সব অর্জনের সার্থকতা জনগণের

প্রকাশিত: ৫:০৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০১৯

সব অর্জনের সার্থকতা জনগণের

আবুল মাল আবদুল মুহিত :: আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী। টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ৮৫ বছর বয়সেও তিনি ক্লান্ত নন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সরকারের চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেনন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনেও নানাভাবে কাজ করেছেন। তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর নিয়ে একটি বই লিখছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানিক মুনতাসির

বাংলাদেশ প্রতিদিন : স্বাধীনতার পর ৪৭ বছর কেটে গেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এসব বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

এ এম এ মুহিত : বঙ্গবন্ধু বলতেন আমার মাটি আছে। আমার মানুষ আছে। আমার আর কিছু চাই না। এবং আমরা তা প্রমাণ করে দিয়েছি। এতে সময় লেগেছে অনেকটা। কেননা এর মধ্যে কতগুলো সামরিক শাসক এসেছেন। তারা আমাদের পিছিয়ে দিয়েছেন। সামরিক শাসন মানেই জংলি শাসন। এতে দেশের উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন হয় একটি গোষ্ঠীর। সেটা সামরিক গোষ্ঠীর। সামরিক শাসকরা ক্ষমতা ছাড়তে চান না। কিন্তু এখানে আমরা এরশাদ সাহেবকে একটা ধন্যবাদ দিতে পারি। কারণ তিনি আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়েছেন। পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচন দিয়েছেন। এরপর নির্বাচিত সরকার এসেছে। হয়তো শাসক দলের পরিবর্তন হয়েছে। খালেদা জিয়া কোনো উন্নয়ন করেননি তা আমি বলব না। তিনিও দেশের অর্জনে অবদান রেখেছেন। কিন্তু গত ১০ বছরে দেশে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে; যার পুরো অবদানই আওয়ামী লীগের। আরও নির্দিষ্ট করে বললে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান। কেননা তিনি কখনই নিজের জন্য কিছু করেন না। তিনি যা করেন দেশের জন্য করেন। আমরা উন্নয়নটাকে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে আটকে রাখিনি। একে সামাজিক সূচকগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছি।

বা. প্র. বাংলাদেশের ইতিহাস ও উন্নয়নের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মুহিত : ১৯৭১ সালে আমরা যখন স্বাধীনতা অর্জন করলাম তখন আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। প্রচণ্ড অভাব। বহু মানুষ না খেয়ে মারা গেছে। স্বাধীনতার আগেও খাবারের অভাবে আমার কোলে মানুষ মরেছে আর এখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোথাও কোনো অভাব নেই। ২০২৪ সালের পর এ দেশে কোনো দরিদ্র মানুষ থাকবে না। ষাটের দশকে আমি বাগেরহাটের এসডিও ছিলাম, সে সময় শরণখোলায় ও মোরেলগঞ্জে অভাব দেখেছি। সে অভাব বর্ণনা করার মতো নয়। সেখানে পীড়িত মানুষকে কোলে নিয়ে খাবার খাইয়েছি আর একটু পরই সেই লোক মরে গেছে। এখন তো সে অবস্থা নেই। এ দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটবে ২০৩০ সালের মধ্যেই। বঙ্গবন্ধু বলতেন আমার মাটি আছে। আমার মানুষ আছে। আমার আর কিছু চাই না। এবং আমরা তা প্রমাণ করে দিয়েছি। এতে সময় লেগেছে অনেকটা। কেননা এর মধ্যে কতগুলো সামরিক শাসক এসেছেন। তারা আমাদের পিছিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের গ্রামগুলো এত স্বয়ংসম্পূর্ণ যে সেগুলো যদি উন্নতি করা যায় তাহলে সেটাই হবে আসল উন্নয়ন। এ লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করেছি। আমরা ৬৪ জেলা নিয়ে কাজ করেছি। আর উপজেলাকে আমরা বেইজ ধরেছি। এর ফলে অনেক উন্নয়ন হয়েছে।

বা. প্র. বর্তমান সরকার টানা ১০ বছরের শাসন শেষে তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিয়েছে। এ সময়ে দেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, প্রবৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, একজন সাবেক অর্থমন্ত্রী হিসেবে সামনের দিনগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মুহিত : এখানে একটু অতীত থেকে বলতে হয়, ২০০৮ সালে ড. ফখরুদ্দীন আর্মিদের বলল, আপনারা নির্বাচন দিন। নির্বাচন হলো। তারপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো। এর পর থেকে তিনটি নির্বাচন হলো। পরপর দুটি নির্বাচনে একটি সরকার জেতার ফলে দেশের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এটা কন্টিনিউ করল ১০ বছর। এটা একটা সৌভাগ্যের বিষয়। আমিও এর অংশ ছিলাম। বাংলাদেশের জন্য এটা খুব ভালো হলো। আর এর পেছনে ছিলেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার নিজের কিছু চাওয়ার ছিল না। উনি সবকিছু দেশের জন্য করেছেন। জনকল্যাণের জন্য করেছেন। তবে একটি কথা এখানে আমরা শুধু বাস্তবায়ন করেছি। দেশের উন্নয়ন করেছে সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষই দেশটাকে এগিয়ে নিয়েছে। এখন দরকার এ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা। মানুষ কিন্তু উন্নয়ন চায়। মানুষ কাজ চায়। মানুষ বসে থাকতে চায় না। জ্বালাও-পোড়াওকে প্রত্যাখ্যান করেছে সাধারণ মানুষ। এ ধারা সামনের দিনেও অব্যাহত থাকবে।

বা.প্র. আপনি জানেন বাংলাদেশ টানা কয়েক বছর ধরে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এমনকি আশা করা হচ্ছে ২০২৪ সালের আগে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ অঙ্কে উন্নীত হবে, এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মুহিত : ২০২৪ সালের আগেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ অঙ্কে পৌঁছাবে। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা তো ইতিমধ্যে ৮ শতাংশ অর্জন করে ফেলেছি। বিশ্বের অন্য দু-একটি দেশ চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধি ২ অঙ্কের ঘর ছুঁয়েছে। এখন জাপান আমাদের ওপরে আছে। জাপান এখন ৩ নম্বরে আছে। আমরা ২০২৪ সালের আগেই জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জাপানকে ছুঁয়ে ফেলব বলে আশা করা যায়।

বা.প্র. রোহিঙ্গা ইস্যুতে আপনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। এ ইস্যুতে আমরা এখন সঠিক পথে আছি কিনা। আপনি আরও জানেন রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। একে কীভাবে দেখেন?

মুহিত : এখানে একটা কাজ করতে হবে। তা হলো যারা রাখাইন দখল করে আছে তারা কিন্তু সেখানকার প্রকৃত অধিবাসী নয়। আজ থেকে ৩০০ বছর আগে এই মগরা এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। তারা অত্যন্ত দুষ্ট। এদের থাইল্যান্ডে ফেরত যেতে হবে। এর জন্য রোহিঙ্গারাই রাখাইন স্বাধীন করে নিজেদের সমস্যা সমাধান করবে। রাখাইন এলাকাটা হলো রোহিঙ্গাদের বাড়ি। তাই রাখাইন থেকে মগদের বিতাড়িত করবে রোহিঙ্গারা। সেটাই হবে তাদের দেশ। এটাই হলো পার্মানেন্ট সলিউশন। আর এটা হবেই হবে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যেই এটা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মিয়ানমার থেকে রাখাইন আলাদা হয়ে যাবে। সেটা হবে শুধু রোহিঙ্গাদের স্বাধীন দেশ। তবে বাংলাদেশ এতে বিরোধিতাও করবে না, সমর্থনও করবে না। আমরা আমাদের জায়গায় থাকব। রোহিঙ্গারা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করবে। তারা কিছু সৌদি আরব, ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়ায় আছে। তাদের কিছু আর্মস (অস্ত্র) প্রয়োজন। অস্ত্র জোগাড় করে তারা মগ দস্যুদের বিতাড়িত করবে। এটা আমার বিশ্বাস। তবে অস্ত্র জোগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ভূমিকা রাখবে না। আমার সময়ে দুবার বিদেশি সাহায্য পেয়েছি। এবারও পুরো খরচ বিদেশিরা দিচ্ছে। তবে রোহিঙ্গাদের এ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হবে না বলে আমার বিশ্বাস।

বা.প্র. বর্তমান সরকারের ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি কি সঠিক পথে রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মুহিত : অবশ্যই সরকারের ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি সঠিক পথে রয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো পুনর্গঠন করা দরকার। সেই সঙ্গে নতুন নতুন রপ্তানির বাজার অনুসন্ধানে কাজ করার সময় এসেছে। কেননা প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বের মার্কেটে টিকে থাকতে হলে আরও বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে আমাদের দূতাবাসগুলোকে।

বা. প্র. পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ালেও পরে আবার ফিরে আসতে চেয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

মুহিত : বিশ্বব্যাংক চুক্তি বাতিল করার পর আবার অর্থায়ন করতে চেয়েছিল এবং শর্ত দিয়েছিল, আবার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। কিন্তু আমরা তাতে রাজি হইনি। আমরা বলেছি একই কাজ বার বার হতে পারে না এবং আমরা তখন বিশ্বব্যাংক যে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে নিষেধ করেছিল যেহেতু পরে তারা ভুল স্বীকার করেছে, তাই আমরা সে প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দিয়েছি।

এবং তাদের জানিয়ে দিয়েছি তোমাদের অর্থায়ন আর লাগবে না। আমরা নিজেদের অর্থেই করব। হয়তো ডিসেম্বরের মধ্যেই এটা চালু হয়ে যাবে। ওবায়দুল কাদের সাহেব খুবই চেষ্টা করেছেন। তিনি খুবই (উচ্চাকাক্সক্ষী) অ্যাম্বিশাস। তবে আমি পদ্মা সেতু প্রকল্প দেখতে যেতে চাই। খুব দ্রুতই যাব। এ মাসেই যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওবায়দুল কাদের অসুস্থ হওয়ায় তা হয়নি। তবে আমি যাব। কাদেরের অনুমতি তো লাগবে। কেননা প্রকল্পটা তার। ফলে সে সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক। আমি যাব। অবশ্যই যাব।

বা. প্র. ব্যাংক খাতের জন্য আপনি একটি কমিশন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বর্তমান অর্থমন্ত্রী বলেছেন সেটার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মুহিত : আমি চেয়েছিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত করিনি। সেটা আমি ছেড়ে এসেছি। এখন সেটা ত্যাগ করছি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী হয়তো প্রতিটি ব্যাংকের জন্য পৃথক পৃথক কোনো কার্যক্রম নিতে চাচ্ছেন। আর কমিশন যদি কখনো হয়ও সেটা তো দুর্নীতি ধরার জন্য নয়। সেটা হবে কাজ করার জন্য।

বা. প্র. ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

মুহিত : এখানে যতটা মনে পড়ে ১৯৮২ সালে আমাদের খেলাপি ঋণ ছিল সম্ভবত ৪০ শতাংশ। এখানে তো সরকারি ব্যাংকের খেলাপিটাই বেশি। সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণটা বাদ দিলে তো যা থাকে সেটা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। ফলে একটা বড় সিদ্ধান্ত হচ্ছে এতগুলো সরকারি ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন আছে কিনা। এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কেস টু কেস ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। না পারলে মার্জ করাতে হবে।

বা. প্র. ব্যাংক পরিচালকদের যোগসাজশ কীভাবে বন্ধ করা যায়?

মুহিত : এটা বন্ধ করা যায়। আমি চেষ্টাও করেছি। পরিচালক যদি ব্যবসায়ী হয় তাকে একটা সিস্টেমে আসতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। যেন কোনো পরিচালকই কোনোভাবে যোগসাজশ করতে না পারে। তবে সেটা এখন করা মুশকিল।

বা.প্র. দেশ খেকে পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে এটা অনেকের দাবি, আপনিও অনেক সময় এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে আপানর অভিমত কী?

মুহিত : পাচারের পরিমাণ কিন্তু কমেছে। তবে যারা অর্থ পাচার করেন তারা এ দেশের উন্নয়ন চান না। ফলে এ দেশের পুঁজি বিদেশে পাচার করে দেন। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি এদের মূলটা খুঁজতে। কিন্তু এরা বেশ শক্তিশালী চক্র।

বা. প্র. ব্যাংকগুলো খারাপ করলে নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। ফারমার্স ব্যাংকের পাশাপাশি আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকও নাম পরিবর্তনের আবেদন করেছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন।

মুহিত : ও তাই নাকি? নাহ! নাম পরিবর্তন করলেই ভালো হয়ে যায় না কোনো ব্যাংকই। এজন্য মানুষ পরিবর্তন করতে হবে। মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

বা.প্র. বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর তিন বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আপনি সে সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন। অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংক নিউইয়র্কের কোর্টে মামলা করেছে। আরসিবিসিও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মুহিত : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে খোয়া যাওয়া অর্থ মামলার মাধ্যমেই ফিরে আসবে। ফিলিপাইনের আরসিবিসি যে মামলা করেছে তা ‘বোগাস’। এটা টোটাল রাবিশ। আমি সবসময় মামলা করতে চেয়েছি। আমি এমন একটি ব্যাংককে (আরসিবিসি) দুনিয়া থেকে দেখতে চাই না। ব্যাংক ইজ অ্যা মেটার অব ট্রাস্ট। তারা বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। এমন চোর ব্যাংক যখন হয় তখন আর কোনো ট্রাস্ট থাকে না। তাই তাদের এ দুনিয়াতে থাকার কোনো দরকার নেই। আদালতের রায়ে রিজাল ব্যাংককে ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে বিদায় করে দেওয়া উচিত। এটাই আমার লক্ষ্য। যদিও বাংলাদেশের মামলা করতে কিছুটা সময় লেগেছে যার কারণ-ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছিলেন, টাকাটা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু ফিলিপাইনের যে সিস্টেম তাতে তিনি তা করতে পারেননি। বাংলাদেশ যে মামলা করেছে তাতে আদালতের রায়ে রিজাল ব্যাংকের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দূর হতে হবে। এ বিষয়টি যখন তাদের বোধগম্য হবে তখন তারা এমনিতেই সমঝোতার প্রস্তাব করবে।

বা.প্র. গত ১০ বছরে ব্যাংক খাতের অবস্থা নাজুক পর্যায়ে চলে গেছে। এ সময়ে হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ বেশ কয়েকটি বড় বড় স্ক্যাম হয়েছে আপনার সময়ে। এ বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মুহিত : দেশের ব্যাংকিং খাতের ব্যাপারে আমি খুবই আশাবাদী। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক পরিবর্তন হবে। আমি খুবই আশাবাদী। আমি সবসময়ই বলেছি, ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ে আমি খুব উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আল্টিমেটলি এগুলো থাকবে না। খারাপ ব্যাংকগুলো মার্জ (একীভূতকরণ) হয়ে যাবে। সাবেক ফারমার্স ব্যাংক নতুন নামে আসার বিষয়টাকে আমি ভালোভাবে নিতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম, ফারমার্স ব্যাংককে যেন মেরেই ফেলা হয়। এটা যেন ফিনিস হয়ে যায়। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। এখানে আমার নিজের ভুল ছিল। ওই ব্যাংকটাকে তখনই ফিনিশ করা দরকার ছিল। আমি ফারমার্স ব্যাংককে টাকা জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। চারটা ব্যাংককে বলেছি, এটাকে উদ্ধার কর। এটি ঠিক হয়নি। তার পরিবর্তে আমি এটাকে বিক্রি করে দিতে পারতাম। রিডিউস প্রাইসে বিক্রি করে দিতে পারতাম। আর রিডাকশন যেটা হতো সেটা সরকার একটা শেয়ার নিয়ে ব্যবস্থা করে দিতে পারত। এখন দেশে আর খারাপ ব্যাংক থাকবে না। কারণ মার্জার করা হবে। আইনকানুন ঠিক করা হচ্ছে। এখন মার্জ হবে। কারণ এর নীতিমালা অনেক উন্নত করা হয়েছে। তবে ব্যাংক ক্র্যাপসির প্রসিডিউরটা ঠিকমতো হয়নি। এটা ঠিক করতে হবে। আর হলমার্ক বিসমিল্লাহ ঘটনায় দায়ীদের তো ধরা হয়েছে। সেগুলো বিচারাধীন রয়েছে। সমাধানের জন্য সময় লাগবে।

বা. প্র. দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দ্রুতগতিতে কমছে। অন্যদিকে ধনীর সংখ্যাও বাড়ছে। পাশাপাশি আয় বৈষম্যও বাড়ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মুহিত : এখানে এটা বলা হয় ২০৩০ সালে দুনিয়াতে কোনো দারিদ্র্য থাকবে না। তবে আমি বলি, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোনো দারিদ্র্য থাকবে না। আর ২০৩০ সালেই আমাদের দেশে শিল্প বিপ্লব হবে। ইতিমধ্যে শিল্প বিপ্লব কিছু কিছু জায়গায় শুরু হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী যে উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছেন সেটা ২০৪০ সালেই সম্ভব হবে। আর বৈষম্য কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে মানুষের তো আয় বেড়েছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। জীবন মানের উন্নতি ঘটেছে। সামাজিকভাবে মানুষের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। এসব তো অস্বীকার করা যায় না।

বা. প্র. আপনার সময় অনেকগুলো নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আবারও দেওয়া হচ্ছে। জনসংখ্যার অনুপাতে এখন নতুন কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন আছে কিনা?

মুহিত : আমি আগেও বলেছি ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়াটা কোনো সমস্যা না। একটা সময় আসবে তখন প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। তখন একটার সঙ্গে আরেকটা মার্জ (একীভূত) হয়ে যাবে। আমেরিকায় এক সময় পাঁচ হাজারের বেশি ব্যাংক ছিল কিন্তু এখন হাতেগোনা পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে। এক সময় এখানেও তাই হবে হয়তো।

বা. প্র. দীর্ঘ কর্মময় ও রাজনৈতিক জীবন থেকে আপনি বিদায় নিয়েছেন, এ মুহূর্তে আপনার কোনো অতৃপ্তি আছে কিনা?

মুহিত : দেখ আমি ২০০৪ সালে রিটায়ার্ড করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন দেখলাম, আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম তার তেমন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। তাই আমি সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলাম। আর এখন আমি যে অবসরে গেছি, আমি নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করছি। আমি অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে অবসরে গেছি। কারণ, এখন অভাব বলে কিছু নেই। এটা খুব সন্তোষজনক। আমরা এত সবজি ফলাই যে, এখন তো মনে হয় আমরা সবখানেই সফলতা অর্জন করেছি। ধান, সবজি ফলানোর দিক থেকে আমরা বিশ্বে দ্বিতীয়। মাছ উৎপাদনে আমরা তৃতীয়। আমাদের গরুর ফলনও ভালো। কৃষি এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ যে কত এগিয়েছে তা চিন্তাও করা যায় না। বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় আছে তাতে শিল্প বিপ্লবে যেতে বেশি সময় লাগবে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন সুখে-শান্তিতে রয়েছে। ফলে আমি এখন খুবই তৃপ্তি নিয়ে দুনিয়া থেকে চলে যেতে পারব।

বা. প্র. ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?

মুহিত : আমি দেখতে চাই এ দেশের একজন মানুষও গরিব থাকবে না। তবে গরিব কিছু থাকবে যেটা সাত/আট শতাংশ। সেটা হবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল। যা হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এটা পৃথিবীর সব দেশেই আছে। মালয়েশিয়াতেও আছে। এবং সেদিন হয়তো দূরে নেই। বাংলাদেশ সত্যিই একদিন সোনার বাংলাদেশ হবে। আমরা যেমন উন্নয়নশীল দেশের মডেল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি তেমন এ দেশ একদিন হবে উন্নত বিশ্বের জন্য মডেল।

বা. প্র. আপনার জীবনের সবচেয়ে গোল্ডেন পিরিয়ড কোন সময়টাকে মনে করেন?

মুহিত : স্ফীত হাসি হেসে, বুক উঁচু করে জবাব হ্যাঁ অবশ্যই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়টাই আমার জীবনের স্বর্ণকাল। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছি। তখন আমার ৩৭ বছর বয়স। আমি একেবারেই যুবক সে সময়। তারপর দেশ গঠনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরকম লড়াই সংগ্রাম করেছি। সত্যিই সেটা আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার।

বা. প্র. এখন আপনার অবসর জীবনের সময় কাটছে কী করে?

মুহিত : এখন তো আমি আরও বেশি ব্যস্ত। আমি এখন কিছু লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত আছি। একটা বই লিখছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে সে বইটি লিখছি। বইয়ের নাম হবে ‘হিস্ট্রি অব দি ওয়ার্ল্ড’। যা ইংরেজি ভাষায় লেখা হচ্ছে। এটার তথ্য কালেকশন খুব কষ্টসাধ্য। এখন এটার ৪১২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লেখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার হবে। যা আগস্টে প্রকাশ করার চেষ্টা করছি।

বা. প্র. আপনি তো সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন। সেটার কী হলো।

মুহিত : হ্যাঁ এটার খুব দরকার। এটা শুরু করতেই হবে। হয়তো আগামী বাজেট থেকে সম্ভব হবে না। এটা বেশ ব্যয়বহুল প্রকল্প। কন্ট্রিবিউটরি সোশ্যাল সিকিউরিটি ছাড়া এটা করা সম্ভব নয়। তবে এটাই উপযুক্ত সময় সেটা শুরু করার জন্য।

বা. প্র. সাবেক অর্থমন্ত্রী হিসেবে আগামী বাজেট নিয়ে আমার প্রত্যাশা কী?

মুহিত : ওয়েল। বাজেট নিয়ে আমার প্রত্যাশা হচ্ছে আমি আগেই (ডিসেম্বর) কিছু আউট লাইন দিয়ে এসেছি। সেগুলোর ওপরই এখন কাজ হচ্ছে। ইতিমধ্যে বর্তমান অর্থমন্ত্রী ও অর্থসচিব আমার কাছে এসেছিলেনও। তারা কিছু পরামর্শ নিয়ে গেছেন। বাজেটের একটা মিটিং হবে সেখানে আমিও থাকব আশা করছি। হ্যাঁ সে দিন আর দেরি নয়। এদেশে শিল্প বিপ্লব ঘটবে ২০৩০ সালের মধ্যেই।
সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ