ব্রিটেনের জাতীয় নির্বাচন:লেবার পার্টিতেই আস্থা বাঙালি ভোটারদের

প্রকাশিত: ৬:০১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

ব্রিটেনের জাতীয় নির্বাচন:লেবার পার্টিতেই আস্থা বাঙালি ভোটারদের

সিলনিউজবিডি ডেস্কঃরাত পোহালেই ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচন। ১২ই ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবারের এই নির্বাচন স্বাভাবিক মেয়াদ শেষের নির্বাচন নয়, বিশেষ নির্বাচন। গণভোটের রায় অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কারনেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই মধ্যবর্তী নির্বাচন। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচন সাধারণত মে মাসে হয়ে থাকলেও ব্রেক্সিট জটিলতার কারনে এবার ডিসেম্বরেই করতে হচ্ছে এই মধ্যবর্তী নির্বাচন। ১৯২৩ সালের পর এবারই প্রথম ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই নির্বাচন।

দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে রক্ষণশীল দলের নেতা ও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বিরতিহীনভাবে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পাড় করেছেন বিগত কয়েক সপ্তাহ। বেক্সিট নিয়ে সৃষ্ট সংকট অবসানের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবারের এ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশটিতে ২০১৬ সালে এক গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বরং বেক্সিট ইস্যু নিয়ে দেশটিতে একের পর এক রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে জনসনের দল আশা করছে তারাই সরকার গঠন করবে এবং আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে তারা ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করতে পারবে। এদিকে জনসনের মধ্য-ডান রক্ষণশীল দলটি জনমত জরিপেও এগিয়ে রয়েছে।তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন রক্ষণশীল দল হয়তো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বুধবার জনসন (৫৫) উত্তর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশ্যায়ারে তার শেষ  প্রচারণায় বলেন, ব্রেক্সিট সংকট থেকে বেরুতে না পারলে আমাদের দেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিতই থেকে যাবে। তাই ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের সুযোগ দিন, যাতে পুরো যুক্তরাজ্য জুড়ে সুযোগ ও সম্ভাবনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে লেবার দলীয় নেতা করবিন(৭০) মিডেলবার্গের এক নির্বাচনী প্রচারণায়, বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে উল্লেখ করেন। দ্য ব্রিটেন ইলেক্টস পরিচালিত জনমত জরিপে বলা হয়েছে, এ নির্বাচনে রক্ষণশীল ৪৩ শতাংশ, লেবার দল ৩৩ শতাংশ, লিবারেল ডেমোক্রেটস ১৩ শতাংশ ভোট পাবে।

এদিকে, নির্বাচনী ফলাফলে বিরাট প্রভাব রাখবে এথনিক মাইনোরিটি ভোট, মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো এমনই আভাস দিচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থি হয়ে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন মোট ১০জন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত প্রার্থি। বর্তমান এমপি  রোশনারা আলী, শেখ রেহানা কন্যা টিউলিপ সিদ্দীক ও রূপা হক ছাড়াও আরেক বঙ্গকন্যা আফসানা বেগমও এবার পার্লামেন্টে যাচ্ছেন, এটি প্রায় নিশ্চিত। প্রতিদ্বন্ধীতায় আছেন লিবডেম দলীয় প্রার্থী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত  ড. বাবলিন মল্লিকও।

ঐতিহ্যগত ভাবেই ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা লেবার পার্টির সমর্থক। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের মধ্যে এর কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেলেও এবারের নির্বাচনেও বাংলাদেশীদের পছন্দ লেবার পার্টি। সত্যবাণীর পক্ষ থেকে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের উপর পরিচালিত ছোট্ট এক জরীপে এমনটাই আভাস পাওয়া গেছে। মোট ২০০ জন বাংলাদেশীর উপর পরিচালিত এই জরীপে ১৪৭জনই মনে করেন লেবার পার্টিই এথনিক মাইনোরিটি গ্রুপের ভরসার রাজনৈতিক দল। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। ৩৯ ব্রিটিশ-বাংলাদেশীর সমর্থন বর্তমানে ক্ষমতাসীন এই দলটির প্রতি। আর যারাই সমর্থন দিয়েছেন তাদের অধিকাংশই আবার তরুণ প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশী। ইমিগ্রেন্ট ইস্যুতে মূল রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে খুব একটা পার্থক্য না থাকলেও লেবার পার্টির প্রতিই ভরসা রাখতে চান ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা। 

ঐতিহ্যগত ভাবে বাংলাদেশীরা বিগত কয়েক দশক থেকে লেবার পার্টিকে একচেটিয়া সমর্থন দিয়ে আসলেও বর্তমানে আগের সেই অবস্থা কেন নেই? এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তরুন এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশী সত্যবাণীকে বলেন, ‘এক সময় লেবার পার্টি ইমিগ্রেন্ট কমিউনিটির স্বার্থে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের পূর্ব প্রজন্ম মূলধারার তুলনায় অনগ্রসর থাকায় সরকারী ভাতা/বেনিফিটের প্রতি ছিল তাদের ভরসা। বর্তমান প্রজন্ম শিক্ষা-দীক্ষায় নিজেদের যোগ্য করে মূলধারার সাথেই প্রতিযোগীতা করছে, তাদের লক্ষ্য ভাতা/বেনিফিট নয়, যোগ্যতা অনুযায়ী মূলধারায় সমঅধিকার। সুতরাং কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ নির্ভরতা নয়, চোখ-কান খোলা রেখে রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের চিন্তা মাথায় রেখেই সমর্থনের বিষয়টি বিবেচনা করছেন নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা’।

এবারের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কমপক্ষে ১০ জন প্রার্থী লড়াইয়ে রয়েছেন।মধ্যবর্তী এই নির্বাচনে একটি ইস্যু প্রাধান্য পেলেও যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে এবার বাংলাদেশি প্রতিনিধিত্ব বাড়বে, এটা নিশ্চিত। তবে আলোচনা বেশি হচ্ছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পাঁচ নারীকে নিয়ে, যাদের তিনজন এখন সংসদ সদস্য। নিজ আসন ধরে রাখতে লড়ছেন রুশনারা আলী, টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক ও রূপা হক। তাদের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আফসানা বেগম এবং বাবলিন মল্লিক। এর মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিক জয়ী হলে এবার হ্যাটট্রিক করবেন। এ ছাড়া কনজারভেটিভ পার্টি থেকে ডা.আনোয়ারা আলী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে রাবিনা খান মনোনয়ন পেয়েছেন। 

লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে রোশনারা আলী ২০১০ সাল থেকে লন্ডনের বেথনাল গ্রিন ও বো আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এই আসনটিতে সব সময় লেবার পার্টির প্রার্থী জয়ী হয়ে থাকেন।

রুশনারা আলী: ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত প্রথম এমপি রুশনারা আলি। ২০১০ সালে তিনি লেবার পার্টি থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথের মেয়ে রুশনারা। তিনি পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।আরও পাঁচ বছর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে থাকতে লড়ছেন।২০১৭ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির চার্লট চিরিকোর চেয়ে ৩৫ হাজার ৫৯৩ ভোট বেশি পেয়ে তিনি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারার অধীন রুশনারার আসনটি লেবার দলের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সাধারণ এক কর্মজীবী বাঙালির মেয়ে রুশনারা পরিবারের প্রথম সদস্য, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ডিগ্রি নিয়েছেন অক্সফোর্ডের সেইন্ট জন’স কলেজ থেকে।

টিউলিপ সিদ্দিক: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনী উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের হ্যাম্পস্টিড অ্যান্ড কিলবার্ন থেকে নির্বাচিত লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ ২০১৫ সালে লেবার পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হন। পরের দফায় ২০১৭ সালের নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। ৩৭ বছর বয়সী টিউলিপ সিদ্দিককে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। টিউলিপ প্রথমে ইংরেজি এবং পরে রাজনীতি ও সরকার বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেট দলের বারাক ওবামার প্রচারাভিযানে অংশ নেন।

রূপা হক: লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসন থেকে টানা দুই বারের এমপি রূপা হকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনে। বাংলাদেশে আদি বাড়ি পাবনায়। ৪৮ বছর বয়সী রূপা অল্প ভোটের ব্যবধানে হলেও ২০১৫ সালের নির্বাচনে রক্ষণশীলদের হাত থেকে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনেও তিনি ব্যবধান বাড়িয়ে আসনটি ধরে রাখেন। রূপা হক কেমব্রিজে রাজনীতি, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন পড়েছেন। তিনি পড়াচ্ছেন সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের মতো বিষয়। শিক্ষক রূপা এর আগে ডেপুটি মেয়র হিসাবে স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আফসানা বেগম: টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার পপলার অ্যান্ড লাইম হাউস আসন থেকে লেবার পার্টি থেকে এবার প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আফসানা বেগম।আফসানার জন্ম ও বেড়ে ওঠা টাওয়ার হ্যামলেটসে হলেও বাংলাদেশে তাদের আদি বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে।টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আবাসন বিভাগে কর্মরত আছেন তিনি। লেবার দলীয় এমপি জিম ফিটজপেট্রিক অবসরে চলে যাওয়ায় টাওয়ার হ্যামলেটসের পপলার ও লাইম হাউস আসনে লেবার পার্টির মনোনয়ন পান আফসানা। এই আসন লেবারের সেইফ সিট হওয়ায় বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আফসানা পার্লামেন্টে যাচ্ছেন, এমনটাই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

বাবলিন মল্লিক: ব্রিটেনের এবারের নির্বাচনের জন্য ড.বাবলিন মল্লিককে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে সে দেশের উদার ধারার রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাট (লিবডেম)।বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলা থেকে ব্রিটেনে স্থায়ী আবাস গড়া বাবলিন কার্ডিফ সেন্ট্রাল আসনের জন্য প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন।সাংবাদিকদের দেয়া সাক্ষাৎকারে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। বাবলিন মল্লিক মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কচুয়া গ্রামের মোহাম্মদ ফিরোজের মেয়ে।ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে আসেন তিনি।পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ বাবলিন বায়ো কেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন।কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন তিনি।

নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি (টোরি পার্টি) এবং জেরেমি করবিনের লেবার পার্টির মধ্যে।এছাড়া আরো ছোটো দল রয়েছে যারাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।এদের মধ্যে কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থি ও কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী দল হিসেবে পরিচিত।টোরি ও লেবার পার্টি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান তথা ব্রেক্সিট ইস্যুতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশেষ করে বাজেটে কাটছাঁট ইস্যুও আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।জরিপে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি লেবার পার্টির চেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে।(সত্যবাণী)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ খবর

আমাদের ফেইসবুক পেইজ