বায়োফকে লাভের হিসাব

প্রকাশিত: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

বায়োফকে লাভের হিসাব

শাইখ সিরাজ :: টিমসহ কাজে বের হই এমনিতেই ভোর সাড়ে ৪টা-৫টার দিকে। ঢাকার জ্যাম এড়াতে এবং ভিডিওতে সকালের আলোটাকে কাজে লাগাতেই আমাদের এ প্রচেষ্টা। এ ক্ষেত্রে সাধারণত ফজরের নামাজটা আদায় করা হয় পথে বা গ্রামের কোনো মসজিদে। কিন্তু এবার ঠিক ভোরে নয়, বলা চলে মাঝরাতেই রওনা দিতে হলো। রাত ৩টায় রওনা হলাম নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বল্লভদি গ্রামের দিকে। দূরত্ব হয়তো ঘণ্টাখানেকের, কিন্তু কেউ কেউ বললেন, মাঝরাত থেকেই নারায়ণগঞ্জের ওই রাস্তাটায় নাকি জ্যামে আটকে থাকে শত শত বাস-ট্রাক। যা হোক, যাওয়ার সময় তেমন কোনো জ্যাম পেলাম না। রাত ৪টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বল্লভদি। গত সেপ্টেম্বরেই এখানে এসেছিলাম। এখানেই জহুরুল-মুস্তাফিজের বায়োফক প্রকল্প। পাঠক! নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে, সেপ্টেম্বরে চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে এই বায়োফক প্রকল্প নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছিল। তখন তারা মাছের পোনা ট্যাঙ্কিতে ছেড়েছিল। এবার এসেছি মাছ ধরার চিত্র দেখতে। সাড়ে ৪টায় পাইকারি ক্রেতা আসবে মাছ কিনতে। বায়োফক পদ্ধতিতে মাছ চাষের হার্ভেস্ট এই প্রথম। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও কয়েকজন আগ্রহী উদ্যোক্তা এসেছেন। গত সেপ্টেম্বরে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলেছিলাম ‘উঠোনে মাছের কারখানা’। সেই কারখানার উৎপাদন ফলাফল দেখতেই সবার তুমুল আগ্রহ। দুই উদ্যোক্তা- জহুরুল ও মুস্তাফিজের জন্য পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার দিন।

উঠোনের ১০টি ট্যাঙ্কির একটি থেকে মাছ তোলা হবে। প্রতিটি ট্যাঙ্কিতে সাড়ে ১৭ হাজার লিটার পানি। একেক ট্যাঙ্কিতে একেক ধরনের মাছ। যে ট্যাঙ্কি থেকে মাছ তোলা হবে এটিতে মিশ্র জাতের মাছ। তেলাপিয়ার পরিমাণ বেশি হলেও কই, কালবাউশ, পাঙ্গাশ, রুইসহ নানান ধরনের মাছ আছে। শুরু হলো পানি সেচার কাজ। মর্টারের সাহায্যে ট্যাঙ্কির পানি ফেলা হচ্ছে কাছের পুকুরে, কারণ পানিতে তখনো মাছের খাবার রয়ে গেছে। পানি সেচার সময়টুকুর ফাঁকে জহুরুল ও মুস্তাফিজের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তাদের প্রত্যাশা ৭০০ থেকে ৭৫০ কেজি মাছ উত্তোলনের। হিসাবটি শুনতে বিস্ময়কর বলে মনে হয়। বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। বহুকাল আগেই মাছের পুকুর দেখিয়ে ময়মনসিংহের কৃষক আবুল হাশেম বলেছিলেন টাকার ব্যাংক। এখন পুকুরের তুলনায় ক্ষুদ্রায়তনের একটি চৌবাচ্চাই টাকার ব্যাংক নয়, রীতিমতো টাকার খনি। ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে এ খামারে এসে আমাদের মনে হয়েছিল এ যুগের হাকিম আলীর সন্ধান পেয়ে গেছি।
চৌবাচ্চাটিকে ঘিরে রীতিমতো উৎসব চলছে। মানে এ চৌবাচ্চাটির মাছের পরিমাণ বলে দেবে এটি রীতিমতো বিশালাকার এক দীঘির সমান। উত্তেজনা আর অপেক্ষা সবার মধ্যেই। সবাই এখানকার পানি সেচার অপেক্ষা করছেন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসেছেন কয়েকজন। এদের কেউ ব্যাংকার, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কেউ চাকরিজীবী। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী আবুল কাশেম এসে গেছেন। তিনি বায়োফক চৌবাচ্চা থেকে ওঠা মাছ প্রথম কিনবেন। তিনি জানালেন বায়োফকের মাছগুলো পুকুরের মাছ থেকে ভিন্ন আকারের ও রঙের। বেশ সজীব ও তাজা হয়েছে মাছগুলো। প্রতি কেজি ১১০ টাকা দরে কিনে নিচ্ছেন তিনি। পানি কমছে। সবার পলকহীন দৃষ্টি এই বায়োফক চৌবাচ্চার দিকে। চারদিক ফরসা হচ্ছে। সকালের আলোর আভা চারদিকে। অগ্রহায়ণের কিছুটা শীতল আবহাওয়া। সবার দৃষ্টি আরও তীক্ষè ওই চৌবাচ্চায়। হ্যাঁ, গিজগিজ মাছের অবস্থান টের পাওয়া যায়। পানি আরও কমেছে। সত্যিই মাছে পরিপূর্ণ চৌবাচ্চার নিচের অংশটা। চারদিকে মানুষের ভিড়। শুরু হলো জাল দিয়ে মাছ ধরা। আসলে মাছ ধরা নয়, মাছ তোলা। খেতের ফসল তোলার মতো। অভূতপূর্ব দৃশ্য। এক নীরব বিপ্লব। জালভর্তি মাছ তুলে প্লাস্টিকের কেরেটে তুলে ১০ কেজি করে মাপা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফল পাওয়া যাবে।

জহুরুল ইসলাম ও মুস্তাফিজের জন্য অন্যরকম আনন্দের এক দিন। তাদের কাছে সময়টা শ্বাসরুদ্ধকর। যারা দেখতে এসেছেন তাদেরও উদ্যোগের স্বপ্ন আজ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। মাছ তোলার পর পরিমাপ শেষে ক্যারেটে করে চলে যাচ্ছে পাইকারের ট্রাকে। সব মাছ তোলা হলো। মাপাও শেষ হলো। ৬০০ কেজি মাছ হয়েছে। চার মাসে ৬০০ কেজির এই হিসাবকে কাক্সিক্ষত হিসাবের চেয়ে কম বলেছেন উদ্যোক্তারা। এর ব্যাখ্যাও করলেন তারা। বললেন, হাইব্রিড তেলাপিয়া হলে ওজন আরও বেশি হতো। তবে এতেই তারা যথেষ্ট খুশি।

যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের জন্য এই বিনিয়োগ ও লাভের হিসাবটি আরও সবিস্তার তুলে ধরতে চাই। জহুরুল ও মুস্তাফিজের দেওয়া তথ্যানুযায়ী প্রতি ট্যাঙ্কির স্থাপনা ব্যয় সব খরচসহ ৪০ হাজার টাকা। এটির স্থায়িত্ব ধরা হচ্ছে পাঁচ বছর। বছরে তিনটি মাছের মৌসুম ধরা হলে চৌবাচ্চা স্থাপন ব্যয় হিসেবে প্রতি মৌসুমে ধরা যায় ২ হাজার ২৬৬ টাকা। সাড়ে ১৭ হাজার লিটার পানির একটি চৌবাচ্চার মাছ চাষের জন্য ব্যয় হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৫ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে পোনা ৩ হাজারটি ৬ হাজার টাকা, ১ কেজি প্রোবায়োটিক ২ হাজার টাকা, চিটাগুড় ৭ কেজি ২১০ টাকা, লবণ ৩ কেজি ৪৫ টাকা, চুন ৩ কেজি ৯০ টাকা, বিদ্যুৎ ব্যয় মাসে ১ হাজার ১০০ টাকা হিসাবে চার মাসে ৪ হাজার ৪০০ টাকা, শ্রমিক খরচ ৪ হাজার টাকা, খাদ্য খরচ ৪৩০ কেজি ১৯ হাজার ৩৫০ টাকা। উৎপাদিত মাছ ৬০০ কেজির মূল্য পাওয়া গেছে ৬৭ হাজার ১০০ টাকা। তার মানে সাকল্যে এক মৌসুমের ব্যয় ৩৮ হাজার ৭০০। প্রথম মৌসুমেই লাভ এলো ২৮ হাজার ৩৬৯ টাকা। আরেকটু খোলাসা করে দেখলে, একটি ট্যাঙ্কি স্থাপনে ৪০ হাজার টাকা খরচের পর প্রথম মৌসুমে ৩৬ হাজার ৯৫ টাকা লগ্নি করা হলে একবারেই বিনিয়োগের সমান অর্থ উঠে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মৌসুম থেকে টানা পাঁচ বছর স্থাপন ব্যয় শূন্য হয়ে যাবে।

আরেকটু জানিয়ে রাখি, বাংলাদেশে মাছপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদফতরের একটি প্রচলিত হিসাব রয়েছে। তা হলো, প্রতি হেক্টরের পুকুরে চাষে পাওয়া যায় ৪ হাজার ৮৫১ কেজি মাছ। অর্থাৎ শতাংশে প্রায় ২০ কেজি। এখানে অর্ধ শতাংশে পাওয়া গেছে ৬০০ কেজির বেশি। সে হিসাবে বায়োফক পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদনের হার বহুগুণ বেশি। উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে প্রায় অর্ধেক ব্যয়ে ৩০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন সম্ভব।

প্রযুক্তির এটিই গুণ। নতুন একটি প্রযুক্তি এসে রীতিমতো বিস্ময় জাগিয়ে দেয়। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির এ জাগরণটি অনেক বেশি বিস্ময়কর। মাছ চাষের এই বায়োফক পদ্ধতি শুধু আশাই জাগায়নি, মাছ চাষে বিশ্বে তৃতীয় স্থান থেকে শীর্ষস্থানে পৌঁছে রপ্তানি বাণিজ্যে পৌঁছে যাওয়ারও এক সম্ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। প্রয়োজন শুধু বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞানসম্মত কর্মপন্থায় যে বিষয়গুলো প্রয়োজন তা হলো ধৈর্য, নিষ্ঠা, সঠিক প্রশিক্ষণ ও হিসাব মাথায় রাখা। কোথাও ব্যত্যয় হলে পুরো কার্যক্রমটি গোলমেলে হয়ে যেতে পারে। বিপর্যয় ঘটতে পারে উৎপাদনে। এ ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে।

লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ