মাওলানা আকবর আলী (রহ:) র্দীঘ ৫৮ বছর দরগা মসজিদের ইমাম ছিলেন

প্রকাশিত: 9:40 AM, August 13, 2019

মাওলানা আকবর আলী (রহ:) র্দীঘ ৫৮ বছর দরগা মসজিদের ইমাম ছিলেন

মাওলানা জুনাইদ :; জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এ পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন, আরিফ বিল্লাহ ইমাম আকবর আলী (রহ.)।
মূলত এ বসুন্ধরা কাউকেই চিরদিন ধরে রাখবে না। যুগের চাকা ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী সকলকেই এক নির্দিষ্ট সময়ে পাড়ি জমাতে হবে পরপারে। কথায় আছে, ‘মাউতুল আলিমে মাওতুল আলম’। একজন যথার্থ আলিমের মৃত্যু যেন একটি জগতের মৃত্যুতুল্য। এমনই একজন যথার্থ আলিমের মৃত্যু হয় ২০০৫ সালের ৮ নভেম্বর। তিনি হচ্ছেন দরগাহ মসজিদের সুদীর্ঘ ৫৮ বছরের ইমাম আরিফ বিল্লাহ মাও. আকবর আলী রহ.।
মাওলানা আকবর আলী (র.) কেবল একজন গতানুগতিক আলিমই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সিলেটের আলিমদের অভিভাবক তুল্য এক শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। জনসাধারণের এক পরম আস্থাভাজন শ্রদ্ধেয় মুরব্বি, পথহারা মানুষের পথের দিশারী। হাজার হাজার আলিমের উস্তাদ। আত্মসংশোধনকারী অজস্র মুরিদানের আধ্যাত্মিক রাহবার। অসহায় মানুষের সহায়, পরোপকারী এক অন্তরঙ্গ বন্ধু। সৎ বিনয়ী সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারার অধিকারী এ মানুষটি যেমন ছিলেন একজন প্রকৃত খোদাভীরু আলিমে দ্বীন, বিরল প্রতিভাধারী একজন শিক্ষক, তীক্ষèধী শক্তিসম্পন্ন একজন সফল সংগঠক, তেমনি ছিলেন একজন সত্যিকারের আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ ও উঁচু মাপের একজন ভদ্রলোক।
তিনি ছিলেন নম্র লাজুক এবং সংযতবাক স্বভাবের। তাঁর চেহারায় ঔদ্ধত ছিল না, তার আচরণে হিংসাত্মকভাব কিংবা স্বার্থপরতার কোনো লেশ ছিল না। যারা তাঁকে দেখেছেন, তাঁর অবয়বে দৃঢ়চেতা এক নিষ্পাপ মুখচ্ছবি লক্ষ করেছেন। প্রতিহিংসার ক্রুরতা কিংবা লোভের কলুষতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বিশ্বের খ্যাতনামা আলিমেদ্বীন বরেণ্য ফক্বীহ, জাস্টিস আল্লামা তাক্বী উছমানী দা. বা. তাঁর সম্মন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘আকবর আলী আয়ছা এক বুযুর্গ হায়, যিসকো দুনিয়া ছুঁ কর ভি নেহি গোযরা।’ অর্থাৎ আকবর আলী এমন বুযুর্গ, যাকে দুনিয়ার মোহ আদৌ স্পর্শ করতে পারেনি। মূলত তিনি ছিলেন সালাফে সালেহিনের রেখে যাওয়া একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন হাদিস, তাফসির, ফেক্বাহসহ তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক ইলমের অধিকারী। তাঁর আমল ও আখলাক ছিল কিংবদন্তিতুল্য। আসলে তিনি ছিলেন সেই সাগরের মতো, যার উপরিভাগ নীরব ও সমান্তরাল, কিন্তু তাঁর ভেতরাংশ অসংখ্য মণিমুক্তায় ভরা উত্থাল উর্মীমালা, তাঁর ইলম ছিল অনেক প্রসারিত, বিস্তৃত ও গভীর। এই মহাপুরুষ শুধু বয়ান ও বক্তৃতায়, কিংবা দরসের মাহফিলে ইলমের ভান্ডার উন্মোচিত করেননি। বরং বাস্তব জীবনে আমল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আপাদমস্তক সুন্নতের অনুসারী হয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোরআন ও হাদিসের আমলিরূপ গ্রহণ করা কোনো মুমিনের জন্য মোটেই দুঃসাধ্য নয়।
মুহব্বতে ইলাহিতে অবগাহন করে তিনি আপন সত্ত্বাকে ঈমানের অত্যুজ্জ্বল রওশনিতে করে তুলেছিলেন ভরপুর। রাহে লিল্লাহ নিজেকে করেছিলেন নিবেদিত। তাওয়াক্কুলের দৌলতে সমৃদ্ধ ছিলেন বলেই একাধারে তিনটি মাদ্রাসা পরিচালনা করে গেছেন অতি সফলতার সঙ্গে। দেশ ও জাতির কল্যাণে সুনিপুণ কারিগর গড়ায় তাঁর অবদান গোটা জাতির কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে চিরকাল। তাঁর দানশীলতা ও দাতব্যকর্মে কতো দরসগাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কতো অবহেলিত প্রতিভা তাঁর প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ পেয়েছে, স্থবির প্রতিষ্ঠানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। কতো বোর্ড, কতো পরিষদ চাঙ্গা হয়ে ওঠেছে। তাঁর অবদান কোনোদিন ম্লান হবে না, যদিও তিনি আজ আমাদের থেকে চলে গেছেন দূরে অনেক দূরে।
হজরত মাওলানা আকবর আলী ১৯২০ সালে বিয়ানীবাজারের মাটিজুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোট বেলায় মাতৃহারা মাওলানা আকবর আলী মামা মন্তাজ আলী ও খুর্শিদ আলীর তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হন। নিজ গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। যখন তাঁর বয়স ৫/৬ বছর তখন মাথিউরা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। অতঃপর বাহাদুরপুর মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে মোট চার বছর শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি আসাম ভিত্তিক ছাফেলা চাহারমের (এসএসসি) বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৩১ সালে শিক্ষার উদ্দেশে গ্রাম ছেড়ে সিলেট শহরে চলে আসেন। ভর্তি হন সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসায়। একটানা সাত বছর লেখাপড়া করার পর তাঁর উস্তাদ ছহুল উছমানীর পরামর্শে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশে দারুল উলুম দেওবন্দে চলে যান। সেখানে ধারাবাহিক চার বছর অধ্যয়ন করেন। দেওবন্দ থেকে ফিরে তিনি প্রথমে আছিরখাল মাদরাসায় অতঃপর সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসায় কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৭ সালে তার উস্তাদ মাওলানা সহুল উসমানীর পরামর্শে ঐতিহ্যবাহী দরগা মসজিদের প্রধান ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
হজরত ইমাম সাহেব রহ. এক বা-আমল আলিম ছিলেন। জিকির তেলাওয়াত অধ্যবসায় ওয়াজ নসিহত ইত্যাদিতে দিবানিশি মশগুল থাকতেন। কথা বলতেন কম। ভাবুক মনা এ আলিমের মধ্যে গাম্ভীর্য ছিল। নীরবে কথা শোনতেন। চেহারার মধ্যে আল্লাহওয়ালা বুযুর্গদের ছাপ ছিল। একটি শিশুসূলভ সারল্য ফুটে ওঠতো তাঁর চেহারায়। তাঁর জীবনবোধ ও জীবনাচার ছিল অতিসাধারণ এবং সহজসরল। তাঁকে যতদিন দেখেছি পাজামা-পাঞ্জাবি ও মাথায় পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি, সবকিছুতে অকৃত্রিম সাদাসিধে জীবনবোধের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কোনও অহমিকা অহংকার ছিল না। কথাবার্তা লেবাস-পোশাক চাল চলনে তিনি ছিলেন অকৃত্রিম, অতিসাধারণ লৌকিকতামুক্ত এক মহৎপ্রাণ মানুষ।
তাঁর আমানতদারী ছিল দৃষ্টান্তস্বরূপ। তাঁর হিসাব-নিকাশ ছিল মতো স্পষ্ট। যেরকম সম্পদের প্রাচুর্যে বসবাস ছিল তাঁর। তিনি চাইলে কোটি-কোটি টাকার মালিক হতে পারতেন। গড়ে তুলতে পারতেন সম্পদের বিশাল পাহাড়। কিন্তু বিভব-বিত্ত সম্পদের প্রাচুর্য তাঁকে আদৌ মোহাবিষ্ট করতে পারেনি। অনেকে তাঁর কাছে মাদ্রাসা মসজিদের জন্য টাকা দিয়ে যেতেন, তিনি প্রাপ্ত টাকাগুলো যথাস্থানে পৌঁছানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠতেন। দরগাহ মসজিদ থেকে তিনি যখন নামাজ পড়িয়ে মাদ্রাসার অফিসে আসতেন, তখন রাস্তায় মুসল্লিরা সারিবদ্ধ হয়ে তাঁর সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষমান থাকতেন। পানি, তৈলপড়া, তাবিজ, ফুঁক ইত্যাদি ছাড়াও তাঁর নিকট বাইয়াত (মুরিদ) হওয়ার জন্য এবং দোয়া চাইতে প্রতিদিন প্রতিওয়াক্তে আসা লোকজনের ভিড় লেগেই থাকতো। সে-সময় অনেকেই গোপনে তাঁর হাতে বিরাট অংকের টাকা তুলে দিতেন, তিনি জিজ্ঞেস করতেন : এ টাকাগুলো মাদ্রাসার না আমার? আগন্তুক যখন বলতো : এটা মাদ্রাসার, তখন এ টাকাগুলো আর পকেটে ঢুকাতেন না, হাতেই রেখে দিতেন। মাদ্রাসার অফিসে প্রবেশ করেই তা হিসাবরক্ষকের কাছে সোপর্দ করতেন। যা আমার স্বচক্ষে দেখেছি। বিশ্ব কবি ইকবাল বলেছেন :
সবক নেরে তুই আমানতের দিয়ানতের/ এবং বীরত্বের,/ তোরে দিয়ে কাজ হবেরে আবার/ সারা দুনিয়ায় ইমামতের।
সত্যিই ইমাম সাহেব (র.) আমানতদারী দিয়ানতদারী, সত্যবাদিতা এবং বীরত্বের শিক্ষা নিয়েছিলেন বলেই তিনি শুধু দরগাহ মসজিদে ইমামতি করে যাননি। বরং বাংলার টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, সুন্দরবন থেকে জাফলং, গোটা বাংলাদেশের মানুষের হেদায়াতের ইমাম হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর এই মহৎ কার্যাদি আমাদের প্রেরণা যোগায় সঠিকপথে চলার, উদ্বুদ্ধ করে সিরাতে মোস্তাকিমের পথে অটল অবিচল থাকার।
আল্লাহ পাকের এ নেক বান্দা, অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র, হাজার হাজার আলেমের প্রিয় উস্তাদ, গত ৮ নভেম্বর ২০০৫ মঙ্গলবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকাস্থ পি.জি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না… রাজিউন)। তাঁর মৃত্যু সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পরিবার ও অসংখ্য ভক্ত অনুরক্তের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একমাত্র কন্যা মরিয়ম ও স্ত্রীকে রেখে যান। পরের দিন বুধবার বিকাল তিনটায় সিলেটের এমসি কলেজ মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে ট্রাকযোগে মরহুমের লাশ শাহজালাল দরগা গোরস্থানে নিয়ে আসা হয় এবং শাহজালালের মাঝারের পূর্ব প্রান্তে একটি দর্শনীয় স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সমাধিকে রহমতের অফুরান বারিধারায় সিক্ত করুন এবং জান্নাতের সু-উচ্চ স্থানে তাঁকে অধিষ্ঠিত করুন। আমীন।
লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষক, জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ হজরত শাহজালাল (র.), সিলেট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ