বরেণ্য নেতাদের যেমন দেখেছি

প্রকাশিত: ৩:২৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

বরেণ্য নেতাদের যেমন দেখেছি

রণেশ মৈত্র

১৫ বছর বয়স তখন আমার। ভর্তি হয়েছি অষ্টম শ্রেণিতে পাবনা গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে ১৯৪৮ সালে। ওই বছরের মার্চে ভাষা আন্দোলনের শুরু। বুঝে-না বুঝে ওই ১৫ বছর বয়সেই রাজনীতির অঙ্গনে পা ফেলতে শুরু করি।

পাকিস্তান আমল সবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু যাত্রালগ্ন থেকে আজতক সে দেশে গণতন্ত্রের নাম-নিশানাটুকুও চোখে পড়েনি নাগরিকদের। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা। জাতীয়তায় বাঙালি। পশ্চিম পাকিস্তানের চক্ষুশূল। তাই বাঙালি জাতি ও তার অবিসংবাদিত নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ছাত্রসমাজই ছিল ওই আন্দোলনগুলো গড়ে তোলার প্রধান অবলম্বন। ছাত্র হিসেবে আমিও তাতে ওই ’৪৮ সালেই জড়িয়ে পড়ি। আর সে কারণেই আমার সুযোগ হয়েছে তৎকালীন বরেণ্য জাতীয় নেতৃবৃন্দের ভোজনদৃশ্য দেখার। এঁরা হলেন- শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ।
হামেশাই ১৪৪ ধারা জারি, সভা-সমিতি, মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের স্বাধীনতা হরণ- এগুলো ছিল তখনকার দৈনন্দিন ঘটনা। কিন্তু আন্দোলন তাতে থামেনি, বরং এ-জাতীয় নির্যাতন ও জুলুমের অবসানের দাবিতে ক্রমান্বয়ে আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। এ আন্দোলনে গতি সঞ্চার করতে একদিকে বিভিন্ন দাবিতে বিভিন্ন দিবস ঘোষণা করা হতো যা প্রধানত স্থানীয় নেতা-কর্মীরাই সংগঠিত করতেন; তেমনি বেশ ঘন ঘনই বরেণ্য নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন জেলা সফর করতে আসতেন। সে উপলক্ষে আয়োজিত হতো বিশাল বিশাল কর্মী সম্মেলন ও জনসভার। ফলে আন্দোলনগুলোয় নতুন গতিবেগেরই সঞ্চার হতো এবং সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাও ঘটত। ওই আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ছাত্র হত্যার পর থেকে গণসম্পৃক্ততা ঘটতে শুরু হয়। পাকিস্তানি জোশ ধীরে ধীরে অস্তাচলে যেতে থাকে।

ভাষা আন্দোলনে গুলি চালনার পর ধীরে ধীরে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নামতে শুরু করে। একপর্যায়ে পাকিস্তানে নতুন নির্বাচন চাই- এ দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম লীগ ও তার পরিচালিত সরকার তখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের ৩০টির বেশি আসনে সংসদ সদস্যের মৃত্যু, দেশত্যাগ প্রভৃতি কারণে শূন্য হয়ে পড়লেও সে আসনগুলোয় উপনির্বাচনের আয়োজন করতে সাহস পায়নি। একদিকে ক্রমবর্ধমান নির্যাতন অন্যদিকে গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন অমান্য করে অতগুলো আসনে উপনির্বাচন না দেওয়ার ফলে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জোরদার হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সরকার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দিতে সম্মত হয় এবং ১৯৫৪ সালের মার্চের প্রথম দিকে ওই নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে।

ওই নির্বাচনকে যেমন দেশের ছাত্র-যুব সমাজ, তেমনই সব গণতন্ত্রকামী দল ও বরেণ্য নেতারা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন। ছাত্র সংগঠন ও যুবলীগসহ (আওয়ামী যুবলীগ নয়, কারণ তার তখন জন্মই হয়নি) গণতন্ত্রকামী দল ও নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিটি আসনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একক প্রার্থী ঘোষণা এবং সে কারণে একটি যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে- এমন দাবি উত্থাপন করেন জোরেশোরে।

সে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী মুসলিম লীগ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টি বা কেএসপি, গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলাম পার্টি সমবায়ে হক-ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় এবং সব আসনে একজন করে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়নপর্ব শেষ হতেই জাতীয় নেতৃবৃন্দ জনমত গড়ে তুলতে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের সপক্ষে ব্যাপক প্রচারাভিযানে নেমে পড়েন।

তখন পাবনা সদর (পাবনা-৫) আসনে মনোনয়ন পান কৃষক শ্রমিক পার্টির প্রার্থী আবদুল গফুর। শেরেবাংলা বিভাগ-উত্তর পাবনায় ওই প্রথম এলেন তাঁর দলীয় প্রার্থীর সপক্ষে জনসভা অনুষ্ঠানের জন্য। থাকলেন পাবনা সার্কিট হাউসে। বিশাল জনসভা হলো পাবনা স্টেডিয়াম ময়দানে। পরদিন সকালে শেরেবাংলা ব্রেকফাস্ট করবেন তাঁর প্রার্থী গফুর সাহেবের বাসায়। যেহেতু কৃষক শ্রমিক পার্টির কোনো কর্মী ছিল না, তাই ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের বলা হয়েছিল শেরেবাংলাকে নাশতা খাওয়ানোর কাজে সহায়তা করতে। সৌভাগ্যক্রমে আমাকেও বলা হয়েছিল ওই দায়িত্ব পালন করতে। তাই উপস্থিত থেকে শেরেবাংলাকে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখা এবং খাওয়ানোর সুবাদে তাঁর ভোজনপর্ব দেখার সুযোগ হয়েছিল। যেমন উঁচু, লম্বা, ভারী ওজনের দেহ শেরেবাংলার, তেমনই উঁচু মাপের আয়োজন ব্রেকফাস্টের। বাড়িতে কাজের লোক বেশি না থাকায় ভিতর থেকে প্লেট, গ্লাস ও খাবার যা যা তৈরি হয়েছে সেগুলো এনে আমরাই পরিবেশন করছিলাম। চীনামাটির এক বিশাল প্লেট শেরেবাংলার সামনে, আর টেবিলে এক পাত্রে ডজন দুই বড় সাইজের ঘিয়ে ভাজা পরোটা, বড় এক পাত্রে প্রচুর মুরগির মাংস, ২৪টি সেদ্ধ ডিম, এক ছড়া বড় শবরি কলার কথা মনে আছে। ভাবছিলাম অত বেশি বয়সের মানুষ এত খাবার খেতে পারবেন না।

কিন্তু না, পরোটাগুলো এক এক করে হাতে তুলে ছিঁড়ে টুকরাগুলো মুখে পুরছেন অতঃপর মাংস, এক এক করে সিদ্ধ ডিম মুখে পুরছেন, সেগুলো শেষ করে কলা ১০-১২টা! যা যা আনা হয়েছিল তার কোনো কিছুই প্রায় অবশিষ্ট থাকেনি। আজ এমন ভোজনের কথা সবার কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। তবে যেহেতু চোখে দেখেছি তাই হুবহু বর্ণনা করলাম। দীর্ঘ দেহ, ফলে বিরাট হাঁ। তাই যা-ই মুখে দিচ্ছেন সবই গিলে খাওয়ার মতো খেয়ে ফেলছেন। ভাবলাম ব্রেকফাস্ট এমন হলে লাঞ্চ, ডিনার বা কেমন! এটা ১৯৫৪ সালের কথা। অতঃপর ’৬২ সাল। আইয়ুবের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছে। ছাত্রসমাজ ওই আন্দোলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ। নয় নেতা এক যুক্ত বিবৃতি দিলেন সামরিক শাসন প্রত্যাহার, পাকিস্তানব্যাপী সাধারণ নির্বাচন, রাজবন্দীদের মুক্তি প্রভৃতি দাবি তুলে। মওলানা ভাসানী তখন জেলে। নয় নেতার মধ্যে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, মাহমুদ আলী, আবু হোসেন সরকার, নূরুল আমিন, যাদু মিয়া প্রমুখ। ওই নয় নেতার যুক্ত বিবৃতি সংবাদপত্রে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশব্যাপী তার সপক্ষে বিপুল সাড়া, আলোড়নের সৃষ্টি হয়। ফলে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট-এনডিএফ নামে একটি ঐক্য মোর্চা গঠন করে নেতারা দেশব্যাপী সফর, জনসভা করতে বেরিয়ে পড়েন। উত্তরবঙ্গ সফর তাঁরা শুরু করেন পাবনা দিয়ে। বিশাল জনসভা হয় পাবনা স্টেডিয়াম ময়দানে। নেতারা থাকলেন পাবনা সার্কিট হাউসে- স্টেডিয়াম থেকে হাঁটা পথে মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা। টিমে নাম থাকলেও নূরুল আমিন আসেননি; তাঁর নামে সর্বত্র কর্মীদের আপত্তি থাকার কারণে।

যা হোক, বিকালে জনসভা হলো। সন্ধ্যায় তা শেষ করে পরদিন সকালে নেতৃবৃন্দ ঈশ্বরদী থেকে ট্রেনে উত্তরবঙ্গের বড় বড় জায়গায় যাবেন। আমি তখন দৈনিক সংবাদের পাবনা সংবাদদাতা। সংবাদ অফিস থেকে টেলিগ্রামে আমাকে জানানো হয়েছিল এনডিএফ নেতাদের উত্তরবঙ্গ সফর কভার করার জন্য। মুজিব ভাই পাবনার জনসভা শেষে বললেন, সংবাদ তাঁকে জানিয়েছে আমি তাঁদের সঙ্গে যাব। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আমি প্রস্তুত কিনা। জানালাম, আমি প্রস্তুত।

যথারীতি পরদিন সকালে বাসা থেকে নাশতা সেরে সার্কিট হাউসে এলাম। খানিক পরই নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসে ঈশ্বরদী এবং সেখান থেকে ট্রেনে রাজশাহী। সেখানে সার্কিট হাউসে সবার থাকার ব্যবস্থা। বিকালে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে বিশাল জনসভা। অতঃপর প্রেস টেলিগ্রামে সংবাদ পাঠালাম। পাবনার জনসভার পরও তাই করা হয়েছিল। সময় হাতে না থাকায় সার্কিট হাউস থেকে দ্রুত রাতের খাবার নিজ রুমে বসে খেয়েই সবার সঙ্গে রাজশাহী স্টেশনের দিকে ছুটতে হলো।

নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, আবু হোসেন সরকার, মাহমুদ আলী, যাদু মিয়া প্রমুখ। ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছিলেন দুজন। একজন ইত্তেফাক থেকে, অন্যজন বার্তা সংস্থা পিপিআই (পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) থেকে। আমি খবর পাঠাতাম প্রেস টেলিগ্রামে, তারা টেলিফোনে (ল্যান্ডফোন)।

ট্রেন গিয়ে থামল সান্তাহার স্টেশনে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব এক কামরায়, অন্য নেতৃবৃন্দ অন্য কামরায়; আমরা সাংবাদিক তিনজন অন্য কামরায়। সকালে নাটোর স্টেশনে সামান্য স্টপেজ। হালকা নাশতা চলে এলো আমাদের কামরায়। পরপরই নেমে এলেন মুজিব ভাই। প্ল্যাটফরমের ওপর ইত্তেফাক ও সংবাদ হাতে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের ঘুম কেমন হয়েছে, নাশতা পেলাম কিনা ইত্যাদি। তিনি স্বেচ্ছায় পরমযতেœ এ কাজ করে চলেছেন সর্বত্রই। পত্রিকা দুটি দেখিয়ে বললেন, ‘সংবাদ’-এর নিউজ সবচেয়ে ভালো হয়েছে। অতঃপর সান্তাহার। সেখানে জনসভা বিকালে। দুপুরে ওখানেই লাঞ্চের আয়োজন। এই প্রথম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একত্রে খাওয়ার ব্যবস্থা।

চেয়ে দেখি ভোজনের বিশাল আয়োজন। যেমন- পোলাও, দুই রকমের মাংস, মাংসের চপ, দই, মিষ্টি ইত্যাদি। পরিবেশনকারীরা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পাতে কোনো আইটেম একটু কমে এলেই আবার দিচ্ছেন কিন্তু সোহরাওয়ার্দী সাহেব বিন্দুমাত্র আপত্তি না করে বেমালুম সবই খেয়ে যাচ্ছেন। শেরেবাংলা ছিলেন প্রায় প্রাচীন যুগের নেতা- যে যুগে খাবার প্রতিযোগিতা চলত। সর্বাধিক যিনি খেতে পারতেন তিনি পুরস্কৃত হতেন। ছোটবেলায় দেখেছি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের কেমিস্ট্রির শিক্ষক ডা. মনীন্দ্র মজুমদার এমন এক প্রতিযোগিতায় ৮০টি বড় বড় পানতুয়া খেয়ে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। এগুলো অনেকটা ফিউডাল যুগের ব্যাপার। কিন্তু আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য অনুরাগী সোহরাওয়ার্দী সাহেব অমন খাবেন- কেউই আমরা ভাবতে পারিনি।

জনসভা শেষে আবার ট্রেনযোগে পার্বতীপুর। সেখানেই রাতযাপন। ডিনারের ব্যাপক আয়োজন। আমরা তো ভয় পাচ্ছি আবারও হরেক রকম খাবার খেতে হবে কিনা। ঠিক তাই। স্থানীয় নেতারা কে কত ভালো খাবারের আয়োজন করবেন- তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আমরা তিন সাংবাদিক সাদা ভাত আর মাছের আয়োজন থাকলে দিতে বললাম। কিন্তু তা না থাকায় ওই খাবারই খেলাম সামান্য পরিমাণে। সকালে প্ল্যাটফরমেই বড়সড় জনসভা। ট্রেনে মাইক বেঁধে নেতারা বক্তৃতা করলেন। অতঃপর ব্রেকফাস্ট। আবারও একই চিত্র। সেখান থেকে ট্রেনযোগে রংপুর। দুপুরের খাবার সেখানে। এবারে আয়োজক স্বয়ং যাদু মিয়া। তিনিই বা কমে ছাড়বেন কেন? একই ধরনের আয়োজন তাঁরও। নিশ্চিন্তে খেলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব আগের মতোই। তবে যাদু মিয়া আমাদের জন্য মাছ-ভাতের আয়োজন রেখেছিলেন, মহা আনন্দে খেলাম।

রংপুরের জনসভা শেষে আমি রাতেই রাতের খাবার শেষে ট্রেনযোগে ঈশ্বরদী রওনা হলাম পাবনার পথে। অন্য সবাই ভোরে ওখান থেকে ঢাকা যাবেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রচ- ভক্ত ছিলাম। অবশ্য ’৬২-এর পর থেকে তাঁর চীন সমর্থক (আইয়ুবের প্রতি দুর্বল এবং পরে ছয় দফার বিরোধিতা) রাজনীতির কারণে রাজনৈতিক ব্যবধান রচিত হলেও তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে আজও আমার মনে কোনো প্রশ্ন নেই। সম্ভবত ১৯৫৭ সালের গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে মিসরের কর্নেল নাসেরের আমন্ত্রণে তিনি কায়রো গেলেন। বিপুল সংবর্ধনা পেলেন কায়রো বিমানবন্দরে। তাঁকে রাখা হলো আন্তর্জাতিক মানের হোটেল আলেকজান্দ্রায়। হঠাৎ একদিন পাবনার বাসায় ডাকযোগে একটি চিঠি পেলাম কায়রো থেকে। খুলে দেখি মওলানা ভাসানীর নিজ হাতে লেখা। দুর্ভাগ্য, চিঠিটি আজ নেই। যা হোক, তিনি লিখেছেন, দেশে ফিরে তিনি জানাবেন। আমি যেন রংপুর জেলার মাইনকার চরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। অনেক জরুরি কথা আছে।

ইত্তেফাক প্রতিনিধি ভাসানীভক্ত মাহমুদ আলম খানকে সঙ্গে নিয়ে মাইনকার চরে গেলাম। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল।

কাঁচা বাড়িতে ঢুকে দেখি মওলানা ভাসানী লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছেন। দেখেই বললেন, হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আগে খাওয়া পরে কথা। একটি মাদুর পেতে মওলানা সাহেবের সঙ্গে বসলাম খেতে। অতি সাধারণ খাবার। ভাত, ডাল, সবজি ও মাছ- সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা কাঁচা পিয়াজ। তবে পরিমাণে প্রচুর খেলেন তিনি। কিন্তু যখন তাঁর সঙ্গে নানা জায়গায় টুরে গিয়েছি তখন স্থানীয় আয়োজন হতো রাজকীয় ধরনের। তাতেও মওলানা সাহেব কম যেতেন না। দিব্যি খেয়ে যেতেন বেশ ভালো পরিমাণেই। তবে যখন যেমন তখন তেমন এমনই ছিল তাঁর খাদ্যাভ্যাস। এবার বলি বঙ্গবন্ধুর কথা। সুযোগ হলেও তাঁর খাওয়া বিশেষভাবে কখনো খেয়াল করিনি। তিনি ভারী ও হালকা যখন যা পেতেন তা-ই খেতেন।

১৯৬৭ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে তিনি দেওয়ানি ওয়ার্ডে, আমি পুরাতন ২০ নম্বর সেলে। একদম সামনাসামনি। ভাবি বেগম ফজিলাতুন্নেছা ও শেখ হাসিনা একদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্টারভিউতে এসে অতি সুস্বাদু নানা ধরনের খাবার দিয়ে যান। রাতে বঙ্গবন্ধু সব আইটেমের বেশ ভালো পরিমাণে আমার জন্য পাঠালেন। পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেলাম। ভাবির হাতের অসাধারণ সুস্বাদু রান্না। জানি না, ওই ধরনেরই ছিল কিনা বঙ্গবন্ধুর দৈনন্দিন খাবার। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সহকর্মী হিসেবে ছিলাম ১৯৫৭ সাল থেকে ’৯৩ সাল পর্যন্ত। এ দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তাঁর সঙ্গে নানা স্থানে সভা-সমিতি-সম্মেলন উপলক্ষে সফরও করেছি।

তাঁর খাবার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। খুবই স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। আজীবন অতি সাধারণ খাবার খেয়েছেন। বিভিন্ন জেলায় সফরকালে দলীয় নেতারা পোলাও-বিরিয়ানি ভুরিভোজের আয়োজন করলে তিনি খেপে যেতেন। তিনি খেতেন সাদা ভাত, সবজি আর মাগুর মাছের ঝোল এবং হালকা মসলায় রান্না মুরগির মাংস। তিনি বেঁচেও গেছেন সব নেতার চেয়ে বেশি দিন।

লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ।

সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন