যুবসমাজের অঙ্গীকার

প্রকাশিত: ১:১৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

যুবসমাজের অঙ্গীকার

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত :; ছাত্রসমাজের নিয়মানুবর্তিতার কোনো বিকল্প নেই। নিজ ঘর থেকেই এর শুরু। ছোটবেলায় শুনেছি, যত সকালে ঘুম থেকে ওঠা যায়, স্বাস্থ্যের জন্যই শুধু মঙ্গলকর নয় বরং দিনটা অনেকটা বড় পাওয়া যায়। আর সেজন্যই বোধ হয় প্রতিটি ধর্মে প্রাতঃকালীন প্রার্থনার নিয়ম ছিল। আমাদের জন্য ছোটবেলায় প্রার্থনা বাধ্যতামূলক ছিল না, তবে লেখাপড়ার জন্য ভোর ৫টায় উঠতে হতো। সুবিধা ছিল নিঃশব্দ পরিবেশে কোনোরকমের বিঘ্ন ছাড়া গভীর মনোযোগের সঙ্গে লেখাপড়া করা যেত। অতি অল্প সময়ে লেখাপড়া কণ্ঠস্থ করা যেত। সময় এতই মূল্যবান সে কারও জন্য অপেক্ষা করে না। অলসভাবে সময় কাটানো অর্থ হলো সময়ের অপচয় করা। বিশ্রামের জন্য যে সময় তা উপভোগের জন্য। প্যারাডাউস্ট লস্ট লেখার জন্য মহাকবি মিলটন প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া ছাত্ররা পারে জীবনের মূলমন্ত্র নিয়মানুবর্তিতাকে সুদৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে। একবার যদি নিজেদের সুদৃঢ়ভাবে গড়া যায়, ভবিষ্যতে যত লোভ-লালসা, প্রলোভন-প্রতারণা, এমনকি হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় না কেন, তাদের সততার পথ থেকে বিন্দুমাত্র সরানো যাবে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শিক্ষকের পক্ষ থেকে একটি মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করতে হবে- যদি তুমি নিজে কোনো কিছু উপার্জন না কর, নিজের আয় থেকে কিনতে না পার।

জীবনে আশা বা স্বপ্নের কোনো শেষ নেই। যুবসমাজকে এও বোঝাতে হবে জীবনে পছন্দ ও চাহিদার শেষ নেই। চাহিদা হতে হবে সীমিত এবং পূর্ণ করার মতো অক্লান্ত পরিশ্রমে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রথম পছন্দ রাজনীতি। রাজনীতির জন্য নিজেকে পরিচিতি দেওয়ার কিছু থাকলে শিক্ষক, পিতা-মাতা উৎসাহিত করবেন। যদি আইডেন্টিটি ক্রাইসিস অর্থাৎ পরিচিত হওয়ার মতো কিছু না থাকে তাহলে সেখান থেকে সরে আসা ভালো। যদি ব্যক্তি, জাতি এবং নেতৃত্বকে নিয়ে গর্ব করার থাকে তবে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে জনগণের সেবক হওয়ার জন্য। তার জ্বলন্ত উদাহরণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমনকি এসব যুবকের খাবার প্রতি আগ্রহ থাকতে পারে, তাদের বোঝাতে হবে বেশি খেলে ওজন বাড়বে, ওজন বাড়ার সঙ্গে অধিক পরিশ্রমী হওয়া যায় না, ঘুমের মাত্রা বেড়ে যায়। বেশি ঘুমালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। এ বয়সের নেশার প্রতি আসক্তি অর্থাৎ সঙ্গদোষে জীবন যায় এবং সৎসঙ্গে জীবন মূল্যবান হয়। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, সত্তরের দশকে তখন ধূমপান একমাত্র বদভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন নিকোটিন (সিগারেট), কেনাবিজ (গাঁজা), ইয়াবা, মদ ইত্যাদি হরেকরকম দ্রব্য নেশার জন্য সহজলভ্য। অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো এসব সেবনের পরিণাম তাদের সামনে তুলে ধরা। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জীবনী পড়লে জানা যায়, কত বড় আসক্তি থেকে ফিরে এসে তিনি এত উচ্চতায় উঠেছিলেন। সংক্ষেপে দুটো লাইন বলছি। তাদের বোঝাতে হবে- তোমরা যখন কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে, অনুরূপ একটা খারাপ ব্যবহার তোমাদের জন্যও অপেক্ষা করছে। আমরা যদি অন্যের প্রতি যত্নশীল না হই, তখন অন্যরাও আমাদের প্রতি যত্নশীল হবে না। যুবসমাজকে বোঝাতে হবে তাদের সামনে অফুরন্ত পছন্দের পথ খোলা আছে। ভালো হওয়ার পথ যেমন আছে, তেমন আছে খারাপ হওয়ার পথ।

প্রত্যেকের পছন্দের অধিকার আছে। প্রত্যেক পছন্দের পরিণতি আছে। আমরা যে রকম মুক্তভাবে পছন্দ করতে পারি, কিন্তু পরে পছন্দ আমাদের শৃঙ্খলে নিয়ন্ত্রণ করে। জীবনকে মৃত্তিকাশিল্পীর কাজের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যে শিল্পীর মাটির কারুকার্য করতে গিয়ে তার নিজের পছন্দ বা ক্রেতার পছন্দের মতো তৈরি করে দিতে পারে। সে রকম জীবনটাকে আমরা আমাদের মতো করে অথবা মা-বাবার চাহিদামতো সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রয়োজনমতো গড়ে তুলতে পারি। ডরষষরধস ঔবহহরহম ইৎুধহ-এর এক মূল্যবান উক্তি- জীবনের লক্ষ্য কোনো দৈব দুর্বিপাকে ঘটে না, এটা লক্ষ্য করে, স্বপ্ন বাস্তবায়নের মতো নামতে হয়। এ লক্ষ্য অপেক্ষা করলেই পূরণ হওয়ার নয়, অর্জন করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের যে কোনো প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের প্রথম ক্লাসে, প্রথম সপ্তাহে প্রতিটি ক্লাসেই, প্রত্যেক শিক্ষককে একই মন্ত্র দিতে হবে- জীবনটা কোনো বন্ধু-আসর বা আনন্দ আশ্রম নয়; এখানে ব্যথা-বেদনা আছে, হতাশা আছে। অকল্পনীয়, অভাবনীয় বিষয় ঘটে যেতে পারে। অনেক সময় সবকিছু উলট-পালট হয়ে যেতে পারে। ভালো ছাত্রদের কপালে খারাপ কিছু ঘটে, অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘটে যায়।

সবাই বন্ধু হবে সীমার মধ্যে, অসীমে হারিয়ে বন্ধুত্বের প্রয়োজন নেই। সব ধর্মেই বলা আছে- কখনো সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়, স্রষ্টা নিজেও তা পছন্দ করেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ আসেন জ্ঞান আহরণের জন্য, কেউবা জ্ঞানের স্বাদ বা গন্ধ নেওয়ার জন্য, কেউ কুলকুচা করে ফেলে দেওয়ার জন্য। যেমনটা একটি লেকে অনেক নৌকা পাল তুলে বিনোদনকারীদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যদিও বাতাস দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে যাচ্ছে, কিন্তু নৌকাগুলো সবদিকেই ছুটছে, এটা নির্ভর করে নৌকার পাল কীভাবে সেট করা হয় এবং নৌকার চালক কীভাবে চালাতে ইচ্ছা করেন। স্বাস্থ্য, সুখ ও কৃতকার্যতা নির্ভর করে পরিশ্রম বা যুদ্ধ করার প্রবল ইচ্ছার ওপর। ওদেরকে মেধাবী ছেলে যারা অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে হারিয়ে গেছে তাদের উদাহরণ দিতে হবে। কেন তারা হারিয়ে গেছে সঠিক তথ্য জানা থাকলে সহৃদয়তা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সেসব উদাহরণ তোলা উচিত নয়, কারও সম্মানবোধে আঘাত করার অধিকার আমাদের নেই। জীবনে কী ঘটল তা মুখ্য বিষয় নয়, কী ঘটাতে পেরেছি তা-ই আলোচ্য। এই লেভেলের ছাত্ররা সব জানে কিন্তু পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে সচেতন করার ওপর নির্ভর করবে, মনের ওপর প্রভাব, আর মন যখন তার অবচেতন এবং সচেতন অংশের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে তখনই লক্ষ্য স্থির করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোজনকালীন প্রথম সপ্তাহের ওরিয়েন্টশনে প্রতিষ্ঠানের রোল মডেল শিক্ষদের সম্পর্কে ধারণা, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা, স্বনামধন্য উপাচার্যদের বর্ণনা, সাধারণ জ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিক এসবের তামিল দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। নিজেদের চরিত্র গঠনে দৃঢ়সংকল্প হয় এবং সে সাহসের সঙ্গে জীবনকে এগিয়ে নেয়। সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ