বিদেশ ফেরত কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইউসেপ বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৫:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২১

বিদেশ ফেরত কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইউসেপ বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :: ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত স্কিলস-২১ একটি উন্নয়ন প্রকল্প। যেটি বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাস্তবায়ন করছে। স্কিলস-২১ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের যুবাদের দক্ষতা উন্নয়ন করা। এর আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করার সুযোগ তৈরি করা। এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো বিদেশ ফেরত কর্মী এবং তাদের পরিবারের সক্ষম সদস্যদের দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয়মূলক কর্মকান্ডে পুনঃসংযোগ ঘটানো।

এ লক্ষ্যে আইএলও তিনটি ক্যাটাগরিতে কাজ করছে-১. সুবিধাভোগী স্তর- যেখানে তিন হাজার বিদেশ ফেরত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সক্ষম সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ২. বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যাতে পরবর্তীতে তারা নিজেরাই এই প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হয়। ৩. বিদেশ ফেরত কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার স্থায়ী একটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

এ লক্ষ্যে আইএলও তাদের প্রজেক্ট এর স্টেকহোল্ডার যেমন- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ (শিক্ষা মন্ত্রণালয়) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিটিই) এর সাথে কাজ করছে।

এই পুরো কাজে ইউসেপ বাংলাদেশ আইএলও’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে-ওকাপ ও হেলভেটাস । ইউসেপ বাংলাদেশ বিশেষত বিদেশফেরত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সক্ষম সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করছে।

মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে ইউসেপ হাফিজ মজুমদার সিলেট টেকনিক্যাল স্কুল পরিদর্শনকালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার তাহমিনা খানম বলেন, ইউসেপ সিলেট রিজিওন বিদেশফেরত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সক্ষম সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পাদন করছে।” তিনি ইউসেপ হাফিজ মজুমদার সিলেট টেকনিক্যাল স্কুলের ল্যাব সুবিধা, দক্ষ প্রশিক্ষক, মানসম্মত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিবেশের উচ্চসিত প্রশংসা করেন।

তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ট্রেইনি শনাক্ত ও সংগ্রহ করা। কিন্তু ইউসেপ হাফিজ মজুমদার সিলেট টেকনিক্যাল স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মাধ্যমে যেমন- কমিউনিটি মিটিং,পেরেন্টস মিটিং, সামাজিক অনুষ্ঠান, পরিসংখ্যান অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদ ইত্যাদির মাধ্যমে অত্যন্ত সফলতার সাথে তাদেরকে শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে এবং তাদের পরিকল্পনা ও প্রয়োজন মোতাবেক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে পারছে। দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ এর পাশাপাশি উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও বিদেশ ফেরত এসব কর্মীদের যদি অন্য কোন কাজের পূর্বদক্ষতা থেকে থাকে সেগুলোও বিবেচনায় নিয়ে তাদেরকে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আইএলও প্রতিনিধিদের পরিদর্শনকালে প্রশিক্ষণগ্রহনকারী মো. বদরুল ইসলাম জানান, পারিবারিক অভাব ঘোচানোর জন্য তিনি বিদেশে পাড়ি জমাতে চাইলে একজন দালালের মাধ্যমে কুয়েতে কাজ করার জন্য তার চাহিদা মতো টাকা প্রদান করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হন। তাকে কুয়েতে ঠিকই নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু কিছুদিন পর সেখান থেকে তাকে জোর করে সৌদি আরব পাঠানো হয়। সেখানে তিনি এক মালিকের কাছে কাজ করতেন, মাঝেমধ্যে তার গাড়িও চালাতেন। করোনা প্রকট আকার ধারণ করলে এ বছরের শুরুর দিকে তিনি দেশে ফেরত আসেন। এরই মধ্যে জানতে পারেন ইউসেপ হাফিজ মজুমদার সিলেট টেকনিক্যাল স্কুল বিনামূল্যে বিদেশফেরত কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যেহেতু তিনি ড্রাইভিং জানেন তাই তিনি প্রশিক্ষণের জন্য অটোমোটিভ মেকানিক্স ট্রেডকে বেছে নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। এখন তার লক্ষ্য, প্রশিক্ষণ শেষে দেশেই কিছুদিন একটি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ করা বং পরবর্তীতে দক্ষ কর্মী হিসেবে কোন দেশে কাজ করার সুযোগ পেলে সেই সুযোগ গ্রহণ করা।

প্রায় একই ধরণের অভিজ্ঞতা খাদিমনগর ইউনিয়নের পীরের বাজারের মোহাম্মদ আনিসুর রহমান চৌধুরীর, যিনি প্রায় ৭ বছর দুবাইয়ে প্রবাস জীবন কাটিয়ে ২০১৮ সালে দেশে ফিরে এসেছেন, ৪ বছর মালয়েশিয়ায় কাজ করে এ বছর শুরুর দিকে ফিরে এসেছেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোহাম্মদ মনসুর মিয়া, ৫ বছর কাতারে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে দেশে ফিরেছেন বিশ্বনাথ উপজেলার নাসিরুদ্দিন, ৪ বছর সাউথ আফ্রিকার প্রবাস জীবন কাটিয়ে ২০১৯ সালে দেশে ফিরেছেন খাদিমনগর ইউনিয়নের মোঃ রুবেল আহমেদ, একযুগেরও বেশি সময় সিঙ্গাপুরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে দেশে ফিরেছেন গোয়াইনঘাট উপজেলার শফিকুল ইসলাম। তারা সবাই এখন নিজের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ইউসেপ হাফিজ মজুমদার সিলেট টেকনিক্যাল স্কুলের অটোমোটিভ মেকানিক্স ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর অর্থায়নে পরিচালিত স্কিলস-২১ প্রকল্পে বিদেশ ফেরত কর্মীদের পরিবারের সদস্য হিসেবে আরো প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন সৌদিআরব ফেরত মো. আব্দুল্লাহ এর ছেলে মো. মনসুর ইসলাম, মোসা. বিলকিস বেগম এর ছেলে মো. ফাহিম আহম্মেদ, দুবাই ফেরত মো. মঈনুদ্দীনের সহোদর মো. শফিকুল ইসলাম এবং সুমন উদ্দিনের ভাইপো আহমদ আবিদুল হাকিম তফাদার ।

ইউসেপ সিলেট রিজিওনে রিজিওনাল ম্যানেজার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ইউসেপ মূলত সুবিধাবঞ্চিত যুবাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শোভন কর্মসংস্থানের সহযোগিতা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সাথে স্কিলস-২১ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়ে ইউসেপ গর্বিত। বিশেষত, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের লোকজন যারা নানা কারণে বিদেশ থেকে ফেরতে এসেছেন তাদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়ায় আইএলও কর্তৃপক্ষকে তিনি ধন্যবাদ জানান ।

এই প্রজেক্ট এর আওতায় ইউসেপ হাফিজ মজুমদার সিলেট টেকনিক্যাল স্কুল থেকে প্রথম ব্যাচে ইতোমধ্যেই ১৮ জন বিদেশ ফেরত কর্মী অটোমেটিক মেকানিক ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বাকিরা দেশের ভেতরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন অথবা আত্মকর্মসংস্থানে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।

সিলনিউজবিডি ডট কম / এস:এম:শিবা

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ