সংসদে সমাপনী ভাষণ : জিয়াকে আসামি করতে চেয়েছিলাম : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ২:১৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১

সংসদে সমাপনী ভাষণ : জিয়াকে আসামি করতে চেয়েছিলাম : প্রধানমন্ত্রী

♦ আমাদের দলেরও বেইমান ছিল ♦ ২৪ কোটি ডোজ টিকা কিনব ♦ বন্ধুত্বের নিদর্শন ও বাজারজাতকরণে আম পাঠানো

অনলাইন ডেস্ক

 

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সে (জিয়া) ’৭৫-এর হত্যাকান্ডের সঙ্গে যে জড়িত এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি তাকে আসামি করতে চেয়েছিলাম। তখন আমাদের হোম সেক্রেটারি ছিল রেজাউল হায়াৎ। সে বলল মৃত মানুষকে তো আসামি করা যায় না। কিন্তু আমার মনে হয় নামটা থাকা উচিত ছিল।’

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে গতকাল তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, জিয়া যে ষড়যন্ত্রে জড়িত তা তো ফারুক-রশীদ নিজেরাই বলেছে বিবিসির ইন্টারভিউতে। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের বইতে আছে, লরেন্স লিফশুলজের বইতেও আছে। কীভাবে অস্বীকার করবে? আর তাই যদি না করে তাহলে স্বাধীনতার পর যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছিল তাদের সে ছেড়ে দিল কেন? এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের সাত খুনের আসামিকেও মুক্ত করে দিল! এমন বহু ঘটনা সে ঘটিয়েছে। জিয়া সেই খুনিদের নিয়েই পরে দল করল। তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমাদের দলের বেইমান তো ছিলই। খন্দকার মোশতাক-টোশতাক তো ছিলই। এটা তো অস্বীকার করি না। আমাদের বাড়ির ভাত কার পেটে না গেছে। জিয়াউর রহমান তো খালেদা জিয়াকে নিয়ে মাসে একবার করে আমাদের বাড়ি গিয়ে বসে থাকত। জিয়ার দেশ শাসনের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আরও বলেন, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এক হয়ে এ দেশে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ করেছে সে (জিয়াউর রহমান) তাদের মন্ত্রী, উপদেষ্টা করে সংসদে বসাল। জাতির পিতার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করল। আর তার থেকে একধাপ ওপরে গিয়ে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া কর্নেল রশীদ এবং হুদাকে এমপি বানিয়ে সংসদে বসাল। এই তো তাদের চরিত্র। যে খুনি, সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদ, যুদ্ধাপরাধী, ধর্ষণকারী এদের নিয়েই তাদের চলাফেরা। তিনি বলেন, গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে চলে গিয়েছিল। জিয়াউর রহমান তাকে ফেরত নিয়ে এলো।

জিয়া কারাগারে কত মানুষ হত্যা করেছে খুঁজে বের করুন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি আমাদের সংসদ সদস্যদের একটা উদ্যোগ নেওয়া উচিত, জিয়ার আমলে প্রত্যেকটা কারাগারে কত মানুষকে ফাঁসি দিয়ে মারা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, বগুড়া, রাজশাহী, খুলনা এবং কুমিল্লায়। একটার পর একটা ক্যু আর শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সেগুলো একটু খুঁজে বের করে দেখেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর কত শত সৈনিক-কর্মকর্তা এবং মানুষকে সে সময় হত্যা করা হয়। এগুলো তো (রেকর্ড) থেকে যায়, সেগুলো একটু খুঁজে বের করে দেখেন। একেক রাতে ফাঁসি দিতে দিতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল, এখনো এ রকম লোক আছে। বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, এদের কাছ থেকে মানবাধিকারের কথা শুনতে হয়! এদের কাছে জ্ঞানের কথা, আইনের শাসনের কথা শুনতে হয়! অথচ আমি আমার বাবা-মা হত্যার জন্য মামলা করতে পারিনি। আমার কোনো অধিকার ছিল না। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব এবং বাংলাদেশকে নিয়ে জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সে স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করব। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারে এলে জনগণের কল্যাণ হয়। এ সময় তিনি কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে সবার টিকার ব্যবস্থা করতে যত টিকা লাগে সে ব্যবস্থা সরকার করবে বলে উল্লেখ করেন এবং সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্‌বান জানান।

জিয়া বহুদলীয় নয়, দেশে কারফিউ গণতন্ত্র দিয়েছে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, জিয়া আসলে বহুদলীয় নয়, দেশে কারফিউ গণতন্ত্র দিয়েছে। দেশে ফিরে এসে দেখেছি ’৮১ সালে রাত ১১টার পর কারফিউ। জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্র, জিয়ার নির্বাচন, ’৭৭-এর হ্যাঁ-না ভোট, ’৭৯-এর নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিচিত্রা’ তখন সরকারি পত্রিকা, সেখানে উঠল আওয়ামী লীগ ৪০টি সিট পাবে। অথচ তখন দল বলতে বাংলাদেশে একটাই ছিল আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, মানুষের ভোট ধ্বংস করে ভোটের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্টটা জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশে করেছে। ব্যাংকের থেকে টাকা নিয়ে লোন শোধ না করার কালচার তার শুরু করা। মানুষকে দুর্নীতিবাজ করা। মেধাবী ছাত্রদের এত হাতে পুরস্কার দিয়েছে, অন্য হাতে তাদের অস্ত্র, অর্থ তুলে দিয়ে বিপথে পাঠিয়েছে।

জিয়ার লাশ পাওয়া যায়নি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, আজকে জিয়ার কবর (সংসদের সীমানায় থাকা) নিয়ে কথা উঠেছে। জিয়ার মৃত্যু সংবাদের পর তার লাশ পাওয়া যায়নি। গায়েবানা জানাজা হয়েছিল। আর কয়েকদিন পরে একটা বাক্স আনা হলো। জেনারেল এরশাদের বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাজিয়ে গুছিয়ে একটা বাক্স নিয়ে এসে দেখানো হলো। কারও পরামর্শে এটি করা হয়। তখন এ সংসদে বারবার প্রশ্ন এসেছে। যদি লাশ পাওয়া যায় তবে লাশের ছবি থাকবে না কেন? তিনি বলেন, মীর শওকত (সাবেক বিএনপি নেতা মীর শওকত আলী বীরউত্তম) সেই লাশ শনাক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে চেনার কারণে এ বিষয়ে একদিন তাকে, প্রশ্ন করেছিলাম, সত্যি কথা বলেন তো। সে বলেছিল ‘লাশ কোথায় পাব!’ এমনকি জেনারেল এরশাদকে বারবার এবং মৃত্যুর কিছুদিন আগেও জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি যে একটা বাক্স নিয়ে এলেন লাশটা কোথায় পেলেন? এরশাদ বলেন, ‘বোন, লাশ পাব কোথায়?’ আর কী বলব? বিএনপির এমপি রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। জাতির পিতার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি ৭ মার্চের ভাষণটি পর্যন্ত এ দেশে বাজাতে দেওয়া হতো না। সে সময় দেশে বিকৃত ইতিহাস শেখানো হয়েছে। ২১ বছর পর ইতিহাস নিজস্ব ধারায় ফিরে এসেছে। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। ওই দিন জিয়াউর রহমান কিন্তু কোনো ঘোষণা দেয়নি। ওই দিন দুপুর ২টা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন। তাকে (জিয়াকে) যখন নিয়ে আসে, ২৭ তারিখ সন্ধ্যায় জিয়াউর রহমান ওই ঘোষণাটা পাঠ করে। যখন জিয়াউর রহমানকে ঘোষক বলা হতো তখন এ সংসদে প্রশ্ন উঠল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস। তাহলে উনি ২৭ তারিখ ঘোষণা দেয় কী করে? পরে ইতিহাস এমনভাবে বিকৃত করে যে সেই ২৭ তারিখকে তারা ২৬ তারিখ বানিয়ে ফেলল! অথচ ২৬ মার্চ জিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে কমর্রত ছিল। তাহলে কী করে ঘোষণা দিল? তিনি বলেন, জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়ারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ঘোষণা সংগ্রহ করে সারা দেশে প্রচার করে দিল। চট্টগ্রামে সেটা প্রচার হলো। ২৬ মার্চ দুপুর ২টা থেকে প্রথমে আমাদের হান্নান সাহেব একের পর এক জাতির পিতার ওই ঘোষণাপত্র পাঠ করতে থাকেন। ২৭ তারিখে সেটা সে পাঠ করে। তিনি বলেন, যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ দেশের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার সব ব্যবস্থা করে দেশ স্বাধীন করেছেন, সেখানে একজন মেজর একখানা ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে একটা বক্তব্য দিল আর দেশ স্বাধীন হলে গেল! সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল! এটা হয়?

উর্দু খুব পছন্দের ছিল জিয়ার : প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান একজন মেজর ছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে দ্রুত প্রমোশন দিয়ে মেজর জেনারেল করলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে জিয়া মেজর জেনারেল হতে পারত? কারণ তার বাবা-মা পাকিস্তানে মাইগ্রেট করে। জিয়াউর রহমান ওখানেই আর্মিতে ঢোকে। তার পোস্টিং হয় আমাদের দেশে। সে ভালো করে বাংলাও বলতে পারত না। উর্দু খুব পছন্দের ছিল তার।

জিয়ার সেক্টরে বেশি প্রাণহানি হয়েছে : বিএনপি নেতার বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সংসদে বলা হয়েছে জিয়াউর রহমান যে সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানে সব থেকে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে, সে তাহলে যুদ্ধে কী কাজ করেছে? পাকিস্তানিদের পক্ষে? যাতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করে, সেই ব্যবস্থা করেছিল কি না সেটাই আমার প্রশ্ন। সেক্টরের অধিনায়ক করে প্রাণহানি বাড়িয়ে দেওয়ার মানে কী? নিজের হাতে নিজেদের লোকদের এগিয়ে দিয়েছে মরতে। মেজর হাফিজের বইতে কী আছে? এখন বই চেঞ্জ করছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে যে ক্যান্টনমেন্টে ছিল জিয়াউর রহমান, সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। যার কারণে সেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে। সেই গণকবর ভাটিয়ারিতে আছে। সে সঠিক সিদ্ধান্ত দিলে আমাদের সৈনিকরা ব্যবস্থা নিতে পারত।

আম বন্ধুত্বের নিদর্শন ও বাজারজাতকরণে পাঠানো হয়েছে : পাকিস্তানে আম পাঠানো নিয়ে বক্তব্যের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, কেবল পাকিস্তান নয়, ভারতসহ আশপাশের প্রতিবেশী দেশ এমনকি মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে সব দেশেই আম পাঠিয়েছি। আমাদের আম অত্যন্ত সুস্বাদু। আম পাঠানোর একটা কারণ হচ্ছে বন্ধুত্বের নিদর্শন এবং দ্বিতীয়টি হলো বাজারজাতকরণ। দুই দিক থেকেই দেখতে হবে। সেজন্য সবাইকে আম পাঠিয়েছি। তবে একাত্তরে পাকিস্তান আমাদের ওপর যে অত্যাচার করেছে সেটা নিশ্চয়ই আমরা ভুলতে পারি না। এটা ভুলে গিয়েছিল বিএনপি।

২৪ কোটি ডোজ টিকা কিনব : করোনার টিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, সবাই যাতে টিকা পায় আমরা সে ব্যবস্থা নিয়েছি। ২৪ কোটি ডোজ টিকা আমরা কিনব। আমাদের দেশে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য চুক্তি হয়েছে। সেখানেও ভ্যাকসিন উৎপাদন করা হবে।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ