“বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন, কবে হাম হেরিব শ্রীবৃন্দাবন “

প্রকাশিত: ১:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২১

“বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন, কবে হাম হেরিব শ্রীবৃন্দাবন “

এস:এম:শিবা 
ভগবদ্ভক্তির প্রতি যাঁর নিষ্ঠা পাথরে অঙ্কিত রেখার ন্যায় অটুট, যাঁর পাদ্যাদি স্পর্শমণির ন্যায় অভীষ্টপ্রদ এবং যাঁর বাক্য বেদবাক্যের ন্যায় অভ্রান্ত, এ মনুষ্যলোক যাঁকে দেখে বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ সর্বদা এমন মন্তব্যই করেন যে, এ পুরুষ কি মূর্তিমান ভক্তি নাকি বৈরাগ্যের সার ? সেই শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয়কে পুনঃ পুনঃ প্রণাম করি।
মূর্তিমান বৈরাগ্য শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয় ছিলেন বিপ্রলম্ভ রস-ভাবের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিক। বৈষ্ণবজগতে তাঁর আসন অনেক উচুঁ স্তরে অধিষ্ঠিত। তাঁর রচিত পদাবলি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, তা যেন অপ্রাকৃত মন্ত্রশক্তির আধার। গরানহাটি ঘরানার এক নতুন মাধুর্যময় সুরের প্রবর্তন করে তিনি সে সুরে ভক্তি মিশিয়ে এমনভাবে তাঁর সঙ্গীতবিদ্যার প্রকাশ ঘটাতেন যে, তাতে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর প্রকট-অপ্রকট লীলার সকল পার্ষদ সমবেত হয়ে দর্শক-শ্রোতার আনন্দ বৃদ্ধি ও বিস্তার করতেন, যার সূত্রপাত ঘটে শ্রীপাট খেতুরীতে। সুপ্রাচীন খেতুরী উৎসবের ঐতিহ্য প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরানো। প্রেমভক্তির মহাজন শ্রীল নরোত্তম ঠাকুর মহাশয়ের উদ্যোগেই প্রথম খেতুরীতে অনুষ্ঠিত হয় মহাবৈষ্ণব সম্মেলন। বৃন্দাবনের তিন আচার্যের একজন ছিলেন শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর, যিনি পূর্ববঙ্গ (অধুনা বাংলাদেশ),আসাম, মেঘালয়, মনিপুর ও ত্রিপুরায় মহাপ্রভুর নাম ও প্রেমধর্মের প্রচার করেন। “প্রেমবিলাস” গ্রন্থে শ্রীমন্মহাপ্রভুর পরম অভীষ্ট প্রচারের জন্য আবেশাবতাররূপে তিন আচার্যের (শ্রীনিবাস, নরোত্তম, শ্যামানন্দ) আবির্ভাবের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখিত হয়েছে। শ্রীমন্মহাপ্রভু প্রথমবার বৃন্দাবন যাত্রাকালে রামকেলীতে শ্রীল রূপ ও সনাতন গোস্বামীকে দর্শন দিয়ে কানাই নাটশালা পর্যন্ত আসেন। সেখানে হরিনাম সংকীর্তন করার সময় তিনি হঠাৎ ভাবাবিষ্ট হয়ে খেতুরীর দিকে মুখ করে “নরোত্তম!”, “নরোত্তম!” বলে বার বার ডাকতে থাকেন। তখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু মহাপ্রভুকে ঘিরে “জগন্নাথ!”, “জগন্নাথ!” বলে চিৎকার করলে মহাপ্রভু বাহ্যচেতনা ফিরে পান। কিন্তু পরক্ষণেই আবার “নরোত্তম!”, “নরোত্তম!” বলে ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু, হরিদাস ঠাকুর আদি ভক্তগণ বুঝতে পারেন যে, ‘নরোত্তম’ নামে মহাপ্রভুর বিশেষ কোনো প্রেমের পাত্র এদেশে প্রকট হবেন। মহাপ্রভু ভক্তগণকে নিয়ে তখন পদ্মার পাড়ে গিয়ে পদ্মাকে বলেন, “ হে পদ্মাবতী, তুমি এ প্রেম নাও। আমার ভক্ত নরোত্তম না আসা পর্যন্ত তুমি এ প্রেম তোমার কাছে সযত্নে গচ্ছিত রাখো; সে এলে তাকে তুমি তা প্রদান করবে।”
বৈরাগ্যের চরম পরাকাষ্ঠা ছিলেন ঠাকুর নরোত্তম। সেবা পারিপাট্যের একাগ্রতা দর্শনে অভিভূত হয়ে শ্রীল লোকনাথ গোস্বামীর হৃদয় বিগলিত হয়ে যায় ও নিজ শিষ্য হিসেবে স্বীকার করে নেন। স্বীয় গুরুদেবের আদেশে শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর খেতুরীতে শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া-গৌরাঙ্গ, বল্লভীকান্ত, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীব্রজমোহন, শ্রীরাধা-রমণ ও শ্রীরাধাকান্ত– এ ছয় বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। গুরু আজ্ঞায় তিনি নিত্য রাধাগোবিন্দের ‘দুগ্ধ-আবর্তন’ সেবাকে প্রাপ্ত করাই স্বয়ং শ্রীমতি রাধাঠাকুরাণী আবির্ভূত হয়ে শ্রীকৃষ্ণের জন্য ‘দুগ্ধ আবর্তন’ সেবাকে নিত্য করতে বলেন এবং যেহেতু শ্রীমতির প্রিয়সখী চম্পকলতারও সেই একই সেবা, তাই ঠাকুর মহাশয়ের নাম দিলেন ‘চম্পক-মঞ্জরী’। শ্রীনিবাস, শ্যামানন্দ ও নরোত্তম প্রভুত্রয় কে শ্রীজীব গোস্বামী একদিন ডেকে বলেন গৌড়দেশে শ্রীমন্মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করার কথা। তিনি গোস্বামী গ্রন্থরত্ন দিয়ে গৌড়দেশে গিয়ে প্রচার করতে বললেন। সেই মুহূর্তেই তাঁরা বৃন্দাবনবাসের সংকল্প ত্যাগ করে শ্রীগুরু আজ্ঞা শিরে ধারণ করে গৌড়দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ঠাকুর মহাশয় গৌড়ীয় বৈষ্ণব জগৎকে তাঁর দু’টি মাত্র গ্রন্থের দ্বারাই সমৃদ্ধ করেছেন। তা হলো: “শ্রীপ্রেমভক্তিচন্দ্রিকা” ও “প্রার্থনা”। প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা পরম আর্তিময় বলে এ গীতিকাসমূহ মধুর ও হৃদয়স্পর্শী। সাধকের অখণ্ড জীবনরসের উজ্জ্বল সঙ্গীত মালা প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা, ভক্ত সাধক কীভাবে তার সাধনার স্তরগুলো অতিক্রম করবেন, কীভাবে সাধকোচিত প্রেমসেবা সম্পাদন করবেন, তারই দিব্যগীতি প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা। তেমনি ‘পয়ার’ ও ‘ত্রিপদী’ ছন্দে রচিত ” প্রার্থনা” যা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন যেকোনো পাঠক বা শ্রোতার হৃদয়ে যে ভগবদ্ভজন বিষয়ে এক অভিনব জাগরণ জন্মে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রার্থনা সমূহের অন্তস্থলে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তত্ত্ব ও তথ্য নিহিত- তা সাধারণের ইন্দ্রিয়গোচর না হলেও ; তার মধ্য যে সরলতা, স্বাভাবিকতা ও ভাবের ঐকতান আছে, তাতেই সকলকে মোহিত হতে হয়। এছাড়া শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয়ের নামে আরোপিত অনেক গ্রন্থাদি পাওয়া যায় যেগুলির প্রামাণিকতা সম্পর্কে বিভিন্ন মতানৈক্য দেখা যায়।
ঠাকুর মহাশয় একদিন গাম্ভীলায় অবস্থানকালীন সময়ে স্নান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তদশিষ্য রামকৃষ্ণ আচার্য ও গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যান। তাঁদেরকে তিনি তাঁর দেহ মার্জনের আদেশ করেন। তাঁরা তখন গাত্রমার্জন করতে থাকলে, হঠাৎ নরোত্তম দাস ঠাকুর গঙ্গার তরঙ্গে দুগ্ধের আকার ধারণ করে অন্তর্হিত হলেন। ভক্তগণ তখন গঙ্গা থেকে সেই দুগ্ধজল নিয়ে গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তীর বাড়ির পাশে একটা সমাধি করলেন, যাকে ‘দুগ্ধ-সমাধি’ বলা হয়। যে ঘাটে তিনি অপ্রকট হয়েছিলেন, সে ঘাটকে ‘দুধ-ঘাট’ বলা হয়। এভাবে নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয় গাম্ভীলায় অনেক অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করে গাম্ভীলাকে মহাতীর্থে পরিণত করলেন।
আজ তিরোভাব তিথিতে প্রেমভক্তির মহাজন শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয়ের শ্রীচরণকমলে রইল দণ্ডবৎ প্রণতি ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

তথ্য সূত্রঃ শ্রীনরোত্তম বিলাস
শ্রীভক্তিরত্নাকর
শ্রীপ্রেমবিলাস

সিলনিউজবিডি ডট কম / এস:এম:শিবা

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ