শঙ্কা বাড়াচ্ছে মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা

প্রকাশিত: ১:২২ পূর্বাহ্ণ, মে ২৮, ২০২২

শঙ্কা বাড়াচ্ছে মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা

সিলনিউজ বিডি ডেস্ক :: জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি রয়েছে মোহসিন হোসেন। ১০ বছরের মোহসিনের স্কুল মাঠে দাপিয়ে বেড়ানোর কথা থাকলেও পঙ্গু হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটে তার। প্রথমে পিঠের মাঝখানে ব্যথা করত। এক সময় পিঠে কুঁজের মতো উঁচু হয়ে যায়। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে নিটোর অর্থাৎ পঙ্গু হাসপাতালে এসে শনাক্ত হয় মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত মোহসিন। মোহসিনের বাবা মাহতাব হোসেন বলেন, বছর খানেক আগে থেকে মোহসিন মাঝে মাঝে পিঠে ব্যথার কথা বলত। আমরা ভাবতাম ছোট ছেলে খেলাধুলা বা ঘুমানোর সময় কোনোভাবে ব্যথা পেয়েছে। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ছেলের পিঠের মাঝের হাড় কেমন যেন বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অল্প অল্প জ্বর আসত, খেতে চাইত না। নরসিংদীতে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে কিছু ধরতে পারল না। ছেলের পরিস্থিতি দেখে ঢাকায় কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে এক চিকিৎসকের পরামর্শে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসকরা মোহসিনকে দেখে প্রাথমিকভাবে যক্ষ্মায় আক্রান্ত বলে ধারণা করেন। কিছু টেস্ট করার পর তাদের শঙ্কাই সত্যি হয়। মোহসিনের মেরুদণ্ডে যক্ষ্মা বাসা বেঁধেছে বলে জানায় চিকিৎসকরা। এর মধ্যে পিঠের মাঝখানে কুঁজের মতো উঁচু হয়ে ওঠে। সেখান থেকে এক দফা অপারেশন করে পুঁজ বের করেছে চিকিৎসকরা। তারা আশ্বাস দিয়েছেন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে মোহসিন, তবে কিছুটা সময় লাগবে। শুধু মোহসিন নয় দেশে এ রকম আরও অনেক রোগী মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় ভুগছে। দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ কমলেও মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীর হার ঊর্ধ্বমুখী। এ ধরনের যক্ষ্মার আগে উপসর্গ না থাকায় শনাক্ত হয় দেরিতে। ফলে রোগী প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল গনি মোল্লা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যক্ষ্মা বা টিবিতে আক্রান্ত রোগীদের ১৫-৩০ শতাংশ মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত। আমাদের হাসপাতালে আসা মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশের বয়স ৭-১৫ বছরের মধ্যে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হার বাড়ার বিষয়টি আশঙ্কাজনক।

দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগী রয়েছে। তবে ইউরোপে এ রোগে আক্রান্ত রোগী কম। মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে অনেকের অপারেশন প্রয়োজন হয়। অনেকে প্যারালাইসিস হয়ে যায়।’ বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির (বিওএস) সভাপতি ডা. মো. আবদুল গনি মোল্লা আরও বলেন, ‘যক্ষ্মা প্রতিরোধে সরকার যথেষ্ট উদ্যোগী। সব সরকারি উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় হাসপাতালে যক্ষ্মা প্রতিরোধী ওষুধ দেওয়া হয়। ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালসহ অধিকাংশ হাসপাতালে টিবি প্রতিরোধী ওষুধ রয়েছে। অপারেশনের প্রয়োজন হলে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে নিটোরে রেফার্ড করে পাঠানো হয়। সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা শনাক্ত খুব কম হয়। আমাদের কাছে রোগী আসে দ্বিতীয়-তৃতীয় পর্যায়ে। রোগের লক্ষণ হিসেবে অল্প জ্বর, মুখে রুচি না থাকা, পিঠ ডিম্বাকৃতি হয়ে ফুলে ওঠা। অনেক সময় মেরুদণ্ডে পুঁজ জমে যায়। তখন আমাদের চিকিৎসকরা অপারেশন করেন। প্রতি মাসে ২০-৩০ জন যক্ষ্মা রোগী আসে। মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা রয়েছে আমাদের হাসপাতালে।’ পাবনার সুজানগরের মিজান মিয়ার (৩৮) হাত-পা মাঝে মাঝে অবশ লাগত। একটা সময় এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) অর্থোপেডিক বিভাগে এসেছিলেন তিনি। সমস্যার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মিজান মিয়া বলেন, ‘আমার শরীর অবশ লাগত, বিশেষ করে পায়ে কোনো জোর পেতাম না। একটা সময় প্রস্রাব-পায়খানায় তীব্র সমস্যা হতে শুরু করল। পাবনায় চিকিৎসক দেখালে তার পরামর্শে ঢাকায় স্পাইন সার্জন দেখাই। তিনি দেখে কিছু টেস্ট করে জানান আমার মেরুদণ্ডে টিবি দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয় অনেক দেরি হওয়ায় আমার শরীর প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। জরুরি অপারেশন প্রয়োজন বলে জানিয়ে ঢামেকে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এরপর সেখানে আমার অপারেশন করেন স্পাইন সার্জনরা। এখন আমি বাড়ি থেকে ফলোআপ চিকিৎসার জন্য এসেছি।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা, জয়েন্টের যক্ষ্মা এগুলো দিনদিন বাড়ছে। আগে কম ছিল। মেরুদণ্ডের, খাদ্যনালির, শ্বাসনালির, মূত্রথলির যক্ষ্মাকে আমরা সেকেন্ডারি যক্ষ্মা বলি। এগুলো যখন শনাক্ত হয় তখন অনেক বেশি অগ্রসর পর্যায়ে থাকে, অবস্থা জটিল হয়ে যায়। যখন একটা রোগীর প্যারালাইসিস হয়ে ঘা হয়ে যায় এবং প্রস্রাব পায়খানা বন্ধ হয়ে যায় তখন এটাকে লেট কেস বলে।’

দেশসেরা অন্যতম এই স্পাইন সার্জন আরও বলেন, ‘দেরিতে রোগ নির্ণয় হওয়ায় চিকিৎসা খুব জটিল হয়ে যায়। বিশেষ করে প্যারালাইসিস হলে, প্রস্রাব-পায়খানা বন্ধ হয়ে গেলে সার্জারি করতে হয়। ২৫-৩০ শতাংশ রোগীর সার্জারি করতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আসলে ওষুধে ভালো করা যায়। গত ১৫-২০ বছর ধরে আমাদের দেশে এই সার্জারি অনেক হচ্ছে, আগে ছিল না। মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া রোগী আমরা অনেক বেশি পাই। আমি এ পর্যন্ত মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া ৮৮৫ জন রোগীর অপারেশন করেছি। তারা আবার হাঁটতে পারে, সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। এই যক্ষ্মায় রোগী প্যারালাইসিস হলে দুই মাসের মধ্যে অপারেশন করলে শতভাগ সুস্থ হয়। ছয় মাস পর করলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়। কিন্তু ছয় মাসের বেশি হলে অথবা দুই বছরের বেশি হলে সেখানে অপারেশন করা খুব কঠিন। এই মেরুদণ্ড প্যারালাইসিস হয়ে অনেক সময় বাঁকাও হয়ে যায়। এ সময় অপারেশন করা কঠিন হয়ে যায়। প্রতিবছর আমাদের হাসপাতালে ১৮-২০ রোগী আসেন মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা নিয়ে।’

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
27282930   
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ