স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মুজিব বর্ষের চেতনা – ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশিত: ২:৪৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২০

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মুজিব বর্ষের চেতনা – ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার

 

 

সাত কোটি বাঙ্গালীর ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি ।  আমি সব হারাতে পারি , কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারবো না ।

– বঙ্গবন্ধু

 

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন – পাকিস্তানে বন্দিদশা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন । আত্মসমর্পনকৃত পাকিস্তানি বিশাল সৈন্যবাহিনীকে ফিরে যেতে দেওয়া এবং বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক মিত্রদের ক্রমাগত কূটনৈতিক চাপের মুখে ভুট্টো নমনীয় হন । ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ , প্রথম বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছেন ভুট্টো ।

৮ জানুয়ারি ১৯৭২ , সকালে হিথ্রো বিমানবন্দরে পাকিস্তানি একটি বিশেষ ফ্লাইট ৬৩৫ এ অবতরণ করে । এর কিছুক্ষণ আগে সকালের বিবিসি মর্নিং সার্ভিসে প্রথম ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে লন্ডনে আসছেন । হিথ্রো বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে তাঁকে নিতে এসেছেন বৈদেশিক দপ্তরের কর্মকর্তারা ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ইয়ার মাদারল্যান্ড ।

সকালবেলা বিখ্যাত ক্ল্যারেজ হোটেলে উঠার পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ , আমেরিকার সিনেটর কেনেডি , ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন । সাত সকালেই সেখানে ছুটে এসেছিলেন হ্যারল্ড উইলিয়াম ( সে সময়ের ব্রিটেনে বিরোধী দলের নেতা , যিনি পরবর্তীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ) । অতঃপর ক্লারিজে প্রেস কনফারেন্সে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন তাঁর বিজয়ের বার্তা – মুক্তির বার্তা । ক্লারিজে উপস্থিত বাঙালিদের কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না । বঙ্গবন্ধু বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন শহীদদের কথা , দেশের কথা , ধ্বংসের কথা ।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী সরকারি সফর সংক্ষিপ্ত করে লন্ডনে ফিরেন শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে । বিকেল ৫টায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে বৈঠকের পর যাবতীয় রীতি উপেক্ষা করে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে বহন করা গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন এই মহান নেতার প্রতি বিনম্র সম্মান জানাতে । এডওয়ার্ড হিথকে এজন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ হাউস অব লর্ডসে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় । জবাবে হিথ বলেছিলেন , “ আমি জানি কাকে সম্মান জানিয়েছি , তিনি হচ্ছেন একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর । তাঁকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি । ”

পরের দিন ৯ জানুয়ারি ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর একটি বিমানে হিথ্রো থেকে দেশের পথে যাত্রা করেন । ১০ জানুয়ারি সকালে তিনি নামেন দিল্লিতে । সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি , প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী , সমগ্র মন্ত্রিসভা , নেতৃবৃন্দ , তিন বাহিনীর প্রধানগণ , বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ ও ভারতবাসীর কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন । বঙ্গবন্ধু ভারতের অকৃপণ সাহায্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন ।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ , বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত মহান নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন । পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে বিজয়ীর বেশে আসলেন ইতিহাসের মহানায়ক , বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।

বিকাল পাঁচটায় তিনি রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ) লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন । সশ্রদ্ধচিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন , সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন । রাজনীতির ধ্রুপদী কবি বলেন , “ যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি , যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি , যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি , আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কি না ! আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে , মায়েদের কাছে , বোনদের কাছে । বাংলা আমার স্বাধীন , বাংলাদেশ আজ স্বাধীন । ”

বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার সেই সূর্য পুরুষ, মহান আলোকবর্তিকা – যাকে জেল, ফাঁসির মঞ্চ কিছুই করতে পারেনি । একটি স্বপ্নের জন্য বার বার জেল ( জীবনের প্রায় ১৩ বছর জেলে ) , নির্যাতন – নিপীড়ন সহ্য করে মহান আলো দিয়ে উদ্ভাসিত করে গেছেন একটি জাতিসত্ত্বাকে , স্বাধীন ভূখণ্ডকে । বঙ্গবন্ধু , মুক্তিযুদ্ধ , বাঙালি জাতিসত্ত্বা , স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন । মহান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই কালজয়ী সূর্য পুরুষ , ক্ষণজন্মা রাজনীতির কবি , বাঙ্গালীর মুক্তির সারথী , স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ৷ অভিনন্দন জানাই বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর উচ্চশিক্ষিত সুযোগ্য দৌহিত্রদেরকে ৷ শুভেচ্ছা জানাই সত্যিকারের মুজিব আদর্শ লালনকারী সকল মুজিব সৈনিকদেরকে ৷

এই মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাগত জানাই মহান মুজিব বর্ষকে । ১০ জানুয়ারি ২০২০ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কর্মসূচি দিয়ে মুজিব বর্ষ ক্ষণ গণনা ও মুজিব বর্ষ পালন উৎসব শুরু হয়েছে । মুজিব বর্ষ সফল ও সার্থক হউক । মুজিব বর্ষ পালনের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি হউক বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে , তাঁর যাপিত জীবন এবং রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শন থেকে শিক্ষা নেয়া ও তাঁর মহান ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টাকারীদের প্রতিহত করা । আরও প্রতিশ্রুতি হোক সুখী সমৃদ্ধ দেশ গঠনে এবং মাদক-দুর্নীতি-সন্ত্রাসমুক্ত ও শোষণহীন সমাজ গঠনে আত্ম নিয়োগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা ।

মুজিব বর্ষ পালনের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা – যেখানে জনমানুষের সত্যিকারের মুক্তি ঘটবে – রচনার পথ প্রশস্ত হউক । এজন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কেবল মুজিব কোর্ট পরিধানকারী নয় বরং সত্যিকারের মুজিব আদর্শ লালনকারী সোনার ছেলেদেরকে খোঁজার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে – যারা নতুন প্রজন্মের জন্য রাজনীতি করবে , যারা জননেত্রীর লক্ষ্য বাস্তবায়নে , অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে পরিণত করতে নিবেদিত ও কার্যকরীভাবে কাজ করতে পারবে ।

রাজনীতি ও নেতৃত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । মানুষের জীবনমান ও কল্যাণ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত । রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রান্তিক ও সাধারণ জনগণের ক্ষুধা , দারিদ্র্য , অসুস্থতা , নিরক্ষরতা , নিপীড়ন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি গুরুত্বপূর্ণ । এটি একটি দেশের টেকসই বা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পৃক্ত । রাষ্ট্রের মতো একটি সম্প্রদায় বা নির্বাচনী এলাকার ক্ষেত্রেও এটি সত্য । শুধু রাজনীতির সমালোচনা, গবেষণা, মতামত নিবন্ধ লেখা বা ওপর থেকে আরোপিত সংস্কারের মাধ্যমে রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না । রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করতে হলে মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল ও আদর্শিক তরুণদের রাজনীতির মূলধারায় আসতে হবে । মেধাবী ও আদর্শিক তরুণদের রাজনীতি করার , তাতে টিকে থাকার এবং সংসদীয় রাজনীতিতে অনুপ্রবেশের সুযোগ দিতে হবে । রাজনীতির ভেতর দিয়েই রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে । জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু ।

 

লেখক : ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার , আহবায়ক , বঙ্গবন্ধু পরিষদ , সুনামগঞ্জ জেলা ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ