সুনামগঞ্জে ধীর গতিতে পানি নামলেও বেড়েছে দুর্ভোগ

প্রকাশিত: ৩:৩৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২২

সুনামগঞ্জে ধীর গতিতে পানি নামলেও বেড়েছে দুর্ভোগ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জে বানের পানি ধীর গতিতে নামলেও বন্যার্ত লোকজনের দুর্ভোগ বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে ত্রাণের জন্যে চলছে হাহাকার। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে কোনো কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ দেয়া হলেও সরকারি ত্রাণ যেনো সোনার হরিণ। কেবল খাবার নয় আশ্রয় কেন্দ্র সমূহে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। কবরস্থান শুকনো না থাকায় ৬ দিন ধরে লাশ ভেসেছে বানের পানিতে। দিরাইয়ের এক যুবকের লাশ দাফন করতে হয়েছে পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায়। পানি কমার সাথে সাথে নানা ধরনের রোগবালাইও বাড়ছে। বন্যার পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন এমন অভিযোগও উঠেছে। হাওরাঞ্চলে নতুন করে দেখা দিয়েছে ডাকাত আতংক। স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল বুধবার নতুন করে ৩৬০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৮৮ লাখ টাকা ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা বন্যার্তদের সহায়তা করছেন। একদিনে চার ফুট পানি বেড়ে যাবে এমন আভাস ছিলনা। এটি ধারনার বাইরে ছিল। পার্শ্ববর্তী দেশে হঠাৎ করে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাবে এটাও ধারনার বাইরে ছিল। বন্যার্ত মানুষকে উদ্ধার করতে সেনাবাহিনীর সহায়তায় আমরা চেষ্টা করেছি।
সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন,পানি কমতে শুরু করেছে। নতুন করে চাল,নগদ টাকা ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্যার্ত লোকজনের পাশে থেকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গ্রামাঞ্চলের আশ্রয় কেন্দ্রে সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সকল এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর কাজ গত কয়েক দিন ধরে চলমান রয়েছে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় সকল আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ পৌঁছানোর কাজ চলছে।

৬ দিনেও কেউ খোঁজ নেয়নি
সুনামগঞ্জ শহরের বাসিন্দা অজিত দাস জানান, বাসায় বুক সমান পানি হয়ে গেলে রাতেই পরিবার পরিজন নিয়ে সুনামগঞ্জ আদর্শ বিদ্যালয়ে এসে আশ্রয় নেই। পরনের কাপড় ছাড়া আর কোন কিছুই নিয়ে আসতে পারিনি। তিনদিন আশ্রয় কেন্দ্রে কিছুই পাইনি। এখন পর্যন্ত বাসার আশেপাশে পানি থাকায় গ্যাস লাইনও বন্ধ রয়েছে। চাল,ডাল যা ছিল সব বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। আজ বুধবার (গতকাল) বন্যার ৬ দিন অতিবাহিত হল। ৬ দিনেও কেউ কোনো খোঁজ নেয়নি। যদি ত্রাণের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাকে ত্রাণ দেয়ার জন্যে আকুতি জানান তিনি।
একইভাবে সুনামগঞ্জ শহরের বনানীপাড়ার বাসিন্দা সুহেল মিয়া জানান, সন্ধ্যায় দেখলাম বন্যার সামান্য পানি বাসায় ঢুকছে। ভাবছিলাম তেমন কিছু হবে না। এর পর আরেকটু পানি বাড়ল। পরিবারের সকলকে নিয়ে প্রতিবেশীর উঁচু বাসায় গিয়ে উঠলাম। শিশু,নারীসহ সব মিলিয়ে ১৫ জন ছিলাম প্রতিবেশীর বাসায়। রাত তিনটার দিকে খাটের উপর পানি উঠে গেলে প্রতিবেশী নিজের পরিবারের চার সদস্যসহ আমরা ১৫ জন গত শুক্রবার ভোর তিনটা পর্যন্ত বুক সমান পানিতেই ছিলাম। ভোরে একটি নৌকায় করে পার্শ্ববর্তী একটি বাসার চতুর্থ তলায় গিয়ে উঠলাম। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। ওই ফ্লাটে রান্না-বান্নার জন্য গ্যাসের ব্যবস্থাও নেই। পরনের কাপড় নিয়ে কাটালাম ৫টি দিন। খাবার পানি ও খাবারের অভাবে মানবেতর দিন কাটালাম। কিন্তু প্রশাসনের কেউ একটু খোঁজ-খবরও নেয়নি।

গ্রামাঞ্চলে ত্রাণের জন্যে হাহাকার
জামালগঞ্জ উপজেলার চান্দবাড়ি গ্রামের ফয়জুন নুর জানান, তার পরিবারসহ ৩০ থেকে ৩৫ টি পরিবার গ্রামের প্রাইমারি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যার ৬দিন পেরিয়ে গেলেও তারা কোনো ত্রাণ পাননি। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদশ্রী গ্রামের কৃষক আমান উল্লাহ জানান, বন্যায় বসতঘরে মাচা বেঁধে বেঁচে আছি। একই এলাকার আশি উর্ধ্ব আলী আহমদ তালুকদার জানান, তার বসতঘরে এখনো হাটু পানি রয়েছে। কষ্ট করে বেঁচে থাকলেও তাদের কপালে ত্রাণ পাওয়ার সৌভাগ্য এখনো হয়নি। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চললেও গ্রামাঞ্চলের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা বানভাসি লোকজন এখনো ত্রাণের জন্যে হাহাকার করছেন। দুর্গম গ্রাম সমূহের আশ্রয় কেন্দ্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বানভাসী লোকজন গ্রামাঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
দেয়া হচ্ছে খিচুড়ি
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে আশ্রয় নেয়া সদর উপজেলার আফতাব নগরের রেনু বিবি জানান, গত শুক্রবার সকালে হাসপাতালে এসে পরিবার পরিজন নিয় আশ্রয় নিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে খিচুড়ি ও শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে। একই বক্তব্য উপজেলার ওয়েজখালি গ্রামের ময়না মিয়ার। তিনি বলেন, ৪টি পরিবার হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খিচুড়ি ও শুকনো খাবার দিচ্ছেন। ওই হাসপাতালের তৃতীয় তলায় আশ্রয় নেয়া ফজর বানু জানান, তিনি ২টি প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। দিরাই পৌরসভার চন্ডিপুর মাদ্রাসার আশ্রয় কেন্দ্রের প্রায় ৪ শতাধিক বানভাসি মানুষকে গ্রামের লন্ডন প্রবাসীদের অর্থায়নে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় কেন্দ্র সমূহে খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

১ হাজার ৩০ টন চাল বরাদ্দ
জেলার ১২ উপজেলার বানভাসি মানুষের জন্যে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ১ হাজার ৩০ মেট্রিক টন জিআর চাল, নগদ ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ও ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া বরাদ্দের বিতরণ কার্যক্রমও পুরোদমে চলছে বলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন।
ডাকাত আতংকে রাত জেগে পাহারা
জেলার প্রায় সকল উপজেলায় দেখা দিয়েছে ডাকাত আতংক। সুনামগঞ্জ সদর, জগন্নাথপুর, দিরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে রাতের আঁধারে নৌকাযোগে এসে ডাকাতরা হানা দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের মসজিদের মাইকে ডাকাত এসেছে বলে জানানো হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা।
জগন্নাথপুর উপজেলার রতিয়ারপাড়ার বাসিন্দা রোটারিয়ান এস. এম সুহেল জানান, তাদের গ্রামে গেল দুদিন আগে চারটি নৌকায় করে ডাকাতরা হানা দেয়। বিষয়টি টের পেলে গ্রামবাসী ডাকাতদের ধাওয়া করলে ইঞ্জিন চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা।
সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগরের বাসিন্দা তুহিন মিয়া জানান, রাতে চোর ও ডাকাতের জন্য বন্যার্তরা ঘুমাতে পারছেন না।

৬ দিন ধরে লাশ ভেসেছে পানিতে
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সুরমা নদীর তীরবর্তী ইব্রাহীমপুর গ্রামের আশরাফ আলী (৭০) ও সাজু মিয়া (৬৫) গত শুক্রবার মারা যান। আশ্রয়কেন্দ্রে মারা যান আশরাফ আলী আর বানের পানির তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয় সাজু মিয়ার। তারা যেদিন মারা যান সেদিন সুনামগঞ্জ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। চারদিকে তখন থই থই করছে বানের পানি। দাঁড়ানোর মাটি নেই কোথাও। সবকটি কবরস্থানও তলিয়ে গেছে। কবরস্থানগুলো হাঁটু কিংবা কোমরপানির নীচে।
দাফনের জায়গা না পেয়ে দুটি লাশ বাক্সবন্দী করে কবরস্থানের পানিতে বাঁশ পুঁতে আটকে রাখেন। লাশ যাতে ভেসে না যায় সে জন্য পাহারাও দেন। ৬ দিন পর গতকাল বুধবার কবরস্থানের সামান্য জায়গা ভেসে ওঠলে আশরাফ আলীর লাশ স্বজনরা দাফন করেন। দাফনের মতো মাটি ভেসে না ওঠায় এখনো কবরস্থানেই বাক্সবন্দী আছে সাজু মিয়ার লাশ।
আশরাফ আলীর কন্যা স্থানীয় ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য তানজিনা বেগম বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাদের ঘরে বন্যার পানি ঢুকে যায়। এরপর গ্রামের স্কুলেই তারা আশ্রয় নেন। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় আশ্রয় কেন্দ্রেই তার পিতা মারা যান। আশরাফ আলী যখন আশ্রয় কেন্দ্রে মারা গেলেন বাইরে তখন মুষলধারে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। হু হু করে বাড়ছিল বন্যার পানি। ভোর হওয়ার পর দাফনের জন্যে কবরস্থান খোঁজা শুরু করেন তারা। কিন্তু কোথাও লাশ দাফনের উপযোগী কোনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে লাশের গোসল দিয়ে , কাপড় পরানো শেষে পলিথিনে মোড়ানো হয়। চারজন মানুষ নৌকায় থেকে জানাজা পড়েন। এরপর লাশ কবরস্থানে নিয়ে সেখানে বাক্সবন্দী করে বাঁশ দিয়ে আটকে রাখা হয়। তানজিনা বলেন,’বন্যার কারণে বাবার লাশ দাফনের জায়গা পাইনি। লাশটা কবরস্থানে ভেসে ছিল। এই কষ্ট সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।’

ভাটিধলের সেনাউরের দাফন বানিয়াচংয়ে
দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের ভাটিধল গ্রামের গিয়াস উদ্দিন (৬২) ও তার পুত্র সেনাউর মিয়া (২০) গত শনিবার সকালে পার্শ্ববর্তী ভরাউট গ্রামের উদ্দেশ্যে নৌকা যোগে রওয়ানা হন। নিজ গ্রাম থেকে সামান্য দূরে যাওয়া মাত্র হঠাৎ করে বজ্রপাত শুরু হয়। এসময় বজ্রপাতে পিতা-পুত্র নৌকা থেকে হাওরে পড়ে যান। এঘটনার দুদিন পর ঘটনাস্থলের সামান্য দূরে সেনাউর মিয়ার লাশ পাওয়া যায়। তবে,তার পিতা গিয়াস উদ্দিনকে এখনো পাওয়া যায়নি। সেনাউরের লাশ পাওয়া গেলেও তার দাফন নিয়ে স্বজনরা বেকায়দায় পড়েন। কারণ, আশপাশের সকল কবরস্থান বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ধমারগাও গ্রামের একটি কবরস্থানে তার লাশ পরিবারের লোকজন দাফন করেন। ধমারগাও এর ওই কবরস্থান কিছুটা ভেসে ছিল। নিহত সেনাউরের চাচা সাবেক মেম্বার গোলাম রব্বানী এ তথ্য জানিয়েছেন।

পূর্বাভাস দিতে তারা ব্যর্থ
এতো ভয়াবহ বন্যা এলো কিন্তু এর কোনো পূর্বাভাস দিতে পারেনি প্রশাসন। এটি নিঃসন্দেহে তাদের ব্যর্থতা। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান এমন অভিযোগ করে বলেন, বন্যার পূর্বাভাস দিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জানান,আগে জেলা প্রশাসন থেকে বন্যার সতর্কবার্তা দিয়ে সুনামগঞ্জ শহরে মাইকিং করা হতো। এবার তা করেনি প্রশাসন। জেলা প্রশাসন বন্যার সতর্ক বার্তা জারি করলে মানুষের ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি আরও কম হতো।

নদীর পানি বিপদ সীমার উপরে
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার সকালে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরের নিকটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি কমতির দিকে রয়েছে। তবে,পানি নামছে ধীর গতিতে।

এস:এম:শিবা

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ