আমাদের মন নেচে উঠতো, যতটা না শিক্ষা সফরের জন্য, তার চাইতে বেশি ক্যাডেট কলেজের বন্দী জীবন থেকে সামান্য মুক্তি লাভের আনন্দে! জানা গেলো এক্সকারশনের স্থান হবে সিলেট শহরের অদূরে খাদিমনগর চা বাগান। স্পটের নাম শোনে আমরা যারপরানাই খুশি হয়েছিলাম, কারণ আমাদের মেজরিটি ছিলো সিলেটের বাইরের, যাদের কাছে চা বাগান ছিলো একটা বড় ব্যাপার।

ইনসিডেন্টালি খাদিমনগর চা বাগানের সেই সময়ের ব্যবস্থাপক ছিলেন আমাদেরই সহপাঠী আখতারুল মোস্তফার শ্রদ্ধেয় পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব গোলাম মোস্তফা। তখন মোস্তফা আঙ্কেল আমাদের প্রিন্সিপাল অপর বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক বাকিয়াতুল্লাহ স্যারকে বললেন, আপনারা আমার বাগানে আসবেন, এতো আমার সৌভাগ্য। তার উপর আমার নিজের ছেলেই আছে ওদের মধ্যে। আমার অনুরোধ আপনারা দুপুরের লাঞ্চ ও বিকালের চা চক্র আমার বাড়িতেই করেন, সব আয়োজন আমি করবো।
যথাদিনে আমরা খাদিমনগর চা বাগানে পৌছালাম।

আমাদের সাথে আমাদের শ্রেণিশিক্ষকরা ছাড়াও ছিলেন, আমাদের শ্রদ্ধেয় উপাধ্যক্ষ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল আমীন। ঐ এক্সকারশনটি ছিলো আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনাগুলোর একটি। মোস্তফা আঙ্কেল বাগানের গেটে আমাদের রিসিভ করলেন। তারপর আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো চা বাগানটি দেখালেন। চায়ের গাছ থেকে শুরু করে চা প্রসেসিং পর্যন্ত অনেক অজানা তথ্য আমাদেরকে দিলেন। ষাটজন কিশোর আমরা ঐ অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্যের মধ্যে পুরো দিনটি কাটিয়েছিলাম প্রজাপতির ডানায় ভর করে!

তারপর সময় এলো বিকালের চা চক্রের। পাহাড়ের চূড়ায় মোস্তফা আঙ্কেলের নয়নাভিরাম বিশাল বাংলোর বারান্দায় আমরা সবাই বসলাম। আবদুল্লাহ আল আমীন স্যার বললেন- শুধু খাওয়া-দাওয়া করলে হবে না, তোমাদের প্রতিভাও প্রদর্শন করতে হবে। যে যা পারো গান, আবৃত্তি, নাটক, উপস্থাপনা ইত্যাদি দেখাতে হবে।

শুরু হলো ষাটজন বালকের প্রতিভা প্রদর্শন। আমরা লক্ষ্য করলাম, আমাদের মাঝে কয়েকজন অপরিচিত মুরুব্বিও হাজির আছেন। ভাবলাম উনারা বাগানের কর্মকর্তা হতে পারেন। স্যারের পরিচিত অথবা, এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ হতে পারেন। যাহোক, আমাদের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার শেষে, উপাধ্যক্ষ স্যার বললেন- আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন অত্র এলাকার প্রাক্তণ সংসদ সদস্য জনাব খন্দকার আব্দুল মালেক। এবার আমি উনাকে কিছু বলতে অনুরোধ করবো।

এই কথা শুনে আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। আমাদের মাঝে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত আছেন তা আমরা বুঝতেই পারিনি।

জনাব খন্দকার আব্দুল মালেক উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন- প্রমেই আমি বলতে চাই যে, ক্যাডেট কলেজে কিছু শৃঙ্খলা শেখানো হয়। যা এই বয়সে অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ! আমার ছেলেকে সেটা ভালোভাবে শেখানো হচ্ছে, এই দেখে আমি আনন্দিত। আজ আমার এখানে আসার কথা ছিলো না। জনাব মোস্তফা যখন দেখলেন যে ক্যাডেটদের মাঝে আমার ছেলে মুক্তাদির উপস্থিত আছে, তখন তিনি মুক্তাদিরকে বলেছিলেন- তোমার বাবা-কে আসতে বলি?

উত্তরে আমার ছেলে মুক্তাদির বলেছিলো- ‘না, প্রয়োজন নাই। এটা এক্সকারশন। পিতামাতার সাথে দেখা করার জন্য ক্যাডেট কলেজের রীতি অনুযায়ী পৃথক প্যারেন্টস ডে আছে। আমি ঐ দিনে আমার পিতামাতার সাথে দেখা করবো। ক্যাডেট কলেজের শিক্ষা ও আমার ছেলের এই শৃঙ্খলাবোধ দেখে আমি মুগ্ধ!

আমরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। উপাধ্যক্ষ আল-আমীন স্যার আনন্দিত হলেন। ঐদিন আমরা সবাই মুক্তাদিরের গর্বে গর্বিত হয়েছিলাম। সত্যিই তো, আমরা সবাই-ই ওখানে পিতামাতার সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকি, তাই কেউ যদি হঠাৎ কোন সুযোগ নিয়ে তার পিতামাতার সাথে পৃথকভাবে দেখা করে, এতে আমাদের অন্য সাবার মন খারাপ হবে। মুক্তাদির এটা ভেবে তার পিতামাতার সাথে দেখা করতে চায়নি। ঐ কিশোর বয়সেই তার মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, সততা, এবং অপরের বেদনাকে অনুভব করার সূক্ষ্ম অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিলো!

[পাঁচ]
সাজ্জাদ ওয়াহিদ
আমার সাথে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের পরিচয় ব্লু-বার্ড স্কুলে পড়ার সময় থেকে। সে পরিচয় আরো গাঢ় হল যখন আমরা সিলেট ক্যাডেট কলেজের একই কক্ষের বাসিন্দা হলাম। এরপরে কমবেশি প্রায় চারটি বছর আমরা রুমমেট হিসাবে থেকেছি। ক্যাডেট জীবনের কিছু সময় থাকাটা আর বাকি জীবনে সেই বন্ধুত্ব বজায় রাখাটা বেজায় কঠিন একটা ব্যাপার। সবার সাথে সবার যোগাযোগ থাকা বা রাখাটা আমাদের ব্যস্ততায় ভরা এই জীবনে খুব দুস্কর।

মুক্তাদিরের সাথে আমার বহু স্মৃতি আছে। সব বলতে গেলে এই স্বল্প পরিসরে কিছুই বলা যাবে না। তারপরেও আমি এই ছোট পরিসরে একটা কথা ঘটনা বলতে চাই। এই ঘটনাটা খুবই আবেগের এবং এর কোন প্রতিদান দেওয়া আমার মত তুচ্ছ মানুষের পক্ষে একরকম অসম্ভব।

আমার মা ১৯৯১ সালের ক্যান্সারে ভুগে মারা যান। সেই দিন ছিল আগস্ট মাসের ২৬ তারিখ। সন্ধ্যা থেকে বেজায় বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের বাসায় অনেকেই এসেছেন। কেন জানি বিকেল থেকেই আমরা একটা খারাপ কিছু হতে চলেছে, এমন একটা ধারণা নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই সময়ে, প্রায় এশার আজানের খানিক পরে আমার মাকে ঘিরে বসে থাকা একজন চিকিৎসক মাথা নাড়তে লাগলেন। তাঁর চোখে অঝোর ধারায় জল। তিনি নিঃশব্দে উঠে চলে গেলেন। ঘরে যারা পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করছিলেন, তাদের পাঠের শব্দ অনেক জোরদার হয়ে উঠল। সদ্য মাতৃহারা আমরা তিন ভাই ভিড় ঠেলে আমাদের মায়ের নিথর সেই দেহের পাশে গেলাম। কি করব, তা ভেবে উঠতে পারছিলাম না।

আব্বা আমাদের আগেই বলেছিলেন, উনাকে শেষ অভিপ্রায় অনুসারে উনাকে আমার নানার সমাধির পাশে সমাহিত করতে হবে। এখন এতদূর সিলেট থেকে কি করে আমাদের দেশের বাড়ি পাবনাতে নিয়ে যাব? কোন প্রস্তুতি নেই আমাদের। আব্বা কেমন যেন থ মেরে বসে আছেন।

সেই মুহূর্তে আমার মাথায় একটাই চিন্তা, কি ভাবে আমার মা-কে পাবনায় নেওয়া হবে?
টিক সেই মুহূর্তেই আমার মনে এলো মুক্তাদির তো সিলেটেই আছে। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখিই না কি বলে। সাথে সাথে ওর বাসায় ফোন করলাম। সে যুগে তো আর মোবাইল ছিল না! মুক্তাদির সে সময়ে বাসায় ছিল না। খানিক পরে সে অন্য কোথাও থেকে ফোন করল। আমাকে জিজ্ঞেস করল কি সাহায্যের প্রয়োজন। আমি খালি এইটুকুই বলতে পারলাম যে, আমার মা মারা গেছেন, তাঁকে দাফনের জন্য পাবনা নিতে হবে। সামান্য এই কথা। সে ফোন রেখে দিল।

আমার ভেতরে অনুভূতি আমাকে বলছিল যে, মুক্তাদির জানে এখন আমার সমস্যা। আমার আর এই ব্যাপারে চিন্তার কোনই কারণ নেই। আমার ভেতরের ইন্সটিংক্ট আমাকে বলছিল যে ঠিক সময় মতই মুক্তাদির বাস যোগাড় করবে। সে বাস নিয়েই আসবে। এই নির্ভরতার ব্যাপারটি অনেক আগেই আমাদের ভেতরে সে গেঁথে দিতে পেরেছিল।
এরপরে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম জানাজা ও আনুষাঙ্গিক অন্যান্য কাজের জন্য। একটা মাইকসহ রিক্সা ভাড়া করা হল। আব্বা আমাকে বললেন যে শহরে একটু জানাতে, কেন না আমার মায়ের অনেক পরিচিত ও শুভানুধ্যায়ী ছিলেন, যারা হয়ত আর আমার মা-কে আজকের এই দিনের পরে আর দেখবেন না, তাদেরকে জানানোর জন্য এই মাইকিং। ফোন করে সবাইকে জানানো সম্ভব ছিল না। আমি প্রায় ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টা মাইকিং করে ফেরত এসে দেখি গোসল ও কাফন পরানো প্রায় শেষ।

আমি বাসায় ফিরতেই আব্বা বললেন এতোক্ষণ কোথায় ছিলাম। আমি বললাম, আমি মাইকিং করতে গিয়েছিলাম। উনি আর কিছু বললেন না। খানিক পরে আরেকবার জিজ্ঞেস করলেন, বাসের ব্যবস্থা কি হয়েছে? আমি বললাম, আমি মুক্তাদিরকে বলেছি। দেখি কি হয়। সে তো বলেছে বাসের ব্যবস্থা করেই সে আসবে।

ওদিকে রাত বাড়ছে। আমার আব্বার শরীর বেশি ভালোও না। মাত্র কয়েক বছর আগে ওপেন হার্ট সার্জারী করিয়ে এসেছেন। এই অবস্থায় উপস্থিত সকলেই উনার শরীরের দেখভাল করতেই ব্যস্ত। কাফন পরানোর কাজও প্রায় শেষ। মেডিকেল কলেজের প্রায় সব ছাত্ররাই জানাজার জন্য নেমে এসেছে। তাই বৃষ্টির ভেতরেই জানাজার জন্য আমরা দাঁড়ালাম। ঠিক সেই সময়ে দেখি একটা গাড়ি আসছে। সবাই একটু জায়গা ছেড়ে দিলে দেখা গেল বাস চলে এসেছে। মুক্তাদির বাস থেকে নেমে এলো। আমরা জানাজা শেষ করলাম।

জানাজা করিয়েই আমার মাকে কফিনের বাক্সে বরফ ও চা-পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল। এরপরে সেই কফিন বাসে তুলে দেওয়া হল। আমি মুক্তাদিরকে কি বলে ধন্যবাদ দিবো, সেই ভাষা খুঁজে পেলাম না। এবং সেই ভাষা আজও আমি খুঁজে পাই নি। আমাদের যাত্রা পথের যা কিছু দরকার, সেইগুলো নিয়ে আমরা বাসে চেপে বসলাম। আমাদের গন্তব্য এখন পাবনা। এরপরের ঘটনা আমি শুনেছি অন্যদের মুখ থেকে।

আমাদের বাস ছাড়ার পরে সবাই যার যার গাড়িতে করে ফিরছেন। সবার শেষে কয়েকটি গাড়ি ছিল। তারা রওয়ানা হয়েছেন। তখন পথে আর কোন মানুষ নেই। তারা দেখলেন, কেউ একজন বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভিজতে ভিজতে হেঁটে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কে, এবং কোথায় যাবেন। মুক্তাদির বলেছিল সে আমার বন্ধু, এবং সে তার বাসায় যাবে। সেই চিকিৎসকেরা তাকে তার বাসায় পৌছে দিতে গিয়ে তার পরিচয় এবং বাস নিয়ে আসার ঘটনা জানতে পারে।
এর বেশ কিছুদিন পরে আমি মুক্তাদিরের কাছে কথা প্রসঙ্গে সেই রাতে তার বাস ভাড়া করার গল্পটি জানতে পারি।

যে সময়ের কথা, সেই সময়ে ঢাকা সিলেট মহাসড়কে দুটি ফেরি ছিল। সে জন্য সন্ধ্যা সাতটা-আটটার পরে দূরপাল্লার কোন বাস থাকত না। যখন মুক্তাদিরকে আমি বাসের কথা বলেছিলাম, সে জানত যে কদমতলীতে কোন বাস থাকার সম্ভাবনা নেই। তারপরেও সে কদমতলীতে যায়, এবং লোকাল বাসের লোকদের খুঁজে বের করে। তাদের কেউই লাশবহনের এমন গুরু দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী ছিল না। কি ভাবে যে মুক্তাদির এই অনাগ্রহীদের ভেতর থেকে একজনকে রাজি করালো, তা আজো আমার অজানা।
আমি জানি এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী আমাদের আশেপাশের অনেকেই আছেন। শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া আর কিছু করার সামর্থ্য আমাদের নেই। আমি তাই সব সময়ে দোয়া করি মুক্তাদির যেন আমাদের সকলকেই এমন কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ রাখে। আমি চাই মানুষের মনের এই দোয়াটুকু যেন সে সব সময়েই পায়। আর সে জন্যই আমি চাই, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করে সিলেটকে এগিয়ে যাবেন।

এদিকে, ২০০৬ সালের কথা। আমার সাথে একদিন মুক্তাদিরের দেখা। আমি জানতাম না যে সে বিশাল এক কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত। এই কথা সেই কথা বলার পরে কিছুটা লজ্জিতভাবে জানালো যে সে একটা টাওয়েল ফ্যাক্টোরি বানিয়েছে, সেই ভালুকাতে। এইটাই আমার বন্ধুর গুণ। এত বিনয়ী যে নিজের এতবড় একটা অর্জন, তা প্রকাশেও তার ভীষণ লজ্জা, অসম্ভব বিনয়। জানালো, কিছু সমস্যা হবার পরেও সে কাজ এগিয়ে নিয়েছে, এবং আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে সেই প্রজেক্ট সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। শুনে আমার খুব আগ্রহ হল। আমি ওকে বললাম, একদিন কি ঘুরতে যাওয়া যায়? সে সাথে সাথেই রাজি।

বেশ কয়েকবার পরিকল্পনা করেও যাওয়া হল না। আমি অনেকটাই ভুলে গিয়েছিলাম। এরপরে হঠাৎ একদিন আমাকে ফোন করে মুক্তাদির জানালো পরদিন শুক্রবার আছে, সেদিন যাওয়া যায় কি না? আমি তো সাথে সাথেই রাজি। সেই মোতাবেক তার সাথে তার নতুন ফ্যাক্টরি দেখতে রওয়ানা হলাম।

ড্রাইভার ছিল সাথে। তারপরেও মুক্তাদির নিজেই গাড়ি চালিয়ে গেল। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ রোড ধরে গেলে কি পরিমাণ যানজটে পড়তে হয় গাজিপুর চৌরাস্তায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে গল্প করতে করতে পথ যেন নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। আমরা তার ফ্যাক্টরিতে পৌছালাম।

ভালুকা প্রাকৃতিকভাবে অনেক সুন্দর জায়গা। মধুপুর গড়ের এক পাশ আছে এই ভালুকায়। লাল মাটি, ছোট ছোট টিলা। মনোরম পরিবেশ। সেখানেই তার ফ্যাক্টরি। আমি ওখানে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম! অপূর্ব সেই প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতরে আরো অনেক প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা কারখানা দাঁড়িয়ে আছে। আমার দেখেই একটা অদ্ভুত ভালো লাগা শুরু হল।

কারখানার মালিক এসেছেন, তার জন্য সবাই খুবই তৎপর হয়ে উঠলেন। কিন্তু মুক্তাদিরের সেই সব আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। সবাই যার যার কাজ করছে, এইটাই যেন সে দেখতে চায়। বলে দিল, এমন যেন আর না হয়। আমরা বাঙালিরা যদিও এমন আচরণ আশা করি, কিন্তু সেই লোভ থেকে দূরে থাকাটাও একটা বড় গুণ। তার এই গুণ দেখে আমি অভিভূত হলাম।

আমাকে নিজে সাথে করে কারখানার বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখালো। আমি ডাইয়িং কিংবা সুতার ব্যাপার-স্যাপার সমন্ধে একেবারেই অজ্ঞ। কিন্তু আমার বন্ধুর বলার ধরণের কারণে কোন কিছুই বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল না। তবে সবচেয়ে বেশি মাথাব্যাথার কারণ ছিল কোয়ালিটি এসুরেন্স। উৎপাদিত পণ্যের মান যেন ভালো থাকে সেই ব্যাপারে তার কড়া মনোভাবের কারণে আমি আশাবাদি ছিলাম যে তার কারখানায় উৎপাদিত পণ্য অল্পদিনের ভেতরেই সুনাম অর্জন করবে। সেই মুহুর্তে বাংলাদেশে টেরি টাওয়েল উৎপাদনের এইটা ছিল দ্বিতীয় কারখানা।

কারখানাতে বেশ কিছু কাজ ছিল মুক্তাদিরের। সেসব শেষ হবার পরে আমরা আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হব, তখন কারখানার পাশেই নতুন একটি স্থাপনা গড়ে উঠছে দেখলাম। সেটা কি জিজ্ঞেস করাতে মুক্তাদির জানালো এই বহুতল ভবণটি হবে শ্রমিকদের থাকার জায়গা। কারখানা চালু হয়েছে মাত্র, আয় রোজগার হলে তারপরে না এই সব কাজ করা হবে! কিন্তু অপরের সমস্যা নিয়ে ভাবিত আমাদের প্রিয় বন্ধুর কাছে শ্রমিকদের জন্য আবাসন তেরি অনেক জরুরি!

একজন উদ্যোক্তার ভেতরে এমন গুণাবলীই তো তাঁকে সামনের কাতারের একজন মানুষে পরিণত করেছে। কারো দুখে দুঃখিত হওয়া একজন নেতার সবচেয়ে বড় গুণ। অন্যের উদ্বেগে উদ্বিগ্ন হওয়া, অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়া- এসবই নেতৃত্বের গুণাবলী। উদ্যোক্তা হিসাবে সফল মুক্তাদিরের মাণবিক এই গুণাবলীর যে কারোরই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
মোদ্দা কথা হল, আমরা যে মুক্তাদিরকে চিনি তিনি অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, সজ্জন, সৎসাহসী, উদ্যোগী এবং যে কোন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারা একজন সফল মানুষ। যাকে আমরা আমাদের বন্ধু বলে জানি, সে আসলে একজন সহজজাত নেতা। সিলেটের জন্য এমন একজন মানুষ ও নেতার দরকার খুব বেশি। আমরা সবাই চাই রাজনীতিতে ভালমানুষরা আসুক। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে আসলে আমরা সবাই চাই এমন নেতাদের হাত ধরে গড়ে উঠুক আগামীর সুন্দর ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ।

[লেখকগণ: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সহপাঠি, যাঁরা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা/ প্রবাসী আইটি বিশেষজ্ঞ/ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ