নেতৃত্বে সৃজনশীলতা আনতে হবে

প্রকাশিত: ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

নেতৃত্বে সৃজনশীলতা আনতে হবে

নূরে আলম সিদ্দিকী :: এ দেশে একশ্রেণির তথাকথিত ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বনামধন্য। তাদের দু-একজন ব্যতিক্রম বাদে অন্যরা নিষ্প্রভ নক্ষত্রের মতো ম্রিয়মাণ। তাই পরচর্চা ও পরনিন্দা করে তারা জাজ্বল্যমান হতে চান। এদের অনেকের পেশা কী, উপার্জনের মাধ্যম কী তা সর্বজনজ্ঞাত নয়। তবে নৈমিত্তিক জীবনে তারা বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন এবং বিলাসী জীবন যাপন করেন। কেউ কেউ আবার ফ্যাশন হিসেবে বিশেষ পোশাক পরিধান করেন। মানুষ, বিশেষ করে সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। ভাগাড়ে মরা গরু ফেলে দিলে অজানা স্থান থেকে যেমন শকুন উড়ে এসে ভাগাড়ে পড়ে এবং মহানন্দে মরা গরুর মাংস ভক্ষণ করতে থাকে, কিচিরমিচির করে খুশিতে গান গাইতে থাকে, কখনো কখনো পরম আহ্লাদে নৃত্য করতে থাকে- ছোটবেলায় এই দৃশ্য দুু-একবার চোখে পড়েছিল। আমাদের এক বন্ধু সেই ছোটবেলা থেকেই রগচটা, বদরাগী কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্টভাষী। শকুনের মাংস ভক্ষণের প্রাক্কালে অথবা ভক্ষণ শেষে পরিতৃপ্ত চিত্তের নৃত্য দেখে সে খুব ক্ষিপ্ত হয়ে যেত। রূঢ় ও কর্কশ ভাষায় এমনভাবে কথা বলত যেন কোনো সহপাঠীর সঙ্গে ঝগড়া করছে। সে আজ দেশের বাইরে, সুদূর আমেরিকায়। নইলে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের অপভ্রংশের এই নিত্যদিন সুযোগের সন্ধানে থেকে মানববন্ধনের মাঝে সেঁধিয়ে পড়ার প্রবণতাকে কঠোর সমালোচনায় তুলাধোনা করত। তারা ওত পেতে থাকেন নতুন নতুন ইস্যুর সন্ধানে। এসব পেশাদার মানববন্ধনকারীর উপস্থিতি ক্ষেত্রবিশেষ দাবি-দাওয়া আদায়ে সাহায্য তো করেই না, বরং মানববন্ধনের গুরুত্ব অনেকটা কমিয়ে আনে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা পরম আহ্লাদে গদগদ হয়ে পরদিন পত্রিকায় তাদের ছবি দেখেন এবং কৃতার্থ হন। যারা মানববন্ধন করেছিলেন, তাদের দাবি-দাওয়া পূরণ হলো কিনা বা উদ্দেশ্য হাসিল হলো কিনা তার খোঁজখবর রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন না। কারণ সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে ছবি প্রদর্শনই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা বেশ ভালোই আছেন। সংবাদমাধ্যমের ওইসব ছবি দেখে অনেক শিল্পপতি তাদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বন্ধ করার অভিপ্রায়ে তথাকথিত সুশীলসমাজের ওই প্রতিনিধিদের অতি সঙ্গোপনে কিছু ধরিয়ে দেন। বোধকরি, এর চেয়ে সহজ উপার্জন বাংলাদেশে আর নেই। এ যেন সোনায়-সোহাগা। টু-পাইস আয়ও হলো, নামও ফাটল। মূল দাবি-দাওয়া উত্থাপনকারীদের কোনো সুরাহা হলো না। তাদের সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেল।

কারণ তথাকথিত এসব বুদ্ধিজীবীর শিকড় মাটিতে গ্রোথিত নয়। তারা শখের পায়রা বা সিজনাল বার্ড। তাই সত্যিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেই নির্মোহচিত্তে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যাদের দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা আছে, যাদের জবাবদিহির প্রশ্নটাও উঠে আসে, তাদেরই এ দায়িত্বটি নিতে হবে। উদ্ভূত যে কোনো সমস্যা, সে দুর্নীতি, ইয়াবা বা ক্যাসিনো যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে সাময়িক ফায়দা লোটা নয়, বরং সমাজকে সম্পূর্ণরূপে এসব ক্ষয়রোগ থেকে নিরাময় করার দক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার শক্তি ও মানসিকতা থাকতে হবে।
আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অত্যাসন্ন। কোনো বাধা-বিপত্তি বা ব্যত্যয়-ব্যতিক্রম না হলে আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। এ কাউন্সিলকে ঘিরে তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশার আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের শুধু স্বাধীনতা অর্জনই নয়, ভাষা আন্দোলন থেকে শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু আওয়ামী লীগ মূলত তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আন্দোলনের সৃষ্টি ও সফলতায় এর নেতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন মুখ্য। সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের ভূমিকা অত্যন্ত দুর্বল ও গৌণ ছিল। আন্দোলনের সৃষ্টি ও সফলতায় এমনকি শেখ মুজিবকে একটি অন্যতম রাজনৈতিক নেতা হতে বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনকের উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া ও প্রতিস্থাপিত করার মূল কারিগর ছাত্রলীগই। তবু স্বীকার করতেই হবে, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেই ছয় দফা কর্মসূচিটি লাহোরের গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। বিরোধী দলগুলোর মোর্চা এবং ওই গোলটেবিল বৈঠকে ছয় দফা কর্মসূচিটি গৃহীত হয়নি। বরং এনজাম লাগিয়েছে শেখ মুজিব আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সুকৌশলে ছয় দফা দাবিটি উত্থাপন করেছেন। আন্দোলনের গতি স্তিমিত বা স্তব্ধ করাই তার উদ্দেশ্য। ন্যাপ নেতা রংপুরের মশিউর রহমান যাদু মিয়া ছয় দফা উত্থাপনের দায়ে শেখ মুজিবের ফাঁসি দাবি করে বসলেন। ন্যাপসহ তৎকালীন বিরোধী দলের অনেক নেতাই তারস্বরে চিৎকার করতে থাকলেন। কেউ বললেন, শেখ মুজিব ভারতের দালাল, কেউ আবার শেখ মুজিবকে আইয়ুবের অনুচর বলতেও দ্বিধা করলেন না। অন্যদিকে আইয়ুবসহ পশ্চিম পাকিস্তানের সব দলের শীর্ষ নেতারা ছয় দফার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে তীব্র বিরোধিতা করতে শুরু করলেন। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগে ছয় দফার পক্ষে কার্যনির্বাহী কমিটিতে সমর্থন সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। তখনকার প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ কায়মনোবাক্যে ছয় দফাকে সমর্থন করলেও ছয় দফার প্রশ্নে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগেও শেখ মুজিব নিরঙ্কুশ ছিলেন না।

অবস্থাদৃষ্টে শেখ মুজিব ছাত্রলীগ সভাপতি মাযহারুল হক বাকী এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে ডেকে বিনম্র ও প্রত্যয়দৃঢ় চিত্তে ছয় দফার সব দায়দায়িত্ব তুলে দেন। যার ফলে ছয় দফাই তখন ছাত্রলীগের মূল কর্মসূচিতে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসার ছাদে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় ছয় দফা উপস্থাপনের পর আওয়ামী লীগের ভাবগতি অবলোকন করে একদিকে ছাত্রলীগের দিকে ঝুঁকে পড়েন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করে আওয়ামী লীগের কায়েমি নেতৃত্বের চক্রকে ভেঙে ফেলে অপেক্ষাকৃত নতুন নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে বিস্তীর্ণ রাজনৈতিক পথ পরিক্রমণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক এবং মিজানুর রহমান চৌধুরী সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এখানে পুনরুল্লেখ প্রয়োজন, ইডেন সম্মেলনের আগে শেখ মুজিব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সে যাই হোক, ইডেন সম্মেলন শেখ মুজিবকে একগুচ্ছ তরুণ তাজা-তপ্ত-প্রাণ শুধু উপহারই দিল না, বরং কাউন্সিলে সর্বসম্মতভাবে ছয় দফা প্রস্তাবটি গৃহীত হলো। সেই কাউন্সিলে উপস্থিত কাউন্সিলরদের চোখে-মুখে একটি দৃপ্ত শপথ, প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যয় পরিলক্ষিত হয়েছিল। যেটি শেখ মুজিবকে বিস্তীর্ণ পথ পরিক্রমণে স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার পথে চলতে শুধু অনুপ্রেরণাই জোগায়নি, বরং সমস্ত বাধাবিঘ্ন, অন্তরায়, নির্যাতন-নিগ্রহ উপেক্ষা করে, জেলজুলুম এমনকি ফাঁসির আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দিয়ে ছয় দফার তরণিটিকে সফলতা, অর্থাৎ স্বাধীনতার তীরে নোঙর করাতে সক্ষম হয়েছে।

আমি আগেও বলেছি, বহুবার বলেছি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলতেই থাকব যে, ছয় দফার এই বিশাল ও বন্ধুর অভিযাত্রায় তার প্রাণের মূলশক্তি, হৃদয়ের ধড়কানি এবং চিত্তের দৃঢ়তার উৎস ছিল ছাত্রলীগ। তখনকার ছাত্রলীগ ছয় দফাকে মাথায় নিয়ে ফেরিওয়ালার মতো শহরে-বন্দরে গ্রামেগঞ্জে বাংলার নিভৃত কন্দরে কন্দরে শুধু ছুটেই বেড়ায়নি, বরং এর সফলতাকে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। শেখ মুজিব, বাংলার স্বাধীনতা ও ছাত্রলীগ প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। একই কবিতার তিনটি পঙ্ক্তি। এই কবিতা বাংলার মানুষের চিত্তকে বিমুগ্ধ করেছে, তাদের জাগ্রত করেছে, ‘উদ্যত-উদ্গত-উদ্ধত পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো’ বিকশিত করেছে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে, শেখ মুজিবের কর্তৃত্বে।

আমার উপলব্ধিপ্রসূত বক্তব্য, শেখ মুজিব, স্বাধীনতা ও ছাত্রলীগ- এ তিনটি শব্দই একটি অন্যটির পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যগুলো পরিপূর্ণ হয় না, বরং একটি ব্যত্যয় ও অপূর্ণতা সৃষ্টি করে। কথাটি এখানে পুনরুল্লেখ অত্যাবশ্যক মনে করছি এই কারণে, আওয়ামী লীগের সম্মেলন আসন্ন। শেখ হাসিনাসহ কাউন্সিলে নির্বাচিত নেতৃত্বকে প্রোজ্জ্বল মানসিকতায় উজ্জীবিত হতে হবে যে, ছাত্রলীগ তাদের অনুপ্রেরক শক্তি, ছাত্রলীগের রথ সামনের দুর্গম পথ অকুতোভয়ে নির্মোহচিত্তে অতিক্রম করবে। নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কোনো ক্ষেত্রেই এই সফল ও সাবলীল ছাত্র সংগঠনটিকে অঙ্গসংগঠন হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টায় ব্যাপৃত হবেন না। আদর্শের একটি নির্দিষ্ট ধ্রুবতারার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার কালজয়ী সংগঠন ছাত্রলীগকে তার অনির্বাণ ও অম্লান আদর্শকে অক্ষুণœ রেখে চলতে দেবেন, তবে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সম্মানের কোনো ঘাটতি থাকবে না।

আওয়ামী লীগ জনসমর্থনসমৃদ্ধ নির্বাচনমুখী একটি সংগঠন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় কর্মীসমৃদ্ধ প্রাণোচ্ছল সংগঠন হলো আওয়ামী যুবলীগ। আওয়ামী যুবলীগের তরুণ তাজা-দীপ্ত-প্রাণ নেতা-কর্মীদের অবগতির জন্য জানানো প্রয়োজন যে, ১৯৭৩ সালের রাজনৈতিক সংকটের কালে যুবলীগের জন্ম হয়েছিল, সেই সংকট মোকাবিলা ও জাসদের গণবাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা ও হত্যাযজ্ঞের বীভৎসতাকে প্রতিরোধ করার জন্য। ঈদের জামাতে কুষ্টিয়ার সংসদ সদস্য কিবরিয়া হত্যা, রাজবাড়ীর সংসদ সদস্য হেদায়েত উল্লাহকে ইটভাটায় পুড়িয়ে হত্যা করে গণবাহিনীর সদস্যরা চরম দানবীয় উল্লাসে মেতে উঠল। তাদের দৌরাত্ম্য ও আতঙ্কে দেশবাসীর যখন দিশাহারা হয়ে ম্লান মূক মুখে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হলো, তখন প্রান্তিক জনতার ভগ্ন হৃদয়ে আশার আলো প্রজ্বালিত করেছিল যুবলীগ- তার জন্মলগ্ন হতেই।

আজকের প্রজন্মের কাছে মুুছে দেওয়া হয়েছে যে, আমি যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলুল হক মণির নাম কেবল সর্বজনবিদিতই নয়, অন্যদের নাম ও অবদান এতটাই বিস্মৃত হতে চলেছে যে, ইতিহাসও হয়তো তাদের খোঁজ পাবে না। অথচ কে না জানে, শেখ ফজলুল হক মণি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন না। তার শখ ও স্বপ্ন ছিল মানিক মিয়া হওয়া। তাই স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বাংলার বাণী পত্রিকার মাধ্যমে তিনি শুধু সাংবাদিকতার জগতেই নয়, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনের রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সেখান থেকে সরিয়ে এনে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে শামিল করানো খুবই কঠিন ও দুরূহ কাজ ছিল। সৈয়দ সুলতান শরীফ, ড. আলী হায়দার, মেজবাহউদ্দীন আহমেদ, মোস্তফা মহসীন মন্টু, কাজী ফিরোজ রশীদ, প্রকৌশলী আবদুল হান্নান, সাংবাদিক আবদুর রাজ্জাক, অধ্যাপক সবক্তুগিন মাহমুদ, ডা. আলী হাফিজ সেলিম ও আমি বিভিন্নভাবে নানা প্রক্রিয়ায় বুঝিয়ে-সুুঝিয়ে বলতে গেলে পটিয়ে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সক্রিয় করার জন্য যুবলীগ গঠন ও তার নেতৃত্ব গ্রহণে তাকে উজ্জীবিত করি। শেখ ফজলুল হক মণি চেয়ারম্যান, সৈয়দ সুলতান শরীফ, শেখ হায়দার আলী প্রথম সম্মেলনে প্রেসিডিয়াম মেম্বার করা হয়েছিল। সম্ভবত কাদের সিদ্দিকীও প্রেসিডিয়ামে তালিকাভুক্ত ছিলেন। যুবলীগ তখনকার যুবশক্তিকে প্রচ-ভাবে আলোড়িত করে। ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে আসা বা ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতৃত্ব যুবলীগের দৃপ্ত পথ পরিক্রমণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। যুবলীগের লক্ষ্য ছিল মূলত তিনটিÑ গণবাহিনীর ঔদ্ধত্যকে প্রতিরোধ করা, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা প্রদান এবং যুবশক্তিকে দেশ ও জাতির বিনির্মাণে শক্ত ও সক্রিয় সহায়ক শক্তিতে পরিণত করা, যাতে তারা যৌবনের উন্মাদনায় বিশৃঙ্খল না হয়ে পড়েÑ সেই লক্ষ্যে নানামুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি তৈরি করা। আজকে বিরোধী দলের রাজনীতির সক্রিয় আন্দোলন তেমন চোখে না পড়লেও সরকারকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করার জন্য বিরোধী দলের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। আমি যুবলীগকে সরকারের বিরোধী-দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বলছি না। তবে মাদক, দুর্নীতি ও সামাজিক অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তারা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। অথচ ক্যাসিনো ও দুর্নীতির সঙ্গে যুবলীগের প্রাক্তন চেয়ারম্যানের যোগসূত্রের কথা সমগ্র দেশ ও জাতিকে মর্মান্তিকভাবে হতাশ করেছিল। শেখ হাসিনা অবস্থাটি সম্যক উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তড়িঘড়ি যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানে সাবেক কমিটিকে বাধ্য করেন এবং একগুচ্ছ নতুন নেতৃত্ব সামনে নিয়ে আসেন। পদক্ষেপটি প্রশংসনীয় হলেও পরশকে রাজনীতির বাইরে থেকে টেনে এনে চেয়ারম্যান পদে আসীন করিয়ে তার পারিবারিক প্রভাবকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন বটে, তবে পারিবারিক বন্ধনের যে উগ্র মানসিকতা প্রতিভাত হয়েছে, জাতি তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। পরশ যদি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকত, তাহলে এই প্রশ্নের অবতারণা হতো না। পরশ শিক্ষিত এবং সজ্জন। প্রাক্তন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী পরশের আপন ফুফা হওয়া সত্ত্বেও সে একজন সৎ ও ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, ছাত্রলীগের অগণিত প্রাক্তন নেতৃত্বের মধ্য থেকে একজনও যুবলীগের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য যোগ্য ছিল না? তবে কেন এই উগ্র পরিবারতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে? যুবলীগ ও ছাত্রলীগে নেতৃত্ব গঠনে বঙ্গবন্ধুর মনন ও মানসিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। তবে কখনই তিনি সরাসরি কোনো নেতৃত্ব চাপিয়ে দেননি। এই ঔদার্যই তাঁর প্রতি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের আনুগত্যকে শর্তহীন করেছে। তাই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পদবঞ্চিত ব্যক্তিত্বরা বিক্ষুব্ধ হলেও বিদ্রোহী হননি। এটা নেতৃত্বের একটা বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, এই বৈশিষ্ট্য ভিন্নমাত্রার এবং গৌরবের। ছাত্র ও যুবসমাজকে একটা বিদগ্ধ চিত্তে উজ্জীবিত করার যে সম্মোহনী ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর ছিল, শেখ হাসিনাকে অবশ্যই তা উপলব্ধি করতে হবে এবং আগামীতে সেই আলোকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ না করুন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে দুর্দিনের ঝড় এলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীরাই সেই ঝড়কে রুখতে পারবে। যত ঘনিষ্ঠই হোক, কোনো অরাজনৈতিক সত্তার পক্ষে সে ঝড় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ