১৯৮২-এর কাঠামোতে চলছে প্রশাসন সচিব কমিটিতে উপেক্ষিত জনপ্রশাসন সংস্কার

প্রকাশিত: ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২১

১৯৮২-এর কাঠামোতে চলছে প্রশাসন সচিব কমিটিতে উপেক্ষিত জনপ্রশাসন সংস্কার

অনেক আগেই কমিশন হওয়া উচিত ছিল -ফিরোজ মিয়া * ১৯৯৭ সালের শামসুল হক কমিশনের অনেক বিষয় বাস্তবায়ন হয়নি
বাহরাম খান

সচিব কমিটিতে উপেক্ষিত হলো জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ। সম্প্রতি প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ‘জনপ্রশাসন সংস্কার’র লক্ষ্যে নতুন কমিশন গঠনের প্রস্তাব তোলা হয়। কিন্তু কমিটির বৈঠকে সেটি গ্রহণ না করে পরে উত্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এতে জনপ্রশাসন সংস্কারের দীর্ঘ প্রত্যাশিত উদ্যোগ আরেক দফা হোঁচট খেল। সাবেক জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুনের দায়িত্বকালে দুই বছর আগে সংস্কার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এরপর করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেটি থেমে যায়।

সামরিক সরকারগুলোর নেওয়া নীতিনির্ধারণী অনেক বিষয় বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগে বড় পরিসরে কোনো সরকারই হাত দেয়নি। একুশ শতকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রশাসনিক বিন্যাসের কথা সব সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেন। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ এখনো কেউ নেননি।

প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সর্বশেষ বৈঠক ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। এতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যুগোপযোগী আধুনিক জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে নতুন কমিশন গঠনের প্রস্তাব তোলা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর হওয়া প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির ১৪তম বৈঠকের সূত্র তুলে ধরে। সেখানে নেওয়া এক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল-‘সেবাধর্মী ও উন্নয়নমুখী প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি কমিশন গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’ কিন্তু বৈঠকে প্রস্তাবটি আপাতত না ওঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, জনপ্রশাসন এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। অনেক আগেই সংস্কার কমিশন হওয়া উচিত ছিল। যদি কোনো উদ্যোগ থাকে তা সম্পূর্ণ করা উচিত। তিনি বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ইচ্ছেমতো অনেক কিছু করা যায়। তাই সহজে এ ব্যবস্থা কেউ বদলাতে চান না। কিন্তু দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করলে এখনি জনপ্রশাসন সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

দেশের সংবিধানের ১৩৬ অনুচ্ছেদে ‘কর্মবিভাগ-পুর্নগঠন’সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এতে বলা হয়েছে, ‘আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগসমূহের সৃষ্টি, সংযুক্তকরণ ও একীকরণসহ পুনর্গঠনের বিধান করা যাইবে এবং অনুরূপ আইন প্রজাতন্ত্রে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তির কর্মের শর্তাবলীর তারতম্য করিতে ও তাহা রদ করিতে পারিবে।’ সংবিধানে সরকারি কর্মচারীদের জন্য আইন করার নির্দেশ থাকলেও বাস্তবায়ন হয়েছে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর। ২০১৮ সালে প্রণীত সরকারি চাকরি আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে-দক্ষ, জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এমন উদ্যোগের দেখা মিলছে না। সাবেক রাষ্ট্র্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক সরকারের আমলের এনাম (ব্রিগেডিয়ার এনামুল হক খান) কমিশনের সুপারিশের আলোকে তৈরি প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে চলছে এখনো।

সাবেক জনপ্রশাসন সচিব, বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সচিবের মর্যাদায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা শেখ ইউসুফ হারুন যুগান্তরকে বলেন, সরকারের সার্বিক কার‌্যাবলী অনেকগুণ বেড়েছে। এ অবস্থায় জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া খুবই জরুরি। কেন কমিশন গঠনের বিষয়টি দেরি হচ্ছে তা আমার জানা নেই। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কোনো কমিটির নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত নয়। কারণ তুলে ধরে ইউসুফ হারুন বলেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার নেতৃত্বে কমিটি হলে সেটি মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বের বাইরে কিছু চিন্তা করতে পারবে না। কিন্তু কমিশন হলে সেখানে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার একজনকে প্রধান করে কমিটি গঠন হয়। সেই কমিটি সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করেন। এমন একটা কমিশন হওয়া খুবই জরুরি বলে মনে করি।

সরকারের কার্যপ্রণালী বিধিতে (রুলস অব বিজনেস) জনপ্রশাসন সংস্কারের দায়িত্ব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে। অ্যালোকেশন অব বিজনেস অ্যামাং দ্য ডিফারেন্ট মিনিস্ট্রিজ অ্যান্ড ডিভিশনস-এর ৮, ২০ ও ২১ নম্বরে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধির কথা উল্লেখ আছে। যে কোনো সরকার চাইলে এসব কার্যপরিধি প্রয়োগ করে সময়ে সময়ে জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু ১৯৮২-এর ব্রিগেডিয়ার এনামুল হক খানের নেতৃত্বে হওয়া প্রশাসনিক সংস্কারের পর বড় কোনো সংস্কারে হাত দেওয়া হয়নি। ১৯৯৭ সালে এটিএম শামসুল হকের নেতৃত্বে আরেকটি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুপারিশ করেছিল-সেগুলো তেমন আমলে নেওয়া হয়নি। এর বাইরে সব সরকারের আমলেই জনপ্রশাসন সংস্কার সম্পর্কিত কোনো না কোনো কমিটি ও মূল্যায়ন হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন কাঠামোর তেমন উন্নতি হয়নি। তবে নিয়মিত বেতন কমিশন গঠিত হওয়ায় উন্নতি হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, প্রশাসন সংস্কারের বেশ কিছু কাজ চলমান রয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই এসব কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, তারপরও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাতে আরেকটু সময় লাগবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলমান কাজগুলো শেষ হলে জনপ্রশাসনের ইতিবাচক একটি পরিবর্তন দেখা যাবে আশা করি।

‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়’ স্লোগান নিয়ে ২০১২ সালের অক্টোবরে ‘জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র’ প্রণয়ন করা হয়। কৌশলপত্রের ‘নির্বাহী বিভাগ ও জনপ্রশাসন’ অংশে যে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে-পাবলিক সার্ভিসের সামগ্রিক সংস্কার। প্রায় এক দশকে শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের সামান্য কিছু বিষয় বাস্তবায়ন হলেও জনপ্রশাসন সংস্কারে কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি।

এদিকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন পুনর্গঠনের তাগিদ দিয়েছিল ৮ম বেতন কমিশন। সাত বছর আগে দেওয়া কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের উচ্চ এবং নিম্ন পর্যায়ের কিছু পরিবর্তন আনলেও সামগ্রিক দিক বিবেচনায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কারণে প্রশাসনের অনেক জায়গায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের পক্ষ থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনীতির পরিবর্তন, শাসনতান্ত্রিক রদবদল, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরিখে প্রশাসনে বাস্তবসম্মত বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বলা হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে রূপান্তর হলেও দেশের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতির ছাপ থেকে গেছে। যেটা পালটানো প্রয়োজন।

জনপ্রশাসন সংস্কারের যত উদ্যোগ : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে প্রশাসনিক সংস্কারে একটি কমিশন ও দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীনের দুই সপ্তাহের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর গঠন করা হয় ‘সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেস্টোরেশন কমিটি (কার্ক)। কমিটির চেয়ারম্যানসহ সব সদস্যই ছিলেন সরকারি চাকুরে। এ কমিটি ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গঠনসহ সাতটি স্বতন্ত্র সংস্থা গঠনের সুপারিশ করেছিল। বেশিরভাগ সুপারিশ গ্রহণ করা হলেও ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। ন্যায়পাল নিয়োগের কথা সংবিধানেও রয়েছে, কিন্তু ৫০ বছরে কোনো সরকারই তা গ্রহণ করেনি।

একই বছর ১৫ মার্চ ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যান্ড সার্ভিসেস রিঅর্গানাইজেশন কমিটি (এএসআরসি)’ শিরোনামে শক্তিশালী আরেকটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী করে ব্রিটিশ-ভারত প্রশাসনের বৈষম্য কমিয়ে আধুনিক সংস্কারের বহুমুখী সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকারে থাকা সিএসপি অফিসাররা এটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ, এতে তাদের অনেক ক্ষমতা ও প্রভাব কমে যাবে। ঠিক ওই সময়ে দেশে দুর্ভিক্ষসহ নানা জটিলতা থাকায় তৎকালীন সরকার শীর্ষ আমলাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে হাত দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর আমলে প্রথম পে-কমিশন গঠন হয়েছিল ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘পে অ্যান্ড সার্ভিস কমিশন’ গঠন হয়। এ কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে মেধার ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ, সিভিল সার্ভিসের সংজ্ঞা স্পষ্টীকরণ, সিএসপি অফিসারদের সঙ্গে অন্য অফিসারদের পার্থক্য দূরীকরণ, দক্ষ অফিসারদের নিয়ে পুল গঠনসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ১৮ এপ্রিল এনাম আহমেদ খানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ‘মার্শাল ল কমিটি-১’ করে। কমিটির মধ্যে চারজনই ছিলেন সামরিক অফিসার। একজন ছিলেন মধ্যম পর্যায়ের বেসামরিক অফিসার। কমিটির পক্ষ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের মধ্যে ছিল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা কমানো, অহেতুক জনবল নিয়োগ বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় দপ্তর-সংস্থা বিলুপ্তকরণ। এরশাদ সরকার এ কমিটির সুপারিশগুলো গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে। সুপারিশ বাস্তবায়নে আরেকটি কমিটি করে। সেই কমিটি ৩৬ মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ১৯টিতে নামিয়ে আনে। ২৪৩টি দপ্তর-সংস্থাকে ১৮১টিতে কমানো হয়। এ ছাড়া ১২টি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কমিয়ে ৯টি করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নিম্ন পর্যায়ে কর্মরত সাড়ে ৯ হাজার কর্মচারীর মধ্যে ৩ হাজারের কিছু বেশি রাখা হয়।

১৯৮৩ সালের ৮ মে ‘মার্শাল ল কমিটি-২’ গঠন হয় স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্যায়ন করতে। এ কমিটিও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের চিত্র খুঁজে পেয়ে তা পর্যায়ক্রমে কমানো সুপারিশ করে। অন্যদিকে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘কমিটি ফর এক্সিমিনিশন অব ইরেগুলিরিটিজ (সিইআই)’ গঠন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনা, কর্মরত যোগ্য ও দক্ষ অফিসারদের ক্যাডারভুক্ত করা, বিভিন্ন বিষয়ে বিধি প্রণয়নের বেশ কিছু সুপারিশ করলেও এসব বিষয় তৎকালীন সরকার তেমন আমলে নেয়নি। এরশাদ সরকারের আমলে সেক্রেটারিয়েট কমিটি, স্পেশাল কমিটি, কেবিনেট সাব-কমিটি ও কাউন্সিল কমিটি শীর্ষক কিছু বিষয়ভিত্তিক কমিটিও হয়েছিল।

১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার আমলে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রি-অরগানাইজেশন কমিটি (এআরসি)’ গঠন হয়। কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া সুপারিশে তৎকালীন ৩৫টি মন্ত্রণালয়কে ২২টি, ২৫৭টি দপ্তর-অধিদপ্তরকে ২২৪টিতে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছিল। সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, হিসাব বিভাগ এবং অডিট বিভাগকে পৃথকীকরণের সুপারিশ করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে বিদেশে থাকা মিশন কমানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। নূরুনন্নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটি ক্যাডার সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তৎকালীন অফিসারদের ব্যাপক আপত্তির মুখে এ কমিশনের সুপারিশ আমলে নেয়নি সরকার।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্ম কমিশন (এআরসি)’ গঠন হয়েছিল। সাত সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান ও একাধিক সদস্য সংশিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর ১৯৯৭ সালে এটিএম শামসুল হকের নেতৃত্বে ‘পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিফর্ম কমিশন (পার্ক)’ গঠন হয়। এ পর্যন্ত গঠন হওয়া কমিশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো তিন ধাপে তুলে ধরেছে এ কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে-মন্ত্রণালয়গুলোকে তিনটি গুচ্ছ ভাগে ভাগ করা, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সরকারি দলিলে সাধারণের প্রবেশ সুবিধা তৈরি, অডিট এবং হিসাব বিভাগকে আলাদা করা, সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পুল গঠন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা কমানো, ন্যায়পাল নিয়োগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, সিটিজেন চার্টার নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনাকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা, সরকারি জনবল নিয়োগে সাধারণ-টেকনিক্যাল-শিক্ষা সংক্রান্ত তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিফর্ম মনিটরিং কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করে শামসুল হক কমিশন। এসব সুপারিশের দু-এটি পূরণ করা হলেও বাকিগুলো কাগুজেই রয়ে গেছে।

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সরকারি কর্মচারীদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং, পদোন্নতি, পদায়ন ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে গত প্রায় একযুগ ক্যারিয়ার প্ল্যানিং নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে সেটি আলোর মুখ দেখেনি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ সালে পাশ হয়েছে। অনির্বাচিত এ সরকারের আমলে নেওয়া উদ্যোগের মধ্যে ছিল ‘সিভিল সার্ভিস অথরিটি’ গঠন করা। কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন টানা একযুগের সরকারে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন হয়নি। তবে পূর্ববর্তী বিভিন্ন কমিশন ও কমিটির সুপারিশ এবং সরকার নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে কিছু কাজ করছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশপত্র-২০১২ (এনআইএস) প্রণয়ন করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে ই-ফাইলে কাজ শুরু হয়েছে। কর্মচারীদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) নম্বরিংয়ের প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন করে নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। গ্রিভেন্স রিড্রেস সিস্টেমের (জিআরএস) মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ প্রতিকারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কমিটি একাধিক বৈঠক করে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
সুত্র : যুগান্তর

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ