বিশেষ সম্পাদকীয়
বঙ্গবন্ধু ও সিলেট আওয়ামী লীগ

প্রকাশিত: ১০:৪৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০১৯

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'> বিশেষ সম্পাদকীয়</span> <br/> বঙ্গবন্ধু ও সিলেট আওয়ামী লীগ

মস্তাক আহমদ পলাশ :: মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ এ তিনটি নাম এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বপ্নদ্রষ্টা, নির্মাতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর প্রেম ও দ্রোহের ইতিহাস হয়তো সবটুকু আমার জানা নেই। সাতচল্লিশের রেফারেন্ডাম থেকে শুরু করে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ এর ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভুত্থ্যান এবং একাত্তরের স্বাধীনতা। সে সব আন্দোলনে বহুবার বঙ্গবন্ধুকে আসতে হয়েছিল শাহজালাল শাহ পরানের পূণ্যভূমি সিলেটে। ইতিহাসের বিশাল মানচিত্রে বঙ্গবন্ধুর সিলেট ভ্রমনের ইতিহাস আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। সিলেটের মানুষজনের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল গভীর সম্পর্ক আর সে কারণেই বঙ্গবন্ধু এই পূণ্যভূমিতে একটি বাড়ি নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সিলেট আসতেন ভ্রমণের জন্য নয় সংগ্রাম, রাজনীতি ও স্বাধীনতার দাবি নিয়ে। বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি বিজড়িত এই স্কুল। ১৯৪৭, সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তখন প্রায় ৫০০ জন ছাত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধু আসেন সিলেটে। এটাই তার প্রথম সিলেট সফর। সে সময় তাকে এই স্কুলটিতেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর তখনই শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরিচিত হন দেওয়ান ফরিদ গাজী। তখন তরুণ ছাত্রনেতা ফরিদ গাজীর উপর দায়িত্ব পড়ে কলকাতা থেকে আগত ছাত্র নেতাদের দেখাশোনা করার। ফরিদ গাজীর কর্তব্যনিষ্ঠা, অসীম সাহস, অমায়িক ব্যবহার ও বিচক্ষণতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আকৃষ্ট করে। তিনি হয়ে যান শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রিয় পাত্র। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর শেখ মুজিব ১৯৫৪ সালে আবার সিলেট আসেন। তখন তিনি প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের বন, পরিবেশ ও প্রাদেশিক মন্ত্রী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের সফর সঙ্গী হয়ে তিনি সিলেট এসেছিলেন।
১৯৬৭, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের দলীয় কাজে সিলেট এসেছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন সিলেটের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সেই সময় তালতলা গুলশান হোটেলে অবস্থান করেন এই মহান নেতা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিময় গুলশান হোটেল পরবর্তীতে সিলেট আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রিয় স্থানে পরিণত হয়। জানা যায়, ১৯৬৭ সালে এই গুলশাল হোটেলে বসেই বঙ্গবন্ধু বৃহত্তর সিলেটের আওয়ামী লীগের কাজকে ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু বেশ কয়েকবার সিলেটে আসেন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জন্য সমাবেশে বক্তৃতা দেন। সবচেয়ে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল কর্নেল ওসমানী সাহেবের নির্বাচনী এলাকা ফেঞ্চুগঞ্জে। তখন বঙ্গবন্ধু ওসমানী সাহেবের সিলেট নাইওরপুলস্থ বাসায় উঠেছিলেন। ছয় দফা দাবিতে যখন সারাদেশ উত্তাল তখন বঙ্গবন্ধু আসেন বিয়ানীবাজারে। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু যখন সারা দেশ সফর করছিলেন তখন তিনি আবার আসেন বিয়ানীবাজারে। সে সময় বঙ্গবন্ধু বিয়ানীবাজার সদর পোষ্ট অফিস মোড়ে জনসভায় ভাষণ দেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন- বিয়ানীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে আমার মনে হচ্ছে এটি যেন বাংলার কাশ্মীর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা-শ্রমিকদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭-৫৮ সালে তিনি চা-বোর্ডের প্রথম বাঙ্গালী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি শ্রীমঙ্গলে চা-বাগান পরিদর্শনে আসেন। শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত চা-মিউজিয়ামে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত চেয়ার, টেবিল, খাট সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। যা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বহন করে চলছে। ১৯৫৭ সালে চা-বোর্ডের অধীন পাকিস্তান টি রিসার্চ স্টেশন বর্তমানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট শ্রীমঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপে ও তৎপরতায় এ প্রতিষ্ঠানের নিমার্ণ কাজ দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে চা শ্রমিকরা নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারপ্রাপ্ত হয়।

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করার পর সারাদেশে গণসংযোগ করেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু আবার আসেন শ্রীমঙ্গলে। বঙ্গবন্ধু আগমনের খবর শুনে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভিড় করেন বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য। কথা ছিল বেলা ২ টায় আসবেন কিন্তু আসলেন রাত তিনটায়। শ্রীমঙ্গল শহর তখনও লোকে লোকারণ্য। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধু আপ্লুত হন। বঙ্গবন্ধু সে সময় উঠলেন আব্দুল আলী সাহেবের বাসায়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের সময় জনমত তৈরির সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন সমস্ত বাংলাদেশ সফর করছিলেন তখন তিনি সিলেটে আসেন। সে সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় ৩০৫৩ দিন জেলখানায় ছিলেন। এর মধ্যে ৫ দিন তিনি ছিলেন সিলেট কেন্দ্রিয় কারাগারে। বঙ্গবন্ধুকে যে ঘরটিতে রাখা হয়েছিল বর্তমানে সেটি বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম নামে সংরক্ষন করে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি লাইব্রেরি। কারণ এই ঘরটিতে বসেই বঙ্গবন্ধু চিঠি লিখতেন তাঁর স্বজনদের কাছে।

সিলেটের অপরূপ প্রাকৃতিক বৈচিত্রের টানে নয়, মুক্তি সংগ্রামের নানা আন্দোলনকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনের বহু সহযোদ্ধা ও ঘনিষ্ট সহচর রয়েছেন এই সিলেট অঞ্চলে। তাদের মধ্যে জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী, জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী, মেজর জেনারেল এম এ রব বীর উত্তম, জননেতা আব্দুল সামাদ আজাদ, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, জননেতা মোহাম্মদ ইলিয়াস, সৈয়দ মহসিন আলী প্রমুখ সহ বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন সিলেটের তিন আমলা এম এস কিবরিয়া, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও আব্দুল মাল আবদুল মুহিত। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তেই সারাদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও পরিচিতজনদের কাছে তিনি একটি তার বার্তা প্রেরণ করেন। এটাই ছিল মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। যা পরদিন সারাদেশে নানাভাবে প্রচার হতে থাকে এই ঘোষণাপত্রটি। সিলেটে যাদের কাছে এই তার বার্তা পৌঁছে ছিল তারা হলেন- জননেতা আলহাজ্ব দেওয়ান ফরিদ গাজী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, অ্যাডভোকেট মোস্তফা আলী, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ও মোহাম্মদ ইলিয়াছ। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ও জাতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বাঙালি জাতি যেমন কোন দিন ভুলতে পারবে না। তেমনি সিলেটের সাথে বঙ্গবন্ধুর যে গভীর হৃদ্দতা ও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল তা কোনদিন ভুলবার নয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ