হাসপাতাল বাণিজ্যের জন্য নয়

প্রকাশিত: ১:০৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০২০

হাসপাতাল বাণিজ্যের জন্য নয়

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক :; তিরিশ মিনিট অক্সিজেন প্রদানের জন্য ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল বিল করেছে ৮৬ হাজার টাকা। চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন হাসপাতাল স্যালাইন এবং ঘুমের ওষুধ প্রদানের জন্য বিল করেছে ৯৪ হাজার টাকা। এমন সব খবরের সঙ্গে আছে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে সিট থাকা সত্ত্বেও রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার কাহিনি, দুর্বল আইসিইউ সংবাদ যা মানুষের মনে সৃষ্টি করেছে গভীর উদ্বেগের। সঙ্গত কারণেই তাদের প্রশ্ন বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কি কেবল মুনাফা এবং বাণিজ্য করার জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়?

অনেক বেসরকারি হাসপাতাল মালিক কিন্তু এমনটাই ভাবেন। তারা বলে থাকেন, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় প্রচুর অর্থের বিনিয়োগ করা হয় বিধায় উপরি দাবি না করলে তাদের বাণিজ্য হবে না। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল আইন ভঙ্গ করে কেবল ইচ্ছামাফিক ফি আদায় করছে না, ব্ল্যাকমেইলিং প্রক্রিয়ায় রোগীদের অনেক অপ্রয়োজনীয় টেস্ট এবং ওষুধ ক্রয় করতে বাধ্য করছে অধিক মুনাফার জন্য। আকাশচুম্বী ফি নিচ্ছে আইসিইউর জন্য। এ যেন বেআইনি মুনাফার মহোৎসব। ভাবটা এই হাসপাতালগুলো যেন মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এক কথায় যে সময় দেশের মানুষের সর্বনাশ তখন বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের পৌষ মাস।
যে কথাটি সরকারের উচ্চমহল থেকে বলে দেওয়া উচিত সেটি হলো এই সুযোগ নিয়ে বাণিজ্য এবং মুনাফার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। দেওয়া হয় জনগণকে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য, যা সরকারের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব। তারা অবশ্যই ফি দাবি করতে পারেন কিন্তু ফি হতে হবে যৌক্তিক, লাগামহীন মুনাফা উৎপাদক নয়।

হ্যাঁ, তাদের কঠোর ভাষায় বলে দেওয়া উচিত কেবল মুনাফার আশায় পুঁজি বিনিয়োগ করার জায়গা হাসপাতাল নয়। যারা মুনাফার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান তাদের সেটা করতে হবে শিল্প এবং বাণিজ্যিক খাতে। চিকিৎসা খাতে নয়। দুর্ভাগ্যবশত অবৈধভাবে বেসরকারি হাসপাতালকে মুনাফা এবং বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করে দেশে একটি নতুন পুঁজিপতি গোষ্ঠী গজিয়ে উঠেছে। আরও দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সম্প্রতি এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কাছে মাথা নুইয়েছেন অনেকেই। করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মেতেছে অবৈধ আয়ের উৎসবে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল এসব ব্ল্যাকমেইলিং হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা ১৯৮২ সালের আইন প্রয়োগ করে। যেমনটি পশ্চিমবাংলায় কঠোরভাবে করেছেন মমতা ব্যানার্জি। তা ছাড়াও ২০১২-এর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী এসব হাসপাতাল সাময়িকভাবে অধিগ্রহণ করা যেত।

হাসপাতাল যে বাণিজ্যের জন্য নয় সংবিধান এবং প্রচলিত আইনের কথা উল্লেখ করে সেটা বোঝানোই এই লেখনীর উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্ট সবাই যদি তা পালন করে তবেই আমার লেখা সার্থকতা পাবে, দেশ ও দশের মঙ্গল হবে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রকে চিকিৎসাসহ অন্যান্য বিষয়সমূহ নিশ্চিত করতে হবে। মৌলিক উপকরণসমূহ আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হলেও বলা হয়েছে সংবিধান এবং অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যা দানের ক্ষেত্রে এগুলো নির্দেশক হবে।

১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ২৫ অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরি ব্রিটিশ রাজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পক্ষ ছিল বিধায় এর বিধানসমূহ দ্বারা আমরা বাধিত। তদুপরি এই সনদ বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা লাভ করায় আমরা তা মানতে বাধ্য। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী সব আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি সম্মান দেখানো বাধ্যতামূলক।

এটা বোধগম্য যে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে সরকারিভাবে সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত দুরূহ, তাই প্রয়োজন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। অতীতে রণদাপ্রসাদ সাহা, ডাক্তার মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ব্রিগেডিয়ার মালেক, অধ্যাপক নুরুল ইসলামসহ বেশ কিছু মানবহিতৈষী ব্যক্তি বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কুমুদিনী, বারডেম, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, হার্ট ফাউন্ডেশন, আহছানিয়া হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতালসহ বেশকিছু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মানবতার সেবায়। মুনাফার কথা তারা কখনো ভাবেননি।

প্রথমদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আইনের প্রয়োজন ছিল না। পরে যখন বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং অতি মুনাফা লোভী কিছু মানুষ রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার উদ্দেশে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা শুরু করে তখন নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের প্রয়োজনে ১৯৮২ সালে একটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়-নাম মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স। সে সময় বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ছিল ৩৩টি। হাসপাতাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান হতে পারে এই ধারণা সে সময় বিস্তার লাভ করেনি। তাই ৮২ অধ্যাদেশের বিধানসমূহ আজকের প্রেক্ষাপটে অনুপযোগী এবং অপ্রতুল। বেসরকারি হাসপাতালসমূহকে বাণিজ্য করার নিমিত্তে লাইসেন্স প্রদান করা না হলেও তারা যেন রোগীদের থেকে যৌক্তিক ফি আদায় করতে পারে অধ্যাদেশে সে বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে তারা যেন অযৌক্তিক, ইচ্ছামাফিক এবং রোগীকে বিপদে ফেলে গলাকাটা ফি আদায় করতে না পারে সেজন্য অধ্যাদেশের তফসিলে সর্বোচ্চ ফির কথা উল্লেখ থাকলেও তাতে এমন ফাঁকফোকর রয়েছে যার ফলে বেসামরিক হাসপাতালসমূহ আসলেই গলাকাটা ফি নির্ধারণ করতে পারছে। শর্ত ভঙ্গকারী হাসপাতালসমূহের লাইসেন্স বাতিল করার বিধান রয়েছে। বিধান রয়েছে হাসপাতালগুলো শর্তসমূহ পালন করছে কিনা তা সরেজমিন তদারকি করার জন্য পরিদর্শক নিয়োগের। চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সেবীদের সংখ্যা হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, থাকতে হবে উপযুক্ত আইসিইউ।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশকে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং অনুপযোগী বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন ফি আদায়ের ব্যাপারেও রয়েছে অস্পষ্টতা।

২০০০ সালে সরকার একটি উন্নত আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করলেও সেটি দিনের আলোর মুখ দেখেনি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গবেষণায় যেসব চরম অব্যবস্থা, অন্যায়, অবহেলা এবং অপরাধমূলক কাজের ফিরিস্তি উঠে এসেছে সে তালিকা দীর্ঘ। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর সংকট অনেক ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত আইসিইউর অভাব, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, অন্যায় এবং বেআইনি মুনাফার জন্য অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করানো অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় শৈল্য চিকিৎসা বিশেষ করে বিনা প্রয়োজনে সিজারিয়ান করা ইত্যাদি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে ইচ্ছামাফিক অযৌক্তিক ফি আদায়ের কথা যা করতে অনেক সময় রোগীদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশের বহু দুর্বলতা এবং ঘাটতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফি নির্ধারণ এবং তদারকির বিষয়ে অস্পষ্টতা। তদারকির জন্য যথেষ্ট লোকবল নেই বলে মন্ত্রণালয় বলে থাকে।

বেসরকারি হাসপাতালসমূহ যেসব ফৌজদারি অপরাধ করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দন্ডবিধির ৩০৪ ক ধারার অপরাধ। যেটা নরহত্যা কিন্তু খুনের পর্যায়ে পড়ে না। ৩০৪ ক ধারায় যা বলা হয়েছে তার অন্যতম কথা হলো এই যে, গাফিলতির কারণে মৃত্যু ঘটলে ৩০৪ ক ধারায় অপরাধ হবে।

হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের ব্যাপারে আইনি অবস্থা পরিষ্কার, যখন কোনো রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আগমন করে তখনই হাসপাতালের দায়িত্ব শুরু হয়। সে রোগীকে চিকিৎসা দিতে অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু মানে ৩০৪ ক ধারার অপরাধ। ফৌজদারি অপরাধের বাইরে টর্ট আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে এবং এ ধরনের ক্ষতিপূরণের নির্দেশ বহু বছর ধরে আমাদের হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট এবং ভারতের হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট দিচ্ছে। আরও একটি অপরাধ প্রায়ই কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল করে থাকে তা হলো-ফি আদায়ের জন্য মৃত ব্যক্তির লাশ জিম্মি করা। এটি দ-বিধির ২৯৭ এবং ৫০৪ ধারার অপরাধ টর্ট আইনেও এটি বিচারযোগ্য। তা ছাড়া ভ্রান্ত এবং প্রতারণামূলক ফি ধার্য করে ফি আদায় ইত্যাদিও দ-বিধির বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উপযুক্ত এবং যৌক্তিক ফি আদায়ের অধিকার হাসপাতালগুলোর রয়েছে কিন্তু তা আদায় করতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। লাশ জিম্মি রেখে অপরাধমূলক প্রক্রিয়ায় নয়। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।

সম্প্রতি এক ভ্রাম্যমাণ আদালত জাপান বাংলা হাসপাতালকে শাস্তি প্রদান করেছে এক মৃত শিশুর জন্য বিল দাবি করার অপরাধে। ল্যাবএইড হাসপাতালকে সাজা দিয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের জন্য।

আমি হাই কোর্টের বিচারপতি থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মৃদুল চক্রবর্তী ডায়রিয়া নিয়ে ল্যাবএইড হাসপাতলে গেলে দুই ঘণ্টা তাকে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখার পর তার মৃত্যু হলে স্বপ্রণোদিতভাবে ল্যাবএইডের মালিকদের তলব করে চক্রবর্তী পরিবারকে তাৎক্ষণিক ৫০ লাখ টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের আদালতের কাঠগড়ায় বন্দী করে রেখেছিলাম। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ৩০৪ ধারায় মামলা করতে পুলিশের আইজিকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। ইবনে সিনা হাসপাতালের অন্যতম মালিক যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমকে একই ধরনের শাস্তি দিয়েছিলাম তার হাসপাতলে অবহেলায় শিশু মৃত্যুর জন্য। অনেকেই ভাবেন চিকিৎসায় অবহেলার জন্য আমাদের আইন নেই। কথাটা মোটেও ঠিক নয় চিকিৎসায় অবহেলার জন্য যুক্তরাজ্যের আইন থেকে আমাদের আইন মোটেও আলাদা নয়, পার্থক্যটা প্রয়োগে। করোনা সংক্রমণ নতুন করে প্রমাণ করল বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ কত প্রয়োজনীয়।

সরকার বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন করছে বলে জানা গেছে। নতুন আইনে ফি নির্ধারণের বিষয়টিকে অবশ্যই সর্বোচ্চ স্থান দিতে হবে এবং যারা ইচ্ছামাফিক ফি দাবি করবে তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তির বিধান রাখতে হবে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে বলেছেন প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। এই আলোচনায় বিদ্যমান ১৯৮২ সালের আইন প্রয়োগ করে আদেশের মাধ্যমে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া যায়, একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায় যে, রোগী ভর্তি না করলে, অধিক ফি নিলে অথবা অন্য বেআইনি কাজে গা ভাসালে তাদের লাইসেন্স বাতিলযোগ্য। ইতিমধ্যে সেন্ট্রাল বেদ বুর ও প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর আইসিইউ রিক্যুজিশন চেয়ে আদালতে একটি রিট দাখিল করা হয়েছিল। সেই রিটের শুনানির আদেশে আদালত বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ব্যবহারের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করার আদেশ দিয়েছে-

প্রতিনিয়ত হাসপাতাল পরিদর্শনের বিধান থাকতে হবে। আইনে স্পষ্ট বলে দিতে হবে হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়া হয় চিকিৎসা দানের জন্য, বাণিজ্য করার জন্য নয়। এ বিষয়টি কিছুটা বলা হয়েছে ২০১১ সালের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ স্থাপনের নীতিমালায়।

হাসপাতালে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, চিকিৎসা কর্মী, মানসম্মত আইসিইউ, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অক্সিজেন ব্যবস্থাসহ অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী এবং জরুরি বিভাগ না থাকলে লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

হাসপাতালসমূহ যথোপযুক্ত চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে কিনা নিয়মিত নির্ধারিত নিয়মে ফি নিচ্ছে কিনা ইত্যাদি তদারকি এবং ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা বিষয়ক অমবাডসমেন রয়েছে। সেই আদলে আমাদের দেশেও চিকিৎসা বিষয়ক অমবাডসমেন চালু করতে হবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা নালিশ করতে পারবে এবং সে সংস্থা তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

আমাদের জনগণের অধিকাংশই, হাসপাতাল পরিচালকদের থেকে ডাক্তারদের যে পার্থক্য রয়েছে তা অনেকে বুঝতে পারেন না। ডাক্তাররা এই অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের অধীনে কাজ করা একজন কর্মচারী মাত্র। অভিযোগ উঠেছে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এবং ক্লিনিকগুলো সাধারণ ডাক্তারদের বেতন অর্ধেক করে দিয়েছে, ভাড়া বাড়ি থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য চলছে কিন্তু তারা প্রাইভেট ক্লিনিক বা মেডিকেল কলেজের মালিক নন। সেই প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ বা ক্লিনিকের একজন কর্মচারী মাত্র। যদিও কয়েকজন ডাক্তার এই মালিকদের তালিকায় আছেন, যারা আছেন তারাও এই বেনিয়াবৃত্তির হাত ধরেই হাঁটছেন। তারপরও করোনাকালে আমাদের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনপণ করে যেভাবে মানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন তা অভাবনীয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশে করোনায় ডাক্তার মৃত্যুর হার সর্বাধিক। তাদের আত্মত্যাগ যা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে কুষ্ঠ রোগীদের সেবা করেছেন।

আইনের শাসন রক্ষায় আমাদের উচ্চ আদালতসমূহের রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। অতীতের মতো করোনা আকালেও বেশকটি যুগান্তকারী রায় এবং নির্দেশনা দিয়েছে আমাদের হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট। হাই কোর্ট ইউনাইটেড নামক বেসরকারি হাসপাতালকে নির্দেশনা দিয়েছে তাদের অবহেলার জন্য যে কয়জন রোগী দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করার জন্য আলাপ করতে এবং আইন প্রয়োগকারীদের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত ত্বরান্বিত করে ব্যবস্থা নিতে। আদালতের এমন কঠিন অবস্থান এবং একটি যুগোপযোগী নতুন আইন বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের বাধ্য করবে আইনের পথে চলতে এবং মুনাফার ধ্যান-ধারণা পরিহার করে, যুক্তিসঙ্গত ফি আদায় করতে। এটাই সবার কামনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে না থেকেও নিরলসভাবে এই মহামারী রোধে কাজ করছেন সেটি এরই মধ্যে বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। মহামারীকালে আমরা যেসব মঙ্গলাবস্থা অর্জন করতে পেরেছি তার কৃতিত্ব একান্তই জনদরদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। তার কাছে প্রত্যাশা সময়ের বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের বেপরোয়া মুনাফালোভী মনোবৃত্তি, অপরাধমূলক কর্মকা- ও নৈরাজ্য বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ