৭১ এর মুক্তি যুদ্ধের মাঠের দিন গুলি (টেকেরঘাট)

প্রকাশিত: ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২১

৭১ এর মুক্তি যুদ্ধের মাঠের দিন গুলি (টেকেরঘাট)

নজির হোসেন
সাবেক সংসদ সদস্য
সুনামগঞ্জ ১

আমি টেকেরঘাটে আসায় প্রথমে খুশী হলেও পরবর্তীতে কিছুটা দুরত্ব হয় জনাব আব্দুজ জহুর সাহেবের সাথে ৷। ।ইতিমধ্যে জনাব হুসেন বখত সাহেব টেকের ঘাটে চলে আসেন ।আমার কাজ করার সুযোগ বেড়ে যায়।আমার সাথে বখত সাহেবের রাজনৈতিক আন্তরিকতা এবং সমঝোতা ছিল অনেক বেশী ।একদিন জনাব জহুর সাহেবের সাথে নুতন সেক্টর প্রতিষ্টার ব্যাপারে আলোচনা করি।তিনি বেশ শীতল প্রতিক্রিয়া দেখালেন ।কারন টেকেরঘাটের বেসরকারি কতৃত্বের সর্বেসর্বা ছিলেন তিনি এখন আরো এক সামরিক কতৃত্ব সৃষ্টি তার মনোঃপুত হয়নি ।অবশ্য এটা নিয়ে আর কোন মনোভাব তিনি প্রকাশ করেননি।তার নেতৃত্বই গড়ে ওঠে টেকেরঘাটের বেসামরিক প্রশাসন ৷হাজার হাজার মানুষের চাপ সামলাতে হতো তাকে ৷তাকে কেন্দ্র করে বড়দল গ্রামের ডঃ হারিসে উদ্দিনের উদ্দোগে টেকের ঘাটের চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ৷সাবসেক্টর প্রতিষ্টার পর মুক্তিযুদ্ধাদের খাবার ,ট্রেনিং ক্যাম্পের খাবার,দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত অথিতিদের অপ্যায়ন ,ভিআইপিদের শিলং যেতে সহায়তা ,ইত্যাদি কাজের দায়িত্ব পড়ে জনাব আব্দুজ জহুরের উপর ৷চাউল,ডাল সবজি মাছ মাংসের জোগান নিশ্চিত রাখা চাট্টিখানী কাজ ছিল না ৷এছাড়া ছিল আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ কর্মীদের চাপ ৷সব ছেয়ে ঘুরুত্বপূর্ন কাজ ছিল ১৬ কার্গোর মালামাল ব্যবস্থাপনা ৷মালামালের গোদামজাত করন ৷তালিকা ,মওজুত সংরক্ষন, পাহাড়া অবশেষে ঐগুলি বিক্রি করে সুনামগঞ্জ মুক্তযুদ্ধা কল্যান ষ্ট্রাষ্টের অর্থ জোগান এক বিশাল কর্ম যজ্ঞ করেন জনাব আব্দুজহুর সাব ৷কিন্তু ষ্ট্রাষ্ট গঠন প্রক্রিয়ায় তার নামটি পর্যন্ত উল্লেখ নেই ৷
আমি তাড়াতড়ি সেনদাকে টেকেরঘাট এসে সবাইকে নিয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরির অনুরোধ জানাই ।ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ,সেনদা এবং টেকেরঘাট সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সবাই বসে কাজ ভাগ করে নেওয়ার সবাই যার যার কাজে লেগে যাওয়ায় সবাই যুদ্ধের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ।বেসামরিক এবং সামিরক কাজ দুইভাগ করে দায়িত্ব বন্টনের ফলে সমস্ত বেসামরিক কাজের নেতৃত্ব চলে যায় জনাব জহুর সাহেবের কাছে ।
সামরিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে আমি আর বেসামরিক কাজে সময় দেওয়ার সুযোগ পাইনি।টেকেরঘাটে অনেক রাজনৈতিক নেতা জড়ো হয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে জনাব হোসেনবখত ছাড়াও বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব আব্দুল হামিদ তখনকার কিশোর গঞ্জ এলাকার এমএনএ কিছুক্ষনের জন্য টেকেরঘাট রেষ্ট হাউসে অবসথান নিয়ে ছিলেন ।শিলং যাওয়ার অন্য কোন সহজ পথ ছিলনা বলে তিনি টেকের ঘাটের এই পথটি বেছে নেন ।রেষ্ট হাউসে আমার সাথে কিছু সময় আন্তরিক আলাপ হয় ।এবং জহুর সাহেবের অবস্থান জানতে চান ।একজন মুক্তিযুদ্ধা তাকে জহুর সাহেবের বাসায় নিয়ে যায় ।তিনি ঐ দিনেই বিএসেফ এর সাথে বন্দোবস্ত করে শিলং চলে যান ।
আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুলহুদা এবং ন্যাপ সভাপতি আব্দুল আজিজ দুজনই যার যার কর্মী বাহিনী নিয়ে সংগ্রাম পরিষদের কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন ।তাহিরপুথানার আওয়ামী লীগ ন্যাপ ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়ন এর বিপুল সংখ্যক নেতা কর্মী টেকেরঘাটে এসে সমবেত হয়েছিলেন ৷
আঃ নুর (আখঞ্জি) , আঃ আজিজ ,সুবেদার গণি ,আলী আমজাদ ,কালা মিয়া (তাহিরপুর) ,রাজেন্দ্র পুরকায়স্থ (চিকসা) ;আঃ কাদির (রতনশ্রী) ,হাজী রহিম উদ্দিন , আঃ কুদ্দুছ , আঃ কাদির তালুকদার ,মোঃ মইনুল হক , আঃ ছোবহান (বড়দল) ,আঃ হান্নান ,রমিজ উদ্দিন (কাউকান্দি) ,ফটিক মেম্বার (গোলকপুর) ,আশজদ আখঞ্জি , শহীদ তালুকদার (তরঙ্গ) , আঃ হামিদ ,দুলা মিয়া , আঃ মতিন (শ্রীপুর) ,মকবুল হোসেন মাষ্টার (পাটাবুকা) ,ইসমাইল মড়ল (লামাগঁাও) ,মুক্তার আলী , আঃ রউফ (রামজীবনপুর) ,ফতে আলী মজুমদার * আঃ ছালাম (বালিজুড়ী) *কাজী আঃ কাদির (শক্তিয়ারখলা) , আঃ সাত্তার (দুর্গাপুর) ,লায়েছ চেয়ারম্যান (সিরাজপুর) ,মোজাহিদ উদ্দিন (বাদাঘাট) ,গোলাম মোস্তফা ,আতাউর রহমান (মোল্লাপাড়া) ,জালাল উদ্দিন (মুদাইরগাও) ,আবু তাহের,কালু মেম্বার (কাশতাল) ,আব্দুল মজিদ (শিবের চর) ৷ তাদের অবদান মূখ্য ভুমিকা রেখেছিলো সেইসময়।
।অনেকেই মুক্তিযুদ্ধা ট্রেনীং নিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন ।আবার অনেকে যুদ্ধের বেসামরিক কাজে সহযোগিতা করেন ।আসলেই যুদ্ধটা ছিল জনযুদ্ধ ।
সুনামগঞ্জ জেলার বাইরে থেকে যারা এখানে সমবেত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ মহকুমা, নেত্রকোনা মহকুমা , হবিগঞ্জ মহকুমা, ব্রাম্মনবারিয়া মহকুমা অঞ্চলের ছাত্রলীগ ছাত্রইউনিয়নর লোকজনই ছিল বেশী ।তাহিরপুর জামালগঞ্জ ধর্মপাশা শাল্লার লোকজন ব্যাপকভাবে টেকের ঘাটে এসে সমবেত হন ।অন্যান্য অঞ্চলের অংশ গ্রহন ছিল ছিটে ফুটা ।উল্লেখ যোগ্য ব্যক্তিত্বের মধ্যে নবীগঞ্জের বিধুবাবু এবং কিশোরগঞ্জের মাহফুজ ভুইয়া ।কিশোরগঞ্জ থেকে ছাত্রইউনিয়নের সিরাজ,মতিউর এবং নেত্রকোনার লিপসা থেকে ছাত্র লীগের মনোয়ার এবং গোলাম মৌলা ছিল উল্লেখ যোগ্য ছাত্রনেতাএই সময়ে টেকেরঘাটের এসে পৌঁছল ষাটের দশকের শেষ দিকের সিলেটের অন্যতম তুখোর ছাত্রইউনিয়ন নেতা আমার খুবই ঘনিষ্ট আব্দুল মুনায়েম (নেহেরু)। আমি টেকেরঘাট পৌঁছার পর থেকেই তার কথা ভাবছিলাম, সে তখন সলিটেে ইপআির বাহনিীর সাথে প্রতরিোধ যুদ্ধে নয়িোজতি ছলি ৷ সে সময়ে শারিরীকভাবে অসুস্থ্য থাকা সত্তে¡ও পর দিন সিলেট শহর ত্যাগ করে পায়ে হেঁটে ৬ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে জামালগঞ্জ থানার অর্ন্তগত তার বাড়িতে পৌঁছে। শারিরীকভাবে সুস্থ হয়ে জুন, ১৯৭১ এর ২য় সপ্তাহে টেকেরঘাট এসে আমার নিকট রিপোর্ট করে। আমি তখন তাকে টেকেরঘাট সাব সেক্টর সদর দপ্তরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা তাদের পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী বেসামরিক লোকজনকে খাদ্য সরবরাহের (রেশন বিভাগ) দায়িত্ব অর্পন করলাম। পরবর্তীতে সে টেকেরঘাট সদর দপ্তরের অস্ত্রাগার, কন্ট্রোল রুমেও দায়িত্ব পালন করে। নেহেরু টেকেরঘাট পৌঁছার পরপরেই ই.পি.আর এর নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই তাকে রাইফেল, এসএমজি, গ্রেনেড নিক্ষেপসহ গেরিলা যুদ্ধের বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
সুনামজঞ্জ থেকে আসেন সুনামগঞ্জ মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক জনাব হোসেন বখত ।সুনামগঞ্জ মহকুমায় ৭০ সালের আওয়ামী লীগ গড়ে তোলার কারিগর ছিলেন তিনি ।বঙ্গবন্ধুর অ্ত্যান্ত বিশ্বস্ত ছিলেন তিনি ।৭১ মধ্য এপ্রিলে সুনামগঞ্জ ছেড়ে বালাট চলে আসেন ।কিন্তু ওবাদুররেজা সাহেবের একক কর্তৃত্ব এবং তার নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বাস্তব পরিস্থীতি তাকে টেকের ঘাট টেনে নিয়ে আসে ।ফলে টেকেরঘাট জনাব হোসেন বখতের উপস্থিতিতে আওয়মী সুভিনিজম মুক্ত হয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি ঐক্যবদ্ধ মুর্চা হিসেবে গড়ে ওঠে ।আমিও অনেকটা নির্ভার হয়ে সামরিক কাজে আত্ন নিয়োগ করি ।
(চলবে )

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ