রোববার ফের সুনামগঞ্জে আসছেন মামুনুল হক, ‘উত্তেজনার’ শঙ্কা

প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২১

রোববার ফের সুনামগঞ্জে আসছেন মামুনুল হক, ‘উত্তেজনার’ শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
মাওলানা মামুনুল হকের সমালোচনা করে ফেসবুকে লেখার জেরে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দুপল্লীতে হামলার রেশ না কাটতেই রোববার (২১ মার্চ) ফের সুনামগঞ্জে আসছেন বিতর্কিত এই ইসলামি বক্তা। রোববার জামালগঞ্জে একটি মাদ্রাসার ইসলামী মহাসমম্মেলনে অতিথি করা হয় মামুনুল হককে।

এই আয়োজনে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ এবং স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাদেরকেও অতিথি করা হয়েছে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, তাদেরকে না জানিয়েই অনুষ্ঠানে অতিথি করা হয়েছে। শাল্লার ঘটনার পর মামুনুল হক জামালগঞ্জে আসলে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিতে পারে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ। তিনি এই আয়োজন বন্ধ করার জন্যও প্রশাসনকে অনুরোধ করেছেন।

তবে উপজেলা প্রশাসন বলছে, ইসলামী মহাসম্মেলনের ব্যাপারে এখনও কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। অনুমতি নিতে এলে বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখার জেরে গত বুধবার সকালে শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় তার হাজারও অনুসারী। এসময় গ্রামের প্রায় ৮০টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে তারা। এ সময় গ্রামের লোকজন পাশের হাওরে গিয়ে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

এ ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার মধ্যে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে মামনুল হককে অতিথি করে ইসলামী মহাসম্মেলনের আয়োজন করা হয়। খাদিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসা জামালগঞ্জের আয়োজনে খতমে বুখারি ও ইসলামী মহাসম্মেলনের জন্য উপজেলাজুড়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পোস্টারিং করা হয়েছে দেয়ালে দেয়ালে।

উপজেলা সদরের হেলিপ্যাড মাঠে এই সমাবেশ হেফাজতের মামুনুল হক ছাড়াও অতিথি হিসেবে নাম রয়েছে জামালগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল আল আজাদ, সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য আব্দুল মুকিত চৌধুরী, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার (সাজিব), জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম (সুহেল) এর, নাম আছে জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলীর। অনুষ্ঠানের লিফলেট-পোস্টারে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তাদের নাম রয়েছে।

তবে তাদের প্রত্যেকের দাবি, তাদেরকে না জানিয়েই অনুষ্ঠানে অতিথি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন তারা।

উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বলেন, আমার সাথে কোনো কথা না বলেই আমাকে এই আয়োজনে অতিথি করা হয়েছে। বিষয়টি আমি আয়োজক ও প্রশাসনকে জানিয়েছি।

তিনি বলেন, শাল্লায় যে দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছে এনিয়ে সকলেই ক্ষুব্ধ। ফলে এই মূহূর্তে মামুনুল হকের এখানে না আসাই উচিত। কারণ আমাদের এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রয়েছে। তিনি (মামুনুল হক) আসলে এবং কোনো আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিলে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। এতে শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এই সমাবেশ বন্ধ করার জন্য আয়োজক ও প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও জানান উপজেলা চেয়ারম্যান।

এ প্রসঙ্গে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, মামুনুল হক আসার ব্যাপারে আমরা এখনো তেমন কিছু জানি না। আমাদের কাছ থেকে সমাবেশের কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি। তবে এধরনের কোনো আয়োজনের জন্য আবেদন করা হয়ে থাকলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

এদিকে, অনুমতি না নিয়ে হেফাজতের সমাবেশের পোস্টারে নাম ব্যবহারের অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে থানায় জিডি করেছেন জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী।

জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামালগঞ্জ থানার ওসি সাইফুল আলম। তিনি বলেন, না জানিয়ে পোস্টারে নাম ব্যবহারের কারণে বৃহস্পতিবার আয়োজক কমিটির লোকজনকে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে বৈঠক হয়।

এ প্রসঙ্গে ওই ইসলামী সম্মেলন আয়োজক কমিটির সদস্য ও খাদিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসার মুহতামিম হাফিজ মাওলানা কাওছার আহমদ বলেন, আমাদের অনুষ্ঠানটি শাল্লার ঘটনার অনেক আগেই নির্ধারিত। ফলে এটি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

না জানিয়ে অনেককে অতিথি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা অনেককেই দাওয়াত দেওয়ার পর নাম দিয়েছি। তবে ইউএনও অফিসে বৈঠকের পর তাদের বলেছি পরের প্রচার-প্রচারণায় আর তাদের নাম ব্যবহার করবো না।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে বিতর্কিত ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক গত ১৫ মার্চ দিরাইয়ে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে বক্তৃতা করেন। ওই সমাবেশে তার কিছু বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হন শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের এক তরুণ। তিনি মামুনুলের সমালোচনা করে মঙ্গলবার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এই পোস্টকে কেন্দ্র করে দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় উত্তেজনা দেখা দেয়। হেফাজতে ইসলাম ও মামুনুল হকের অনুসারীরা এমন পোস্টে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এই ঘটনায় বুধবার সকালে বিক্ষোভ মিছিল আহ্বান করে হেফাজতে ইসলাম।

তবে আগের রাতেই উত্তেজনা আঁচ করতে পেরে নোয়াগাঁও গ্রামবাসী ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত তরুণকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের প্রায় সবাই দরিদ্র হিন্দু। ফলে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের মানুষজনের মধ্যে।

তবে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আর আতঙ্ক সত্ত্বেও প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি না থাকায় বুধবার সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিছিল করে নির্বিঘ্নেই হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামের সবগুলো বাড়িঘরই ভাঙচুর ও লুটপাট করে। গ্রামের প্রায় ৮০টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এ সময় গ্রামের লোকজন পাশের হাওরে গিয়ে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
17181920212223
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ