সাবরিনা আরিফ চৌধুরী কেনো গ্রেপ্তার হলো না?

প্রকাশিত: ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০

সাবরিনা আরিফ চৌধুরী কেনো গ্রেপ্তার হলো না?

সিল-নিউজ-বিডি ডেস্ক :

করোনার ভয়াল থাবায় দেশের মানুষ যখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ধুকছে, ওই সময় চিকিৎসক স্ত্রীর সাইনবোর্ড ব্যবহার করে তখন জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফুল হক চৌধুরীর মতো এক শ্রেণির প্রতারক ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে পকেট ফুলিয়েছেন। টাকার বিনিময়ে অনুমোদন ছাড়াই বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অপরাধে আরিফুলসহ জেকেজির প্রতারক চক্রের ৫জন এখন কারাগারে।এদের সার্বিক কাজে প্রধান সহায়তাকারী ছিলেন আরিফুল চৌধুরীর চতুর্থ স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তার নামেই করোনা নমুনা সংগ্রহের অনুমোদন পায় জেকেজি। প্রশ্ন ওঠেছে, প্রতারক স্বামীর সব শক্তির উৎস ডা. সাবরিনাকে কেনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তার খুটির জোর কোথায়? করোনাকালে মানুষকে তাদের প্রতারিত করায় সাবরিনা আরিফ চৌধুরীও সমান অপরাধী।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেজিস্ট্রার চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও তিনি ছিলেন জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান। এই পরিচয়ে তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং কথা বলতেন গণমাধ্যমের সঙ্গে। সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকা সম্ভব?

 

জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফুল হক চৌধুরীসহ পাঁচ প্রতারককে গত ২৩ জুন আটক করে পুলিশ। ওইসময় জেকেজি অন্যতম কর্ণধার হিসেবে আরিফুল চৌধুরীর স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফের নাম এলেও তিনি দাবি করেছেন, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত দুই মাস ধরে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে সাবরিনা বলেন, আমাকে জড়িত করা হবে কেনো? আমি অনেকদিন ধরেই এদের সাথে নেই। আমি কখনোই কাগজে কলমে জেকেজির চেয়ারম্যান ছিলাম না। আমাকে মুখে মুখে চেয়ারম্যান বলা হতো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তিতুমীর কলেজে নিজেদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ব্যবহারের আগে থেকেই জেকেজির চেয়ারম্যান পরিচয় তিনি ব্যবহার করতেন। করোনার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পাওয়া থেকে শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত এই চিকিৎসক। তার বিরুদ্ধে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নানা রকম অভিযোগ করেছেন। নির্ধারিত অফিস টাইমে হাসপাতালের কাজ বাদ দিয়ে এই চিকিৎসক সময় দিয়েছেন জেকেজিতে। সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে জেকেজি নামের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা সম্পূর্ণ অসদাচরণ।

এপ্রিল মাসে দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার জন্য অনুমতি পায় জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা বা জেকেজি হেলথকেয়ার। নমুনা পরীক্ষায় টেকনোলজিস্ট ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের জন্য তাদের রাজধানীর তিতুমীর কলেজে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জায়গা করে দেওয়া হয়। ১২ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জেকেজির প্রস্তুতি দেখতেও যান তিতুমীর কলেজে। সেদিনও উপস্থিত থেকে নিজেকে চেয়ারম্যান পরিচয় দেন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তিতুমীর কলেজের কর্মচারিদের সঙ্গে জেকেজির কর্মীদের সংঘর্ষের পর গভীর রাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের উপর কথিত হামলার বিচার চান সাবরিনা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবেই। সংঘর্ষের ওই ঘটনাটি ঘটে একমাস আগে।কিন্তু প্রতারণার দায়ে যখন আটক স্বামী, অভিযুক্ত ওই প্রতিষ্ঠান; এখন সাবরিনার দাবি, তিনি গত দুইমাস ধরে এর সাথে সংশ্লিষ্ট নেই!

সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একজন কার্ডিয়াক সার্জন ও ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর উদ্যোগেই মূলত জেকেজি হেলথকেয়ার বুথ স্থাপনের কাজ পান। তবে পরবর্তীতে তাদের দুজনের সম্পর্ক নিয়ে আরিফুল চৌধুরী আপত্তি জানালে সেখানেই শুরু হয় টানাপোড়েন। এরই মধ্যে একদিন আরিফুল যান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখানে তিনি একটি বিভাগের দায়িত্বে থাকা কার্ডিয়াক সার্জনের রুমে স্ত্রীকে অপমান করেন। একই সঙ্গে ধমক দেন সেই কার্ডিয়াক সার্জনকেও। এ বিষয়ে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ও সেই কার্ডিয়াক সার্জন শের-ই বাংলা নগর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন । এ ঘটনার পর থেকে জেকেজির কার্যক্রমে অংশ নেওয়া থেকে বিরত আছেন ডা. সাবরিনা।

সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, আমরা যারা সরকারি হাসপাতালে চাকরি করি তারা কোনোভাবেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে থাকতে পারি না। কিন্তু হাসপাতালের একজন রেজিস্ট্রারড চিকিৎসক হয়ে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী কিভাবে এই পদের পরিচয় দিতেন বা চেয়ারম্যান পদে থাকেন তা বোধগম্য না।

প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তোলা কিছু ছবি ব্যবহার করে এই চিকিৎসক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিজের ক্ষমতা জাহির করতেন এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

জেকেজির প্রতারক চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ও সরকারী চাকরি বিধি লঙ্ঘণ করলে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই চিকিৎসকের ক্ষমতার উৎস কি কেবলই তার রূপ নাকি নেপথ্যে আছে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা মহল, তা খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কর্মরত তার সহকর্মীরাই।

পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ