রাজনীতির নভোনীলে অশনিসংকেত

প্রকাশিত: ২:৩৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০১৯

রাজনীতির নভোনীলে অশনিসংকেত

নূরে আলম সিদ্দিকী :; বাংলাদেশ আজ শুধু মৌলিক অধিকার-বিবর্জিতই নয়, পূর্ণমাত্রায় রাজনীতি-বিবর্জিত। দৃশ্যত এক ব্যক্তির শাসনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এর সত্যতা অস্বীকার করা না গেলেও দেশে পুলিশি শাসন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। তার ওপর ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’র মতো আমলাতান্ত্রিক প্রভাববলয়, সামাজিক জীবনব্যবস্থায় রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মকা–বিবর্জিত এহেন অস্বস্তিকর পরিবেশ কখনো এত প্রকটভাবে দৃশ্যমান ছিল না।

খুন, গুম, ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। খবরের কাগজ খুললেই খুন-ধর্ষণ, ছিনতাইয়ের সংবাদগুলো যেমন প্রকটভাবে চোখে পড়ে- এর জোরালো প্রতিবাদ তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রান্তিক জনতার কাছে এটা অনেকটাই গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কোনো প্রবণতা যেমন পরিলক্ষিত হচ্ছে না, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সামাজিক দুর্নীতি ও দুর্বিচারের অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ম্য। আইন তার যথাযথ প্রয়োগে যখন স্থবির, নিষ্প্রভ ও নির্বিকার তখন দুর্নীতি, অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে ঘুষ গ্রহণ ও প্রদান একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। প্রশাসন চলার ও চালানোর এবং সেখান থেকে কার্যসিদ্ধির একমাত্র বাহন থাকা উচিত ছিল আইন ও ন্যায়বিচার। তা তো নেই, বরং ঘুষ ও দুর্নীতি প্রকাশ্যে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। একটা স্বাধীন দেশে এহেন দুরবস্থা, আইন প্রয়োগে এমন নিঃস্পৃহতা ও বেহাল অবস্থা কারও কাছেই কাম্য হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে এটিই নিরেট বাস্তবতা। এই তো সেদিন, আমরা যখন যুবক ছিলাম, মৌলিক অধিকার উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনের থরে-বিথরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কার্যকর ও সক্রিয় করার লক্ষ্যে ক্রমাগত লড়াই করছিলাম এবং প্রতিটি তরুণ তাজা প্রাণের কাছে ওই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ প্রায় অনিবার্য ছিল। মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত উদ্ধার, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার তখনকার সময়ের মানুষের কাছে সুতীব্র তাড়নার সৃষ্টি করে। ছাত্রসমাজ মূলত ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই ধীরে ধীরে মানুষ সোচ্চার হতে থাকে এবং প্রান্তিক জনতা ক্রমান্বয়ে সত্তায়, অভিব্যক্তিতে, চেতনায় এবং মননে আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। সেটা এতই প্রত্যয়দৃঢ় ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, আন্দোলনের মূল স্থপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সুদূর বৈরুতে পরলোকগমন করলে (অথবা তাকে নির্জনে হত্যা করলে) আন্দোলন থমকেও যায়নি, পথও হারায়নি। একদিকে ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আন্দোলন সামনের দিকে এগিয়ে নিতে থাকে, অন্যদিকে নানা দলমতের ভিন্নতা সত্ত্বেও একটি প্রত্যয়দৃঢ় অগ্নিস্নাত অকুতোভয় ব্যক্তিত্ব বেরিয়ে আসেন আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার তাগিদে ও অভিপ্রায়ে। তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আমি আমার অনেক লেখনীতে সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছি, আন্দোলনের জন্য শেখ মুজিব না শেখ মুজিবের জন্য আন্দোলন- এটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রশ্নে একটি বিস্ময়কর জিজ্ঞাসা।
সেদিন শোষণ-বঞ্চনা ছিল। গণতন্ত্রের চর্চায় প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন বিস্ময়কর হতাশা এবং সবকিছুকে মেনে নেওয়ার এমন আশ্চর্যজনক গা-সওয়া মানসিকতা ছিল না। তখনকার মানুষ ছাত্রসমাজ মানসিকভাবে যেমন সত্যনিষ্ঠ, প্রত্যয়ী ও প্রতিবাদী ছিল; আজ সেটা দৃষ্টিগোচর তো হয়ই না, প্রান্তিক জনতা কেমন যেন আত্মকেন্দ্রিক, দেশপ্রেমহীন, নিরুৎসাহী ও সবকিছুতেই গা-ছাড়া গোছের হয়ে গেছে। ভাবখানা এমন যে, যা হয় হোক, চোখ-কান-মুখ বন্ধ রেখে উটপাখির মতো মুখ গুঁজে পড়ে থাকো। আমার বন্ধুদের একাংশ এর পেছনে নৈতিকভাবেই একটি যুক্তিগ্রাহ্য ইতিবাচক দিক খুঁজে পান। আর সেটি হলো- বিজ্ঞানের আবিষ্কার। বিশেষ করে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদির আবিষ্কার ও ব্যবহারে দিগন্তবিস্তৃত অগ্রযাত্রার সুফল।

অন্যদিকে নিজের মেধাবিকাশ ও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পৃথিবী -জোড়া দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীদের একটা বিরাট অংশ আত্মপ্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে প্রায়শ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন এবং এই বিদেশ গমনের উদগ্র বাসনাকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার সঙ্গে নিয়ে তাদের যোগীর মতো একাগ্র চিত্তে তপস্যার মতোই সাধনা করতে হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়াকে নিরীক্ষণ বা পর্যবেক্ষণ করার মানসিকতা তরুণ সমাজের কাছে বিভিন্ন কারণে অবলুুুপ্ত হচ্ছে। বিদেশযাত্রা বা ভাগ্য বিনির্মাণের লক্ষ্যে উদয়াস্ত পরিশ্রমকে আমি নিন্দা করি না বা আবার বন্ধ করার পরামর্শও দিই না। সে দেশেই থাক আর বিদেশেই থাক, স্বদেশপ্রেম তার হৃদয়ের গভীরে জাগ্রত থাকুক- এটি প্রত্যাশা করি। আমরা অত্যন্ত অধ্যবসায়ী ছিলাম, লেখাপড়ায়ও কম মনোযোগী ছিলাম না। আমাদের জ্ঞানপিপাসু হৃদয়ে দেশপ্রেম প্রান্তিক জনতার প্রতি অনুরাগ ভালোবাসা, মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার ইচ্ছাটার ওপর বিবেক প্রদীপ্ত সূর্যরশ্মির মতো আলো ছড়াত। তার বিকীর্ণ অগ্নিকণায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা শুচিশুদ্ধ মন নিয়ে প্রজ্বলিত হতাম, প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিতাম।

আজকের প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আমরা পরীক্ষা বর্জনের জন্য কখনো আন্দোলন করিনি। প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও কোনো উদ্যোগ নিইনি। এগুলো আমাদের মনন ও মননশীলতার আবর্তের বাইরে ছিল না। আমরা মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্যুতির কথা ভাবতাম না বলেই জনগণের সামগ্রিক প্রয়োজনের দাবি উপেক্ষা না করে অন্যায়, সামাজিক অবিচার, ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের চারণ ক্ষেত্র বানানোর প্রতিবাদে দৃপ্ত মানসিকতায় অকুতোভয়ে এগিয়ে আসতে পেরেছিলাম। আর পেরেছিলাম বলেই আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমণের শুধু অভিযাত্রীই ছিলাম না, সময়ের দাবিতে আন্দোলনের স্রোতধারায় অগ্রদূতও হতে পেরেছিলাম। আজকের হত্যা, ধর্ষণ, গুম, দুর্নীতি ও লুটপাট- সার্বিকভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় রুখতে না পারলে এত আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষরণের স্বাধীনতা কি তার স্বকীয় সত্তায় টিকে থাকতে পারবে? নাকি একটি জীর্ণ-শীর্ণ ক্যান্সারের রোগীর মতো মূল্যবোধ-বিবর্জিত একটি জাতি কঙ্কালের মতো পা-ুর দেহ নিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকবে?

জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা মধ্যরাতের ভোটে ভয়াবহ কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলদার সরকার তাদের একক প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে নানাভাবে প্রচার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভেসে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বাজেটের কলেবর বৃদ্ধি হচ্ছে, এটা ঠিক। পদ্মা সেতুসহ কিছু উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও চলছে- এও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু প্রান্তিক জনতার জীবনযাত্রার মান কতটুকু বেড়েছে বা আদৌ বেড়েছে কিনা তা বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি দেশে যদি গণতান্ত্রিক অধিকার সমুজ্জ্বল না থাকে, নাগরিকরা মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত থাকে, দেশের নির্বাচন যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ না হয়, প্রান্তিক জনতা যদি ভোট দিতেই না পারে- পদ্মা সেতুর ধুয়া তুলে অধিকারহীন প্রান্তিক জনতাকে উন্নয়নের প্রশ্নে কতটুকু আশ্বস্ত করা যাবে? দ্রব্য ক্রমেই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিচারব্যবস্থা অজান্তে অলক্ষ্যে রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসনের কুক্ষিগত হচ্ছে। দেশের প্রধান বিচারপতি স্বয়ং হতাশায় ভুগছেন। সে দেশের সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাই বা রাখবে কী করে, সুবিচারই বা পাবে কেমন করে?

জনশ্রুতি রয়েছে, একটা কনস্টেবলের নিয়োগ পেতে হলে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় বিভিন্ন স্তরে। চাকরির শুরুতেই ঋণভারে জর্জরিত ওই নিয়োগপ্রাপ্ত কনস্টেবলটি তো নিজের বিবেককে শিকেয় তুলে রাখতে বাধ্য হয়। তার কাছে দুর্নীতিবিমুক্ত সততা ও বিবেক প্রত্যাশা করাই তো অবান্তর। দুর্নীতির মহামারী সব ক্ষেত্রে মানুষের সুকোমল বৃত্তিটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যে কোনো মূল্যে এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কবল থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। না হলে স্বাধীনতা নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। দৃশ্যত দেশে একদলীয় শাসন নয়, এক ব্যক্তির শাসন চলছে। যে দলটি শাসনক্ষমতায়, সেখানেও দুর্নীতি তো আছেই, সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মনোনয়নেই বাণিজ্যিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। অর্থ ছাড়া মনোনয়ন তো দূরে থাক, আজকাল প্রাথমিক সদস্যপদও লাভ করা যায় না। রাজনীতিতে আদর্শ, মূল্যবোধ, ত্যাগ ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবদানের কোনো স্বীকৃতি পরিলক্ষিত হয় না। যারা রাজনীতিকে জীবনের আদর্শ এবং দেশ ও জাতির সেবায় নিবেদিত মনে করেন, তারা আজ অপাঙ্ক্তেয় ও অসহায়।

মূল সংগঠন আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহের জন্য সাংগঠনিক সপ্তাহ/পক্ষ পালন করা হতো। কোনো কোনো বছর মাসব্যাপীও সদস্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা ও কর্মকা- চলত। যারা সদস্য সংগ্রহ করতেন এবং যারা নতুন সদস্য হতেন, সবার মধ্যেই একটি সাংগঠনিক উদ্দীপনা ও চেতনা ব্যাপকভাবে কাজ করত। কিন্তু এখন জনশ্রুতি, এখন আর সদস্য সংগ্রহ করতে হয় না। বরং প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সদস্য হতে হলে উৎকোচ দিতে হয় এবং এই উৎকোচের প্রভাব এতটাই ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, দুর্নীতিগ্রস্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসী, স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী এমনকি সারা জীবন আওয়ামী লীগের বিপক্ষে কাজ করা ব্যক্তিবর্গও অনায়াসে সদস্য তো হচ্ছেনই, ক্ষেত্রবিশেষ প্রচ- দাপুটে নেতা হিসেবে সমাজে বিচরণ করছেন। অধুনা সরকারি দলের এবং তার অঙ্গসংগঠনের পদে বহাল থাকা শুধু সম্মানের বা সামাজিক মর্যাদার বিষয়ই নয়, বরং আর্থিকভাবে লাভজনক। টেন্ডারবাজি- সেটি অনলাইনে হলেও ভাগ-ভাটোয়ারায় কাজকর্ম বিতরণ করা হয় এবং সেখান থেকেও নির্ধারিত অনেকের অর্থ সংগৃহীত হয়।

আজকাল ধর্ষণ-খুন যে মহামারীরূপে দেখা দিয়েছে এবং আপাতত এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় পরিলক্ষিত হচ্ছে না, তারও মূল কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণেই সামাজিকভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সার্বিকভাবে আইনের অপপ্রয়োগ বা আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারছে না। আমাদের দেশে সব অপরাধের বিরুদ্ধেই শাস্তি প্রদানের আইন রয়েছে। শুধু প্রয়োগের ক্ষেত্রেই তার মারাত্মক ব্যত্যয়। আইন তার নিজস্ব ধারায় চলতে পারছে না। আইনের প্রয়োগ হচ্ছে ক্ষমতা এবং অর্থের ইশারা ও ইঙ্গিতে। ছোটবেলায় সার্কাসের পুতুল খেলা দেখে আনন্দিত তো হয়েছিই, বিস্মিতও হতাম। একটা অদৃশ্য সুতোর টানে পুতুলের নাচ দেখে বিমোহিত হতাম। আজ রাষ্ট্রের আইন ক্ষমতাসীনদের সুতোর টানে পরিচালিত হয়, সেটি অবলোকন ও উপলব্ধি করে কোনো সুস্থ নাগরিক পুতুলনাচ দেখার আনন্দ পেতে পারে না। বরং সুতোর টানে আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগ সামাজিক বিপর্যয় বা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সামগ্রিকভাবে বিপর্যস্ত হতে দেখে ব্যথিত হচ্ছে। কিন্তু পরিত্রাণের কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছে না। এ পথ বিনির্মাণের মূল দায়িত্ব সরকারের। সরকার সৎ হলে, দায়িত্বশীল ও যত্নবান হলে দুর্নীতিও প্রতিহত হবে। কিন্তু বিধিবাম, আজ শর্ষের ভিতরই ভূত এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই।

বিশ্বব্যাংক ও জাইকার অর্থায়নে নামমাত্র সুদে পদ্মা সেতু বিনির্মাণের প্রস্তাবটি আমাদের অর্থনীতির আঙ্গিকে বাস্তবসম্মত ছিল। কিন্তু আমাদের বিসমিল্লাতেই গলদ! বিশ্বব্যাংক প্রস্তাবনার প্রাক্কালেই কীভাবে যেন দুর্নীতির দুর্গন্ধ পেয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকার এই দুর্নীতির দুর্গন্ধের কারণ ও সূত্র অনুসন্ধান না করে একগুঁয়েমি, জেদ ও গোঁয়ার্তুমির পথ বেছে নেয়। আমাদের অর্থনীতি এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করার আদৌ ক্ষমতা রাখে কিনা, তা বিবেচনায় না এনেই পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শুরু করে দেওয়া হলো। স্বাভাবিকভাবেই এই বিশাল ব্যয় বহন করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি ন্যুব্জ হয়ে পড়ল। ব্যাংকগুলো এই বিশাল অর্থযজ্ঞের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বলতে গেলে দিশাহারা অবস্থা। নতুন করে দেশে শিল্পকারখানা তো গড়ে উঠছেই না, দেশের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম এমনকি আমদানি-রপ্তানিতেও এর অতিমাত্রায় বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অবস্থাটা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি হলেও পদ্মা সেতুর কাজ যেভাবে এগিয়েছে, সেখান থেকে ফিরে আসার উপায় নেই।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ঘোষণাটি আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি ‘তৃতীয় মাত্রা’ অনুষ্ঠান থেকে বিনম্র চিত্তে সরকারকে এই ঝুঁকি না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। গরিবের ঘোড়ারোগের মতো এ প্রকল্প আমাদের ব্যাপক উপকারে আসবে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ এর থেকে কিছুটা উপকার পেলেও সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও বিরাট অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকির বিপরীতে তা অত্যন্ত নগণ্য। আজকের কঠিন বাস্তবতা হলো, এই পদ্মা সেতুর মতো এত বৃহৎ প্রকল্প মাঝপথে এসে থামিয়েও দেওয়া যায় না, স্থগিতও রাখা যায় না। এতে শুধু ব্যাংকই নয়, পদ্মা সেতুতে নিজস্ব অর্থায়নের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। ব্যাংকে তারল্য-সংকট, ছোট-বড় কোনো শিল্পকারখানায় ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোর অনীহা, তার ওপর সরকারি প্রভাব বলয়ের গুটিকয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণের ফলে ব্যাংকগুলোই মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই গৃহীত ঋণের টাকায় কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। বরং লাখ কোটির বেশি পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিদেশের কোথাও কোথাও এমন বেপরোয়া লগ্নি হয়েছে যে, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে আত্মঘাতী ছাড়া কিছুই বলা যাবে না। এই বিশাল অঙ্কের ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করে হীরার দামে রুপা কেনা হয়েছে। এ যেন অফেরতযোগ্য লুটের টাকা। আমার জানা মতে, শেখ হাসিনা অত্যন্ত জেদি ও একরোখা। কোন জাদুমন্ত্রে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে, এটি আমার বোধগম্য নয়। রোম নগরী পোড়ার সময় নিরুর বাঁশি বাজানোর মতো এক অস্বস্তিকর উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতেও দেশ আজ প্রতিবাদহীন, ভাবলেশহীন; অন্ধকার অমানিশার বক্ষে নিপতিত।

বিগত নির্বাচনের যে চিত্রটি প্রতিভাত হয়েছে, তাতে এ দেশে একটি প্রভাববিমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশাও তিরোহিত। গত নির্বাচনটি রাজনীতিবিদদের ছিল না। এমনকি রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তেমন পাত্তা পাননি। যা করার ওসি সাহেবরাই সেরে ফেলেছেন। বিচিত্র এ দেশের কী ভয়াবহ পরিণতি! এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার খাতিরেই শেখ হাসিনাকে সতর্ক করার তাগিদে ভুগি। আপনি ক্ষমতায়। ক্ষমতার একটা সুখ সুখ অনুভূতিতে আপনি আপ্লুত আছেন। কিন্তু যেহেতু দেশ এখন রাজনীতিশূন্য, আপনারই কল্যাণে বিরোধী রাজনীতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ও বিকলাঙ্গ, দেশে সভা নেই, মিছিল নেই, প্রতিবাদ নেই। এই অস্বস্তিকর নীরবতা, নিঃস্পৃহতায় আপনি সাময়িক প্রীত হতে পারেন কিন্তু দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য এমনকি আপনার জন্যও এটি অশনিসংকেত। এর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ, সংগঠনের মধ্যে আপনাকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে বিচূর্ণ রাজনীতির যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তাকে উপেক্ষা ও অবহেলা না করে সবার পরামর্শে একটি সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। ধরেই নিলাম, আপনার জীবিতকালে আপনি এভাবেই সামলে নেবেন। কিন্তু আপনি তো মৃত্যুঞ্জয়ী নন, আপনার মৃত্যুর পর কী হবে, সংগঠন ও দেশ কীভাবে চলবে- এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে আপনার সেটিও তো ভেবে দেখা দরকার। ভাবনাটা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, এভাবে চলতে থাকলে সামগ্রিক অবস্থাটা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন ইচ্ছা করলেও আপনি এর প্রতিকার করতে পারবেন না।

►লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।

সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ