মোংলা বন্দরে পণ্য নিলাম: ৩৬ লাখ টাকার পে-অর্ডার জালিয়াতি

প্রকাশিত: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২১

মোংলা বন্দরে পণ্য নিলাম: ৩৬ লাখ টাকার পে-অর্ডার জালিয়াতি

কালো তালিকায় তিন প্রতিষ্ঠান * দুই মাসেও থানায় মামলা রেকর্ড হয়নি
আমির হোসেন আমু, মোংলা (বাগেরহাট)

মোংলা কাস্টম হাউজে ৫৬ কোটি টাকার গাড়ি ও বাণিজ্যিক পণ্য নিলামে পে-অর্ডার জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকার নবীনগর এলাকার সিদ্দিক ট্রেডিং, ধানমন্ডি এলাকার মোনা লিসা আক্তার সুমা ও বংশাল এলাকার বশির আহম্মেদ নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ৭টি পে-অর্ডারে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার জাল পে-অর্ডার জমা দেওয়া হয়।

বিষয়টি ধরা পড়ায় প্রতিষ্ঠান তিনটির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এরপর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযোগ মামলায় রূপ নেয়নি।

জানা যায়, নিলামে তিনটি প্রতিষ্ঠানই সর্বোচ্চ দরদাতা হিসাবে বিবেচিত হয়। নিলাম পাওয়া তিন প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগে দরপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া পে-অর্ডারগুলো যাচাই-বাছাই করতে গেলে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার ৭টি পে-অর্ডারকে অফিশিয়ালি জাল বলে জানিয়ে দেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার পর ২২ আগস্ট মোংলা কাস্টম হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রুম্মআন আলী বাদী হয়ে জাহিদ সিদ্দিক রেজা, মোনা লিসা আক্তার সুমা ও বশির আহম্মেদের বিরুদ্ধে মোংলা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।

এ বিষয়ে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অভিযোগটি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় সংশোধন করে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এজাহারের সংশোধিত কপি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার এজাহারে বলা হয়, চলতি বছরের ১৩ জুন ৪০টি লটের অনুকূলে নিলাম দরপত্র আহ্বান করে মোংলা কাস্টম হাউজ।

দাখিলের শেষ তারিখ ছিল ২৯ জুন। এ নিলামে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দরপত্র দাখিলও করা হয়। নিলাম প্রদান করা হয় ২৯ জুলাই। ৫টি লটের অনুকূলে (আমদানি করা গাড়ি ও বাণিজ্যিক পণ্য) ৫৫ কোটি ৯৫ লাখ ৮ হাজার ৬৪৩ টাকার বিপরীতে ৭টি পে-অর্ডারে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার জাল পে-অর্ডারের দরদাতা ৩টি প্রতিষ্ঠানই সর্ব্বোচ্চ দরদাতা বিবেচিত হয়। পণ্য খালাসের কার্যক্রম শুরু হলে একপর্যায়ে জাল পে-অর্ডারগুলো শনাক্ত হয়। আইএফআইসি ব্যাংকের ৫টি পে-অর্ডারে শাখার নাম নেই।

অভিযোগ রয়েছে- কাস্টম হাউজের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে একটি প্রতারকচক্র দীর্ঘদিন নিলামের সুবিধা গ্রহণ করে আসছিল। এ কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হচ্ছিলেন। তবে নিলাম ক্রয়ে প্রতারকচক্রের এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করেননি ব্যবসায়ীরা। এদিকে তিন প্রতিষ্ঠানের পে-অর্ডার জালিয়াতি ধরা পড়ায় কাস্টম হাউজ কিছুটা নড়েচড়ে বসলেও জালিয়াতচক্রের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।

রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) কার্যনির্বহী সদস্য আহসানুর রহমান আরজু বলেন, করোনার কারণে দেড় বছর শোরুম বন্ধ। গাড়ি আমদানিকারকদের অবস্থা শোচনীয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি ইশতাহার ছিল মোংলা বন্দর সচল করবেন। করেছেনও।

আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়ে মোংলা বন্দরে গাড়ি আমদানি শুরু করেছি। কিন্তু কোনোরকম পরামর্শ ছাড়া শত শত গাড়ি নিলামে দিয়ে আমাদের পথে বসিয়েছে। শুধু তা-ই নয়-আগে মাসে একবার নিলাম হতো, এখন মাসে দুইবার নিলাম হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই করোনার সময় আমরা ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের সহানুভূতি পাচ্ছি না। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে বন্দরকে ঘিরে ঘাপটি মেরে থাকা চক্রটি পরিকল্পিতভাবে মোংলা বন্দরকে ধ্বংস করতে চাইছে। তারাই এই নিলামের সঙ্গে জড়িত। তারা জাল পে-অর্ডার দিয়ে পণ্য নিলামে কিনে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। আর আমরা যারা গাড়ি আমদানিকারক, তাদের অনেকের শোরুম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জাল পে-অর্ডার ধরা পড়ার প্রায় দুই মাস পার হলেও মামলা রেকর্ড হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিদ্দিক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী জাহিদ সিদ্দিক রেজা মোবাইল ফোনে বলেন, নিলামের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। যে যার মতো ডকুমেন্টস জমা দেবে। এটা কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করবে। কাস্টমস সঠিক কাজটি করেছে। তবে এটা কোনো ফোজদারি অপরাধ না। আমাকে কর্তৃপক্ষ অফিশিয়ালি নোটিশ দিলে তার জবাব দেব। আমার প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটা তাদের বিধানে থাকলে কোনো আপত্তি নেই।

এ বিষয়ে কাস্টমস কমিশনার হোসেন আহমদ বলেন, আমরা ১০/১৫ বছর আগের গাড়ি নিলাম করেছি। নিলাম প্রক্রিয়া শুরু করায় ব্যবসায়ীরা তাদের গাড়ি যথাসময়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কারণে আমরা অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছি। জাল পে-অর্ডারের বিষয়ে আমরা পুলিশে এজাহার দায়ের করেছি। জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে দেখবে জাল পে-অর্ডারের সঙ্গে আর কোনো চক্র আছে কি না।
সুত্র : যুগান্তর

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ