সতীদাহ প্রথা

প্রকাশিত: ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২২

সতীদাহ প্রথা

সুদীপ্ত সুজন :: সহমরণের ঘৃণ্য প্রথার অস্তিত্ব ছিল বাংলাদেশসহ পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে। এটি সতীদাহ প্রথা নামে পরিচিত। হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন নারী বিধবা হওয়ার পর স্বামীর সঙ্গে সহমরণে চিতায় যাওয়ার বিষয়টিকেই বলা হয় সতীদাহ। নারী কখনো যেতেন স্বেচ্ছায়, কখনো বা জোরপূর্বক তাকে পাঠানো হতো। সতীদাহের অর্থ হলো মৃত স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর সহমরণের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা এবং স্বামীর শেষকৃত্যের চিতায় আরোহণ করা। কবে এবং কীভাবে এ ধরনের আচার ধর্মীয় প্রথারূপে গড়ে উঠেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। গ্রিক লেখক ডিওডোরাস (আনু. ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এক সতীদাহের ঘটনার বর্ণনা দেন। এই বর্ণনার সঙ্গে আঠারো শতকে বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষে প্রচলিত সতীদাহ ব্যবস্থার প্রায় অবিকল মিল রয়েছে। অতীতে বিশ্বের বহু সমাজে মানুষের আত্মাহুতি প্রথার অস্তিত্ব ছিল বলে নৃবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা মোটামুটি একমত। রাজপুতরা খুব ঘটা করে এই অনুষ্ঠানটি পালন করত। কিন্তু বাংলাসহ ভারতবর্ষের সব প্রদেশে হিন্দুদের কোনো কোনো বর্ণের লোক এই অনুষ্ঠান পালন করত ভিন্নতরভাবে। তুর্কি ও মুঘল যুগে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার প্রথম দিকে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু ইংল্যান্ডে উদারপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠা এবং উনিশ শতকের বিশের দশকে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ভিত মজবুত হওয়ার পর সরকার কিছু জনহিতকর আইন প্রণয়নের চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। খ্রিস্টান মিশনারি, ইঙ্গ-ভারতীয় সংবাদপত্র এবং রাজা রামমোহন রায়সহ কতিপয় দেশীয় সংস্কারবাদী জনহিতকর সংস্কারের পক্ষে সমর্থন জোগান। অবশেষে নিজ দেশের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক (১৮২৮-১৮৩৩) রেগুলেশন XVII, 1829 পাস করেন। বেন্টিঙ্ক নিজেও একজন মানবহিতৈষী সংস্কারপন্থি ছিলেন। এই আইনে ‘সতীদাহ প্রথা বা হিন্দু বিধবা নারীকে জীবন্ত দাহ বা সমাধিস্থ করা বেআইনি’ বলে ঘোষণা করা হয়।

এর প্রতিকারের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত শত শত হিন্দু কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠানো হয়। কিন্তু উদারপন্থি পার্লামেন্ট ভারতে বেন্টিঙ্ক সরকারের ব্যবস্থার পক্ষে খুব শক্ত অবস্থান নেয়। উনিশ শতকে এই প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে সাধারণ জনমত গড়ে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পূর্বের চেয়ে সীমিত পরিসরে হলেও এর অনুশীলন অব্যাহত ছিল। উনিশ শতকের শেষের দিকে অমানবিক প্রথা হিসেবে সতীদাহ প্রথার পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটে।

বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের একান্ত প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে অমানবিক এ প্রথার অবসান ঘটে। তবে এখনো এর অস্তিত্ব একেবারে মিলিয়ে যায়নি। ২০০৬ সালে জানা যায়, ভারতের মধ্যপ্রদেশের তুসলিপার গ্রামের ৪০ বছরের এক নারী স্বামীর মৃত্যুর পর তার চিতায় গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। তবে কেউ তাকে বাধ্য করেনি। তিনি নিজেই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বলে পুলিশ জানায়। আজকের দিনেও অনেক ঐতিহ্যবাহী ধর্মে গোপনীয়ভাবে নরবলি প্রথা পালন করা হয়।

সূত্র : বিডি-প্রতিদিন

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ