মুক্তাদিরের চমকে দিশেহারা আরিফ

প্রকাশিত: 9:20 PM, November 22, 2019

মুক্তাদিরের চমকে দিশেহারা আরিফ

নুরুল ইসলাম :; সিলেটে ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটি নিয়ে চমক দেখিয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সিলেটের সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মালিকের পুত্র ও বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা খন্দকার মুক্তাদির এখন বিএনপির রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তার একের পর এক চমকে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তবে তৃণমূল বিএনপিতে আরিফের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তার কারণ হিসেবে মনে করছেন তিনি দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করা। গত ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস ও ২০ নভেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্মদিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দাওয়াত পাওয়ার পরও অংশগ্রহণ করেননি মেয়র আরিফ। শুধু তাই নয় বিগত দিন দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবীতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সিলেটে থেকেও উপস্থিত ছিলেন না মেয়র আরিফ। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের এই শীর্ষে থাকার মূলে হচ্ছে ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ একযুগ পর জট খুলে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি। তৎকালিন কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব সিলেট মহানগর কমিটির সভাপতি পদে নূরুল আলম সিদ্দিকী খালেদ ও সাধারণ সম্পাদক পদে আবু সালেহ মোহাম্মদ লোকমান এবং জেলায় সভাপতি সাঈদ আহমেদ ও রাহাত চৌধুরী মুন্নাকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি অনুমোদন করেন। পরে ২০১৮ সালের ১৫ জুন পুনরায় সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে আসেন খন্দকার মুক্তাদির। যে কমিটিগুলোতে একাধিপত্ব ছিল এই নেতার। পূর্বে এসকল কমিটি নিয়ে বেশি গুরুত্ব দেননি সিলেট বিএনপির শীর্ষ কোনো নেতা। তিনি (মুক্তাদির) চেয়াপার্সন উপদেষ্ঠার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে সিলেট বিএনপিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং রাজনীতিতে মেধাবীদের দিয়ে অনুমোদন করাচ্ছেন কমিটি। বিশেষ করে দীর্ঘ ১৯ বছর পর গত ১ নভেম্বর সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যেমনিভাবে ছাত্রদলের কমিটি হওয়ার পর কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী একটি বলয় নিয়ে বাধা হয়ে দাড়ান, তেমনিভাবে যুবদলের কমিটি হওয়ার পর বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করেন তিনি।
এ কমিটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অসন্তোষ দেখা দেয় দলের কিছু নেতাকর্মীদের মধ্যে। অভিযোগ ছিলো যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের নাম না আসার, যুবদলের কমিটিতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মতামত না নিয়ে বিশেষ একজন নেতার কথায় কমিটি ‘একতরফা’ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে দলের পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক, সহ স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট শামসুজ্জামান জামান, কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী। যা অনেকেই নাটকীয়তা বলে মনে করেন। যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়। পদত্যাগপত্র নিয়ে গত শনিবার রাতে সড়কপথে ঢাকায় যান রাজ্জাক, আরিফ ও শাহরিয়ার। তবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের বাসভবনে তারা পদত্যাগপত্র জমা দিতে গিয়ে দেখা পাননি তার। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরী খন্দকার মুক্তাদিরের মনোনয়নের বিরোধীতা করেন সেখানেও চমক দেখিয়ে মনোনয়ন নিয়ে আসেন মুক্তাদির।
এই বিষয় নিয়ে গত ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভায় সিলেট মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি ও মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জিয়াউল গণি আরেফিন জিল্লুর বলেন, বিএনপির চার কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে বিষেদাগার ছুঁড়ে আওয়ামী লীগে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তাদের চারজন দল থেকে কেন পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন তার বিষদ বর্ণনা দিয়ে জিয়াউল গণি আরেফিন জিল্লুর সিলেট বিএনপিতে বেশ আলোচনার জন্ম দেন। যা মুহুর্তের মধ্যে সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। জিল্লুর তার বক্তব্যের প্রথমেই কেন তারা পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে বলেন, তাদের অনেক বাণিজ্য আছে। এরপর তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জামানকে নিয়ে সমালোচনা শুরু করেন। তিনি বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের সময় জামান তার নেতাকর্মীকে মিটিং করে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়। মহানগর বিএনপির সাবেক আহবায়ক ও দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে আমেরিকায় চলে যান। তিনি সিলেট ২ আসনের সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর ভায়রা উল্লেখ করে জিল্লুর বলেন, আমরা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন মামলা নিয়ে বাসা বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি। কিন্তু ডা. শাহরিয়ার তাঁর ভায়রা আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ উস সামাদের কাছ থেকে আগেভাগেই খবর পেয়ে চামড়া বাঁচাতে আমেরিকায় চলে গেলেন।
এরপর বিরূপ মন্তব্য করেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে নিয়ে। এসময় জিল্লুরের বক্তব্যের সাথে একাত্মতা করে স্লোগান তুলেন নেতাকর্মীরা। জিল্লুর বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জেল জুলুম তোয়াক্কা না করে নেতাকর্মীরা আরিফের নির্বাচনী কাজে অংশ নেয়। আমার নিজের বিরুদ্ধেও একটি মামলা হয় উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে আরিফের কাছ থেকে কিছু আশা করিনি। কিন্তু বিএনপি আরিফের কাছ থেকে কিছু পায়নি। যুবদলের কমিটি আসার পর পদত্যাগ করতে বেশ উৎসাহী ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আসল মুক্তিযোদ্ধা কিনা প্রশ্ন ছুঁড়েন বিএনপির সহসভাপতি জিল্লুর। তিনি আরো বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনে সিলেটের কোথাও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা রাজ্জাক ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে বক্তব্য রাখেননি।
তাদেরকে আওয়ামী লীগে চলে যাওয়ার আহাবান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, দলের ছত্রছায়ায় থেকে এই চারজন আওয়ামী লীগের পারপাস সার্ভ করেন। তাই দলের ভেতরে না থেকে তারা যেন আওয়ামী লীগে চলে যায়। ষড়যন্ত্রকারীদের লাথি দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দলের জন্য ত্যাগী নেতাকর্মীদের কাজ করার আহাবন জানান তাঁর বক্তব্যে। সিলেট যুবদলের নতুন কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯ বছর পর কমিটি হয়েছে। যারা কমিটিতে এসেছেন তাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের ধন্যবাদ জানান জিল্লুর। তিনি বলেন, আন্দোলন করবে ছাত্রদল, যুবদল, সেচ্ছাসেবকদল। কমিটি না হলে আন্দোলন কারা করবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এই কমিটির মাধ্যমে দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দেয়া মামলা প্রত্যাহার এর জন্য সংগ্রাম করবে।
মহানগর যুবদলের আহবায়ক নজিবুর রহমান নজিব বলেন, যুবদলের কমিটির মাধ্যমে শুধু জট খুলা হয়েছে। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হবে। আর বিভিন্ন কর্মসূচিতে আরিফের অংশগ্রহণের ব্যপারে তিনি জানান, সকল কর্মসূচিতে উনাকে (আরিফ) দাওয়াত দেওয়া হয়। তিনি আসেন না কেন এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
এই বিষয়ে জেলা যুবদলের আহবায়ক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু বলেন, খন্দকার মুক্তাদির রাজনৈতিক পরিবারর মানুষ। দলে অন্ত:ভূক্তির পর তিনি দলের বিভিন্ন কমিটিতে জটলা রয়েছে দেখে তা খুলতে সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বিষয়ে আলাপ করতে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করলে তিনি কল কেটে দেন।
এদিকে, যুবদল সিলেট জেলা শাখার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছাদিকুর রহমান ছাদিক এক যুক্ত বিবৃতিতে গত বুধবার কথিত জেলা যুবদলের বর্ধিত সভায় সকল থানা ও পৌর শাখা কমিটি বিলুপ্তির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার এক বার্তায়- নেতৃবৃন্দ বলেছেন যে আহবায়ক কমিটি সিলেট যুবদলের সর্বস্তরের নেতা/কর্মীদের মতামত ছাড়া জেলা বিএনপির কমিটির লোক দিয়ে গঠন করা হয়েছে সেই কমিটি অবৈধ ও অগঠনতান্ত্রিক, ইতিমধ্যে সকলের কাছে এই কমিটি অবৈধ দখলদার ও পকেট কমিটি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। নৈতিকভাবে সেই অবৈধ দখলদার ও পকেট কমিটি কতৃক কোন শাখা কমিটি বিলুপ্ত বা গঠন করার অধিকার রাখে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ