মতাদর্শ নয়, দ্বীনের পথে ডাকুন

প্রকাশিত: ৬:৩২ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

মতাদর্শ নয়, দ্বীনের পথে ডাকুন

ফয়জুল্লাহ আমান :: রাসূল সা. বলেন, আমি তোমাদেরকে আলোকোজ্জ্বল পথে রেখে গেছি, এই ইসলামের রাত দিন বরাবর। (ইবন মাজাহ) অর্থাৎ ইসলামের পথ অত্যন্ত পরিষ্কার।

এখানে কোনো তিমির নেই। কোনো অন্ধকার নেই।

মূল শিক্ষাগুলো স্পষ্ট হলেও ইসলামের বিভিন্ন পদ্ধতিতে রয়েছে গভীরতা। একেকটি পথ অসংখ্য পথ রচনা করেছে। এ জন্য দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের হতে হবে সর্বোচ্চ সতর্ক।

আমাদের প্রত্যেকেরই একেকটি বুঝ রয়েছে ধর্মের। এই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলোকে মাসলাক বলে। প্রত্যেকেই যদি তার মাসলাকের দিকে অন্যদের আহ্বান করে তাহলে মুসলিমদের ঐক্য সুদূরপরাহত বিষয় হয়ে যাবে।

এ জন্য যারা দাওয়াতের কাজ করবে তাদেরকে মাসলাকের দাওয়াত দেয়া ত্যাগ করতে হবে। আহ্বান জানাতে হবে জটিলতাহীন ইসলামের দিকে।

যে ইসলামের ভেতর কোনো ধরনের অস্পষ্টতা নেই। অর্থাৎ ইসলামের সে সব বিধানের কথা বলতে হবে যেগুলো নিয়ে মতভিন্নতার অবকাশ নেই।

তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাত। ইসলামের মানবিক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। হিকমাহ ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে ধার্মিক বানানোর চেষ্টা করতে হবে। ইসলামী আখলাকের দাওয়াত দিতে হবে।

জটিল চিন্তা-চেতনার দ্বন্দ্বে ফেলে দিলে নবাগতরা ইসলামের সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারবে না। তা ছাড়া অসংখ্য মাসলাকের উপস্থিতি তার জন্য যন্ত্রণার কারণ হবে।

একজন নবাগত মানুষ সোজা-সাপ্টা ধর্ম পালনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। তাকে যদি মুসলমানদের বিভিন্ন ফেরকার কথা শোনানো হয় তারপর কোনো বিশেষ ফেরকার দিকে ডাকা হয় সে ইসলামকে বিদঘুটে মনে করবে।

এভাবে আপনি ইসলামের দাঈ না হয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কারণ হয়ে যাবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

এবার আসুন সমাজের বাস্তবতায়। আমরা আজকে কী করছি? পৃথিবীর জাতিসমূহের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরছি, না কি আমরা পরস্পর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে ইসলামের বদনাম করছি?

বাস্তব চিত্র হচ্ছে, ইসলামের ব্যাখ্যা না করে প্রত্যেকে যার যার পছন্দের তাফসিরের প্রচারে সর্বশক্তি ব্যয় করছি সবাই। যার কারণে আমরা কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারছি না বর্তমান বিশ্বে।

কারণ ব্যাখ্যাগুলো যত সুন্দরই হোক, প্রতিটি ব্যাখ্যাতেই কিছু না কিছু ত্রুটি আছে। আমাদের উপস্থাপনায় তা আরও বিকৃত হয়ে যায়। মূল ইসলামের কিন্তু কোনো ত্রুটি নেই।

ইসলাম তো নির্মল এক ধর্ম। এর গায়ে কোনো কালিমা নেই। এ জন্যই আমাদেরকে মাসলাকের চর্চার চেয়ে ইসলামের চর্চা বেশি করে করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে মাসলাকের মাধ্যম ছাড়া ইসলামের বর্তমান দুনিয়ায় কোনো অস্তিত্ব আছে কি না? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে, না, নেই। সেই সাহাবিদের যুগেই শিয়া, সুন্নি ও খারেজি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে মুসলিম উম্মাহ।

প্রত্যেক ভাগ থেকে অসংখ্য ফেরকার উদ্ভব হয়েছে। একেক ফেরকা থেকে অসংখ্য ফেরকা প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে। এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না।

তারপরও কিছু বিষয় আছে যা নিয়ে কোনো মতভিন্নতা নেই। এমন বিষয় একেবারে কম নয়। প্রচারকদের অবশ্যই সে সব বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত।

তারপর অবশ্যই যিনি দাওয়াত দিবেন তার দাওয়াতে তার চিন্তা-চেতনার প্রভাব থাকবেই। কিন্তু যদি শুরু থেকেই তার চিন্তা-চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করাই লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সে খুব একটা সাফল্য লাভ করতে পারবে না।

আজ পর্যন্ত কেউ এভাবে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ভ্রান্ত মতাদর্শের প্রচারকরাও এ কৌশল অবলম্বন করেই সফল হয়েছে। তারা তাদের বিতর্কিত বিষয় গোপন করে মূল ইসলামের সুন্দর দিকগুলো তুলে ধরেছে।

বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা ছাড়াই তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। আজকাল আমরা যারা নিজেদেরকে আহলে হক মনে করি। আমাদেরও বিষয়টি বোঝা উচিত।

আমরা যদি আমাদের চিন্তা-চেতনা প্রতিষ্ঠা করতেই চাই তাহলে অবশ্যই চেতনার কথাগুলো ভেতরে লুকিয়ে রাখতে হবে।

যত বেশি চেতনা-চেতনা করবেন তত বেশিই পরাজয়ের দিকে অগ্রসর হবেন। মাঝখান থেকে অন্যরা এগিয়ে যাবে। যারা কৌশলী হবে তারাই এখানে টিকে যাবে। এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা।

মূলত এভাবে ঐক্য গড়ে তোলাও সহজ। রাজনীতিতে হাজারটা দল হাজারটা মতাদর্শ আছে। রাজনীতি ছাড়া তাসাওফেও আছে বহু পথ।

আরও বিভিন্নভাবেই বিভক্তি আছে আমাদের ভেতর। মাসলাকের কথা যার যার ভেতর রেখে ইসলামের নির্মল ধারা বিস্তৃত করার চিন্তা করুন। দেখবেন এতে একে অপরের কাছাকাছি আসতে পারবেন।

আপনার মাসলাক-মাশরাব ত্যাগ করতে বলছি না। কারণ নিজের মাসলাক যদি আপনার কাছে সঠিক হয়ে থাকে তাহলে তা ত্যাগ করা আপনার জন্য বৈধ হবে না। কেন ত্যাগ করবেন আপনার চিন্তা-চেতনা?

পূর্ণ শক্তি ব্যয় করে আপনি আপনার চেতনা সংরক্ষণ করুন। বলছি, আপনার দুইটি অস্তিত্ব থাকতে হবে। বরং তিনটি অস্তিত্ব থাকা উচিত। প্রথমত আপনি মানুষ।

দেশের ও জাতির সমস্যায় সব মানুষ এক হয়ে যেতে হবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ মিলে দেশের ও জাতির উন্নতি চিন্তা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যেভাবে আমরা সব ধর্মের মানুষ মিলেই দেশকে স্বাধীন করেছি।

তারপর আপনার দ্বিতীয় অস্তিত্ব সাধারণ মুসলমান। এখানে সব ফেরকার মানুষ মিলে ইসলামের সুন্দর দিকগুলো বিশ্ববাসীর সামনে মেলে ধরতে হবে। তখন আপনি উম্মাহর অংশ।

তৃতীয় অস্তিত্ব আপনার আভ্যন্তরীণ। যেখানে আপনি বিশেষ কোনো মাসলাক ও মাশরাবের ধারক। পূর্ণ শক্তি ব্যয় করে আপনি আপনার চেতনাগুলো রক্ষা করবেন।

আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলবেন সে চেতনার আলোয়। কিন্তু সাধারণ দাওয়াতের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না এগুলোকে। নিজেদের ভেতরের মতানৈক্যগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব যেন না পায়।

ইখতেলাফ যত গভীর হোক না কেন পরস্পর মতবিনিময়ের পথ যেন কোনো অবস্থাতে রুদ্ধ না হয়ে যায়। একে অপরকে ট্যাগ লাগানোর অভ্যাস পরিহার করুন। অপবাদ দেয়া থেকে বিরত থাকুন। জনসম্মুখে গালাগাল থেকে বাঁচুন। প্রয়োজনে গঠনমূলক সমালোচনা করুন।

দলিলভিত্তিক আলোচনা করুন। প্রেম ভালোবাসা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন।

মনে রাখবেন পৃথিবীর কেউ শতভাগ মন্দ হতে পারে না। আপনার প্রতিপক্ষ যত মন্দই হোক তার ভেতর অবশ্যই ভালো কিছু গুণ আছে। যখন আপনি সেই ভালো গুণ দেখতে পাবেন না তখন বুঝবেন আপনার সমস্যা আছে।

নিজের চিকিৎসা করুন আগে তারপর ধর্মের কাজ করার চিন্তা করবেন। প্রথমে আপনি নিজেকে রক্ষা করুন তারপর ধর্মের রক্ষক হওয়ার সাধনা করবেন।

ইবনে আরাবির গল্প দিয়ে শেষ করব। তিনি স্পেন থেকে মরক্কো হয়ে তিউনিসিয়া যেতেন। তিউনিসিয়ায় তার এক শেখ ছিল। পথে মরক্কোয় আরেক বুযুর্গ থাকতেন।

ইবনে আরাবি কখনও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন না। কারণ ইবনে আরাবির পছন্দের তিউনিসি শেখের সঙ্গে মরক্কোর বুযুর্গের দ্বন্দ্ব ছিল। মরক্কোর শেখ তিউনিসের শেখকে পছন্দ করতেন না।

ইবনে আরাবি বলেন, একবার আমি রাসূল সা.কে স্বপ্ন দেখলাম, রাসূল সা. আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি মরক্কোর শাইখের দরবারে কখনও যাও না কেন?
আমি বললাম, উনি আমার শেখকে মহব্বত করেন না।

রাসূল সা. বলেন, কিন্তু সে আমাকে তো মহব্বত করে?
-আপনাকে মহব্বত করবে না তা কি হয়?
– তো আমার সঙ্গে মহব্বত রাখে এই চিন্তা করে তুমি তাকে ভালোবাসতে পারলে না? তোমার শাইখকে
মহব্বত করে না বলেই তাকে অপছন্দ করা শুরু করলে?
ইবন আরাবি বলেন, ঘুম থেকে উঠেই মরক্কোর উদ্দেশ্যে সফর করলাম। মরক্কোর শাইখকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত শোনালাম। তিনি সব শুনে কেঁদে ফেললেন।

বললেন, তাই তো, নবী সা.-এর উম্মত হিসেবে আমাদের তো পরস্পর বিদ্বেষ থাকা উচিত নয়। চলো, তোমার শাইখের সঙ্গে দুশমনি এখনই শেষ করে ফেলি।

উদারতার সীমা অবশ্যই আছে, রক্ষণশীলতারও সীমা থাকা উচিত। কিন্তু যে কথাটি বলতে চাই, তা হচ্ছে, আমাদের সবাইকে অনেক বিষয়ে হয়ত নতুন করে ভেবে কাজ করতে হবে।

ঘৃণা আর বিদ্বেষে ভরে গেছে পৃথিবী। এ সময়ে নতুন করে বিবাদ না বাড়িয়ে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির প্রসারে সবাইকেই ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাই। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ