বীর মুক্তিযোদ্ধা লালটুর এমন মৃত্যু কেন?

প্রকাশিত: ১:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ৮, ২০২১

বীর মুক্তিযোদ্ধা লালটুর এমন মৃত্যু কেন?

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

৩ জুন অর্থমন্ত্রী প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি-সংবলিত এক বাজেট পেশ করেছেন। ৬ লাখ ৩ হাজার কয়েক শ কোটি টাকার বাজেট পেশ না করে ৬ লাখের জায়গায় ৩ লাখ-সাড়ে ৩ লাখ-৪ লাখ করলেই কী দোষ হতো? বাংলাদেশের প্রথম বাজেট কিন্তু ছিল হাজার কোটির নিচে। সেখান থেকে এখন লাখ কোটি, এটা তো মোটেই কম কথা নয়। তবে প্রতিবারের মতোই বাজেটে ধনবানদের সুবিধা বেশি।

গতকাল ছিল ঐতিহাসিক ৭ জুন ছয় দফা দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়েই। পাকিস্তান না হলে আজও আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না। পাকিস্তানের অত্যাচার-নির্যাতন-বঞ্চনা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার প্রথম সোপান ভাষা আন্দোলন, তারপর ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ’৬৬-তে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা। আজ যে যত বড় বড় কথাই বলুক, ছয় দফাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। তেজগাঁওয়ে শ্রমিক মনু মিয়ার রক্তদান বাঙালি জাতির চোখ খুলে দিয়েছিল। কেমন নীরবে নিভৃতে সেই দিনটি শুধু দু-একটি পত্রিকার পাতায় আর ’৬৯-এর ছাত্র-গণ আন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের লেখার মধ্য দিয়ে মনে হয় শেষ হয়ে গেল। দিনটি শুধু আওয়ামী লীগের নয়, ৭ জুন দিনটি বাঙালি জাতির সবার মনে রাখা উচিত।

ভেবে কোনো দিশা পাই না, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সরকারি গাড়িতে মন্ত্রীর হাত থেকে মোবাইল নিয়ে নেয় ছিনতাইকারী! সঙ্গের গানম্যান কী করে, মাননীয় মন্ত্রীই বা কী করেন? বোনের কথা কি বলি, যারা নিজের একটা ফোন সামলাতে পারেন না, ফোন সামলাবার শারীরিক-মানসিক সামর্থ্য নেই তেমন লোককে আমার বোন মন্ত্রী বানিয়ে কী সেবা পাবেন? ছেলেবেলা থেকেই শুনছি, ছাগল দিয়ে ধান মাড়ানো যায় না। সে চেষ্টাই যদি আমার প্রিয় বোন করে থাকেন তাহলে তার জবাবদিহি তো তাঁকেই করতে হবে। শুনি ১৮ ঘণ্টা প্রিয় বোন পরিশ্রম করেন। ১৮ ঘণ্টা কেন, তিনি ২৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করলেও তাঁর টিম যদি অথর্ব হয়, অচল-অদক্ষ হয় তাহলে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাবে না। এ পর্যন্ত সরকার সম্পর্কে যা শুনেছি, সরকারের মূল চালিকাশক্তি বা প্রাণ হলো প্রধানমন্ত্রীর বাইরে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আরও চারটি মাত্র মন্ত্রণালয়- স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থ ও পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনামন্ত্রী সরকারি গাড়ির ভিতর বসেও একটা ফোন হেফাজত করতে পারেন না, এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে? এখনো তিনি পদত্যাগ করেননি, তাকে বরখাস্তও করা হয়নি, এ কী করে সম্ভব!

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার বেশ কিছুদিন বলছিলেন, স্যার, টাঙ্গাইলে থাকলে এক কাপ চা খেয়ে যাবেন। সেদিন এক বৃদ্ধের কান্না সইতে না পেরে জেলা প্রশাসক আতাউল গনির ঘরে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে কান্নার প্রতিকার করেছেন। সময় ছিল তাই পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়ের দফতরে চা খেতে গিয়েছিলাম। যেতে যেতেই চা দিয়েছিলেন, সঙ্গে মিষ্টি এবং পুলিশ ক্যান্টিনে বানানো স্যান্ডউইচ। ১৫-২০ বছর ডায়বেটিক। তাই মিষ্টি মুখে দিই না। কালেভদ্রে দু-চার-ছয় মাসে হয়তো কোনো দিন একটু-আধটু মিষ্টি মুখে তোলা হয়। পুলিশ সুপার বারবার বলছিলেন তাদের ক্যান্টিনের স্যান্ডউইচ খুবই ভালো। তাই স্যান্ডউইচ মুখে দিয়েছিলাম। ভর্তা-ভাত খাওয়া মানুষ আমি। বাইরের খাবার খুব বেশি খাই না, হোটেল-রেস্টুরেন্টে একেবারেই যাই না। দু-চার বছরে রেস্টুরেন্টে কিছু খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। পুলিশ সুপারের স্যান্ডউইচ সত্যিই বেশ ভালো ছিল। পুলিশ সুপার আবার সুনামগঞ্জের মানুষ। আমাদের নেতা প্রয়াত সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্তের ভাতিজা। সে অর্থে আমাকে বেশ সমাদর করেন, টুকিটাকি কথাবার্তাও শোনেন। কথার এক ফাঁকে বললেন, ‘টাঙ্গাইলের বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর একটা বই লিখেছি’। বলেই বইটি হাতে তুলে দেন। ‘টাঙ্গাইলের বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা : সম্পাদক সঞ্জিত কুমার রায় বিপিএম’। যে কোনো লেখাই আমার কাছে সম্মানের এবং প্রশংসার। এ লেখাটি অপ্রশংসা করার তেমন কিছু নেই। তবে উদ্যোগটা খুবই প্রশংসার। মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের কে কোথায় ছিল, বাইরের কজন পুলিশ টাঙ্গাইলে কাজ করেছে এসব লিপিবদ্ধ থাকা খুবই ভালো কথা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বইটিতে বাইরের বেশ কয়েকজনের লেখা আছে। তার মধ্যে আনোয়ারুল আলম, আনিসুর রহমান, শাহ আবদুর রশিদ। আরও প্রায় ২৫-৩০ জন পুলিশ যোদ্ধার নিজস্ব লেখা। তা ছাড়া এক শ কয়েকজনের নামের তালিকা রয়েছে বইটিতে যেটা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। একবার পড়ে সম্পাদক সঞ্জিত কুমারের লেখা কোনটি কতটুকু পুরোপুরি ধরতে পারিনি। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ অবশ্যই সঞ্জিত কুমারের। কয়েক পৃষ্ঠার ইতিহাস। ১৯৪৭-৭১ মোটামুটি ভালোই হয়েছে। ‘টাঙ্গাইলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ কাঁচা হাতের হলেও মোটামুটি ভালো হয়েছে। প্রথম লেখাই আনোয়ারুল আলমের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে পুলিশ বাহিনী’। আনোয়ারুল আলম কাদেরিয়া বাহিনীতে ছিলেন, বেসামরিক প্রধান ছিলেন। প্রচন্ড ক্ষমতা এবং সম্মানের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু তার শেষ জীবনে লেখালেখি দেখে হতাশ না হয়ে পারিনি। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে পুলিশ বাহিনী’ এ নিবন্ধে পুলিশদের নিয়ে তেমন কিছুই তিনি লেখেননি বা লিখতে পারেননি। নিজেকে বড় বানাতে গিয়ে বরং ছোট করেছেন। মোটামুটি সবাইকে ছোট করার চেষ্টা করেছেন। সাটিয়াচরা যুদ্ধের বিন্দুবিসর্গও তার জানার কথা নয়। অথচ সেখানে তিনি ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। তার লেখা থেকেই তুলে ধরছি, ‘এরপর টাঙ্গাইল জেলার সর্বত্র ছাত্র-যুবক-পুলিশ-ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা মিলে ছোট ছোট মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলি এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে ছোট ছোট আক্রমণ চালাতে থাকি। টাঙ্গাইলের নেতারা ভারতে চলে গেলে মে মাসের শেষ দিকে আমি, আবদুল কাদের সিদ্দিকী, হামিদুল হক, নুরুন্নবী, নুরুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, শওকত মোমেন শাজাহান, সোহরাব আলী খান আরজুসহ আরও অনেকে একত্রিত হয়ে পুরো জেলায় একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করি। আবদুল কাদের সিদ্দিকীর সৈনিক প্রশিক্ষণ থাকায় তাকে কমান্ডার হিসেবে সবাই মেনে নেয়। আমাকে বেসামরিক প্রধান ও কাদেরের অনুপস্থিতিতে সামরিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে হয়।’ অসত্য আর কাকে বলে! টাঙ্গাইলের মুক্তিযুদ্ধ বা কাদেরিয়া বাহিনী কোনো বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করে গঠিত হয়নি। গোড়ান-সাটিয়াচরা যুদ্ধের পর টাঙ্গাইল ট্রেজারি থেকে পুলিশের কিছু অস্ত্রশস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে ৩ এপ্রিল পাহাড়ে চলে গিয়েছিলাম। ভর-পাহাড়-সীমান্ত ঘোরাঘুরি করে ১৯ এপ্রিল কালিহাতীতে এক প্রতিরোধ যুদ্ধের পর সারা টাঙ্গাইল উ™£ান্তের মতো ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। সেখানে একজন কালো ফারুক, আরেকজন সাদা ফারুক এ দুজন ছিল আমার সঙ্গে। এরপর চারানের যুদ্ধ, বল্লার যুদ্ধ, কামুটিয়ার যুদ্ধ, বাসাইল থানা দখল, ১০ জুন বহেরাতলীতে শপথ গ্রহণ এসবে আনোয়ারুল আলমের কোনো পাত্তাই ছিল না। জুনের শেষ সপ্তাহে ভূঞাপুরের প্রিন্সিপ্যাল ইবরাহীম খাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে কালামসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ধরে এনেছিল আর নুরুন্নবী, সে এসেছিল জুলাইয়ের মাঝামাঝি। প্রথম প্রথম তাকে নিয়ে অনেক অসুবিধা ছিল। সাধারণ যোদ্ধাদের মতো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে পারবেন না। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর প্রিয়, কদিন আগেও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে আমাদের নেতা। তাই তাঁকে অনেক কষ্টে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মানাতে হচ্ছিল। তাই আনোয়ারুল আলমের লেখাটি বইটিকে সমৃদ্ধ না করে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্তই করেছে। তবে ‘২৫ মার্চ কালরাত্রী’ নামে একটি লেখা খুবই অর্থবহ। লেখাটি কে লিখেছে পরিষ্কার হয়নি। ময়মনসিংহের ঘটনা। আজ কেউ আলোচনা করে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে ময়মনসিংহ সব থেকে সুসংগঠিত হয়েছিল। সেখানে জননেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়া ও প্রিন্সিপ্যাল মতিউর রহমানের অসম্ভব ভূমিকা ছিল। খাকডহরের ইপিআর ক্যাম্প দখল করে অনেক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছিল। এক ডিভিশনের চেয়ে বেশি শক্তির পুলিশ-ইপিআর-আনসার-ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিক নিয়ে ময়মনসিংহে যে প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে উঠেছিল মেজর শফিউল্লাহর নেতৃত্বে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল ময়মনসিংহ গিয়ে সবকিছু তছনছ করে না দিলে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীকে ময়মনসিংহ দখল নিতে আরও অনেক সময় লাগত। প্রথম দিকের প্রতিরোধ যুদ্ধের সর্বনাশ করেছিলেন মেজর শফিউল্লাহ। তিনি বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে তো চলে গিয়েছিলেনই, বাকিদেরও এদিক-ওদিক ভাগ করে নষ্ট করে দিয়েছিলেন। ‘টাঙ্গাইলের বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা’ বইয়ে সব থেকে ভালো লেখা মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন পুলিশ ও ধুনটিয়ার বিরতি ছাউনি। চমৎকার! ঘাটাইলের গর্জনায় আমরা যে বিশ্বাসঘাতক মেম্বারের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলাম, খোরশেদ আলম বীরপ্রতীক আহত হয়েছিল। বীর যোদ্ধা কবি বুলবুল খান মাহবুব খোরশেদ আলমকে হেডকোয়ার্টারে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সম্পর্কে ‘জখমি সাথীকে নিয়ে আমরা ১০ জন’ তাঁর অমর কবিতা। এ ছাড়া ওই এলাকার খুঁটিনাটি নিখুঁত বর্ণনা বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। সর্বোপরি এ প্রয়াসকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। তবে বইটির সর্বত্র ‘পাক বাহিনী, পাক হানাদার বাহিনী’! পাকিস্তানি হানাদারদের পাক বলে আল্লাহ রসুল পাকের অর্থ নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এত কুকর্ম করে পাকিস্তান হানাদাররা যদি পাক থাকে একসময় হয়তো মুক্তিযোদ্ধারাই নাপাক হয়ে যাবে। সম্পাদককে বিষয়টি ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।

৩ জুন কমান্ডার লালটুর কবর জিয়ারতে গিয়েছিলাম। ‘টাঙ্গাইলের বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা’ বইটিতেও কমান্ডার লালটুর নাম রয়েছে। কমান্ডার আলী হোসেন খান লালটু এক প্রাতঃস্মরণীয় যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই সে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগদান করেছিল। নাগরপুর, ভূঞাপুর থানা দখল, ভালুকা-আছিমের যুদ্ধসহ অনেক দুঃসাহসিক অভিযানে সে দারুণ সফল। কাদেরিয়া বাহিনীর তিন-চার জন দক্ষ অভিজ্ঞ কোম্পানি কমান্ডারের মধ্যে আলী হোসেন খান লালটু অন্যতম প্রধান। হাবিব, হাকিম, গফুর, মনির, লোকমানদের সঙ্গে উচ্চারিত হতো তার নাম। ১৫০-১৬০ জন কাদেরিয়া বাহিনী কমান্ডারের মধ্যে লালটু ছিল প্রথম কাতারে। যুদ্ধে ভূমিকা রেখেই সে যোদ্ধা হয়েছে। দেখতে শুনতে ছিল চমৎকার। গায়ের রং ছিল ঝকঝকে তকতকে। ৫ ফুট ৮-১০ ইঞ্চি লম্বা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। মুক্তিযুদ্ধের আগে সে সেনাবাহিনীতে ছিল। প্রশিক্ষণ থাকায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে তার অন্যের চেয়ে কিছুটা বেশি সুবিধা ছিল। যুদ্ধে তো সে সফল ছিলই, মুক্তিযুদ্ধের পরও তার ভূমিকা তেমন কম ছিল না। ’৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পদতলে আমরা যখন অস্ত্র বিছিয়ে দিয়েছিলাম সে অনুষ্ঠানেও আলী হোসেন খান লালটু একটি কোম্পানি লিড করেছিল। আমার এখনো চোখে ভাসে, মঞ্চ থেকে যখন মাঠের দিকে তাকাচ্ছিলাম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী লালটু অস্ত্র হাতে তার কোম্পানির সামনে বুক টান করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে এসে ঘোড়াশাল পলাশ, আশুগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জিয়া সার কারখানায় অনেক দিন কাজ করেছে। ২০০৪ সালে সম্পূর্ণ অবসরে এসে টাঙ্গাইলের বিশ্বাসবেতকায় স্থায়ীভাবে বাস করা শুরু করে। মাঝেমধ্যে যখনই আসত এমন সটান মাটি কাঁপিয়ে অ্যাটেনশন হতো যা ছিল দেখবার মতো। সেই লালটু ১৯ এপ্রিল রমজানের মধ্যে ইন্তেকাল করেছে। তার জানাজায় শরিক হতে পারিনি। একে তো করোনা তার ওপর ঢাকায় ছিলাম। তার দাফন-কাফনের কয়েক দিন পরই কানাঘুষা শুনছিলাম, জমিজমা নিয়ে শরিকি বিরোধ থাকায় মৃত্যুর দিন তাকে অপমান-অপদস্থ ও নির্যাতন করা হয়েছিল। কথাটা শুনে আমার ভালো লাগেনি। তার কোনো সন্তান ছিল না। আফরোজা খানম নামে তার এক ভাইয়ের মেয়েকে লালনপালন করেছে। সে কান্নাকাটি করছিল, ডিসির কাছে গিয়েছিল। ডিসি তদন্ত করে দেখবার জন্য যাকে বলা দরকার বলেছেন। তাই ৩ জুন বৃহস্পতিবার লালটুর বাড়ি যাওয়ার আগে কবর জিয়ারতে গিয়েছিলাম। কবরের কাছাকাছি এক ভদ্রলোককে খড়ের পালার কাছে বসে থাকতে দেখে কাছে আসতে ইশারা করেছিলাম। কাছে এলে হাত ধরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম,

– কী করেন? লোকটির জবাব,

– কৃষিকাজ।

– কতটা জমি আছে? বলেছিলেন,

– কোনো জমিজমা নেই।

– জমিজমা নেই কৃষিকাজ করেন কী করে?

– অন্যের জমি বন্দোবস্ত নিয়ে চাষাবাদ করি।

নতুন অভিজ্ঞতা হলো। ১ শতাংশ ১০০ টাকা এক বছর। ভদ্রলোকের নাকি ভালোই চলে। দুবার ধান, একবার রবিশস্য। এবার ধান খুবই ভালো হয়েছে। যারা শহর-বন্দরে থাকে যাদের জমিজমা আছে তারা ওভাবেই প্রতি বছর ১০০ টাকা শতাংশে বরাদ্দ দেয়। লালটুর কবরে ফাতিহা পাঠ করে হাত তোলার সময় মনে হচ্ছিল যারা আমার কবরে দোয়া করবে, ফাতিহা পড়বে আমি তাদের কতজনের কবরে ফাতিহা পড়ছি, দোয়া করছি। আল্লাহ আর কত দিন এ সুযোগ দেবেন তিনিই জানেন। লালটুর কবরে দোয়া করার সময় হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক, অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুরুল ইসলাম, অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ও বাসাইল থানার ওসি হারুন ছিলেন।

কবর জিয়ারত শেষে কমান্ডার লালটুর বাড়ি গিয়েছিলাম। লালটুর মৃত্যু যে স্বাভাবিকভাবে হয়নি তা কদিন আগে থেকেই বুঝতে পারছিলাম। লালুটর ছোট ভাই হুমায়ুন অনেক দিন থেকে লালটুর জমিজমার ঠিকমতো ফসল দিচ্ছিল না। তা নিয়ে হুমায়ুনের ঘরে পিতৃতুল্য বড় ভাই লালটুর সঙ্গে তর্কবিতর্ক হয়। শুনলাম তার গায়ে নাকি হাত দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে লালটু হুমায়ুনের ঘরের বারান্দায় বসে চিৎকার করছিল, ‘ও আমাকে মারল! আমি ওকে মেরে তারপর যাব।’ এ সময় হুমায়ুনের স্ত্রী লালটুর পালিতা কন্যা আফরোজাকে ফোন করে। তার বাড়ি ফিরতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়। এর মধ্যে লালটুর স্ত্রী ও অন্যরা অনেক বলেকয়ে লালটুকে নিয়ে যায়। লালটু বারান্দায় বসে জারজার হয়ে কাঁদতে থাকে, ‘ছোট ভাই হয়ে ও আমাকে মারল! এই মুখ আমি দেখাব কাকে?’ কিছুক্ষণ এমনি কান্নাকাটি করতে করতে একসময় বারান্দা থেকে নেমে এগিয়ে যাচ্ছিল। ৫-৭ কদম যাওয়ার পরই সে পড়ে যায়। আর উঠতে পারেনি। ধরাধরি করে ঘরে নিলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। হুমায়ুনের ঘরে ঘটনা ঘটে আড়াই-৩টার দিকে, লালটু মারা যায় ৫-সাড়ে ৫টায়। সন্ধ্যায়ই তাকে গোসল করানো হয়। সকালে নেওয়া হয় টাঙ্গাইলের বিশ্বাসবেতকা। সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে সকাল সাড়ে ৯টায় আবার ফিরিয়ে এনে ঝনঝনিয়ায় কবর দেওয়া হয়। ঠিক বুঝতে পারিনি, এত তাড়াহুড়া কেন।

একসময় আমি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা সম্মানী চেয়েছিলাম। গত ফেব্রুয়ারিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২০,০০০ টাকার সম্মানী ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই থেকে সব মুক্তিযোদ্ধা ২০,০০০ টাকা করে সম্মানী পাবেন। লালটুকে পুলিশি গার্ড অব অর্নার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে যে অপমান করা হয়েছে, শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে কেউ সেদিকে তাকিয়েও দেখেনি। লালটুর বাড়িতে যখন গিয়েছিলাম থানার ওসি হারুন পাশেই ছিলেন। তিনি বললেন, ‘ও সময় আমাদের জানানো হলে ঘটনাটা অনেক সহজ হয়ে যেত।’ কে কাকে জানাবে? লালটুর বাড়িতে গিয়ে নতুন পরিবেশ দেখলাম। এখনো গ্রামেগঞ্জে গেলে চারদিক থেকে মানুষ ছুটে আসে, বাচ্চারা পাগল হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন লালটুর বাড়িতে আশপাশের ১০-১৫ বাড়ির কেউ ছিল না। যারা লাশ ধুইয়েছেন, জানাজা পড়েছেন, কবর দিয়েছেন তাদের দু-এক জন ছাড়া। কুলাঙ্গার হুমায়ুন যাকে লালটু সন্তানের মতো বড় করেছিল সেই যে পালিয়েছে আর ফেরেনি। ধোয়ানোর সময় ছিল না, জানাজায় যায়নি, কবর দেয়নি। আমি যখন গিয়েছিলাম তখনো তার দেখা নেই। এতেই তার কুকর্মের কথা বোঝা যায়। অনেক মুক্তিযোদ্ধা গিয়েছিল। নানাজন তাদের পেরেশানির কথা বলছিল। চলে আসার সময় লালটুর স্ত্রী চিৎকার করে বলছিল, ‘এখান থেকে ৫-৭ পা সামনে গিয়েই পড়ে যায়। তার ডান হাতে, ডান পায়ে তিন-চারটা আঘাতের চিহ্ন ছিল। রক্ত বেরিয়ে আসছিল, হাতের দাগ কালো হয়ে গিয়েছিল।’ কেউ শোনেনি তাদের কথা। লালটুর স্ত্রী মতিয়া হোসেনের কান্নায় আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। সরকার সম্মানী দিচ্ছে, পুলিশ সালামি দিয়ে শেষ বিদায় জানাচ্ছে অথচ জীবিতকালে নিরাপত্তা নেই। গায়ে হাত তোলে। আল্লাহ কেন এতটা সময় বাঁচিয়ে রেখেছেন। ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময়ই চলে গেলে হয়তো এসব দেখতে হতো না। অপেক্ষায় থাকলাম যে বা যারা লালটুর গায়ে হাত তুলেছে তার বিচারের আশায় এবং আর যাতে কোনো মুক্তিযোদ্ধার গায়ে কেউ হাত তুলতে সাহস না পায়। দয়াময় আল্লাহ লালটুকে বেহেশতবাসী করুন।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

আমাদের ফেইসবুক পেইজ