রিহার্সেল, না ছাত্র রাজনীতির অঙ্ক?

প্রকাশিত: ১:৪১ পূর্বাহ্ণ, মে ২৮, ২০২২

রিহার্সেল, না ছাত্র রাজনীতির অঙ্ক?

সিলনিউজ বিডি ডেস্ক :: রাজনীতি ছিল ড্রইং রুমে বন্দি। তর্ক-বিতর্ক যে হয়নি তা নয়। সেটাও হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। ভোটের বাকি ১৯-২০ মাস। রাজনীতি কবে মাঠে ফিরবে এ নিয়ে চলছিল নানা আলোচনা। কিন্তু এরমধ্যেই আচমকা ফিরে এলো সংঘাত-সহিংসতা। শুরুটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহুবছর ধরে শান্ত ক্যাম্পাস। এমনকি ছাত্রদল সক্রিয় থাকার পরও। অনেকটাই যেন গুরুত্বহীন, হিসাবের বাইরে।

ছাত্রদলের নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই একধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে থাকে। যা চূড়ায় ওঠে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলের একটি বক্তব্য ঘিরে। গত মঙ্গলবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে সে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সেদিনই ক্যাম্পাসে বাধে লঙ্কাকাণ্ড। ছাত্রদলের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায় ছাত্রলীগ। বৃহস্পতিবার ফের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ছাত্রদলকে পিটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করে ছাত্রলীগ। হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আশ্রয় নিয়েও রেহাই মেলেনি ছাত্রদল নেতাকর্মীদের। এরই মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার খুলনায় সরকারি দলের সমর্থক এবং পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে। গেলো কয়দিনে দেশের আরও কয়েকটি জেলা থেকেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অ্যাকশনে ছিল ছাত্রলীগ।

কেন এই সংঘাত-সংঘর্ষ?

এটি কী আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তাপ, রিহার্সেল। নাকি ছাত্র রাজনীতির কোনো জটিল অঙ্ক রয়েছে এ সংঘর্ষের নেপথ্যে। শাসক দল সমর্থিত ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। শিগগিরই সম্মেলন হতে পারে সংগঠনটির এমন আলোচনা রয়েছে। ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব চেষ্টা করছে কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর। অনেকেই মনে করেন, সে চেষ্টার অংশ হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের জন্যই ক্যাম্পাসে শক্তি প্রদর্শন করছে ছাত্রলীগ। যে কারণে বেপরোয়া সংঘাতে জড়াতেও পিছপা হচ্ছে না তারা। অন্যদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি দায়িত্ব নিয়েছে বেশিদিন হয়নি। নতুন এ কমিটি নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়ার চেষ্টা করছে। যেকারণে টিকতে না পারলেও ক্যাম্পাসে আসার চেষ্টা করছে ছাত্রদল। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, চলমান সংঘাত শুধু ছাত্ররাজনীতির বিষয় নয়। এরসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজনীতির নানা হিসাবনিকাশ।

বিশিষ্ট রাষ্ট্র বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হচ্ছে এটাতো স্বাভাবিক। সরকার এবং বিরোধী দলতো এখন দুই মেরুতে অবস্থান করছে। সেই অবস্থায় সংঘর্ষ হওয়াতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের রাজনীতি কখনোই ভালো ছিল না। গেস্টরুমগুলোতে ছাত্রলীগের ছেলেরা নানাভাবে নির্যাতন করছে। জোর করে মিছিল করাচ্ছে। সাধারণ ছাত্ররা প্রাণের ভয় নিয়ে বেঁচে আছে। সারা দেশ জুড়েই অরাজকতা চলছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটা সহাবস্থান প্রয়োজন। তাহলে দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সরকার সব জায়গায় ভূত দেখছে। সেটা পতনের ভূত। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের মনে ক্ষোভ, ১৪ বছর ধরে অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা, এরমধ্যে আবার বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলো চাপ, অর্থনৈতিক অবস্থাও খুবই বাজে, বিরোধীদলগুলো মুভমেন্ট সব মিলিয়ে সরকার ভয়ের মধ্যে রয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে এখনো অনেক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ছাত্রদল ঢুকে যায় তাহলে মিছিল-মিটিং করতে পারে। ফলে ক্যাম্পাস তাদের জন্য অনিরাপদ হয়ে যাবে। দেশটা অনিরাপদ হয়ে যাবে। এজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলকে এলাউ করবে না। সরকার এতটাই হিংস্র হয়েছে। ছাত্রদলের একটা মেয়ের ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে এটা তো একেবারেই অকল্পনীয়। এটা আমার কাছে একবারেই বর্বরোচিত ঘটনা। নিন্দা জানানোর ভাষা নেই আমার।

ছাত্রলীগ কেন হার্ড লাইনে?

করোনার পর থেকেই ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্রদল। বিরোধী এই ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচিতে বাধা দেয়নি ছাত্রলীগ। যদিও নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর ক্যাম্পাসে ছাত্রদল বড় কয়েকটি শোডাউন করে। এ নিয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে অস্বস্তি ও আলোচনা থাকলেও প্রকাশ্যে কাউকে কথা বলতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে দ্রুত কেন্দ্রীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি নিতে বলায় ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা- আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য এক ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন। সম্মেলন ঠেকাতে তারা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে গিয়ে ধরনা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। এই পরিস্থিতিতেই ছাত্রদলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলো ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের আসন্ন কেন্দ্রীয় সম্মেলনের সঙ্গে এই কঠোর অবস্থানের যোগসূত্র রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। জয়-লেখকের ঘনিষ্ঠ ছাত্রলীগ নেতারা চান তারা যেন আরও কিছুদিন নেতৃত্বে থাকেন। তারা দ্রুত সম্মেলনের বিপক্ষে। ছাত্রদলের ওপর হামলায় তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। হাইকোর্ট এলাকায় ছাত্রদলের দুই কর্মীকে বেধড়ক পেটানোর ক্ষেত্রে যাদের ছবি গণমাধ্যমে এসেছে তাদের বেশির ভাগই জয়-লেখকের ঘনিষ্ঠ। তাদের অনেকে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটিতে রয়েছেন। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আরিফ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি ঘোলাটে করে সম্মেলন বানচালের চেষ্টা কেউ কেউ করে থাকতে পারে। তবে সে চেষ্টা সফল হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আছে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগেই ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

অন্য আরেক সহ-সভাপতি ইয়াজ আল রিয়াদ বলেন, এ ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নির্দেশনা না থাকার পরও কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেন করেছে সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। ছাত্রলীগের প্রতিবাদের ভাষা সহিংস হতে পারে না। ছাত্রলীগের এ সহ-সভাপতি অবশ্য আরও জানান, সামনে যদি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাতে নিজেদের পছন্দের পদ পেতেও ছাত্রলীগের কেউ কেউ এ হামলায় আগ্রাসী ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।

ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে যাওয়ার ব্যাপারে ছাত্রলীগকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের কোনো নির্দেশনা ছাত্রলীগের প্রতি ছিল না। হার্ডলাইনে যাওয়ার নির্দেশনা আমরা কেন দেবো? এটি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের সিদ্ধান্ত। তবে তারা যেটি আমাদের জানিয়েছে, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিকর মন্তব্য করায় তারা মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে। এবং ছাত্রদল লাঠিসোটা নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করতে চাইলে তারা প্রতিরোধ করে।

বিএনপি যা বলছে: বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর কেন হামলা হচ্ছে এটাতো সরকার জানে। আমাদের সকল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকারদলীয় লোকেরা হামলা করছে। পুলিশ বাধা দিচ্ছে, হামলা করছে, গুলি করছে। মূলকথা সরকারের পায়ের নিচে যখন মাটি থাকে না, জনগণের সমর্থন থাকে না তখন তারা সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়।

আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিএনপি কখনোই ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করে না। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলন করছে। সারা দেশে যে সমস্যাগুলো হচ্ছে বিএনপি এর প্রতিবাদ করছে। ছাত্ররা প্রতিবাদ করছে। আর আমাদের প্রতিটা কর্মসূচিতেই সরকার পুলিশ দিয়ে দমন করা চেষ্টা করছে। একটা ফ্যাসিস্ট সরকার এমন নির্যাতনই করে।

হামলার পর উল্টো বিএনপি’র নেতাকর্মীদের নামে মামলা দেয়া হয় অভিযোগ করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, আমাদের ওপর সব সময় হামলা করা হয়। পরে উল্টো আমাদের নামইে মামলা দেয়া হয়। আমরা মামলা দিতে গেলে সেটা নেয়া হয় না। দেশের মানুষ এখন কোনো সমস্যায় পড়লে মামলা করতে চায় না। তারা জানে, এদেশে কোনো আইনের শাসন নেই। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি চেষ্টা করছে জনগণের অধিকার এবং জনগণের কথা বলার জন্য।

কি বলছে ছাত্রদল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রদল। তবে শত বাধার পরেও রাজপথে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং অব্যাহত কর্মসূচি দেয়ার কথা জানিয়েছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, ছাত্রদল বরারের মতোই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিশ্বাস করে। কিন্তু ছাত্রলীগ আমাদের এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। গত দুই বারের হামলায় আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এরমধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে যাই হোক শত বাধা বিপত্তির পরেও আমরা আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাবো।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ দেখছে ছাত্রলীগ লাঠিসোটা, চাপাতি, হকিস্টিক এবং বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যের পরিবেশ দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। তবে সেটা এখন সকল সীমা অতিক্রম করেছে। আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আকতার হোসেন বলেন, ছাত্রলীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস করে। তাই তারা আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদ জানিয়েছে। আটটি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। ছাত্রলীগ আধিপত্য বিস্তার করার জন্য ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের একটি অভয়ারণ্য তৈরি করেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রদল প্রতিনিয়ত আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। যতো ধরনের বাধা বিপত্তিই আসুক আমরা ক্যাম্পাসে যাবো। যতো ধরনের বাধা আসবে প্রতিটি বাধা মোকবিলা করেই ক্যাম্পাসে আমাদের ধারাবাহিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবো।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
27282930   
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ