যেভাবে ক্ষমা পান হারিছ-আনিস

প্রকাশিত: ৫:৫১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১

যেভাবে ক্ষমা পান হারিছ-আনিস

 

অনলাইন ডেস্ক :: একটি হত্যা মামলায় একই পরিবারের তিন ভাইয়ের সাজা মওকুফ করেছে সরকার। ২০০৪ সালের ২৫মে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এ ওই মামলায় তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও মাসুদ নামের আরেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। জোসেফের দুই সহোদর হারিছ আহমেদ, আনিস আহমেদসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমায় ২০১৮ সালের ২৭মে সাজা মওকুফের পর ছাড়া পান জোসেফ। এর নয় মাস পর হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। তবে এতোদিন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। সম্প্রতি কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন আলজাজিরায় প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে এই তিন ভাইয়ের নাম আসে। তারা সেনাবাহিনী প্রধান আজিজ আহমেদের সহোদর।

তবে ওই প্রতিবেদনে হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আল জাজিরার ওই তথ্য যে সঠিক ছিল না তা প্রকাশ পায় মঙ্গলবার প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা ওই দুই আসামির সাজা মওকুফের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সর্বশেষ সোমবার রাতে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সেনাবাহিনী প্রধান আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদ যে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তা উল্লেখ করা হয়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮শে মার্চ তাদের সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল–জাজিরায় প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ তথ্যচিত্রে এই দুই ভাইকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে তাদের টক শো কনফ্লিক্ট জোনে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে এই দুই পলাতক সহোদরের বাংলাদেশে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণসহ নানা বিষয় উঠে আসে।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ হত্যা মামলায় হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা হয়। মৃত্যুদণ্ড হয় জোসেফের। রাজনৈতিক কর্মী মোরশেদ হত্যা মামলায়ও হারিছ আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা হয়। মৃত্যুদণ্ড হয় জোসেফের। আনিস আহমেদ এই মামলায় আসামি ছিলেন না।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ২০১৮ সালের ২৫শে জুন সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। এর এক মাস আগে তার ভাই জোসেফ ছাড়া পান। পরে হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন হয়।

হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা মাফ করা হয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার ক্ষমতাবলে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে সরকার যেকোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত ব্যক্তি যে শর্ত মেনে নেয়, সেই শর্তে তার দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করতে পারে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুয়ায়ী যেদিন মন্ত্রণালয় থেকে সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারি হয়, সেদিনই ঢাকার পৃথক দুটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে অনুলিপি পাঠানো হয়। প্রজ্ঞাপন পাওয়ার পর হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের নামে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বিনা তামিলে ফেরত পাঠানোর জন্য মোহাম্মদপুর ও কোতোয়ালি থানাকে আদেশ দেন আদালত।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক, পরিকল্পিত, সাজানো ও বানোয়াট মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা ও অর্থদণ্ড ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার ক্ষমতাবলে মওকুফ করা হয়েছে।

এই প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, আইনসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগের সচিবকে পাঠানো হয়। আগেই সাজা বাতিল হলেও সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে পলাতক আসামির তালিকায় হারিছ আহমেদের নাম ছিল।

মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে ১৯৯৬ সালের ৭ই মে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হারিছ আহমেদ, আনিছ আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২৫শে মে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে জোসেফ ও মাসুদ নামের এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। পলাতক আসামি হারিছ আহমেদ, আনিস আহমেদসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা জোসেফ হাইকোর্টে আপিল করেন। হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদ পলাতক থাকায় তারা আপিলের সুযোগ পাননি। ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায়ে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও আরেক আসামি কাবিলের সাজা বহাল রাখা হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাসুদ খালাস পান।

হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জোসেফ ও কাবিল। ২০১৫ সালের ৯ই ডিসেম্বর আপিল বিভাগের রায়ে জোসেফের সাজা কমিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন করা হয়। আর খালাস পান কাবিল। পরের বছর ২০১৬ সালে জোসেফের পক্ষ থেকে তার মা সাজা মওকুফ চেয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করেন। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট জোসেফের সাজা মওকুফ করে দেন এবং তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এই মামলায়ই হারিছ আহমেদ ও আনিছ আহমেদের সাজা মওকুফ হয় পরের বছর।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ