‘মাইরালা’ কিংবা ‘ক্রাশ’ যুগে বাংলা চর্চা

প্রকাশিত: ৯:১০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১

‘মাইরালা’ কিংবা ‘ক্রাশ’ যুগে বাংলা চর্চা

প্রণবকান্তি দেব
ভাষা ছাড়া মানুষের একান্ত আপন আর কী-ইবা আছে। মানুষের এক জীবনের যত আবেগ, যত আনন্দ-বেদনা, যত প্রেম, যত সুখ সবটাই প্রকাশের মাধ্যম তার ভাষাটা। মানুষের প্রথম ভাষা শিক্ষক তো তার মা। মাতৃভাষা ছাড়া বস্তুতপক্ষে জীবনের কোনো প্রকাশই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”- এই কথাটি পৃথিবীর আর কোনো ভাষাতে কী এমন মাধুরতা ছড়ায় বাংলা ছাড়া! মাতৃভাষার শক্তি বড় অফুরান, মায়ের ভাষার ঐশ্বর্য মধুময়; অবাক তাকিয়ে থাকতে হয়।

কিন্তু আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কী সেই দরদীয়া, সেই ভাবরসে ভরা প্রিয় মাতৃভাষাকে নিয়ে এভাবে ভাবছে, বুকের গভীরে লালন করছে প্রথম ‘মা’ ডাকা সেই ভাষার রূপ, ব্যঞ্জনা? মুক্তবাজার অর্থনীতি, আকাশ সংস্কৃতি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মাদনা মাতৃভাষার প্রতি তাদের প্রেম, শ্রদ্ধাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী একটি জাতির উত্তরাধিকারীরা সেই ভাষার বিকৃত ব্যবহারে মত্ত আজ।

একটু যদি তাদের ভাষাগুলোর দিকে তাকাই, চোখ রাখি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, এখনকার নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির দিকে তবে শিউরে উঠতে হয়। বেশ আনন্দ চিত্তে অহরহ লেখা হচ্ছে ক্রাশ, মাইরালা, ফডু, খিচ্চা, গেবনে, হপে, খিচাইছে, এগ্লা, টুরু এমন সব উদ্ভট শব্দ। অন্যদিকে মাইন্ড খাইস না, সেইরাম ব্যাপুক বিনুদুন, কাইলকা পরীক্ষা, কিছুই পড়িনাইক্যা, আমারে তুইল্যা নাও নয়তো উপ্রে থেইক্যা দড়ি ফেলাও, আবার ভাব মারাস, বেসম্ভব, নাইচ, কিন্যা, গেসে, ভাল্যাগসে প্রভৃতি শব্দমালা এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মুখে মুখে। আবার যত্রতত্র আজিব, কুল, মাম্মা, আবার জিগায়, দূরে গিয়া মর, জিনিস, বিন্দাস, রক্স, অসাম, বেইল নাই, অফ যা, ধরে দেবানি, এইডা কিছু হইল, মজা লস, কেউ আমারে মাইরালা, পুরাই অস্থির, ঠিকাছে ভায়া, লল, ওয়াও, উরাধুরা, পুরাই টাশকি, প্যারা, ফাঁপর লয় ইত্যাদি বিকৃত শব্দেরও লাগাম টানা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। এসব বাংলা শব্দ ও বাক্যগুলোকে কেউ মজার ছলে কেউবা নিজের অজান্তেই ব্যবহার করছেন। একজনের দেখানো পথে হাঁটছেন অন্যজন।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, ইদানিংকালের টিভি নাটক এবং রেডিওগুলোও ওইসব উঠতি ছেলে-মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য এসব শব্দ, বাক্য হরহামেশা ব্যবহার করে যাচ্ছে। ‘হ্যালো ভিউয়ার্স’, ‘হাই লিসেনার্স’ ইত্যাদি ভাষা জুড়ে দিয়ে, বাংলাতে ইংরেজি ভাষা লিখে, উচ্চারণ করে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর ফলে মৌলিক বাংলা ভাষা চর্চা শুধু ব্যাহতই হচ্ছে না, এক অন্ধকার ভবিষ্যতের পথে হাঁটছে মাতৃভাষার বিকাশও। এ সমস্ত বিকৃত রুচির ভাষার ব্যবহার তারুণ্যের মনোজগতেও প্রভাব ফেলছে দারুণভাবে, তৈরি করছে এক গভীর সংকট। নিজের ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি এক বিরূপ ধারণা তৈরি করছে এ অভ্যাসগুলো, তাদের চিন্তার জগতে সৃষ্টি হচ্ছে বিভ্রান্তি। এই তরুণরা যদি এভাবে নিজেদের মাতৃভাষার বিকৃত প্রয়োগে আনন্দ পায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের পচন শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে, এই সুযোগ নিচ্ছে এক ধরনের অসৎ মানসিকতার মিডিয়া এবং মুনাফাখোররা। নানাভাবে প্রলুব্ধ করছে উঠতি প্রজন্মকে। রাতারাতি যশ, খ্যাতি লাভের মোহে তরুণ প্রজন্ম গা ভাসিয়ে দিচ্ছে সেই জোয়ারে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে স্রোতে যারা গা ভাসায় তীরে এরা ভিড়তে পারে না!

এই যে এখন প্রযুক্তির স্বর্ণযুগে আমরা, উচিত কি ছিল না এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিজেদের মাতৃভাষাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া? কিন্তু তা না করে আমরা উল্টোটাই করে যাচ্ছি। পেছনে যাচ্ছি ভ্রান্ত পথে।

তবে এখন হাহুতাশের যুগ নয়। শুরুটা করতে হবে পরিবার থেকেই। মা, বাবা থেকে শুরু করে একটা ছেলে বা মেয়ের পথ চলতে যারা ভূমিকা রাখেন তাদের সবারই দায়িত্ব এটি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে, মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশ নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের আন্তরিকতার প্রয়োজন আছে, কার্যকর কর্মপন্থার বিষয় আছে। সর্বোপরি একটি জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন আছে আইনেরও। এভাবে চলতে পারে না। আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে নিয়ে যার যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন না। মাতৃভাষা গেয়ো, পুরোনো হয় না কখনো; যেমন হন না আমাদের মা। এ উপলব্ধিটুকু ভেতরে না থাকলে পরিবর্তন সম্ভব নয়। এখনো উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে গলা ফাটাতে হয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য কিছু আছে?

আসলে এখন প্রয়োজন সার্বজনীন একটি ভাষানীতি। শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দিতে হবে ভাষার জন্য নিজের ভালোবাসা। কেবল ফেব্রুয়ারিতেই ভাষাপ্রেম নয়, ফেব্রুয়ারিতেই শুধু বাংলা চর্চা নিয়ে মাথা ঘামানো নয়, এটি প্রতিদিনের কাজ। এটি আমাদের দায়িত্ব। দায়িত্বশীলদের খামখেয়ালিপনা অথবা নিজেদের আখের গোছানোর প্রবণতা প্রিয় বাংলা ভাষার ভবিষ্যতকে, মাতৃভাষাকে ঘিরে বোনা স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। আজকের তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথ বাতলে না দিলে, তাদের চিন্তার গভীরে বায়ান্নের অগ্নিশিখা জ্বেলে না দিলে অন্ধকার আমাদের গিলে খাবেই!

লেখক : শিক্ষক

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ