গল্পে গল্পে ইতিহাস, মহামারীরা ছিল ৭ বোন

প্রকাশিত: ৩:১৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২০

গল্পে গল্পে ইতিহাস, মহামারীরা ছিল ৭ বোন

আনোয়ার হোসেন রানা :: এই ৭ বোনের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বোন ছিল কলেরা। যার জন্ম হয় ১৬৪২ সালের দিকে ইউরোপে। খুব অপরিষ্কার ছিল কলেরা। সে উত্তর আমেরিকা, ভারতসহ নানা দেশে ভ্রমণ করতে লাগলো। অস্বাস্থকর স্যানিটেশনে ছিল যার বসবাস। সুযোগ পেলে তখনকার মানুষদের শরীরে মিশে যেত ক্ষতি করতে। মানুষ তো বিপাকে পড়লো এই মহামারীতে। সারাবিশ্ব উঠে পড়ে লাগলো কলেরার বিয়ে দিতে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও কলেরাকে দমন করতে পারবে এমন ছেলে খুঁজে পাচ্ছিল না। শেষমেশ পাওয়া গেল এক সুযোগ্য পাত্র, যে কলেরাকে রুখতে পারে। তার নাম ডুকরাল।

ডুকরাল হলো একমাত্র পানীয়যোগ্য ভ্যাকসিন যা মানুষকে কলেরা এবং ডায়রিয়ার বিরুদ্ধে ইটেকের দ্বারা সৃষ্ট সুরক্ষা সরবরাহ করে। কলেরার বোন যক্ষ্মা, মানুষকে নাজেহাল করাই যার শখ ছিল। মানুষের মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করলো যক্ষ্মা। বড় বোন কলেরার অভাব দূর করতে মানব শরীরে বাসা বাধাই ছিল তার উদ্দেশ্য।

যক্ষ্মাকে ক্ষয়কারকও বলা হয়, যে শরীরে প্রবেশ করে তাকে রোগা করাই তার কাজ। তারপর বিয়ে হলো যক্ষ্মার। পাত্রের নাম ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুয়েরিন বা (বিসিজি)। এই টিকা জন্মের পরই শিশুকে দেয়া উত্তম। ১৬৮৯ সনে জন্ম হলেও ধারনা করা হয় যক্ষ্মার জন্ম তারও আগে। আর নামকরণ হয় ১৮৩৯ সালের দিকে। এখনো সারা বিশ্বে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ খেয়ে যক্ষ্মা তার অবস্থান নিশ্চিত করে রেখেছে।

কলেরা, যক্ষ্মার আরেক বোন হিংসুটে নিউমোনিয়া যার থাবায় অক্সিজেন গ্রহণ এবং নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই বোনের মূল টার্গেট ছিল বয়স্ক মানুষজন। যারা এমনিতেই ফুসফুস জনিত রোগে আক্রান্ত। আবার শিশুদেরও রক্ষা নেই। এখনো সারাবছর বিশ্বে প্রায় ৯ লাখ শিশু মারা যায় নিউমোনিয়ায়। আফ্রিকার দেশগুলোতে এটার স্থায়ী বসবাস।

সাধারণত ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ঠাণ্ডা, ভাইরাস, কেমিক্যাল ফেলেই তিনি থাবা মেলেন পৃথিবীর বুকে। ১৮৭৫ সালে সর্বপ্রথম একজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ১৯১৮ সনের দিকে নিউমোনিয়াকে প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে নামকরণ করা হয়। আধুনিক মেডিসিনের জনক স্যার উইলিয়াম ওস্লের নিউমোনিয়াকে বলেছেন, ক্যাপ্টেন অব দ্যা মেন অব ডেথ।

১৯০০ সালের দিকে পেনিসিলিনের সঙ্গে নিউমোনিয়ার বিয়ে হয়। পেনিসিলিন হলো এক প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক, যার দ্বারা ছত্রাকের ইনফেকশন দূর করা শুরু হয়। নিউমোনিয়ার মত মহামারীর আরেক বোন হলো হাম। অনেকে তাকে রুবেলা কিংবা জার্মান মিজলস বলেও জানে। এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। হাম হলে শরীরে লালচে র‍্যাশ দেখা যাবে, জ্বর হবে, ক্লান্ত লাগবে।

যার জন্ম হয় আনুমানিক ১৭৪০ সালের দিকে। হামের প্রধান টার্গেট ছিল শিশুরা। ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাবু করাই ছিল হামের কাজ। তবে হামের এমন একজনের সংসারে গিয়ে পড়েছে সে হামকে পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যার নাম রুবেলা ভ্যাকসিন। হাম যার একবার হবে এবং সে যদি সুস্থ হয়ে যায় তাহলে জীবনে তার দ্বিতীয়বার হাম হবার আশঙ্কা থাকে না।

মহামারীর পঞ্চম বোনের নাম গুটি বসন্ত, স্মলপক্স। কারো হয় জলবসন্ত কারো হয় গুটি বসন্ত। এটি ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। এটি মানুষের জীবনে নাকি অন্তত একবার হয়। শরীরে ছোট ছোট গুটির মত দেখা যায় বলে অনেকে বলে গুটি বসন্ত, পরবর্তীতে একটু একটু দাগের সৃষ্টি করে। গুটি বসন্তের জন্ম হয় প্রায় ৯০০ খ্রিস্টাব্দে। আল রাজী প্রথমে বর্ণনা করেন গুটি বসন্তের। তবে ইউরোপে পৌঁছাতে বসন্তের অনেক সময় লাগে। প্রায় ১৬৬৬ সালের দিকে ইউরোপে পাড়ি জমায় স্মলপক্স। পরবর্তীতে ইমভেনেক্স ভ্যাকসিন দিয়ে এই মহামারী বোনটিকে দমন করা হয়।

ইবোলার জন্ম হয় ১৯৭৬ সালের দিকে মধ্য আফ্রিকায়। যা সাধারণত আক্রান্ত পশু থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। কলাবাদুড় ও বানর থেকে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। ইবোলা এই সাত বোনের মধ্যে একটু ভিন্ন। বাতাসে ছড়ায় না এবং ছোঁয়াচেও না। কেবলমাত্র লালা, রক্ত, বমি থেকে অন্য দেহে ছড়াতে পারে। কঙ্গোর ইবোলা নদীর নাম থেকে ইবোলা ভাইরাসের নাম রাখা হয়। ইবোলা সারা বিশ্বে মহামারীর রাজত্ব করতে না পারলেও ২০১৪ সালের দিকে আফ্রিকায় বড় ধরনের হানা দিতে সক্ষম হয়। ইবোলার সুনির্দিষ্ট কোন ভ্যাকসিন আজও বের হয়নি। তবে আমেরিকার তৈরি একটি ভ্যাকসিন প্রয়োগে ভালো ফল পাওয়া গেছে। এটির নাম রিকম্বিনান্ট ভেসিকুলার স্টোমাটাইটিস ভাইরাস বা আরভিএসভি-জেবিওভি। যা ইবোলা ভ্যাকসিন নামে পরিচিত।

মহামারীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বোন হসো পোলিও। যার জন্ম ১৮৪০ সালের দিকে। জার্মানির একজন ডাক্তার জ্যাকব হেইন পোলিও সনাক্ত করেন। এক ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। শতকরা ৯৫ আক্রান্ত মানুষ প্রথমে বুঝতে পারে না যে তারা আক্রান্ত। এটি সাধারণত স্নায়ুকোষকে আক্রান্ত করে ফেলে। পোলিও শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজবেল্ট পোলিও আক্রান্ত ছিলেন।

১৯১০ সালের দিকে মূলত পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে এই মহামারীর দিন সেদিনই শেষ হলো যেদিন প্রথম পোলিওর টিকা আবিষ্কার করা হয়। ১৯৫০ সালে পোলিওর জন্য টিকা তৈরি হয়। যেটি তৈরি করেন আমেরিকান চিকিৎসক, গবেষক স্যার জোনাস সাল্ক।

বর্তমানে আইপল এবং পোলিওবক্স নামে বাজারে ভ্যাকসিনটি পাওয়া যায়। তবে মহামারীর বংশ বিস্তার এখানেই থেমে থাকেনি। পর্যায়ক্রমে তাদের বংশ বিস্তার চলছে। নিত্য নতুন নামে ভাইরাসের মাধ্যমে তারা দখলে নিতে চায় মানব সভ্যতা। সচেতনতা, আধুনিক চিকিৎসা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাই পারবে মানব জাতীকে এইসব মহামারী থেকে রক্ষা করতে।

লেখক: আনোয়ার হোসেন রানা, কম্পিউটার প্রকৌশলী, ফেনী
সৌজন্যে: যুগান্তর

আমাদের ফেইসবুক পেইজ