হে আল্লাহ! করোনায় মৃত্যু নয় তোমার হেফাজতে যেতে চাই

প্রকাশিত: ৩:২৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

হে আল্লাহ! করোনায় মৃত্যু নয় তোমার হেফাজতে যেতে চাই

সৈয়দ নজরুল ইসলাম

‘প্রাণিমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫। মহান আল্লাহর এ অমোঘ বিধান অনুযায়ী আমাদের তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে তা আজ হোক বা কয়েক দিন/মাস/বছর পর হোক। কিন্তু এমন মৃত্যু চাই না যে মৃত্যুর পর আমার /আমাদের শেষ গোসল দিতে, জানাজার সালাত ও কবরস্থ করতে মানুষ এমনকি আমাদের পরিবার-পরিজন কাছে আসবে না। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর যে কটি দিন বেঁচে থাকছি তাও পৃথিবীর কবরজীবন, অর্থাৎ সঙ্গীহীন, পরিবার-পরিজন-বিহীন। তওবা করারও সুযোগ পাচ্ছি না। তাই এখন থেকে বাঁচতে চাই তওবা করে প্রতিদিনের ফরজ সালাত আদায় করে। (রোজা ও জাকাত আগামী বছর বাঁচলে করব সে সুযোগ না পেলে তওবা ও সালাতের পুঁজি নিয়ে যেতে চাই এ নিয়তই করছি)।

প্রথমেই করোনার শিক্ষার দিকে তাকানো যাক। করোনা বলছে, বারবার হাত-মুখ ধুলে সে তার কাছে আসবে না। এর সমর্থনে আরেকটু যোগ করে যদি বলি, করোনা বলছে বারবার হাত ধোয়ার পাশাপাশি অজু করে নাও। অজু করলে তোমাদের মুখে তিনবার পানি দিয়ে গড়গড়া, নাকে তিনবার পানি নিয়ে নাক ঝাড়া, কনুই ও পায়ের খোলা অংশ ধুয়ে এবং মহান আল্লাহর কাছে দেহ পরিচ্ছন্ন হয়ে দাঁড়াও। পৃথিবীর মানুষের কাছে তো ঘামযুক্ত পোশাক নিয়ে দাঁড়াও না। তাই আসুন করোনার উপদেশ অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচবার অজু করে অতীতের অপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি তওবা করে প্রতিদিন ফরজ সালাতে দাঁড়াই। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত শেষে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো পদ্ধতিতে জিকির করে আল্লাহর ক্ষমা ও তাঁর হেফাজতে যাওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করি।
আমাদের দেশে নামাজ শেষে জিকির করার প্রবণতা একেবারেই কম। আমরা নামাজের সালাম ফেরানোর পরপরই অনেকে জায়নামাজ থেকে উঠে যাই, আর যারা বসে থাকি তারা ইমামের দিকে চেয়ে থাকি কখন ইমাম সাহেব বলবেন আল্লাহুম্মা আন্তাস সালাম। অথবা অন্য কোনো দোয়া পাঠ করবেন ওই সময় পর্যন্ত। অথচ আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘যখন তোমরা সালাত শেষ করবে তখন তোমরা তোমাদের অবস্থান অনুযায়ী দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর স্মরণ (মানে জিকির) করবে।’ সুরা নিসা, আয়াত ১০৩। সুরা আহজাবের ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াতসহ আরও বহু আয়াতে আল্লাহ তাঁর পবিত্রতা ও মহত্ত্ব ঘোষণার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করি না। নামাজ শেষ হয়েছে আর কি, যার যার মতো কর্ম করছি। অথচ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, সালাতের সালাম ফেরানোর পর সম্মিলিত মুনাজাত তো নয়ই, এমনকি আল্লাহর জিকির না করে সুন্নত নামাজের জন্য দাঁড়ানোও রসুলের সুন্নতের পরিপন্থী কাজ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহ রসুলুল্লাহকে প্রত্যেক সালাত শেষে তসবিহ পাঠের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহর বাণী, ‘আদবারাস সুজুদ’ অর্থাৎ সিজদাসমূহের সমাপ্তির পর অর্থাৎ সালাত শেষে তসবিহ পড়। বুখারি।

প্রতি ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর জিকির-তসবিহ পাঠ করলে অনেক নেকি হাসিলসহ আল্লাহর জিম্মায় যাওয়া যায়। সুরা আহজাবের ৩৫ নম্বর আয়াত দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, ‘আল্লাহকে অধিক মাত্রায় স্মরণকারী পুুরুষ ও নারীদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার প্রস্তুত রয়েছে।’ তাই আল্লাহর বাণী ও নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রেখে আমরা সহি সুন্নত অনুসরণে আমাদের জানা কমপক্ষে নিম্নোক্ত জিকির প্রতি ফরজ নামাজ শেষে পাঠ করে আল্লাহর ক্ষমা ও পুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাব ইনশা আল্লাহ। ১. সালাতের সালাম ফেরানোর পর প্রথমে আস্তাগ ফিরুল্লাহ তিনবার পাঠ করা। এর ফলে সালাতের মন এদিকওদিক বা কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে তার ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে। ২. আল্লাহুম্মা আন্তাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারকতা ইয়া জালজালালি ওয়া ইকাম (একবার)। ৩. কলমা শাহাদাত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মূল্ক্ ওয়ালাহুল হামদ্ ওয়াহুয়া আলাইকুল্লি শাইয়িন কদির (একবার)। ৪. সুবহানাল্লাহ (৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ (৩৩ বার), আল্লাহু আকবার (৩৩ বার) ১০০ পূরণ করব। আবার কলমা শাহাদাত বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মূল্ক্ ওয়ালাহুল হামদ্ ওয়াহুয়া আলাইকুল্লি শাইয়িন কদির। এ দোয়া পাঠকারীর সগিরা গুনাহ আসমান-জমিন সমান হলেও আল্লাহু ক্ষমা করে দেবেন (মুসলিম)। এরপর কেউ যদি খাঁটি তওবা করে এবং সে পাপ থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে ওই ধরনের পাপ কাজে লিপ্ত না হয় তাহলে তার কবিরা গুনাহও মাফ করে দেবেন। ৫. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস ফজর ও মাগরিবের সালাত শেষে প্রতিটি তিনবার করে জোহর, আসর ও ইশার সালাতে একবার করে। পাঠকারী ব্যক্তিকে এক সালাতের পর থেকে পরবর্তী সালাত পর্যন্ত আল্লাহ নিরাপদ রাখবেন। ৬. আয়াতুল কুরসি : কুরআনুল কারিমের সর্ববৃহৎ আয়াত প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর পাঠ করতে হবে। পাঠকারীকে আল্লাহ মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে রেহাই দেবেন। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, যার মৃত্যুযন্ত্রণা হবে না তার কবরে আজাব হবে না, হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা থেকে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে থাকবেন এবং জান্নাতবাসী হবেন। ৭. সুরা তওবার শেষ আয়াত- হাসবিই আল্লাহু লা-ইলা-হা ইল্লাহুয়া আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়াহুয়া রব্বুল আরশিল আজিম। (সাতবার) পাঠকারীর উৎকণ্ঠা দূরীভূত হবে। ৮. সাইয়্যিদুল ইসতিগফার একবার (আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি… ফাইন্নবাহ লা ইয়াগ ফুরুর জুলব ইল্লা আন্তা)। শাদ হবনু আউস (রা.) বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এটি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দোয়া।

লেখক : বীরমুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, রাজউক।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন