মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও অরক্ষিত শহীদ তালেব উদ্দিনের সমাধিস্থল

প্রকাশিত: ৯:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২১

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও অরক্ষিত শহীদ তালেব উদ্দিনের সমাধিস্থল

অনলাইন ডেস্ক
মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও অযতেœ অবহেলায় সংস্কারের অভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বাংলার সুর্য্য সন্তান ১৯৭১ সালের বীর সেনানী বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ তালেব উদ্দিনের সমাধিস্থল। ১৯৭১ সালে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ তালেব উদ্দিনের লাশ দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের জয়কলস গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিল। সমাহিত করার পর থেকে অদ্যবদি পর্যন্ত কবরস্থান সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পশ্চিম পাশে বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর থাকলেও গেইটে কোন গ্রীল লাগানো হয়নি এবং দক্ষিণ পাশের সীমানায় দেওয়াল না থাকায় দিনে গরু ছাগল ও রাতে শেয়াল কুকুর কবরে প্রবেশ করে প্রতিনিয়ত। এতে করে কবরস্থানের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে এবং সাথে সাথে বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে আতœদানকারী এক অকুতোভয় বীর সৈনিকের আতœকাহিনী। বিগত ২ বছর আগে ব্যক্তি উদ্যোগে শহীদ তালেব উদ্দিনের সমাধিতে নামফলক লাগানো হলেও সংস্কার না হওয়ায় নামফলক থেকে মুছে গেছে শহীদের নাম ও পরিচয়। এই সমাধিস্থল সংরক্ষণের কি কেউ নেই? যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবী করেন,তাদের দায়িত্ব কতটুকু। আমাদের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা না হলে একদিন হয়ত অনেক কষ্ট করেও তালেবের মত শহীদদের পরিচয় পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। যাদের রক্তে প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশে নি:শ^াস ফেলছি তাদের স্মৃতি রক্ষা না করলে এর দায় থেকে কি আমরা মুক্তি পাব।
শহীদ তালেবের জন্ম দিরাইয়ের হাতিয়া গ্রামে। পিতা আব্দুল ওয়াহিদ ও মাতা আয়েশা ওয়াহিদের ৭ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তানের মধ্যে তালেব ছিলেন প্রথম সন্তান। যাকে নিয়ে পরিবারের আশার কমতি ছিলনা। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শুরু। এরপর রাজানগন হাই স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে এস.এস.সি পাশ করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হন। কলেজে ভর্তির পর ছাত্রলীগে সক্রিয় হন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৬ দফায় তখন উত্তাল প্রিয় জন্মভূমি। এরই মধ্যে সুনামগঞ্জে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠিাতা সভাপতি হিসেবে সুজাত আহমদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তালেব উদ্দিনকে দ্বায়িত্ব দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবুন্ধ। ১৯৬৯ সালে এ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকালীন সময়ে তিনি কলেজের বি.এ ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে প্রথমে সুনামগঞ্জ শহরে যে কয়জন যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের প্রস্তুতি নেন তাদের মধ্যে সুজাত আহমদ চৌধুরী, শহীদ তালেব উদ্দিন,গোলাম রব্বানী,শহীদ আলী আজগর,শহীদ জগতজ্যোদি দাস, শহীদ গিয়াস উদ্দিন অন্যতম, তারা কেবল সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহনই করেননি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। লাল সবুজের পতাকার জন্য, হানাদারদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন বীরমুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধকালীন সময়ে মাত্র একবার বাড়ীতে এসেছিলেন শহীদ তালেব। মমতাময়ী মা আয়েশা ওয়াহিদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিজয়ের আর কত দেরি বাবা। আর বেশি বাকী নেই মা। দেশ স্বাধীন হচ্ছে। আমরা সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলব মা। মায়ের দোয়া নিয়ে তালেব সেদিন হাতিয়া থেকে চলে এসেছিলেন কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ধরা পড়লেন আমাদের পতাকার দুশমন,এদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া কুলাঙ্গার বিশ^াস ঘাতকদের হাতে। ২৭ নভেম্বর যুদ্ধকালীন উত্তর সুনামগঞ্জ থেকে তিনি পাক বাহিনীর দোসরদের হাতে ধরা পড়লেন। হায়েনারা তাকে নিয়ে যায় সুনামগঞ্জ শহরের সেই টর্চার সেলে। যেখানে ধরে এনে নির্যাতন করা হতো দেশ প্রেমিক যুদ্ধাদের। ধর্ষণ করা হতো আমাদের মা বোনদের। সুনামগঞ্জ পিটিআই টর্চার সেলে তার উপর চালানো হয় অবর্ণনীয় নির্যাতন। একদির তার দু-হাত পেছেনে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় পুরো শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়। বলা হয় পাকিস্থানের পক্ষে বক্তব্য দিলে ছেড়ে দেওয়া হবে অন্যথায় রাইফেলের বাট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু দেশ প্রেমিক তালেব সেদিন বলেছিলেন, আমাকে মেরে ফেলা হবে। আমি শহীদ হব। দেশ স্বাধীন হবে। মাকে দেয়া কথা রেখে রেখেই মরতে চাই। হাত বাঁধা থাকা তালেব তবুও সেই শকুনদের কাছে মাথা নত করেননি। ১৩ ডিসেম্ভর সুনামগঞ্জ থেকে পাক বাহিনী লেজ গুটিয়ে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে তালেব সহ কয়েকজন বীর সৈনিককে বর্তমান আহসানমারা সেতুর নিচে এনে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। নিহত হলেন এক অকুতোভয় বীর সৈনিক। এরপর ১৬ ডিসেম্ভর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। বিশে^র মানচিত্রে লাল সবুজের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্থান করে নিল। দেশে ফিরলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা তালেবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান দেওয়ার দাবী ও জানালেন। তালেবের দিরাই সদরের নাম করা তালেব নগর। সুনামগঞ্জ কলেজের মুসলিম হোষ্টেলের নাম করা হলো শহীদ তালেব ছাত্রাবাস। রাষ্ট্রের পক্ষে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলহাজ আব্দুস সামাদ আজাদ হেলিকপ্টারে করে হাতিয়া গেলেন। তালেবের গর্বিত পিতা-মাতাকে বঙ্গবন্ধুৃর পক্ষ থেকে সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানালেন। বললেন তালেবের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। সুজাত আহমদ চৌধুরী সহ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে দিরাইয়ের নাম যখন তালেবনগর করতে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছিল তখনই আরেকদল বিশ্বাস ঘাতক মীর্জাফরদের হাতে স্ব-পরিবারে নিহত হন সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর পর্যাক্রমে পাল্টে যায় সকল দৃশ্যপট। তালেব নগর সম্পর্কে গেজেট প্রকাশনার বিষয়টি অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়। সেই অকুতোভয় বীর সৈনিক শহীদ তালেব উদ্দিনের স্মৃতি সৌধ কি সংস্কার করা হবে? নাকি কালের আবর্তনে বিলিন হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধে আতœদানকারী সেই সুর্য্য সন্তান তালেব উদ্দিনের ইতিহাস।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
17181920212223
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ