বিষবৃক্ষ কখনো সুমিষ্ট ফল দেয় না

প্রকাশিত: ২:০৬ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২১

বিষবৃক্ষ কখনো সুমিষ্ট ফল দেয় না

সাংবাদিক আবেদ খান এবং বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

 

বিষবৃক্ষ সুমিষ্ট ফল দিতে পারে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ কথাটি যে মানবকুলের জন্যও প্রযোজ্য তা বহু শতক আগে বলেছিলেন প্রখ্যাত পারস্য কবি ফেরদৌসী। গজনীর দাস বংশীয় রাজা সুলতান মাহমুদ গজনভি কবি ফেরদৌসীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর জীবনী নিয়ে ‘শাহনামা’ নামকরণে একটি মহাকাব্য লিখতে। যার বিনিময়ে সুলতান মাহমুদ কবিকে ৬০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সুলতান মাহমুদ কবি ফেরদৌসীকে ৬০ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বদলে ৬০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা প্রদান করেন। ফেরদৌসী টাকা ফেরত দিয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে বলেছিলেন, বিষবৃক্ষের গোড়ায় যতই মধু ঢালা হোক না কেন, সে বিষাক্ত ফলই জন্ম দেবে। অনুরূপভাবে, সংস্কৃত ভাষায় একটি শ্লোক আছে, অঙ্গারকে শতবার ধৌত করা হলেও, সে অঙ্গারই থাকে। ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিয়ে এ কথাগুলো আজ খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এ জন্য যে, তারা কখনো তাদের রূপ এবং বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে না। এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার? জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের এই গানের লাইনটি আগেও উল্লেখ করেছি। এটা অত্যন্ত বেদনার যে, বারবার একই অন্ধকার আমাদের গ্রাস করছে এবং এই অন্ধকার সকালে আমরা স্বপনের চিতায় দগ্ধ হচ্ছি। পাখির কূজন পরিণত হয়েছে হাহাকারে। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। আমরা তো এমন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি, দেশ স্বাধীন করিনি। অথচ সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও মৌলবাদ, ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে নতুনভাবে জাগরণের ডাক দিতে হচ্ছে!

Bangladesh Pratidinবঙ্গবন্ধু তো এমন একটি সংবিধান দেশ ও জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে আমরা অংশ নিয়েছিলাম জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। সেই লড়াইয়ের ফসল বাংলাদেশ। ধর্মান্ধ অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে লাখ লাখ জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছি এবং এ সুযোগটিই নিয়ে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি।
৫০ বছর তো কম সময় নয়। এই মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকেই তো সামগ্রিকভাবে আমাদের নিশ্চিহ্ন করার প্রয়োজন ছিল। এদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘটে চলেছে উলটো ঘটনা। এরা গর্ত থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে যখন-তখন তা-ব চালানোর পন্থা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে যারা মুক্তবুদ্ধির, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির মানুষ তারা ক্রমশ নিষ্ক্রিয় ও হতোদ্যম হয়ে পড়ছেন। এদের কেউ কেউ মাঝে মধ্যে ফেসবুকে একটি ছোট্ট স্ট্যাটাস দিয়ে দায় সারছেন। কিন্তু তারা বোধহয় ধারণা করতে পারছেন না, এভাবে চললে অচিরেই আমাদের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এসেও যদি আমাদের নতুন করে তাদের কাছে নতজানু হতে হয়, এর চেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার আর কী হতে পারে?

অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আমাদের লক্ষ কোটি তরুণ শক্তি জেগে উঠেছিল দোর্দ- প্রতাপের সঙ্গে। তরুণ শক্তির এই মহাজাগরণে বাঁধভাঙা অপ্রতিরোধ্য জোয়ার উঠেছিল। কিন্তু তারপর? আমরা একটু পিছনে ফিরে দেখতে পাই, বাংলাদেশে যখনই প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক মুক্তবুদ্ধির বিকাশ ঘটেছে, তখনই সেই পরাশক্তিরা সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অ্যামিবার মতো তারা নিজেদের আবৃত করেছে ধর্মের খোলসে। এ জন্য আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তখনই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সব ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসররা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন দ্বিতীয়বারের মতো বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে ঘটানো হয় ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা। প্রতিনিয়ত দুষ্টের দমনের মাধ্যমেই এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে রয়েছে আওয়ামী লীগ, কিন্তু দলের ভিতরে ঢুকে গেছে অনেক বেনোজল। আওয়ামী লীগ ছাড়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভরসার জায়গা নেই। কিন্তু এই ভরসার জায়গাতেও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সুচতুর কৌশল অবলম্বন করে সুযোগ পেলেই সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটিয়ে চলেছে। তুচ্ছ ঘটনায় বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে। গত ১৭ মার্চ যখন দেশব্যাপী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে, সেদিনও সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে ঘটানো হয় ন্যক্কারজনক সাম্প্রদায়িক হামলা। একযোগে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় শাল্লার ৮৮টি হিন্দু বাড়ি ও পাঁচটি মন্দিরে। তাদের হামলা থেকে রেহায় পাননি স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথিত ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে এর আগে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফের বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধপল্লীতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ১৫টি হিন্দু মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক বসতঘরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর বাইরে ছোটখাটো অসংখ্য ঘটনা তো রয়েছেই। যার বা যাদের ইন্ধনে এসব সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়, তাদের শেকড় একজায়গাতেই। আর এসব অপশক্তির মধ্যে প্রকাশ্যে সবচেয়ে বড় অপশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতের ছদ্মাবরণে হেফাজতে ইসলাম।

কওমি মাদরাসাভিত্তিক একটি তথাকথিত ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলামের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে। হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালক শাহ আহমদ শফী ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা। এ সংগঠনটি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আন্দোলন করে ২০১১ সালে। সেই আন্দোলনটি ছিল নারী বিদ্বেষমূলক। ২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষণা করেছিল বর্তমান সরকার। সেই নারী উন্নয়ন নীতিমালা তাদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠেছিল। প্রশ্ন হলো, কেন হেফাজতে ইসলাম গঠিত হয়েছিল? কী ছিল তাদের গোপন এজেন্ডা? এটা উপলব্ধি করা খুব কঠিন নয় যে, হেফাজতে ইসলাম গঠিত হয়েছিল এমন একটি প্রেক্ষাপটে যখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছিল মাত্র। স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের রাজনীতি বন্ধের দাবি গণদাবিতে পরিণত হচ্ছিল। সুতরাং এটা আমরা স্পষ্টতই বুঝতে পারি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু এবং দেশে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধের দাবির ঘটনা প্রতিহত করার জন্যই জন্ম হয়েছিল হেফাজতে ইসলামের। অর্থাৎ বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের সম্ভাব্য শূন্যতাকে বিবেচনাতে নিয়েই ব্যাকআপ হিসেবে জন্ম হয় এই বর্ণচোরা সংগঠনটির।

আমরা সেদিনটির কথা ভুলে যাইনি, যেদিন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তাল হয়ে উঠেছিল শাহবাগ। মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীল লাখ লাখ তরুণের মধ্যে বিস্ময়কর জাগরণ সৃষ্টি করেছিল এই আন্দোলন। কেবল ঢাকা নয়, সারা দেশে এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন বাংলাদেশিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল গণজাগরণের ঢেউ। এমনই শিহরণ জাগানো সেই জাগরণ, যা সে সময় ভয়ংকরভাবে কাঁপন ধরিয়ে দেয় একাত্তরের পরাজিত শক্তির বুকে। কেবল তরুণ শক্তিই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশুরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সে সময় রাজপথে অবস্থান করে। দিনরাত চলেছে সেøাগান, বক্তৃতা, আবৃত্তি।

এ সময়টায় পরাজিত শক্তিরা মরিয়া হয়ে ওঠে কোনো একটি অজুহাতে পাল্টা কিছু একটা করে দেখাতে। তারা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী রাজীব হায়দারকে চক্রান্ত করে খুন করার পরেই গর্ত থেকে অল্প অল্প করে বের হতে শুরু করে। শিখ-ী হিসেবে সামনে আসে হেফাজতে ইসলাম। তারা নিজেদের বাঁচাতে ‘ইসলাম’-কে হেফাজতের নামে নতুন আলখাল্লা পরিধান করে। দেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা উত্থাপন করে ১৩ দফা। দাবিগুলোর বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তারা ‘ইসলাম’-কেই পুঁজি করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে থাকে। ১৩ দফা বাস্তবায়নের উদ্দেশে প্রথমে সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ ও ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে। ওই সমাবেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট ও এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সমর্থন দেয়। সম্প্রতি তদন্তে পত্রপত্রিকায় উঠে এসেছে যে, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন সংগঠনটির তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। আন্দোলন ও সহিংসতার বিষয়ে দুজন বিএনপি নেতা এবং একজন জামায়াত নেতা তাদের অর্থ সহযোগিতা করেছে। এ ছাড়া ওই তা-ব সহিংসতার এক সপ্তাহ আগে (২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল) বাবুনগরীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার গোপন বৈঠক হয়। সেখানেই ৫ মে তারিখের নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়। এরপর আমরা ৫ মে দেখতে পাই হেফাজতের সমাবেশ থেকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা। ডাক দেওয়া হয় সরকার পতনেরও। ওই রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে হেফাজতের নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর তারা গুজব ছড়ায় তাদের বিপুল সংখ্যক কর্মীর মৃত্যু নিয়ে। সেসব গুজব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে এবং সেই সব গুজব ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয় আজকের ইন্টারনেট ও আধুনিক প্রযুক্তিকে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্য দিয়ে। বস্তুত, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে হেফাজতের কূটকৌশলের অভাব নেই। যেসব মাদরাসা ছাত্র এসব বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল, তারা ঘুঁটি মাত্র। নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তাদের ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না এসব ভয়ংকর ধর্মব্যবসায়ী। একাত্তরের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তরুণ শক্তির যেই শিহরণজাগানিয়া উত্থান ঘটেছিল সেদিন, সেটাকে দমন করতেই হেন কোনো হীন কৌশল নেই যা তারা অবলম্বন করেনি। ব্লগারদের খুন করা হলো, দেশান্তরী করা হলো। শত শত মাদরাসা ছাত্রকে হত্যার মিথ্যা গুজব রটানো হলো। সামগ্রিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেওয়া হলো তরুণ শক্তিকে, যেটা তুরস্কে করেছিলেন এরদোগান।

আসলে শফী হুজুরকে সামনে রেখে হেফাজতকে তৈরি করাটা ছিল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর গোপন পরিকল্পনা। যারা এসবের নেপথ্যে ছিলেন তাদেরই কেউ কেউ একটি বিশেষ গোষ্ঠীর গোপন পরিকল্পনায় শামিল হয়। তাদেরই কেউ কেউ পরবর্তীতে রীতিমতো কিছু অন্যতম শক্তিশালী পদে অধিষ্ঠিত হন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তাদের কেউ কেউ অতিমাত্রায় অনুগত হিসেবে পরিগণিত হন। আর এভাবেই তারা বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে সরকারের বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতের লোক বসিয়ে দেন। এখন তাদের অনেকেই দায়িত্বে নেই কিংবা জীবিত নেই। কিন্তু তারা যে সর্বনাশটি করে গিয়েছেন, সেটি শুধু প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় নয়, কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পরিম-ল নয় বরং গোটা ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমস্ত স্পর্শকাতর অঙ্গগুলোতে ঘুণপোকার আবাসে পরিণত করে গিয়েছে। সুতরাং কেউ যদি প্রশ্ন করেন হেফাজত কার হেফাজতে ছিল, সেটা জানতে হলে এসব নেপথ্য ব্যক্তির মুখোশ উন্মোচন করতেই হবে। এর পিছনের যে অপশক্তি বারবার সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং এই সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অর্জনকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিচ্ছে, সেই অপশক্তিরই একটি অংশ এই হেফাজতে ইসলাম।

আমরা এখন বেদনার সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি, হেফাজতে ইসলাম বহু ক্ষেত্রেই তাদের বিষবৃক্ষের চাষাবাদে সাফল্য অর্জন করছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তিটিকে বহুলাংশে তারা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রীও অনেক ক্ষেত্রে হেফাজতের অন্যায় আবদার মানতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরিণাম আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? এর পরিণাম অত্যন্ত মর্মান্তিক। যতই তাদের জায়গা দেওয়া হয়েছে, প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, ততই তারা তাদের হিংস্র দাঁত-নখ বের করতে ব্যগ্র হয়েছে। তার খেসারত দিতে হচ্ছে সমস্ত দেশবাসীকে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী প্রতিটি মানুষকে। ২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সেই ভয়াল রাতে মামুনুল হক বলেছিলেন, ‘লাশের পর লাশ পড়বে, রক্তের বন্যা বইবে, সৈয়দ আশরাফ সাহেব কী করবেন। পরিষ্কার ঘোষণা করছি, আজ রাতের পর আপনারা কোন পথে পালাবেন সেই পথ দেখার চেষ্টা করেন।’ ২০১৩ সালের পর একটি মাহফিলে মামুনুল বলেন, ‘শাহাদাতের রক্ত দিতে যদি আবার শাপলা চত্বরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় তবে আবার শাপলা চত্বরে যাব।’

সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব রাজাকার পুত্র এবং ধর্ম ব্যবসায়ী মামুনুল হক রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য দিয়েছেন। পুলিশি জবানবন্দিতে জানা যায়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘাতক মেজর ডালিম ছিলেন মামুনুলের শ্বশুরের আপন ভায়রা ভাই। সরকার উৎখাতে মামুনুলের বিভিন্ন পরিকল্পনার বিষয়ে আরও জানা যায় যে, পাকিস্তানের একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনকে মডেল ধরে বাংলাদেশে মওদুদি, সালাফি, হানাফির মতাদর্শের মানুষকে একত্র চেষ্টা করেছেন তারা। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ধর্মের নামে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল করে হেফাজতে ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন মামুনুল। উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক পদ, পদবি ও ক্ষমতা দখল করা। পাকিস্তানের একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল মামুনুলের। ভগ্নিপতি নেয়ামত উল্লাহর মাধ্যমে সেই জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন তিনি। আর এই নেয়ামতের সঙ্গে ২০০৫ সালের দিকে মামুনুল টানা ৪৫ দিন পাকিস্তানে অবস্থান করেন। এটাও জানা গেছে যে, নেয়ামত উল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি মাওলানা তাজউদ্দীনের। মুসলিমদের ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল করার পাশাপাশি ভারতবিদ্বেষী মনোভাব উসকে দিতে কেরানীগঞ্জের কলাতিয়ায় বাবরী মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এই মামুনুল। মসজিদ নির্মাণের নামে দুবাই, কাতার, সৌদিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মামুনুল হকের বিকাশ এবং বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা আসত। এ টাকা দিয়ে তিনি উগ্রবাদী কায়দায় বাংলাদেশের কয়েকটি মসজিদ ও মাদ্রাসার কিছু লোককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছেন।

গ্রামবাংলায় একটা কথা আছে, বিষধর সাপকে দুধকলা দিয়ে পুষলেও সুযোগ পেলেই সে ছোবল দেবে। সুতরাং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া বা তাদের সঙ্গে সমঝোতার কৌশল শেষ অঙ্কে তাদেরই বাড়তি সুবিধা করে দেয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলামকে বারবার প্রশ্রয় দিয়ে সেই মারাত্মক ভুলটিই করে যাচ্ছিল দিনের পর দিন। বিষবৃক্ষ থেকে কি কখনো সুমিষ্ট ফল আশা করা যায়? কত বড় ধৃষ্টতা তাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়েও তারা হুঙ্কার দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর অমূল্য জিনিসপত্র পুড়িয়ে ধ্বংস করতে তাদের হাত কাঁপেনি। এরা সর্বশেষ তা-ব ঘটায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী তো তাদের জন্য ভয়ংকর গাত্রদায়ের কারণ হবেই। বাংলাদেশের অভাবিত উন্নতি, প্রগতিশীলতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, জীবনমানের উন্নয়ন যা স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, সেটা দেখে তারা তুসের আগুনের মতো তো জ্বলবেই।

তারা যে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ‘স্বীকার’ করে না, এটা তাদের প্রতিটি কর্মকান্ডের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশ পায়। এখন হেফাজতের নেতা মামুনুল হকের পুলিশি জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসছে তাদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতাসহ বহুবিধ অপকর্মের কথা। দেখা যাচ্ছে, এরা অনেক দূর পর্যন্ত নিজেদের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে। এখনই সময় এসব বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটনের। জাতির পিতার উন্নত প্রগতিশীল, কল্যাণকর সোনার বাংলা বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে এদেশ থেকে এই সাম্প্রদায়িক, উগ্রপন্থি, একাত্তরের পরাজিত অপশক্তিকে রুখে দিতেই হবে।

সেই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বসিয়া আছ কেন আপন মনে?’ এখন আপন মনে বসে থাকার সময় নয়। আমরা কি সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়? আমরা কি স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করব? মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে অনেকবার ছাড় দেওয়া হয়েছে। সুযোগ পেতে পেতে তারা এখন দানব হয়ে উঠেছে। এই দানবকে দমন করতে হবে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই। আর কোনো সুযোগ নয়। লোহাকে গরম করেই আঘাত করতে হয়, নইলে বাঁকে না। অপশক্তিরা যখনই সুযোগ পেয়েছে আমাদের ধাক্কা দিতে চেষ্টা করেছে। আমাদেরও সেই অপশক্তির উত্তপ্ত লৌহকে গরম থাকতে থাকতেই চরম আঘাত করতে হবে, যাতে তারা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার জন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্ব এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশকে এই স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। কোনো ধর্মান্ধ অপশক্তির কাছে মাথা নত করার জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। তাহলে এখনো কেন চুপ করে বসে আছেন মুক্তিযুদ্ধের, মুক্তবুদ্ধির সাহসী মানুষ? বুদ্ধিজীবীরা কেন নিশ্চুপ? আপনারা আর কতকাল ঘুমিয়ে থাকবেন? আর কতকাল চুপচাপ থাকবেন? এখন না জাগলে আর কবে জাগবেন? এখন চিৎকার করে সবাইকে বলার সময় হয়েছে, জাগো বাহে কোনঠে সবায়। এখনই সময় জেগে ওঠার। নতুন জাগরণে সমস্ত অপশক্তিকে সমূলে উৎপাটন করার। এ জন্য প্রত্যেকের পাড়া মহল্লায় নতুন করে শিল্প সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জাগরণ ঘটাতে হবে। নিজেদের শানিত বোধ ছড়িয়ে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের ভিতরে। আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ নয়।

লেখকদ্বয় : আবেদ খান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

এবং শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

আমাদের ফেইসবুক পেইজ