সিলেটে পাইকারি-খুচরায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান!

প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২১

সিলেটে পাইকারি-খুচরায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান!

 

সিলেটে পাইকারি বাজারের সাথে নিত্যপণ্যের দামের আকাশ-পাতাল ফারাক দেখা দিয়েছে। পাইকারি বাজারে নিত্য পণ্যের দাম তুলনামূলক নাগালের ভিতরে থাকলেও খুচরা বাজারে চলছে ইচ্ছামতো দামের ছড়াছড়ি। তবে গত এক সপ্তাহে বেশির ভাগ পণ্যের দাম স্থিতিশীল কিংবা সামান্য কমতে শুরু করলেও খুচরা বাজারে মোটেও তাঁর প্রতিফলন হচ্ছে না। খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে যেমন খুশি তেমন দাম আদায়ের চিত্র। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের বাজার তদারকিকেই দায়ী করছেন ক্রেতারা। আর খুচরা বিক্রেতারা এখনো পণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের দোহাই দিয়ে আদায় করছেন মনখুশি দাম। তবে প্রশাসন বলছে নিয়মিত বাজার তদারকি অব্যাহত আছে। প্রয়োজনে আরও বাড়ানো হবে।

সিলেটের পাইকারি বাজার কালীঘাটে ঘুরে দেখা গেছে, ভারতীয় পেঁয়াজ আসলেও দেশি পেঁয়াজের চেয়ে দাম তুলনায় বেশি। এমনকি আকারে ছোট হলেও মানের দিক থেকে দেশি পেঁয়াজই ভালো বলে জানিয়েছেন আড়ৎ ব্যবসায়ী নীলাঞ্জন দাস টুকু। কালীঘাটে ঘুরে দেখা গেছে পাইকারিভাবে দেশি পেঁয়াজ ২৮-৩০ টাকা, ভারতীয় ৩৫-৪২ আর তুরস্কের পেঁয়াজ ২০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে এখনো বাজারে দেশি পেঁয়াজের চাহিদাই বেশি বলেও লক্ষ্য করা গেছে।

অপরদিকে রসুনের দাম তুলনামূলক বেড়েছে। চায়না রসুন বৃহস্পতিবার বিক্রি হয়েছে মানবেদে ১০০-১১০ যা গত এক সপ্তাহ আগে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা দামে বিক্রি হয়েছিলো। আর দেশি রসুন ৭০-৮০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। যা গত এক সপ্তাহ আগে ৭০ টাকা দামে বিক্রি হয়েছিলো। তবে আদার দাম ক্রমাগত ভাবেই কমছে। আদা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মান ভেদে ৪০-৪৫ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। আর কিছুদিন আগেও ঊর্ধ্বমূল্যের আলু এখন পাইকারি বাজারে ১২-১৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

তবে পাইকারি বাজারে দাম যেমনই হোক খুচরা বাজারে তুরস্কের পেঁয়াজই বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। যা পাইকারি বাজারে মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে পেঁয়াজ প্রতি কেজি থেকে কম পক্ষে ১০ টাকা করে মুনাফা আদায় করছেন খুচরা বিক্রেতারা। আর রসুন সর্বনিম্ন ১৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে কেজিতেই ২০ টাকা করে মুনাফা আদায় করছেন ব্যবসায়ীরা।

তবে দামের এমন তারতম্যের বিষয়ে প্রশাসনের উদাসীনতা আছে বলে অভিযোগ করলেন এক ক্রেতা। বৃহস্পতিবার বিকালে রিকাবীবাজার থেকে ৪৫ টাকা দিয়ে দেশি পেঁয়াজ কিনেছেন আব্দুল কাইয়ুম নামের ঔষধ কোম্পানীর এক সেলসম্যান। এতো বেশি টাকা দিয়ে পেঁয়াজ কেনার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রায় সকল দোকানেই দাম সমান। পাইকারি বাজারে কত বিক্রি হচ্ছে আমরাতো জানি না। এখন দোকানদাররা এর নিচে বিক্রি করবে না। আর আমিতো এক কেজি পেঁয়াজের জন্য কালীঘাটে যেতে পারি না। তাই কিনতে বাধ্য। তবে প্রশাসন উদাসীন না হলে খুচরা ব্যবসায়ীরা আমাদেরকে এভাবে জিম্মি করতে পারত না।

এদিকে চালের দাম অনেকটাই স্থিতিশীল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাগালের ভিতরেও। সুনামগঞ্জ এবং আশুগঞ্জের নতুন চাল বাজারে আসায় অনেকটা নাগালের ভিতরেই আছে। তবে মানভেদে বেশি দামের চালও বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিলেটের কালীঘাট পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফারুক আহমদ।

বৃহস্পতিবার কালীঘাটের পাইকারি আড়তে ঘুরে দেখা গেছে- অগ্রাহায়ন মাসের মুক্তাশাইল পঞ্চাশ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১৬৫০-১৭৫০, রঞ্জিত ঊনপঞ্চাশ ১৯৫০-২০৩০, বৈশাখ মাসের পুরনো হিরা ২০৮০-২১৩০, পুরনো উনত্রিশ মালা চাউল (সুনামগঞ্জি) ২৩৫০-২৪৩০, পুরনো আটাশ (সুনামগঞ্জি) ২৪৫০-২৫৫০, উনত্রিশ মালা (আশুগঞ্জি সুপার) ২৪০০-২৫০০, আশুগঞ্জি সুপার আটাশ ২৫০০-২৬০০, আশুগঞ্জি আটাশ সিদ্ধ (পুরনো) ২৪৫০-২৫৫০, আশুগঞ্জি উনত্রিশ মালা (সিদ্ধ) ২৩৫০-২৪৫০, কাটারিবুক (আতব) ২৯৫০-৩০৫০, মোটা সিদ্ধ (পরনো) ১৯০০-১৯৫০।

সে হিসেবে খোলাবাজারে সবচেয়ে বেশি চলা মোটা সিদ্ধ কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ৩৯ টাকা হলেও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা করে। আর আশুগঞ্জি উনত্রিশ মালা (সিদ্ধ) পাইকারি বাজারে ৪৯ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে ৫৫ থেকে ৫৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মুক্তাশাইল (আতব) পাইকারি বাজারে ৩৫ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে ৪০ থেকে ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উনত্রিশ মালা (আশুগঞ্জি সুপার) পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি হিসেবে ৫০ টাকা দাম হলেও খুচরা বাজারে ৫৬-৫৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

অপরদিকে শীতকালীন সবজি পাইকারি বাজারে সকল কিছুর দামই ২০ টাকার ভিতরে। গত এক সপ্তাহ আগেও সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া টমেটো এখন পাইকারি বাজারে কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। স্থানীয় বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদিত সবজি বাজারে আসা শুরু হওয়ায় সবজির দাম কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন পাইকারি বিক্রেতারা। তবে খুচরা বাজারে এর প্রতিফলন নেই। খুচরা বাজারে যেমন খুশি তেমন দাম হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের চালিবন্দর পাইকারি সবজির আড়ত ঘুরে দেখা গেছে সিম ১২ টাকা, বেগুন ১০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৬০ টাকা, বাঁধাকপি পিস ১৫ টাকা, ফুলকপি কেজি ১৫ টাকা, টমেটো ১৮-২০ টাকা, সালগম ৮-১০ টাকা, মুলা ৮ টাকা, গাজর ২২ টাকা, ধনেপাতা ২০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে এসব সবজিই খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। কেজিপ্রতি কম পক্ষে ১০ টাকা মুনাফা আদায় করছেন খুচরা বিক্রেতারা। আবার সুযোগে তারও বেশি মুনাফা আদায়ের চেষ্টাও করছেন তারা। পাইকারি বাজারে ৮ টাকা দামে বিক্রি হওয়া মুলা খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকা দামে। আর টমেটো বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন কেজি ৩০ টাকায়।

কেবল তাই না, খুচরা বাজারেও এক বাজার থেকে অপর বাজারের সাথে দামের বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় বন্দরস্থ ব্রহ্মময়ী বাজারের সাথেই অন্যান্য বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশ পাতাল পার্থক্য।

তবে পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা পণ্যের দামের স্থিতিশীলতা কিংবা দাম কমার কথা জানালেও তাঁর ঠিক বিপরীত কথা বলছেন খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরা। বেশি মুনাফার লোভে তারা পণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের কথাই বলছেন। আর ক্রেতারা বলছেন পাইকারি বাজারে সকল কিছুর দাম তুলনামূলক কম থাকলেও খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরা জিম্মি করে আদায় করছেন বাড়তি মুনাফা। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পারে জনসাধারণকে স্বস্তি দিতে।

পাইকারি বাজারের সাথে খুচরা বাজারে পণ্যের বাদের এমন আকাশ পাতাল পার্থক্যের বিষয় জানিয়ে বাজার তদারকির ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (সাধারণ শাখা, মিডিয়া সেল) শাম্‌মা লাবিবা অর্ণব বলেন, আমাদের একজন বাজার তদারক কর্মকর্তা আছেন। উনার মাধ্যমে নিয়মিত বাজার তদারকি হয়। তাছাড়া এখনো এমন কোন অভিযোগ আমরা পাইনি। তবুও যেহেতু এখন জানলাম সে ক্ষেত্রে আগামী সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে বাজার তদারকি আরও জোরদার করা হবে।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ