পবিত্র শাবান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

প্রকাশিত: ১:৪০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২০

পবিত্র শাবান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ এহছানুল হক মুজাদ্দেদী :; হিজরি সনের অষ্টম মাস শাবান। শাবান আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো- শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হওয়া। রজব ও রমজান মাসের মাঝামাঝি শাবান মাসের অবস্থান। শাবান মাসজুড়ে আল্লাহতায়ালার অবিরাম রহমত ও বরকত নাজিল হতে থাকে। এ মাসের মধ্য রাতের একটি বিশেষ রজনীর নাম হলো লাইলাতুল বরাত। হজরত রসুলে আকরাম (সা.) শাবান মাসকে নিজের মাস বলে ঘোষণা করেছেন। নেককার বান্দারা রমজান মাসের পরিপূর্ণ বরকত লাভের উদ্দেশ্যে রজব মাস থেকেই ইবাদতের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন।

রজব মাস হলো মুমিনের ইবাদতের বীজ রোপণের মাস। শাবান মাস হলো বান্দার চোখের পানি দিয়ে ইবাদতের বীজে সেচ দেওয়ার মাস। আর রমজান হলো ইবাদতের ফসল ঘরে তোলার মাস। শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা, ফরজ নামাজের পাশাপাশি বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা, তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা, তাসবিহ তাহলিল পাঠ করা, দরুদ শরিফ পড়া, জিকির করা, আল্লাহর নেয়ামতের করিয়া আদায় করা, কোরআন তেলাওয়াত করা, এতিম দুস্থদের সাহায্য করা, রোগী দেখতে যাওয়া ও বিপদাপন্ন প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করা উত্তম। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রসুলেপাক (সা.) রজব মাস এলেই দুই হাত তুলে এই দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবাদের পড়তে বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবাও ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রমাদ্বান।’ (মসনদে আহমদ)। অর্থ : হে আল্লাহ রজব আর শাবান মাসে আমাদেরকে বরকত দান করুন আর রমজান পর্যন্ত আমাদের জীবিত রাখুন, আমাদেরকে রমজানের ফজিলত অর্জন করার তৌফিক দান করুন। বায়হাকি শরিফে বান্দার দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে পাঁচটি বিশেষ রাতের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। পাঁচটি রাতের প্রথমটি হলো জুমার রাত, দ্বিতীয় হলো ঈদুল ফিতরের রাত, তৃতীয় হলো ঈদুল আজহার রাত, চতুর্থ হলো রজব মাসের প্রথম রাত এবং পঞ্চম হলো মাহে শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত।
নবী করিম (সা.) শাবান মাসের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও তাৎপর্যের বিবেচনায় এ মাসে অধিক হারে নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন। মাহে রমজানের মর্যাদা রক্ষা এবং হক আদায়ের অনুশীলনের জন্য রসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন। এ সম্পর্কে হজরত আনাস (রা.) বলেছেন, নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো- ‘আপনার কাছে মাহে রমজানের পর কোন মাসের রোজা উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘রমজান মাসের সম্মান প্রদর্শনের জন্য শাবানের রোজা উত্তম।’ (তিরমিজি)। মাহে রমজানে দীর্ঘ ৩০টি রোজা পালনের কঠিন কর্মসাধনা সহজে আদায় করার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শাবান মাসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে ‘রসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় মাসের একটি হলো শাবান। এ মাসে নফল রোজা আদায় করেই তিনি মাহে রমজানের রোজা পালন করতেন।’ (আবু দাউদ)।

মানবজীবনের সব কালিমা দূর করার বিশেষত্ব নিয়ে লাইলাতুল কদরের মাস রমজানুল মোবারক আসে শাবান মাসের সমাপ্তির পরই। তাই এ গুরুত্ববহ মাস সারা বিশ্বের মুসলমানদের সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। তাই আসন্ন মাহে রমজানের রোজা শুরু করার আগে শাবান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কিছু নফল রোজা রাখা দরকার, যাতে করে মাহে রমজানের রোজা পালন সহজ হয় এবং লক্ষ্যও ঠিকমতো অর্জিত হয়।

দেখা যায়, বেশ কয়েকটি হাদিসে শাবান মাসের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসুল! আপনাকে শাবান মাসে অন্যান্য মাস অপেক্ষা বেশি নফল রোজা রাখতে দেখি।’ এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এ মাস অনেকেই খেয়াল করে না। এটি এমন একটি মাস, যে মাসে সব মানুষের আমলনামা মহান আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হয়। তাই আমি চাই এমন সময়ে আমার আমলনামা আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা হোক, যখন আমি রোজা অবস্থায় রয়েছি।’ (নাসাঈ ও আবু দাউদ)।

শাবান মাসে শবেবরাত নামে বিশেষ একটি রজনী আছে, যে রজনীতে বান্দার সারা বছরের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং আগামী এক বছরের জন্য বান্দার হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত ইত্যাদির নতুন ব্যবস্থা দেওয়া হয়। যে কারণে শাবান মাসকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাদিস শরিফে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত আগমন করে, আল্লাহতায়ালা বান্দাদের দিকে মনোযোগ দেন এবং মুমিন বান্দাদের ক্ষমা করে দেন, আর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেন (যতক্ষণ না তারা তওবা করে সুপথে ফিরে আসে)’ (বায়হাকি)। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রজনীতে তার সৃষ্টির (বান্দাদের) প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন, তবে তারা ব্যতীত যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করে এবং অপরকে ক্ষতিসাধনের বাসনা পোষণ করে।’ (ইবনে হিব্বান)।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের থাবা, তাই আসুন!! আমরা এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা, দান সদকা, কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, নবীজির দুরুদ, পবিত্র শবেবরাত পালন করি। আমিন!! বিহুরমাতি সাইয়্যেদিল মুরসালিন।

লেখক : বেতার, টিভির ইসলামী উপস্থাপক, এমফিল (গবেষক)।
সেৌজনে্‌্য : বাংলাদেশ প্রতিদিন

আমাদের ফেইসবুক পেইজ